Loading...
You are here:  Home  >  ইউরোপ  >  Current Article

আধুুনিক তুরস্ক ও এরদোগান

329366_153

সৈয়দ মাসুদ মোস্তফা : তুরস্কের প্রেসিডেন্ট এরদোগানের মতো বিশ্ব রাজনীতিতে এমন নাটকীয় উত্থান সচরাচর দেখা যায় না। তিনি তার বুদ্ধি, প্রজ্ঞা, দূরদর্শিতা ও ক্যারিশমাটিক নেতৃত্বের মাধ্যমে যেমন একজন বিশ্বনেতায় পরিণত হয়েছেন, ঠিক তেমনিভাবে আধুনিক তুরস্ককেও বিশ্ব দরবারে মর্যাদার আসনে দাঁড় করিয়েছেন। নতুন রাজনৈতিক দল গঠন ও অভাবনীয় সাফল্যের মাধ্যমে রাষ্ট্রক্ষমতার শীর্ষে পৌঁছলেও রাজনীতিতে তার পদচারণা মোটেই নির্বিঘ্নে ছিল না অনেক ঘাত-প্রতিঘাতের মাধ্যমেই তাকে এই পর্যায়ে আসতে হয়েছে। এই বাধা-প্রতিবন্ধকতা বরঞ্চ তাকে তুরস্ক তথা বিশ^রাজনীতির অবিসংবাদিত নেতা হিসেবে আবির্ভাবে সহায়তা করেছে।

১৯৯৮ সালে সেকুলার সরকার ওয়েলফেয়ার পার্টি নিষিদ্ধ ঘোষণা করলে বিক্ষোভে অংশ নেন তদানীন্তন ইস্তাম্বুলের মেয়র রজব তাইয়েব এরদোগান। বিক্ষোভে একটি কবিতা আবৃত্তির কারণে সরকারের রোষানলে পড়েছিলেন তিনি। কবিতাটি ছিল, ‘মসজিদ আমাদের ক্যান্টনমেন্ট, গম্বুজ আমাদের হেলমেট, মিনার আমাদের বেয়নেট আর বিশ্বাসীরা আমাদের সৈনিক।’ এ জন্য কয়েক মাস জেল খাটতে হয় তাকে। একই সাথে পড়তে হয় রাজনৈতিক নিষেধাজ্ঞার কবলে। কেড়ে নেয়া হলো মেয়র পদও। পরে ২০০১ সালে আবদুল্লাহ গুলসহ কয়েকজন নেতাকে নিয়ে প্রতিষ্ঠা করেন জাস্টিস অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট পার্টি সংক্ষেপে যা একে পার্টি নামে পরিচিত। ২০০২ সালে প্রথম পার্লামেন্ট নির্বাচনে অংশ নিয়েই জয়লাভ করে দলটি। বিশ^রাজনীতিতে এমন ঘটনা খুব একটা চোখে পড়ে না।
সম্প্রতি দেশটিতে যুগপৎভাবে প্রেসিডেন্সিয়াল ও পার্লামেন্টারি নির্বাচন হয়ে গেল। আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের প্রচারণা ও নির্বাচনী আবহাওয়া দেখে মনে হয়েছিল তুর্কি প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে বড় ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হচ্ছেন এরদোগান। কিন্তু বাস্তবে এর প্রতিফলন লক্ষ্য করা যায়নি বরং বিপুল ভোটের ব্যবধানে প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হয়ে বিশ্বকে চমকে দিলেন রজব তাইয়েব এরদোগান। সংবিধান অনুযায়ী তিনি অর্ধেকের বেশি ভোট পাওয়ায় প্রথম দফা নির্বাচন শেষেই তাকে বিজয়ী ঘোষণা করা হয়েছে। পার্লামেন্টেও ক্ষমতাসীন একে পার্টি সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়েছে। সদ্যসমাপ্ত নির্বাচনে এরদোগান ছাড়াও ছয়জন প্রার্থী লড়েছেন। নির্বাচনের আগে বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের খবরে বলা হলো, ব্যাপক প্রতিদ্বন্দ্বিতার মুখে পড়বেন এরদোগান। তার বিরুদ্ধে অন্তত দুইজন প্রার্থী শক্ত প্রতিদ্বন্দ্বিতা গড়ে তুলতে পারেন বলেও বিভিন্ন মিডিয়ার খবরে বলা হয়েছে। কিন্তু বাস্তবে দেখা গেছে সম্পূর্ণ বিপরীত চিত্র।

বস্তুত, নির্বাচনে কোনো প্রতিদ্বন্দি¦তাই গড়তে পারেনি তার প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীরা। সব প্রার্থীকে খুব বাজেভাবে হার মানতে হয়েছে এরদোগানের কর্মোদ্দীপনা ও বাঁধভাঙা জনপ্রিয়তার কাছে। নির্বাচনে যে ছয়জন প্রার্থী ছিলেন তারা কেবল প্রচার-প্রচারণাতেই এগিয়ে ছিলেন, কিন্তু ব্যালট বিপ্লবে তাদের ভরাডুবি হয়েছে। তাদের মধ্যে কেবল একজন উল্লেখ করার মতো ভোট পেয়েছেন। রিপাবলিকান পিপলস পার্টির পার্লামেন্টারি দলের নেতা মুহারেম ইনজে। তিনি ভোট পেয়েছেন ৩০ শতাংশের মতো। সংখ্যার হিসেবে তার ভোট এক কোটি ৫৩ লাখের কিছু বেশি, যেখানে এরদোগানের প্রাপ্ত ভোট দুই কোটি ৬২ লাখেরও বেশি।
আরেকজন আলোচিত প্রার্থী ছিলেন মেরাল আকসেনার। তিনি ছিলেন একমাত্র নারী প্রার্থী। ভোটের মাঠে জনপ্রিয়তা না থাকলেও পশ্চিমা মিডিয়ায় তাকে নিয়ে ব্যাপক আলোচনা হয়েছে। তার দলের নাম গুড পার্টি। মেরালের দল রাজনীতিতে নতুন হলেও রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা আছে। ১৯৯৭ সালে আট মাস তুরস্কের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন তিনি। কিন্তু তৃণমূল ভোটারদের কাছে তার জনপ্রিয়তা কেমন সেটা বোঝা গেল ভোটের ফলাফলে, মাত্র ৭ শতাংশ ভোট পেয়ে তার অবস্থান ছয় প্রার্থীর মধ্যে চার নম্বরে।

ভোটের আগে মিডিয়া তাকে এমনভাবে উপস্থাপন করেছে, মনে হয়েছে তিনি শক্তিশালী কোনো প্রার্থী হতে যাচ্ছেন। তৃতীয় অবস্থানে থাকা সেলাহদিন দেমিরতাস পেয়েছেন ৮ শতাংশের মতো ভোট। পঞ্চম অবস্থানে থাকা প্রার্থী তেমেল কারামোল্লাগলু পেয়েছেন এক শতাংশেরও কম ভোট। আর সর্বশেষ অবস্থানের প্রার্থীর ভোট শূন্য দশমিক দুই শতাংশ মাত্র। তার মানে ভোটের আগে বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে শক্ত চ্যালেঞ্জের যে খবর পরিবেশন করা হয়েছিল, বাস্তবে তার দেখাই মেলেনি। গত দেড় দশকে ১৪টি নির্বাচনে অংশ নিয়েছেন এরদোগান। প্রতিটিতেই জয় পেয়েছেন। এর মধ্যে ছয়টি পার্লামেন্ট নির্বাচন, তিনটি গণভোট, তিনটি স্থানীয় নির্বাচন ও দু’টি প্রেসিডেন্ট নির্বাচন।

শুধু তুরস্ক নয়, বর্তমান বিশ্ব াজনীতিতে সবচেয়ে জনপ্রিয় নেতাদের একজন এরদোগান। দেশের সীমানা ছাড়িয়ে সারা বিশ্বের মুসলিমদের মধ্যেও তিনি অসম্ভব জনপ্রিয়। এর কারণ, এক সময়ের খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে চলা তুরস্ককে তিনি পাল্টে দিয়েছেন নিজ প্রজ্ঞা ও কর্মের মাধ্যমে। কামাল আতাতুর্ক দেশটিতে সেকুলারিজমের নামে ইসলাম চর্চার ওপর চরম আঘাত হেনেছিলেন; কিন্তু এরদোগান মানুষকে দিয়েছেন ধর্ম পালনের প্রকৃত স্বাধীনতা। পাশাপাশি, বিশ্বরাজনীতিতেও মুসলিম রাষ্ট্র্রগুলোর প্রতিনিধিত্ব করছেন উচ্চকণ্ঠে। সাহসী ভূমিকা রাখছেন বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ইস্যুতে। এ জন্য তাকে পাশ্চাত্য তথা পরাশক্তিগুলোর কাছে বিরাগভাজনও হতে হচ্ছে। কিন্তু তিনি তার লক্ষ্যে ও গন্তব্যে অবিচল।

১৯৫৪ সালে ইস্তাম্বুলের কাশিমপাশায় জন্ম নেয়া এরদোগান ছোটবেলা থেকেই ছিলেন বাস্তব মানসিকতার। বাবা ছিলেন তুর্কি কোস্টগার্ডের ক্যাপ্টেন। মারমারা ইউনিভার্সিটিতে ব্যবসায় প্রশাসনে পড়ার সময় রাজনীতির সাথে যুক্ত হন এরদোগান। যোগ দেন কমিউনিজমবিরোধী ন্যাশনাল টার্কিশ স্টুডেন্ট ইউনিয়নে। ফুটবলও খেলতেন স্থানীয় একটি নামকরা ক্লাবে। ছাত্রজীবন শেষে যোগ দেন নাজিমুদ্দিন আরবাকানের ন্যাশনাল স্যালভেশন পার্টির যুব সংগঠনে। ১৯৮০ সালে সামরিক অভ্যুত্থানের পর দলটি বিলুপ্ত করা হলে আরবাকানের নতুন দল ওয়েলফেয়ার পার্টির সাথে যুক্ত হন। এই দল থেকেই ১৯৯৪ সালে নির্বাচিত হলেন ইস্তাম্বুলের মেয়র। বিশৃঙ্খল আর অনুন্নত ইস্তাম্বুলকে আমূল পাল্টে দিলেন তিনি। কয়েক বছরের মধ্যে ইউরোপের বড় শহরগুলোর সাথে পাল্লা দিতে শুরু করে ইস্তাম্বুল। ক্রমবর্ধমান হয়ে ওঠে এরদোগানের জনপ্রিয়তা যা তাকে শেষ পর্যন্ত নিয়ে এসেছে দেশের সর্বোচ্চ পদে। কর্ম ও উদ্যমই যে মানুষকে মর্যাদার আসনে অধিষ্ঠিত করে তুর্কি প্রেসিডেন্টই তার উজ্জ্বল প্রমাণ।

মূলত এরদোগানের সুনাম আর জাদুকরী নেতৃত্বই ছিল ক্ষমতাসীন এ কে পার্টির প্রধান পুঁজি। রাজনৈতিক নিষেধাজ্ঞার কারণে প্রথমদিকে এমপি এবং প্রধানমন্ত্রী হতে পারেননি তিনি। ২০০৩ সালে একটি উপনির্বাচনে অংশ নিয়ে পার্লামেন্টে আসেন এবং প্রধানমন্ত্রী হন। এরপর ২০০৭ ও ২০১১ সালের নির্বাচনেও জয়লাভ করে তার দল। তুরস্কের ইতিহাসে প্রথম নেতা হিসেবে তৃতীয়বার প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হন এরদোগান। ২০১৪ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে জয়লাভ করে শপথ নেন তুরস্কের দ্বাদশ প্রেসিডেন্ট হিসেবে।

ইস্তাম্বুলের মেয়র হিসেবে তার প্রতি জনগণের যে আস্থা সৃষ্টি হয়েছিল, তা ক্রমেই বেড়েছে। জনগণের ভালোবাসার প্রতিদান দিতেও দেরি করেননি এই নেতা। ১৬ বছরের দেশ শাসনে তুরস্ককে তৈরি করেছেন আধুনিক বিশ্বের রোল মডেল হিসেবে। এ কে পার্টি ক্ষমতায় আসার আগে ঋণে জর্জরিত ছিল তুরস্কের অর্থনীতি। কূটনৈতিক ও সামরিকভাবেও নির্ভরশীল ছিল পশ্চিমাদের ওপর। শুধু আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) কাছেই তুরস্কের ঋণ ছিল দুই হাজার ৩৫০ কোটি মার্কিন ডলার। ক্রমান্বয়ে সব ঋণ শোধ করে ২০১২ সালে এরদোগান ঘোষণা দেন- ‘এবার আইএমএফ চাইলে তুরস্কের কাছ থেকে ঋণ নিতে পারে’। ২০০২ সালে যে দেশটির কেন্দ্রীয় ব্যাংকের রিজার্ভ ছিল দুই হাজার ৬৫০ কোটি ডলার, ২০১১ সালে তা দাঁড়ায় ৯ হাজার ২২০ কোটি ডলারে।
তুর্কি নাগরিকদের জীবনযাত্রার মান অনেক উন্নতি হয়েছে তার সময়ে। প্রতিটি সেক্টরের রীতিমতো বিপ্লব করেছেন এরদোগান। প্রতিটি প্রদেশে কমপক্ষে একটি করে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেছেন। এয়ারপোর্টের সংখ্যা ২৬ থেকে নিয়ে গেছেন ৫০-এ। ধর্ম পালনে যে নিষেধাজ্ঞা ছিল অতীতে, তা ধীরে ধীরে তুলে দিয়েছেন। অবাধ স্বাধীনতা দিয়েছেন ধর্ম পালনের। মুসলিম কৃষ্টি-সংস্কৃতি সংরক্ষণে নিয়েছেন কার্যকর উদ্যোগ। তবে এসব বিষয়ে কোনো তাড়াহুড়ো করেননি। তাল মিলিয়ে চলেছেন ইউরোপীয় সমাজ ব্যবস্থার সাথেও।

তুরস্ক সফরকালে সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট ওবামা বলেছিলেন, ‘একজন নেতা কিভাবে একই সাথে ইসলামি, গণতান্ত্রিক ও সহিষ্ণু হতে পারেন, তার উৎকৃষ্ট উদাহরণ এরদোগান।’ আর এমন রাষ্ট্রনেতার প্রতি জনগণের আস্থা না থাকার কী কারণ থাকতে পারে? ৬৪ বছর বয়সী এরদোগানের জনপ্রিয়তা কতখানি তার প্রমাণ বিশ্ববাসী দেখেছে ২০১৬ সালের ১৫ জুলাই সেনাঅভ্যুত্থান প্রচেষ্টার সময়। শুধু তার একটি ভিডিও বার্তার ডাকে সাড়া দিয়ে ট্যাঙ্ক, কামানকেও রুখে দাঁড়িয়েছে নিরস্ত্র জনতা। রাষ্ট্রনেতাকে কতখানি ভালোবাসলে ট্যাঙ্কের পথ রোধ করতে স্বতঃস্ফূর্তভাবে রাস্তায় শুয়ে পড়ে মানুষ!

তবে হঠাৎ করে এই জনপ্রিয়তা আসেনি। সুশাসন, সমৃদ্ধি আর স্বনির্ভরতার স্বাদ যখন পেতে শুরু করেছে তুর্কিরা, তখনই এরদোগানের প্রতি বেড়েছে তাদের আস্থা। দীর্ঘ দিন পশ্চিমা দেশগুলোকে ধরনা দেয়ার নীতি অনুসরণ করেছে তুরস্ক। কিন্তু এই নীতি পাল্টে জাতিকে মাথা তুলে দাঁড়াতে শিখিয়েছেন এরদোগান। ইউরোপ-আমেরিকার চোখে চোখ রেখেও যে কথা বলা যায়, সেটি বিশ্বাস করতে শিখিয়েছেন জনগণকে। পশ্চিমা বিশ্বের প্রবল আপত্তির মুখেও গণভোটে জিতে সংবিধান পাল্টে নিজে গ্রহণ করেছেন নির্বাহী ক্ষমতা। অর্থনীতি, কূটনীতির মতো সামরিক শক্তিতেও অনেক এগিয়েছে তুরস্ক। ২০১৫ সালে তুর্কি আকাশসীমায় প্রবেশ করার মাত্র ১৫ সেকেন্ডের মধ্যে ধ্বংস করা হয় রাশিয়ার যুদ্ধবিমান। তা অসীম সাহসিকতারই এক নজির। এটা সমসাময়িক বৈশি^ক রাজনীতিতে তাকে অনন্য উচ্চতায় সমাসীন করেছে।

দেশের সীমানা ছাড়িয়ে বিশ্ব রাজনীতিতেও প্রভাব বিস্তার করেছেন এরদোগান। নেতৃত্বহীন মুসলিম বিশ্বকে এগিয়ে নিতে কাজ করছেন প্রতিনিয়ত। রোহিঙ্গা ইস্যুতে মুসলিম দেশগুলোর মধ্যে সবার আগে ও সবচেয়ে বেশি সহযোগিতা নিয়ে বাংলাদেশের পাশে দাঁড়িয়েছে তুরস্ক। জেরুসালেম ইস্যুতে ওআইসির চেয়ারম্যান হিসেবে এরদোগান জরুরি সম্মেলন ডেকে পূর্ব জেরুসালেমকে ফিলিস্তিনের রাজধানী ঘোষণা করেছেন। মুসলিমবিশ্বকে ঐক্যবদ্ধ করতে চালিয়েছেন ব্যাপক কূটনৈতিক তৎপরতা। কাতার সঙ্কটেও মধ্যস্থতার উদ্যোগ নিয়েছেন। সব কিছু মিলিয়ে, তুরস্ক ও নেতৃত্ব দুটো বিষয়কেই বিশ্বের সামনে রোল মডেল হিসেবে দাঁড় করিয়েছেন এরদোগান। অটোম্যান সাম্রাজ্যের ধ্বংসস্তূপ থেকে আধুনিক রাষ্ট্র হিসেবে আবির্ভূত হতে গিয়ে নানা চড়াই-উতরাই পেরিয়েছে তুরস্ক। আজ বিশ্বে কৌশলগত শক্তিশালী রাষ্ট্র হিসেবে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়েছে দেশটি; যার পশ্চিম সীমান্তে রয়েছে গ্রিস এবং পূর্বে শক্তিশালী ইরান।

২০০২ সাল থেকে প্রেসিডেন্ট এরদোগানের ইসলামি দলের শাসনাধীনে রয়েছে দেশটি। ১৯২৩ সালে আধুনিক তুরস্কের যাত্রা শুরুর পর থেকে দেশটিতে এখন পর্যন্ত বড় ধরনের যেসব পরিবর্তন এসেছে, তার বেশির ভাগই এনেছেন তিনি। সর্বশেষ নির্বাচনে বিপুল ব্যবধানে জয়ী হয়েছেন। ২০১৭ সালের এপ্রিলে গণভোটে জয়ের পর সংবিধানে পরিবর্তন এনে প্রধানমন্ত্রীর পদ বিলুপ্ত করে একচ্ছত্র রাষ্ট্রপতির শাসন জারির ঘোষণা দিয়েছিলেন। শিগগিরই তা কার্যকর করা হবে বলে নির্বাচনে জয়ের পর জানিয়েছেন এরদোগান। এর ফলে ক্ষমতার কেন্দ্রে থাকবেন তিনি। মন্ত্রিপরিষদে মন্ত্রী নিয়োগেও থাকবে তার একচ্ছত্র ক্ষমতা।
মূলত অটোম্যান সাম্রাজ্যের শাসনাধীনে ছিল ইউরোপের বলকান অঞ্চল থেকে শুরু করে বর্তমান সৌদি আরবও। কিন্তু কয়েক শতাব্দীপ্রাচীন অটোম্যান সাম্রাজ্যের শাসনের অবসান ঘটে প্রথম বিশ্বযুদ্ধে পরাজয়ের মাধ্যমে। সাম্রাজ্যবাদী জার্মানির পক্ষে প্রথম বিশ্বযুদ্ধে লড়াই করে ছিলেন তারা। স্বাধীনতা যুদ্ধের পর মুস্তফা কামাল আতাতুর্কসহ তুরস্কের সামরিক প্রধানরা দক্ষিণ-পূর্ব ইউরোপের থ্রেইস থেকে মেসোপটেমিয়া পর্যন্ত সাম্রাজ্যের বিস্তৃতি ঘটান। এরই ধারাবাহিকতায় ১৯২৩ সালে আধুনিক তুরস্ক প্রজাতন্ত্র সৃষ্টির ঘোষণা দেয়া হয়।

অটোম্যান আমলের সেই প্রভাব-প্রতিপত্তি মধ্যপ্রাচ্যে ফিরে পাওয়ার চেষ্টা করছে এরদোগানের শাসনাধীন বর্তমান তুরস্ক। বিশেষ করে সিরিয়া এবং ইরাকে; তদুপরি বলকান উপদ্বীপ ও আফ্রিকায়। কামাল আতাতুর্ক ছিলেন তুরস্কের প্রথম প্রেসিডেন্ট। ১৯৩৮ সালে মৃত্যুর আগ পর্যন্ত ক্ষমতায় ছিলেন তিনি। দেশকে পাশ্চাত্যমুখী করার পাশাপাশি ধর্মনিরপেক্ষতা প্রতিষ্ঠিত করে ছিলেন তিনি।
১৯৪৬ সালে দেশটিতে প্রথমবারের মতো বহুদলীয় গণতন্ত্রের যাত্রা শুরু হয়। আতাতুর্কের উত্তরসূরি ইসমেত ইনোনুর আমলে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে তুরস্ক নিরপেক্ষ অবস্থান ধরে রাখে। যুক্তরাষ্ট্রের প্রবল সমর্থনে একসময়ের শত্রু, গ্রিসের সাথে ১৯৫২ সালে পশ্চিমা সামরিক জোট ন্যাটোতে যোগ দেয় তুরস্ক। যা হোক, এরদোগানের বিরুদ্ধে কর্তৃত্ববাদী শাসনব্যবস্থা জোরালো করার অভিযোগ রয়েছে সমালোচকদের। পশ্চিমমুখী অবস্থান থেকে তুরস্ককে সরিয়ে এনেছেন তিনি। ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র গড়তে তিনি প্রতিশ্রুতিবদ্ধ বলে ন্যাটোর কাছে অবস্থান তুলে ধরেছেন এরদোগান।

১৯৬০, ১৯৭১ এবং ১৯৮০ সালে অভ্যুত্থানের মাধ্যমে সরকারকে ক্ষমতাচ্যুত করে তুরস্কের শক্তিশালী সামরিক বাহিনী। ১৯৬০ সালের অভ্যুত্থানের পর দেশটির ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী আদনান মেনদেরেস ও তৎকালীন দুই মন্ত্রীকে ফাঁসিতে ঝুলানো হয়। আদনানই এরদোগানের ‘রাজনৈতিক নায়ক।’ রাজনীতিতে সেনাবাহিনীর হস্তক্ষেপ ঠেকাতে এরদোগান সামরিক বাহিনীর লাগাম টানেন ক্ষমতায় আসার পর। যার মাধ্যমে ২০১৬ সালের জুলাইয়ে সেনাবাহিনীর একটি বিদ্রোহী অংশের অভ্যুত্থান চেষ্টা নস্যাৎ করতে সক্ষম হয়েছেন।

সিরিয়ার গৃহযুদ্ধে প্রেসিডেন্ট বাশার আল-আসাদের তীব্র বিরোধিতা করে সে দেশে প্রভাব বাড়ানোর চেষ্টা করছে আট কোটিরও বেশি মানুষের দেশ তুরস্ক। সঙ্ঘাতের অবসান ঘটাতে সিরিয়ায় মিত্র রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট পুতিনের সাথে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করছে আঙ্কারা। যুদ্ধবিধ্বস্ত সিরিয়ার প্রায় ৩৫ লাখ শরণার্থী তুরস্কে আশ্রয় নিয়েছে। তাদের বেশির ভাগই তুরস্কের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চল এবং ইস্তাম্বুলে বসবাস করছেন। ইরাক ও আফগানিস্তানের কিছু শরণার্থীরও আশ্রয় হয়েছে তুরস্কে।
মোট কথা, তুর্কি প্রেসিডেন্ট রজব তাইয়েব এরদোগানের জাদুকরী হাতের ছোঁয়া ও ক্যারিশম্যাটিক নেতৃত্বে আধুনিক তুরস্ক এখন অপ্রতিরোধ্য হয়ে উঠছে। বিগত প্রায় দেড় দশকের শাসনে ধর্মনিরপেক্ষতার নামে ইসলামবিদ্বেষ থেকে দেশটি বেরিয়ে আসার চেষ্টা করছে। এতে সাফল্যও এসেছে ব্যাপকভাবে। ভঙ্গুর তুর্কি অর্থনীতি এখন মজবুত ভিত্তির ওপর প্রতিষ্ঠিত। সব শ্রেণীর নাগরিকের জীবনযাত্রার মানও বেড়েছে। নাগরিক পরিষেবাও হয়ে উঠেছে সময়োপযোগী। সামরিক শক্তিতে তুর্কিরা ক্রমেই অপ্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে উঠছে। তুর্কি প্রেসিডেন্ট বৈশ্বিক রাজনীতিতেও উল্লেখযোগ্য অবদান রাখছেন। বিশেষ করে মুসলিম বিশে^র ঐক্য প্রতিষ্ঠা এবং বিভিন্ন সমস্যা সমাধানে তার গতিশীল নেতৃত্ব অনেকটাই ফলদায়ক হয়েছে। দেশীয় রাজনীতিতে তিনি যেমন অপ্রতিদ্বন্দ্বী ও অবিসংবাদিত নেতা হয়ে উঠেছেন, তেমনিভাবে বৈশি^ক রাজনীতিতে তিনি এক উজ্জ্বল নক্ষত্র। তিনি যে এক সফল ও সার্থক মহানায়কের প্রতিচ্ছবি তা নির্দ্বিধায় বলা যায়।

    Print       Email

You might also like...

1531921088_6

এরদোগানের প্রশংসায় ট্রাম্প

Read More →