Loading...
You are here:  Home  >  প্রবন্ধ-নিবন্ধ  >  Current Article

আবার বিজয় এলো

২
গোড়া থেকে শেষ পর্যন্তই ছিল গেরো। হাঁটু অবধি কাদা, বিদ্রোহী আদিবাসী গ্রুপ, বৃষ্টি, সুয়াঙ্গামা টু বেস ক্যাম্প ট্রেকিং আর শেষে খাবার ফুরিয়ে যাওয়া। সব সত্ত্বেও বাংলাদেশের পতাকা কার্সটেন্জ পিরামিডে উড়িয়েই দেশে ফিরেছেন মুসা ইব্রাহীম
আবার বিজয় এলো
অস্ট্রেলিয়া-ওশেনিয়া মহাদেশের সবচেয়ে উঁচু পর্বত কার্সটেনজ পিরামিড। ভারতের এভারেস্ট জয়ী সত্যরূপ সিদ্ধান্ত দাওয়াত দিয়েছিলেন মে মাসের প্রথম সপ্তাহে। সঙ্গে নন্দিতা চন্দ্রশেখরও যাচ্ছেন। নীলসাগর গ্রুপ স্পন্সর হওয়ায় আমার যাওয়া সহজ হলো। ঢাকা ছাড়ার আগ মুহূর্তে ঢাকায় ভারতীয় হাইকমিশনার হর্ষবর্ধন শ্রিংলা হাতে তুলে দিলেন বাংলাদেশ-ভারত মৈত্রী অভিযানের পতাকা।

প্রথম হাজিরা বালিতে
ইন্দোনেশিয়ার বালি। মানাডো অ্যাডভেঞ্চারের ফ্র্যাঙ্কি কোয়াসের সঙ্গে দেখা হলো। তিনি অভিযানের অনুমতিপত্র আমাদের হাতে দিয়ে জানালেন, ইন্দোনেশিয়ার পাপুয়া অঙ্গরাজ্যের সুগাপার সুয়াঙ্গামা গ্রাম থেকে আমাদের যাত্রা শুরু হবে। সুয়াঙ্গামা গ্রামের গ্রামপ্রধান উইলেম যাবেন সঙ্গে। তিনি খেয়াল রাখবেন, কোনো বিদ্রোহী আদিবাসী গ্রুপ যেন আমাদের ওপর চড়াও না হতে পারে। মনে হচ্ছিল, কোনো রোমাঞ্চ উপন্যাসের চরিত্র হতে চলেছি। ফ্র্যাঙ্কি বলে চলেছেন, ‘নাবিরে শহরে পৌঁছেই রাবারের গামবুট সংগ্রহ করবেন। না হলে ট্রেকিং করা কঠিন হবে।’ আমাদের তিনজনকে সতর্ক করে দিয়ে আরো বললেন, সুয়াঙ্গামা টু বেস ক্যাম্প পাঁচ দিনের পথ। প্রথম দুই দিন টিকে গেলে ধরে নেওয়া যায় বেস ক্যাম্প পৌঁছে যাবেন। বেশির ভাগ দল দ্বিতীয় দিনেই কুপোকাত হয়। মনের দিক দিয়ে শক্ত থাকবেন।’ কথাগুলো মাথার মধ্যে ঘুরতে থাকল। ইন্টারেন্ট ঘাঁটাঘাঁটি করে বিপদ-আপদের কথা কিছু জেনেছি, তবে কতটা ভয়াবহ আঁচ করতে পারিনি। ফ্রাঙ্কি আবার বললেন, ‘সারা দিন বৃষ্টি হবে, পথ কাদায় ভরা থাকবে ও পা কাদায় এমনভাবে হাঁটু পর্যন্ত আটকাবে যে বের করা কঠিন হবে। দ্বিতীয় ও তৃতীয় দিনের পথ যাবে রেইন ফরেস্টের ভেতর দিয়ে। নজর সোজা সামনে রাখতে হবে।’

পাপুয়া রাজ্যের নাবিরে
বালির আই গুষ্টি নাগুরা রাই বিমানবন্দর থেকে সুলতান হাসানুজ্জামান ও জয়াপুরা বিমানবন্দর হয়ে শেষে নাবিরে শহরে পৌঁছলাম। দেখা পেলাম আমাদের গাইড লরেন কোয়াস ও রোমি তাগাহর। জোগাড়যন্ত্র সেরে চার দিনের মাথায় উড়ে গেলাম সুগাপা। বৃষ্টিভেজা সকাল সুগাপায় আমাদের স্বাগত জানাল। প্রায় ১৫ জনের একটি মোটরসাইকেল বাহিনী প্রস্তুত। আমাদের সুয়াঙ্গামা নিয়ে যাবে। পথে পুলিশ স্টেশনে রিপোর্ট করতে হলো। তারপর আবার পাহাড়ি পথে যাত্রা। বৃষ্টির কারণে পথ পিচ্ছিল হয়ে আছে। তদুপরি পাথর আর গর্তের কারণে যাত্রা ভয়ংকর। একটি সাইকেল উল্টেও গেল একবার। ঝোপঝাঁড় আগলে ছিল বলে রক্ষা নয়তো সোজা কয়েক শ ফুট নিচে। এর মধ্যেই এলো বিদ্রোহী আদিবাসী।

একা তীর-ধনুক হাতে
বিদ্রোহী একাই পথ আটকেছেন। তীর-ধনুক আর মাশেটি (কুঠার বা ছোট তলোয়ার) নিয়ে। পুরো বাহিনীকে আটকে দিলেন। চাঁদা না দিলে যেতে দেবেন না। শেষে একটা রফায় আসা গেল। আমরা পৌঁছতে পারলাম সুয়াঙ্গামা গ্রামে। উইলেম স্বাগত জানালেন। ভেবেছিলাম উইলেমের হাতেও তীর-ধনুক থাকবে। সজ্জাও হবে সে রকম। কিন্তু তাঁর পরনে লাল রঙের একটা নাইলনের হাফ হাতা গেঞ্জি ও হাফপ্যান্ট। ভুঁড়িও আছে দশাসই। চিন-পরিচয় শেষে উইলেমের বাড়ি গেলাম। এটা অবশ্য সিনেমার মতোই। কাঠের তক্তার ওপর ভর দিয়ে বানানো গোল ঘর। মাথায় ছাউনি। ভেতরের অর্ধেকটায় বাঁশের পাটাতন আর বাকিটায় আগুন জ্বালানোর জন্য গর্ত। মানুষ আর গবাদি পশু একসঙ্গেই থাকে। ছোট-বড় সবার হাতেই হয় তীর-ধনুক, নয় মাশেটি। মেয়েদের গালে বা কপালে তিলক। খবর পেলাম, উইলেমের তিন ঘর। একেবারে ছোট বউয়ের বয়স ১৯। নাম লেসি। লরেন জানাল, গ্রামপ্রধানের বিয়েতে বাদ সাধা চলে না। কিন্তু টিনএজার লেসি পালিয়ে গিয়েছিল। পরে পাঁচটি শূকর উপহার দিয়ে ফিরিয়ে এনেছেন।

ট্রেকিং শুরু
উইলেম আর তাঁর ছোট ভাই রাপুনেস ১২ জন পোর্টার বাছাই করলেন। লরেন আর রোমি তাদের জন্য খাবার (১০ থেকে ১২ দিনের) সংগ্রহে নামলেন। মিষ্টি আলু কেনা শুরু হলো। ঘরের এক কোনায় আলুর পাহাড় তৈরি হলো। বৃষ্টি আমাদের ঘরেই আটকে রাখল বেশির ভাগ সময়। পর দিন আমাদের অবাক করে দিয়ে পাইনগাছের ফাঁক দিয়ে দেখা দিল রোদ। নাশতা সারার পর দেখি ১২ জন নয় ২৫ জন গ্রামবাসী আমাদের সঙ্গী হিসেবে রওনা হচ্ছে। লরেন জানাল, যেহেতু গ্রামপ্রধান যাচ্ছেন তাই তাঁকে সম্মান জানাতে প্রায় পুরো গ্রাম চলেছে। এটা তাদের কাছে পিকনিকের মতো। সকাল ৮টায় যাত্রা হলো শুরু। পাহাড়ের গা বেয়ে আঁকাবাঁকা ট্রেইল। বেলা বাড়লে গরম বাড়ল। সুয়াঙ্গামা নদীর ধার দিয়ে, কাদামাখা ট্রেইলে পথ চলছিলাম। একটা বিরাট কাফেলা। কখনো কখনো পা হাঁটু পর্যন্ত কাদায় ডুবে যাচ্ছিল। তেষ্টা মেটাতে মুখে চকোলেট দিচ্ছিলাম। দুপুরের খাওয়ার বিরতি ঘোষণা করল লরেন একটা পাহাড়ের ঢালে। ভাত আর সিদ্ধ ডিম দিয়ে খাওয়া সারলাম। উঠতে গিয়ে পায়ের পেশিতে টান লাগছে। ব্যথাও শুরু হলো। এ অবস্থায় সুয়াঙ্গামা নদী পার হলাম। প্রচণ্ড গর্জনে নিচের দিকে বয়ে যাচ্ছে। এর মধ্যে আবার বৃষ্টি। ৫টা নাগাদ লরেন ঘোষণা করল, সামনেই ক্যাম্প। আসলে বৃষ্টিতে আর এগোনো যাচ্ছিল না। তাঁবু খাটিয়ে রাত কাটানোর প্রস্তুতি নিলাম।

পথ আরো ভয়াবহ হয়ে উঠল
সকাল থেকেই বৃষ্টি। পথ পিচ্ছিল আর কাদায় ভরা। এ দিন যতক্ষণ না পাহাড়ের গা বেয়ে হেঁটেছি, তার চেয়েও বেশি রেইন ফরেস্টের ভেতর দিয়ে। বনের মধ্যে গাছগুলো এতই বড় আর ঘন যে সূর্যের আলো পৌঁছায় না। অনেক জায়গায় গাছের গুঁড়ি বা শিকড় পথ করে নিয়েছে। ফলে হাঁটতে হয় শিকড়ের ওপর দিয়ে। মনোযোগে ঘাটতি পড়লে পা মচকে অভিযান সাঙ্গ! আমাদের গতি ছিল ধীর। তাই প্রথম তিন দিনে আমরা দুই দিনের পথ অতিক্রম করে ছিলাম। এর মধ্যে সুয়াঙ্গামা নদী পার হয়েছি বেশ কয়েকবার গাছের গুঁড়ির ওপর দিয়ে। চতুর্থ দিনের পথ ছিল পাহাড়ের মাথার ওপর দিয়ে। কিন্তু সোয়াম্প ফরেস্টের মতোই তা ছিল গাছপালায় ভরা আর পানিতে ডোবা। বেস ক্যাম্পে যেদিন পৌঁছাই, সেদিন কার্লসন লেক, ব্ল্যাক লেকসহ নাম না জানা আরো গোটা তিনেক লেক পার হয়েছি। লেকে বুনোহাঁসকে জলকেলি করতে দেখেছি। দুপুরের পরে প্রচণ্ড বৃষ্টি ও তুষারপাতের মধ্যে হি হি করে কাঁপতে কাঁপতে পৌঁছেছি বেস ক্যাম্প লেক ফালেতে। এর মধ্যে চতুর্থ ক্যাম্পে পোর্টাররা ঝগড়া করেছিল খাবারের অভাব দেখা দেওয়ায়। ১২ জন পোর্টারের খাবার ২৫ জনে ভাগ হচ্ছে, খাবার তো কম পড়বেই।

ওড়ালাম লাল-সবুজের পতাকা
ক্যাম্পে পৌঁছেই দুস্তর ইনার লেয়ার পরে নিয়েছি। কারণ রাতেই সামিট পুশ। রাতে খাওয়ার সময় হারনেস, জুমার, ক্যারাবিনা, রোপ ইত্যাদি গুছিয়ে রেখেছি। রাত ১টায় ঘুম থেকে উঠে ২টার দিকে চূড়া জয়ের জন্য বের হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু প্রায় দেড়টা পর্যন্ত বৃষ্টি হওয়ায় রওনা হলাম সাড়ে ৩টায়। খুব ভোরে টেকনিক্যাল ক্লাইম্বিং শুরু হলো ফিক্সড রোপে জুমার লাগিয়ে। সর্বোচ্চ সতর্কতা নিশ্চিত করে সবার আগে লরেন, এরপর নন্দিতা, সত্য, আমি আর রোমি—মোটামুটি এই ক্রমে ক্লাইম্বিং করেছি। প্রায় পাঁচ ঘণ্টা পর যখন কার্সটেন্জ পিরামিড পর্বতের রিজে গিয়ে হাজির হয়েছি, তখন মৃদু বাতাস বইছিল। এখানে দুই পাহাড়ের মধ্যে একটা বেশ বড় ফাটল। সেটা পার হওয়ার জন্য তৈরি করা ছিল বার্মা ব্রিজ। সেটা পার হতেই লরেন জানাল, আর খুব বেশি হলে ঘণ্টাখানেকের মধ্যে আমরা চূড়ায় পৌঁছাব। ছোট ছোট আরো দুটি ফাটল পার হয়ে যখন চূড়ায় পৌঁছেছি, তখন ঘড়িতে স্থানীয় সময় পৌনে ১২টা। সবাই হৈহৈ করে উঠলাম। জড়িয়ে ধরে পরস্পরকে অভিনন্দন জানালাম। এরপর ওড়ালাম বাংলাদেশের লাল-সবুজ পতাকা।

নামার সময় বিপত্তি
হঠাৎ করেই প্রচণ্ড বেগে বৃষ্টি ও তুষারপাত শুরু হলো। সেই সঙ্গে কনকনে বাতাস। আমি আর রোমি দ্রুত নেমে এলেও নন্দিতাকে ঠাণ্ডা কাবু করে ফেলল। তিনি হাইপোথার্মিয়ায় আক্রান্ত হলেন। তাঁকে সহায়তা করলেন লরেন ও সত্য। এ কারণে নামতে নামতে সন্ধ্যা পেরিয়ে গেল। সব মিলিয়ে বেস ক্যাম্পে ফিরতে ফিরতে রাত প্রায় সাড়ে ৮টা। আমাদের চূড়া জয় করতে সব মিলিয়ে সময় লাগল প্রায় ১৮ ঘণ্টা। ক্যাম্পে ফিরেই নন্দিতাকে স্লিপিং ব্যাগে জড়িয়ে গরম স্যুপ খাওয়ানো হলো, যাতে শরীরের উত্তাপ কিছুটা ফেরে।

খাবার ফুরাল
পর দিন পুরো পরিস্থিতি দেখে সিদ্ধান্ত হলো হেলিকপ্টারে ফেরার। বিশেষ করে নন্দিতার জন্যই এ ভাবনা। এই অবস্থায় আমরা বেস ক্যাম্পে হেলিকপ্টারের জন্য অপেক্ষা করতে করতে খাবার ফুরিয়ে যায়। এ পরিস্থিতিতে দ্বিতীয় দিন রোমির নেতৃত্বে পোর্টাররা ফিরে গেল। তখন থেকে বেস ক্যাম্পে আমরা চারজন। লরেন জানাল, যতটা সম্ভব নিজেদের অবস্থান কাউকে জানান না দিয়ে হেলিকপ্টারের জন্য অপেক্ষা করতে হবে। যদি কোনো বিদ্রোহী গোষ্ঠী জানতে পারে যে আমরা মাত্র চারজন এখানে রয়েছি, তাহলে ক্যামেরা, ফোন, কাপড়চোপড়, খাবারদাবার, তাঁবু—সব কিছু লুট করে নিয়ে যাবে। এ পরিস্থিতিতে তৃতীয় আর চতুর্থ দিন আমরা একরকম অনাহারে কাটালাম। শুধু চা আর এক বাটি করে গলা ভাত খেয়েছি। এ সময় থেকেই বাংলাদেশের মাননীয় পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী মোহাম্মদ শাহরিয়ার আলমের সঙ্গে যোগাযোগ হলো সত্যর ডেলোরমে স্যাটেলাইট ডিভাইস দিয়ে। পঞ্চম দিন যদিও তাঁবু গুটিয়ে অধীর অপেক্ষায় ছিলাম হেলিকপ্টার আসবে, কিন্তু এলো না। আমাদের খাবারও শেষ। লরেন বের হলো কোনো গ্রুপ যদি কোনো খাবার ফেলে গিয়ে থাকে, তা নিয়ে আসার জন্য। একটু পর সে হাজির হলো জ্বালানি তেল, ডিম, চিকেন সসেজ, আপেল আর মাল্টা নিয়ে। আমাদের যেন ঈদের আনন্দ। ষষ্ঠ দিন সবার সহযোগিতায় উদ্ধার পেলাম বেস ক্যাম্প থেকে, হেলিকপ্টারে ফিরলাম তিমিকায়। সব মিলিয়ে এক অসাধারণ অভিজ্ঞতা। – সৌজন্যে কালের কন্ঠ
3

    Print       Email

You might also like...

6d2072016765f4ee9e835bf74babc27b-59f833502c170

চীনে ইনোভেশন প্রতিযোগিতায় চ্যাম্পিয়ন বাংলাদেশি

Read More →