Loading...
You are here:  Home  >  এক্সক্লুসিভ  >  Current Article

আব্দুল হালীম খাঁর ‘দাঁড়াও বাংলাদেশ: সমকালীন বাস্তবতা’

a-halimদর্শক বিচারে আব্দুল হালীম খাঁ (জন্ম-১৯৪৪) কোন দশকের কবি তা নির্ণয় করা দুরূহ তাঁর প্রথম লেখা (ছড়া) ১৯৬৯ সালে প্রকাশিত হয় টাঙ্গাইল থেকে প্রকাশিত পাক্ষিক ‘‘হিতকরী’’ পত্রিকায়। প্রথম কবিতা ‘দরজা খোলো’ সিলেটের ‘আল ইসলা’ পত্রিকায়  সালে প্রকাশিত হয় ১৯৬২-এর জুলাই সংখ্যায়। আর তাঁর প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘ও জীবন ও সুখ’ প্রকাশিত হয় ১৯৮৪ সালে। কবি হিসেবে তাঁর প্রথম কাব্যগ্রন্থ প্রকাশ কিছুটা বিলম্বে। সে যাই হোক, মহাকালের কাছে দশক বা এই নশ্বর মানবজীবন খুবই ক্ষুদ্র একটা বিষয়। সময়ের পরিক্রমায় মানুষের কর্মটাই মুখ্য সেটা যে সময়েরই হোক; যদি কর্মটি কালজয়ী হয়।
আব্দুল হালীম খাঁ প্রচার বিমুখ একজন নিভৃতচারী কবি। নীরবে নিভৃতে তিনি নিরলসভাবে লিখে চলেছেন। গল্প, উপন্যাস, প্রবন্ধ লিখলেও তাঁর বড় পরিচয় তিনি একজন কবি।  তাঁর দ্বিতীয় কাব্যগ্রন্থ ‘দাঁড়াও বাংলাদেশ’ প্রকাশিত হয় ১৯৯০ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে। প্রকাশের সাথে সাথেই কাব্যগ্রন্থটি সাধারণ এবং সচেতন উভয় পাঠকের কাছে বেশ সমাদৃত হয়। এ কাব্যের পটভূমি তৎকালীন স্বৈরাচার এরশাদ সরকারের শাসনামল। ৪৮ পৃষ্ঠার এ কাব্যগ্রন্থে মোট ২০টি কবিতা রয়েছে। এর মধ্যে ১৪টি পূর্ণাঙ্গ কবিতা ও ৬টি খ- বা অণুকবিতা রয়েছে।
নামকবিতা ‘দাঁড়াও বাংলাদেশ’ নিয়েই আলোচনা শুরু করা যাক। আমরা দেশকে মাতৃভূমি বা পিতৃভূমি হিসেবে সম্বোধন করে থাকি। কেননা দেশ আমাদেরকে মাতৃমমতায় আষ্টে-পৃষ্ঠে জড়িয়ে রাখে। দেশের বুকে লালিত-পালিত হয়ে বড় হই; বাবা-মার মতো সব দায়িত্ব যেন দেশ পালন করে থাকে। কিন্তু কবির কাছে দেশ ধরা দিয়েছে প্রধানচালিকা শক্তিধর (রাষ্ট্রপতি) হিসেবে। কেননা তিনি যেভাবে দেশ শাসন করবেন, যেভাবে দেশ চালাবেন- সেভাবেই দেশের মানুষ লালিত-পালিত হবে। কবি যেন দেশের বন্ধু ছিলেন এক সময়। তাই তো তিনি বন্ধুর মতোই সহজ-সরল ভাষায় দেশের অসঙ্গতিগুলো তুলে ধরেছেন-
তুমি কখনো এতিম ক্ষুধার্ত বালকের মতো
বিশ্বের সামনে হাত পাতো
দু’চার টুকরো গোস্তরুটি খেজুর
আর রোগজীবাণু ভরা পুরনো কাপড় নিয়ে
ফিরে আসো যখন
তখন তোমাকে দেখে ফটু ফকিরের কথা মনে পড়ে
আমার ভীষণ লজ্জা করে।
পরবর্তী কবিতা ‘রাষ্ট্রপতির সাথে সংলাপ’-এ এর স্বরূপ উন্মোচিত হয়। একই ঢঙের সংলাপীয় ভঙিতে পঙ্ক্তিগুলো সাজানো; সহজ-সরল সাবলীল গদ্য; যেখানে ব্যক্ত হয়েছে দেশের কথা, দশের কথা আর সমাজের ন্যায়-অন্যায়ের কথা। ভন্ডামি আর মুখোশধারীদের মুখোশ উন্মোচন করে রাষ্ট্রপতিকে কবি বলেছেন-
মৌলবাদীদের ঠেকানোর জন্য
ইসলামকে রাষ্ট্রধর্ম ঘোষণা করলেন
ভালোকথা আমরা ইসলামই চাই,
কিন্তু আপনার সরকারের পেটে ডুবুরী নামিয়ে দিলে
ইসলামের একটা ‘ই’ খুঁজে পাবে না যে…
সমকালীন বাংলাদেশের সামগ্রিক প্রেক্ষাপট ফুটে উঠেছে ‘ইঁদুর’ কবিতাটিতে। শিল্পগুণেও কবিতাটি অনন্য। মুক্তক ছন্দে লেখা এ কবিতাটিতে দেখা যায়Ñবাংলাদেশের সর্বত্র ইঁদুরের উৎপাত; সবকিছু কেটে-কুটে একাকার। যেখানে তাকানো যায় সেখানেই ইঁদুর। অবশেষে-
দেয়ালের বাংলাদেশের মানচিত্র চেয়ে দেখি
একি!
টেকনাফ থেকে তেঁতুলিয়া পর্যন্ত ছিন্নভিন্ন ঝড়
সবখানে ইঁদুর বসিয়েছে তার দাঁতের কামড়।
রূপক এ কবিতাটিতে ফুটে উঠেছে বাংলাদেশের ইঁদুররূপী সর্বগ্রাসী দুর্নীতিবাজদের কথা। এ ইঁদুর তাড়াতে হলে একজন সৎ নির্ভীক বাঁশিওয়ালার প্রয়োজন।
এ গ্রন্থের আরো একটি উল্লেখযোগ্য কবিতা হলো ‘ধাতব খাদ্য’। বাংলাদেশ শুধু ফুল-ফলের দেশ নয়, বুলেট, বোমা, গ্রেনেডেরও দেশ। বুলেট- বোমা কতিপয় সন্ত্রাসীদের হাতে থাকলেও তারা ভীতি ছড়ায় সমগ্র জাতির মধ্যে। এদের হাতে বন্দি সাধারণ মানুষ, তারা নিতান্তই অসহায়। তাই কবি মনে করেন চাল, ডাল, আলুর বদলে বুলেট, বোমা, গ্রেনেড কিনে খেলে সবার শরীর হবে অটুট কালজয়ী। কেননাÑ
আজকাল বেঁচে থাকার জন্য
সবার এসব ধাতব খাদ্যের প্রয়োজন।
এমন বাস্তবতা, এমন দর্শন, এমন নীরব প্রতিবাদীচেতনা এবং এমন উপমা প্রয়োগ নিতান্তই বিরল।
এ গ্রন্থে ৬টি অণুকবিতা রয়েছে যা ৪ থেকে ৬ পঙ্ক্তির। এগুলো হলো: পাহাড়, আঁধার, ভাঙচুরের শব্দ, স্বভাব, ঠিকানা ও দেয়াশলাই। এর মধ্যে দু’-একটি কবিতায় কিছুটা সুকান্তীয় ধাঁচ ও চিন্তা-চেতনা ফুটে উঠেছে। যেমন ‘দেয়াশলাই’ কবিতায় কবি বলেছেন-
আজীবন অন্ধকারে দু’হাতে
চারিদিকে খুঁজেছি আগুন জ্বালাবার জন্য
শুধু একটি দেয়াশলাই।
এ কবিতাটিতে সুকান্ত ভট্টাচার্যের ‘দিয়াশলাই’ কবিতার চেতনা লক্ষ্য করা গেলেও অন্যান্য কবিতাগুলোতে নেই। তাঁর ‘পাহাড়’ শিরোনামের আরেকটি কবিতা-
পাহাড় যদি সামনে এসে দাঁড়ায় কভু
ভয় কি দেখে পাহাড় চুড়ো?
পাহাড় কত পায়ের নিচে ঠুকছে মাথা
পায়ের তলেই হচ্ছে গুঁড়ো।
তাঁর এমন অণুকবিতাগুলো রূপকধর্মী ও গভীর তাৎপর্যপূর্ণ।
পরিশেষে বলা যায়, আব্দুল হালীম খাঁ একজন বাস্তববাদী কবি। তাঁর ‘দাঁড়াও বাংলাদেশ’-এর কবিতার ভাষা সহজ-সরল কিন্তু ভাব ক্ষুরধার। তাঁর কবিতায় আছে অন্যায়-জুলুমের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ, নিপীড়িত জনতার পক্ষে স্লোগান, সর্বোপরি মানুষের প্রতি ভালোবাসা। সব মিলিয়ে ‘দাঁড়াও বাংলাদেশ’ কাব্যগ্রন্থে পরিস্ফুটিত হয়েছে সমকালীন বাংলাদেশের নিখুঁত বাস্তবচিত্র।

    Print       Email

You might also like...

6afed405318d4219e5ce1f58be1a4401-5a1580a4a4885

২৭ নভেম্বর লন্ডনে কারি শিল্পের ‘অস্কার’

Read More →