Loading...
You are here:  Home  >  কলাম  >  Current Article

আমিনুর রশীদ চৌধুরী মুক্তবুদ্ধির অনন্য মানুষ

আমিনুর রশীদ চৌধুরী

সাঈদ চৌধুরী: ‘সিলেট বন্ধু’ আমিনুর রশীদ চৌধুরীর জীবন স্বকীয়তায় ভরপুর। তিনি ছিলেন নির্ভিক রাজনীতিক। মুক্তবুদ্ধি সম্পন্ন সাহসী সম্পাদক। সিলেটের সাংবাদিকতার পথিকৃৎ। তাঁর সম্পাদনায় সাপ্তাহিক যুগভেরী অল্পদিনে সিলেট অঞ্চলে গণমানুষের সুখ-দুঃখের সাথী হয়ে ওঠে।

পত্রিকা মানুষের অধিকারের কথা বলে। আর সম্পাদক অধিকার আদায়ের আন্দোলনকে বেগবান করেন। সাংবাদিকতার মধ্য দিয়ে আমিনুর রশীদ চৌধুরী তা বুঝিয়ে দিয়েছেন।

মহাত্মা গান্ধী পরিচালিত ভারতব্যাপী অহিংস গণ-আইন অমান্য আন্দোলনে সামনের সারির ছাত্রনেতা আমিনুর রশীদ চৌধুরী সস্তা জনপ্রিয়তা ও সুযোগসন্ধানী নেতৃত্বের ঘোরতর বিরোধী ছিলেন। অহিংস আন্দোলন যখন সহিংস রূপ নেয়, তখন তাঁকে অনেক ঘাত-প্রতিঘাত পোহাতে হয়েছে। জেল জুলুম নির্যাতন অগ্রাহ্য করে মানুষের অধিকার আদায়ের সংগ্রাম চালিয়েছেন। এমনকি মৃত্যুকেও তিনি ভয় পাননি।

এক সময় আমিনুর রশীদ চৌধুরী অনুধাবন করেন সত্যিকার বিপ্লব ভয়ংকর খুনোখুনিতে নয়, বরং চিন্তা-চেতনায় বিপ্লব তৈরি করতে হবে। সৃষ্টি করতে হবে সামাজিক সচেতনতা। রাজনৈতিক ক্ষেত্রেও সাংবাদিকরা যে ভুমিকা রাখতে পারেন, যুগভেরীর মাধ্যমে তিনি তা দেখিয়ে দিয়েছেন।

আমিনুর রশীদ চৌধুরী ১৯৬১ সালের ৩ নভেম্বর থেকে ইষ্টার্ণ হেরাল্ড ও ৩০ নভেম্বর থেকে যুগভেরী সম্পাদনার দায়িত্ব নেন। পিতা আব্দুর রশীদ চৌধুরী ১৯৩০ সালে যুগভেরী চালু করেছিলেন। সম্পাদক ছিলেন মকবুল হোসেন চৌধুরী। তাঁর মালিকানায় দেশের প্রাচীনতম সাপ্তাহিক যুগভেরী মর্যাদা সম্পন্ন পত্রিকা হিসেবে সকল মহলে ছিল সমাদৃত।

মুক্তিযুদ্ধের সময় যুগভেরী সাময়ীক বন্ধ ছিল। তবে মুক্তিযুদ্ধের সংবাদ সম্বলিত লক্ষ লক্ষ লিফলেট বিতরণ করা হয়েছে যুগভেরী প্রেস থেকে। ১৯৭৪ সালের ১৬ জুন চার পত্রিকা (দৈনিক বাংলা, বাংলার বানী, ইত্তেফাক ও টাইম) ব্যতীত যুগভেরী সহ দেশের সকল পত্রিকা সরকার কর্তৃক বন্ধ করে দেয়া হয়। এতে আমিনুর রশীদ চৌধুরী খুবই ভারাক্রান্ত হন। কান্নায় ভে্ঙ্গে পড়েন তিনি। অনেক চেষ্টা তদবির করে ৫ মাস পর যুগভেরী পুন:প্রকাশ হলে তিনি সম্বিত ফিরে পান। তার জীবদ্দশায় আর কোন দিন যুগভেরী প্রকাশনায় ব্যত্যয় ঘটেনি।

আমিনুর রশীদ চৌধুরী আজীবন সকল প্রকার স্বার্থান্বেষী মহলের রক্তচক্ষুকে উপেক্ষা করেছেন। সম্পাদকীয়তে সব সত্য কথাগুলো বলার যথাসাধ্য চেষ্টা করেছেন। মত প্রকাশে তিনি ছিলেন আপোসহীন ও অবিচল। মানবতার কল্যাণের জন্য নিজে যেমন আলোর পথে অগ্রসর হয়েছেন, তেমনি অন্যদেরকেও তার লেখনীর মাধ্যমে আহবান জানিয়েছেন। পরাধীনতার শৃঙ্খল ভেঙ্গে সিলেটবাসী ঘুরে দাঁড়িয়েছে বার বার।

সমকালীন উল্লেখযোগ্য লেখক-সাংবাদিক যুগভেরীতে লিখতেন। যারা এখন দেশে-বিদেশে স্ব স্ব ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠিত। বিলেতে বসবাসকারী আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি গানের রচয়িতা আবদুল গাফফার চৌধুরী থেকে শুরু করে আমেরিকায় বসবাসকারী সাংবাদিক-কলামিস্ট মাহবুবুর রহমান সহ আরো অনেকে নিজেদের স্মৃতি চারণে যুগভেরীতে তাদের লেখার হাতেখড়ি বলে উল্লেখ করেছেন।

নারী অধিকারের সমর্থনে আমিনুর রশীদ চৌধুরী সোচ্চার ছিলেন। তার স্ত্রী ফাহমীদা রশীদ চৌধুরী অঙ্গন ও প্রাঙ্গন নামে যুগভেরীতে একটি বিভাগ পরিচালনা করতেন। বাংলাদেশের কোন কাগজে এটাই সম্ভবত প্রথম নারী পাতা।

২৪ মার্চ ১৯৭১ সংখ্যা যুগভেরীতে ‘স্বাধীন বাংলাদেশ চাই’ শীরোনাম দিয়ে যে জাগরণ সৃস্টি করেছিলেন তা সারাদেশে স্ফুলিঙ্গ হয়ে রীতিমত দাবানলে পরিনত হয়। প্রশাসন তার ওপর প্রচন্ড ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠে। তাকে শ্রীমঙ্গলের নিজ বাগান থেকে স্বপরিবারে গ্রেফতার করা হয়। স্ত্রী-সন্তানদের হাউজ এরেস্ট করে তাকে নিয়ে যাওয়া হয় টর্চার সেলে। তার ওপর অমানুষিক নির্যাতন চলে। ইউরোপীয় বন্ধুদের সহায়তায় ১৩০ দিন পরে তিনি মুক্তি পান। কিন্তু দী্র্ঘদিন তাকে হাউজ এরেস্ট করে রাখা হয়। এরপর ১৬ সে্প্টেম্বর জেনেভার উদ্দেশ্যে স্বপরিবারে দেশ ত্যাগ করেন। যাত্রা পথেও তাঁকে অনেক কাঠ খড় পোহাতে হয়েছে।

জেনেভায় আইএলও সম্মেলনে শেষে আমিনুর রশীদ চৌধুরী লন্ডনে চলে আসেন। আমাদের মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে জনমত গঠণ এবং মুক্তিযোদ্ধাদের সাহায্যার্থে অর্থ সংগ্রহের উদ্দেশ্যে প্রচার-প্রচারণা চালান। সেসময় প্রবাসী কমিউনিটি নেতৃবৃন্দকে নিয়ে বাংলাদেশ মিশন চালু করতে তার প্রানান্ত প্রচেষ্টা ইতিহাস হয়ে আছে। তৎকালীন অস্থায়ী বাংলাদেশ মিশন এখন বিলেতে বিশাল বাংলাদেশ সেন্টারে পরিণত হয়েছে।

১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর বাংলাদেশ স্বাধীন হয়। স্বাধীনতার স্থপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান নয় মাসের বন্দী জীবন শেষে মুক্তি লাভ করেন ১৯৭২ সালের ৮ জানুয়ারি। পাকিস্তানের কারাগার থেকে সেদিন তিনি পিআইএ’র বিশেষ ফ্লাইট ৬৩৫-এ বিলেত আসেন। লন্ডনের হোটেল ক্যারিজ-এ তার আবাসনের ব্যবস্থা হয়। খবর পেয়ে আমিনুর রশীদ চৌধুরী বঙ্গবন্ধুর সাথে সাক্ষাৎ করেন। এক আবেগঘন পরিবেশে বঙ্গবন্ধু তাঁকে আলিঙ্গন করেন। পাক বাহিনী কর্তৃক গ্রেফতার ও নির্যাতনের ঘটনায় সমবেদনা জ্ঞাপন করেন তিনি। একইভাবে বঙ্গবন্ধু তাঁর নিজের বন্দী জীবনের অনেক কিছু অবহিত করেন।

সমৃদ্ধ জাতি গঠনের প্রত্যাশায় ১৯৭২ সালে স্বাধীন বাংলাদেশে স্বপরিবারে ফিলে আসেন আমিনুর রশীদ চৌধুরী। সিলেটবাসী কর্তৃক তাঁকে প্রদত্ব নাগরিক সম্বর্ধনায় মুক্তিযুন্ধে বাংলাদেশ সশস্ত্র বাহিনীর সর্বাধিনায়ক জেনারেল এমএজি ওসমানী বলেন, জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে খ্যাতিমান সিলেটের এই কৃতি সন্তানকে নাগরিক সংবর্ধনা জ্ঞাপনে দেশের এক রত্বের গুণগত স্বীকৃতির মাধ্যমে আমরা নিজেদের ঐতিহ্যবাহী সম্মান পুনরুদ্ধার করছি।

আমিনুর রশীদ চৌধুরী ছিলেন সিলেট প্রেসক্লাবের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি। ১৯৬৫ সাল থেকে ১১ বার তিনি প্রেসক্লাবের সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। সিলেটের শতবর্ষের সাংবাদিকতার স্মারক প্রতিষ্ঠান সিলেট প্রেস ক্লাবের উন্নয়নে তাঁর অবদান অনস্বীকার্য। তৎকালীন জেলা প্রশাসকের কাছ থেকে প্রেস ক্লাবের জায়গা লিজ নেয়ার ক্ষেত্রে তিনি বিশেষ ভূমিকা পালন করেছেন।

সিলেট আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর, সিলেট বিশ্ববিদ্যালয় সহ স্থানীয় দাবি আদায়ের আন্দোলনকে তিনি সব সময় উৎসাহ যোগাতেন এবং ব্যাপক প্রচারে সহায়তা করতেন। সিলেটের উন্নয়নে অসামান্য ভূমিকা পালনের জন্য আমিনুর রশীদ চৌধুরীকে ‘সিলেট বন্ধু’ বলে ডাকা হতো।

লেখক-সাহিত্যিকদের সব সময় পৃষ্ঠপোষকতা করতেন আমিনুর রশীদ চৌধুরী। যুগভেরী কেন্দ্রিক একটি সাহিত্য আসর জমে ওঠেছিল। এই আসরে অংশ গ্রহনকারী অনেক তরুন লেখিয়ে এখন প্রতিষ্ঠিত কবি ও ছড়াকার। মুসলিম সাহিত্য সংসদের মুখপত্র নুরুল হক সম্পাদিত মাসিক আল ইসলাহ, আব্দুল মান্নান সম্পাদিত সাপ্তাহিক আওয়াজ সহ অনেক পত্রিকা ও সাময়িকী প্রকাশনায় তিনি নিয়মিত আর্থিক সহায়তা করেছেন।

আমিনুর রশীদ চৌধুরীর গ্রামের বাড়ি সুনামগঞ্জের দরগাপাশা। তাঁর পিতা আব্দুর রশিদ চৌধুরী ছিলেন অবিভক্ত ভারতের কেন্দ্রীয় বিধান সভার সদস্য। মা ছিলেন কলতাতার খান বাহাদুর আগা কবির উদ্দিন আহমদের ভাইজি রাজিয়া বেগম। মামা বাড়ি কলতাতার ৩৮ নম্বর জাননগর রোডে তাঁর জন্ম হয় ১৯১৫ সালের ১৭ নভেম্বর। ১৯ জুন ১৯১৯ সালে মা রাজিয়া বেগম ইন্তেকাল করেন। তখন তাঁর দেখাশোনার দায়িত্ব নেন রাজিয়া বেগমের সহপাঠিনী নি:সন্তান এলিজাবেত।

এলিজাবেতের স্বামী চার্লসবেল ছিলেন কলতাতার বিখ্যাত বানিজ্যিক প্রতিষ্ঠান বুল্ক ব্রাদার্সের ম্যানেজিং ডাইরেক্টর। ইংলিশ মহিলার তত্বাবধানে ইংরেজি পরিবেশে বড় হয়েছেন আমিনুর রশীদ চৌধুরী। প্রায় দশ বছর সেখানে পড়াশোনা করেছেন। তিনি ছিলেন কলকাতা বয়েজ স্কুলের ছাত্র। সেখানকার জুনিয়র কেম্ব্রিজ পরীক্ষা দিয়ে চলে আসেন সিলেটে। রাজা জিসি স্কুল থেকে ১৯২৮ সালে মেট্রিক পাস করেন। এরপর এমসি কলেজে ভর্তি হলেও পরে চলে যান আলীগড় বিশ্ববিদ্যালয়ে। সেখানে অধ্যয়নকালে মহাত্মা গান্ধী পরিচালিত আন্দোলনে জড়িত থাকার কারনে গ্রেফতার হলে পড়ালেখার ইতি ঘটে। তবে মহাত্মা গান্ধী ও নেতাজী সুভাস চন্দ্র বসুর মতো আন্তর্জাতিক ব্যক্তিত্বের সংস্পর্শে এসে তিনি আলোকিত হন।

১৯৪৭ সালে পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর সংখ্যাগরিষ্ঠ বাঙালির মাতৃভাষা যখন পাকিস্তানে উপেক্ষা ও চক্রান্তের শিকার হয় তখনই পূর্ব পাকিস্তানের বাঙালিদের মোহভঙ্গ হয়। বহু বছরের স্বাধীকার আন্দোলন রূপ নেয় স্বাধীনতা সংগ্রামে। স্বাধীন হওয়ার জন্য লড়াই শুরু ১৯৪৮ সালে। এই আন্দোলনের ধারাবাহিকতায় ৬৯-এর গণঅভ্যুত্থান এবং ৭০-এর অসহযোগ আন্দোলনে তিনি ছিলেন সামনের কাতারে।

আওয়ামী রাজনীতির সাথে সক্রিয়ভাবে জড়িত না হলেও বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সাথে তাঁর সম্পর্ক ছিল গভীর। মাঝে মধ্যে টেলিফোনে কথা হত তাঁর। ২ মার্চ ১৯৭১ সালে তিনি স্বপরিবারে বঙ্গবন্ধুর সাথে দেখা করেন। বেগম ফাহমমীদা রশীদ চৌধুরী ছাড়াও সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্দুস সামাদ আজাদও সাথে ছিলেন। দেশের ভবিষ্যত নিয়ে অনেক কথা হয় বঙ্গবন্ধুর সাথে। এরপর থেকে তিনি বঙ্গবন্ধুর সকল কর্মসূচি বাস্তবায়নে বিশেষ ভূমিকা পালন করেন। তাঁর বাসভবন আম্বরখানার জ্যোতি মঞ্জিল হয়ে ওঠে শীর্ষ নেতৃবৃন্দের মিলন কেন্দ্র। আন্দোলনের অর্থ সংগ্রহ ও দিকনির্দেশনার কাজ চালিয়ে গেছেন তিনি অসীম সাহসিকতার সাথে।

১৯৪৭ সালে গণভোটের মাধ্যমে সিলেট তৎকালীন পাকিস্তানের অন্তর্ভুক্ত হয়েছিল। দাবি ছিল, সিলেট অঞ্চলকে বিশেষ মর্যাদা দানের। বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় কাঠামোর আওতায় সিলেটকে স্বায়ত্বশাসন দেওয়ার দাবি উচ্চারিত হয়েছিল যুগভেরীতে। দৃঢ় আত্মপ্রত্যয়ী ও সমাজহিতৈষী আমিনুর রশীদ চৌধুরী ছিলেন জালালাবাদ প্রদেশ আন্দোলনের প্রাণপুরুষ। সিলেটি নাগরী লিপির সহজবোধ্যতা আর সহজসাধ্যতা সাধারণ্যের সাহিত্যি রচনার দুয়ার উন্মোচন করেছিল, এরই ফলশ্রুতিতে রচিত হয়েছে বিপুল সংখ্যক নাগরী সাহিত্যি। এই নাগরী লিপির জন্য যারা কাজ করতেন তাদের সামগ্রীক সহায়তা করেছেন তিনি। আর যুগভেরীতে এর ব্যাপক প্রচার চালিয়েছেন।

নিজ অঞ্চলের জন্য নিবেদিত যুগভেরীর এ বিরল সাংবাদিকতার আন্তর্জাতিক স্বীকৃতিও মিলেছিল। আশির দশকে জাতিসংঘের আওতাধীন ’এশিয়ান মাস কমিউনিকেশন’ পাঁচটি সংবাদপত্রকে সফল কমিউনিটি সংবাদপত্র হিসেবে স্বীকৃতি দেয়। যুগভেরী তার মধ্যে ছিল অন্যতম।

আমিনুর রশীদ চৌধুরী শুধু নির্ভীক সাংবাদিকই ছিলেন না, ছিলেন উঁচু মানের সাহিত্যিক। খুব ভালো গদ্য লিখতেন। কলকাতার দেশ সাময়িকীতে তাঁর লেখা বের হতো। মরমি গানও লিখেছেন প্রচুর। তাঁর মানবিক গুণাবলি ছিল অতুলনীয়। ছিলেন দানশীল। ডান হাতে দিলে বাম হাত টের পেত না। রুচিবান, সংস্কৃতিমনা আত্মমর্যাদা সম্পন্ন মানুষ আমিনুর রশীদ চৌধুরীর ব্যক্তিত্ব ছিল খুবই আকর্ষণীয়।

দুটি পাতা একটি কুঁড়ির দেশ সিলেট। চা বাগানের আধিক্যের কারনেই এমন বিশেষণে অভিহিত করা হয় সিলেটকে। দেশের মোট উৎপাদিত চায়ের সিংহভাগই উৎপন্ন হয় সিলেটে। দেশের ১৬৪টি চা বাগানের ১৩৫টিই ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে বৃহত্তর সিলেট জুড়ে। ১৮৫৪ সালে সিলেটের মালনিছড়ায় বাংলাদেশের প্রথম চা বাগান প্রতিষ্ঠিত হয়। এতে ইউরোপীয় চা-কর এবং ব্রিটিশ প্রশাসকদের মধ্যে উদ্দীপনার সৃষ্টি হয়। তারা নিশ্চিত হন যে, শিক্ষা সংস্কৃতি ও যোগাযোগের দিক থেকে সিলেটের মত একটি অগ্রসর এলাকায় চা উৎপাদন বাণিজ্যিক দিক থেকে লাভজনক হবে।

প্রথমদিকে ব্যক্তিগত উদ্যোগে চা বাগান প্রতিষ্ঠা শুরু হয়। কিন্তু উনিশ শতকের ষাটের দশকে ব্যাপক মন্দায় ব্যক্তিগত উদ্যোগে চা বাগান প্রতিষ্ঠার তৎপরতা বন্ধ হয়ে গেলে চা শিল্প ধীরে ধীরে বড় বড় কোম্পানির আয়ত্তে চলে আসে। এসময় সিলেটের চা শিল্পে জেমস ফিনলে নিরঙ্কুশ আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করে। তবে উনিশ শতকের শেষদিক হতে ক্ষুদ্র একটি দেশীয় উদ্যোক্তা শ্রেণি চা শিল্পের সাথে সম্পৃক্ত হন। আমিনুর রশীদ চৌধুরীর পিতা আব্দুর রশীদ চৌধুরী তাঁদের অন্যতম। বাবার পদাঙ্ক অনুসরণ করে চা শিল্পে তিনি ও তাঁর অন্যান্য ভাই বিরাট সাফল্য অর্জন করেছেন।

পাকিস্তান ন্যাশনাল টি এসোসিয়েশন প্রতিষ্ঠায় আমিনুর রশীদ চৌধুরীর অবদান অবিস্মরণীয়। চা শিল্পের উন্নয়নে এবং বাংলাদেশের উপযোগী চা নিলাম প্রক্রিয়া চালুর জন্য তিনি বহু সংগ্রাম ও সাধনা করেছেন। লিখেছেন বিরামহীন ভাবে। তার আমীনাবাদ ও নুরজাহান চা বাগান থেকে অনেক অর্থ ব্যয করেছেন অপরাপর চা বাগানের স্বার্থে।

১৯৭৬ সালে রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান সিলেট সফরে আসলে একটি অনুষ্ঠানে চা উৎপাদন প্রক্রিয়া নিয়ে আমিনুর রশীদ চৌধুরী খুবই অর্থবহ বক্তব্য রাখেন। রাষ্ট্রপতি এই বক্তব্যে মুগ্ধ হন এবং কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহনের জন্য সংশ্লিষ্টদের নির্দেশ প্রদান করেন।

চা শ্রমিক- যাদের ঘাম আর নরম হাতের স্পর্শে এ দেশের চা বিশ্বব্যাপী সমাদ্ধৃত, তাদের জীবন মান উন্নয়নে আমিনুর রশীদ চৌধুরী ছিলেন নিবেদিত প্রাণ। চা শ্রমিকদের অবহেলা ও বঞ্চনা লাঘবে তিনি সোচ্চার ভূমিকা রেখেছেন। তাদের অন্ন, বস্ত্র, বাসস্থান, শিক্ষা, স্বাস্থ্য সহ মৌলিক অধিকার আদায় ও দুঃখ-দুর্দশা লাঘবে অন্যান্য বাগান মালিকদের অনুপ্রানিত করেছেন তিনি।

১৯৮৫ সালের ৩০ আগস্ট ইহধাম ত্যাগ করেন এই বরেণ্য ব্যক্তিত্ব। সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী ও জাতীয় সংসদের সাবেক স্পীকার, জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৪১তম অধিবেশনের সভাপতি হুমায়ূন রশীদ চৌধুরী সিলেট প্রেসক্লাব অয়োজিত শোক সভায় স্মৃতিচারন করতে গিয়ে বলেন, আমি পৃথিবীর বহু দেশ ঘুরেছি, বহু মানুষের সাথে মিশেছি, কিন্তু আমিনুর রশীদ চৌধুরীর মতো এমন হৃদয়বান সিংহপুরুষ দেখিনি। সিলেটের ব্যাপারে তাঁর ছিল প্রবল আকর্ষণ। পাকিস্তান আমলে সিলেটকে প্রদেশ করার দাবিতে সোচ্চার ছিলেন। তিনি একজন নির্ভিক সাংবাদিক এবং খাটি মুক্তিযোদ্ধা। মুক্তিযুদ্ধের সময় আমি ছিলাম দিল্লীতে মিশন প্রধান। পরিচয়পত্র পেশের জন্য রাষ্ট্রপতি ভবনে গিয়েছি। তখন ভারতের প্রেসিডেন্ট ভি ভি গিরি ও ভাইস প্রেসিডেন্ট ফখরুদ্দিন আলী আহমদ জিজ্ঞেস করেন আমি আমিনুর রশীদ চৌধুরীকে চিনি কিনা? গর্বে আমার বুক ফুলে উঠল। বললাম, আমি তাঁর ছোট ভাই। রাষ্ট্রীয় আনুষ্ঠানিকতা ভুলে তাঁরা আমাকে জড়িয়ে ধরলেন।

আমিনুর রশীদ চৌধুরী আমাদের ভাষা-সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য বিধ্বংসী সবরকম ষড়যন্ত্রের বিরুদ্ধে প্রবল প্রতিবাদ করেছেন। সিলেটের বিরুদ্ধে যখনই কোনো অশুভ শক্তি পায়তারা বা ষড়যন্ত্রে মেতেছে, নাগরিক সমাজ তাকিয়েছে তাঁর দিকে। তিনি নির্দেশনা দিয়েছেন। প্রতিবাদ করেছের। চরিত্রের দৃঢ়তায় মুক্তবুদ্ধির অনন্য মানুষ হিসেবে, সর্বোপরি বিবেকের প্রতীক হিসেবে তিনি আমাদের সবার আপনজন। আমাদের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য রক্ষায়, রাজনৈতিক আন্দোলন ও অধিকার প্রতিষ্ঠায় অভিভাবক হিসেবে অভিষিক্ত। সবার ভালোবাসায় স্নাত ‘সিলেট বন্ধু’ আমিনুর রশীদ চৌধুরীকে বিনম্র শ্রদ্ধায় স্মরণ করি।

    Print       Email

You might also like...

Mofajjol-Karim

সামাজিক বৈষম্যের ঈদ আর কত দিন

Read More →