Loading...
You are here:  Home  >  এক্সক্লুসিভ  >  Current Article

আরবি সাহিত্যের রোমান্টিক কবি আবুল কাসেম আল শাবি

abul-kasam-al-sabiড. কামরুল হাসান: আধুনিক তিউনিসিয়ার প্রখ্যাত কবি আবুল কাসেম আল শাবি। তিনি চির সবুজের কবি হিসেবেই তিউনিসিয়দের কাছে অধিক পরিচিত। তিউনিসের তিজুর প্রদেশের শাবিয়া অঞ্চলে ১৯০৯সালের ২৪ফেব্রুয়ারি কবি শাবির জন্ম।
বিচারিক চাকুরির সুবাদে কবি শাবির পিতা মুহাম্মদ শাবি তিউনিসিয়ার বিভিন্ন অঞ্চলে ঘুরে বেড়ান এবং তিউনিসিয়ার মনোমুগ্ধকর প্রাকৃতিক সৌন্দর্য প্রত্যক্ষ করেন। তিনি ১৯১০সালে সিলইয়ানার জাস্টিস পদে অধিষ্ঠিত হোন। ১৯১১ সালে কাফসা ও ১৯১৪সালে কাবুস এর জাস্টিসের দায়িত্ব পালন করেন। ১৯১৭সালে তালাহ উপত্যকা, ১৯১৮সালে মাজায আল বাব, ১৯২৪সালে রাস আল জাবাল, ১৯২৭সালে জাগুয়ান প্রভৃতি অঞ্চলে বিচারিক দায়িত্ব পালন করেন। কবি আবুল কাসেম আল শাবিও তার বাবার সাথে এসব অঞ্চলে ঘুরে বেড়ান।
কবি আবুল কাসেম আল শাবির পিতা শাইখ মুহাম্মদ শাবি একজন সৎ ও মুত্তাকি মানুষ ছিলেন। বিচারালয়, বাড়ি, মসজিদ এ তিনের মাঝেই তার দিন অতিবাহিত করতেন। ফলে কবি শাবি ধর্মীয় ও সংরক্ষণশীল পরিবেশে বেড়ে ওঠেন।
কবি আবুল কাসেম আল শাবি তার বাবার সাথে ১৯১৭সাল থেকে ১৯২৭সাল পর্যন্ত জাগুয়ানে থাকেন। এ সময় তার বাবা হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়লে তিনি তিজুরে ফিরে আসার আগ্রহ প্রকাশ করেন। তিজুরে ফিরেও আসেন। তবে এরপর তিনি বেশিদিন বাঁচেননি। ১৯২৯সালের সেপ্টেম্বর মাসে কবি আবুল কাসেম আল শাবির পিতা ইন্তিকাল করেন।
কবি আবুল কাসেম আল শাবি ১৯২৮সালে জাইতুনা বিশ্ববিদ্যালয় হতে ¯œাতক এবং ১৯৩০ সালে তিউনিসিয়া বিশ্ববিদ্যালয় হতে আইন বিষয়ে ¯œাতক ডিগ্রি অর্জন করেন।
১৯২৯সালে প্রথম তার হার্টের অসুখ ধরা পড়ে। তবে তখনও তা প্রকট হয়নি। এ সময়ে তার বাবা তাকে বিয়ে দিতে মনস্থ করেন। কিন্তু কবি শাবি স্বাস্থ্যগত কারণে তার বাবার ইচ্ছায় আপত্তি করেন। শীঘ্র ডাক্তারের শরণাপন্ন হোন। বিশেষজ্ঞ ডাক্তার মুহাম্মদ আল মাতেরিকে দিয়ে স্বাস্থ্য পরীক্ষা করান। ডাক্তার মাতেরি তাকে প্রাত্যহিক বিধি-নিষেধসহ ব্যবস্থাপত্র প্রদান করেন। বাবার চাপাচাপিতে বিয়েতে সম্মতি প্রকাশ করেন। দু’পুত্রের জনক হোন। কবি শাবির শারীরিক অবস্থার ক্রমশ অবনতি হতে থাকে। তিনি নতুন নতুন সমস্যার মুখোমুখি হতে থাকেন। অবশ্য কবি ছোটবেলা থেকেই  ক্ষীণকায় ও দুর্বল স্বাস্থ্যের অধিকারী ছিলেন। ফলে জাইতুনা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র থাকাকালীন তার স্বাস্থ্যের আরো অবনতি হয়। ইতোমধ্যে দুর্ঘটনা ঘটে- তার বাল্যবান্ধবীর মৃত্যু। এতে তিনি মারাত্মকভাবে চপেটাঘাত প্রাপ্ত হোন। ফলে ডাক্তারের পরামর্শ ও নির্দেশনাকে উপেক্ষা করতে থাকেন। তার প্রতি ডাক্তারের পরামর্শ ছিলো কোনো প্রকারের কায়িক পরিশ্রম ও মানসিক চাপ থেকে দূরে থাকতে হবে। তিনি এ উপদেশ পালন তো করেননি। তদুপরি বিয়ে তাকে আরো চিন্তান্বিত করে তোলে। ডাক্তার তাকে দৌড়াদৌড়ি, হাঁটাহাঁটি, পাহাড়ে ওঠা, সাইকেল চালানো ইত্যাদি বারণ করেন। এতে তিনি যারপরনাই ব্যথিত হোন। একদা তিনি জাইতুনা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছেলেদের মাঠে খেলাধুলা করতে দেখে ডুকরে কেঁদে ওঠেন। আফসোস করে বলতে থাকেন-
হায় আমার হার্ট! তুমি বড়োই দুর্বল। তুমিই আমার যতো কষ্টের কারণ। তুমিই আমার সকল চিন্তার উৎসভূমি। তুমিই আমার জীবনকে অর্থহীন করেছো।
তার অসুস্থতা ক্রমশ বৃদ্ধি পেতে থাকে। একে একে কয়েকজন ডাক্তারের শরনাপন্ন হোন। ডাক্তাররা তাকে কোনো মনোরম প্রাকৃতিক পরিবেশে অবকাশ যাপনের পরামর্শ দেন। ১৯৩২সালে ডাক্তারের পরামর্শ মোতাবেক গ্রীষ্মকালীন অবকাশ যাপনের জন্য আইনু দারাহিমে যান। এ সময় তিনি তাবরাকাহ নগরী পরিদর্শন করেন। কিছুটা সুস্থতা বোধ করেন। পরবর্তী বছর সমুদ্র তীরবর্তী এলাকা ভ্রমনে যান। দৃষ্টিনন্দন ও প্রাকৃতিক সৌন্দর্যশোভিত এলাকা দর্শনে তার মন জুড়ে যায়। পুরো গ্রীষ্ম সেখানেই কাটিয়ে দেন। শীতের প্রারম্ভে তিনি তুজির এ ফিরে আসেন। কিন্তু এবারের পরিভ্রমন তার সুস্থ্যতার কোনো সুসংবাদ বয়ে আনেনি। ১৯৩৩সালের শেষদিকে তার শারীরিক অবস্থার ভয়াবহ অবনতি হতে থাকে। তিনি শয্যাশায়ী হয়ে পড়েন। শীত যায়। বসন্ত আসে। কিন্তু কবির অবস্থার কোনো পরিবর্তন হয় না। সুস্থতার মানসে কবি এবার হিম্মা এলাকায় যান। ডাক্তারদের সকল প্রচেষ্টা ব্যর্থ হয়। শেষতক কবি তিউনিসিয়ার রাজধানীতে ফিরে আসেন। এখানে সেখানে ছুটোছুটি করেন। কিন্তু কিছুতে কিছু হয় না কবি শাবির। দিনদিন কবির অবস্থা ক্রমাবনতির দিকেই যেতে থাকে। ৩রা অক্টোবর তিনি তালইয়ান হাসপাতালে ভর্তি হোন। ৬দিন পর ৯অক্টোবর সোমবার প্রত্যুষ চারটার সময় কবি ইহজীবনের মায়া ত্যাগ করে পরপারে পারি জমান। সেদিনই কবির শবদেহ তুজিরে নেয়া হয়। সেখানেই কবিকে সমাধিস্থ করা হয়।
কবিকে তিউনিসের দীপ্তি এবং আরবির প্রতীচ্য উপাধিতে ভূষিত করা হয়েছে। তার কালজয়ী কবিতাসমূহের কারণে তাকে প্রাচ্য ও প্রতীচ্যের সেতুবন্ধন হিসেবে অভিহিত করেছেন আরবি কাব্যের বোদ্ধাসমাজ।
২.
তিউনিসিয়ার কবি আবুল কাসেম আল শাবি। তাকে আরবি রোমান্টিক কবিতার পথিকৃৎদের অন্যতম গণ্য করা হয়। তিনি ছিলেন আধুনিক তিউনিসিয়ার সাহিত্যাকাশের উজ্জ্বল তারকা। প্রবাদ পুরুষ। লেখালেখিতে তিনি মিসরীয় সাহিত্যিক ও ইসলামি সংস্কারক মুহাম্মদ আব্দুহুর দ্বারা অতি মাত্রায় প্রভাবিত ছিলেন। ১৯২৬সালে তার প্রথম কাব্যগ্রন্থ প্রকাশিত হয়। তিনি ক্লাসিকধর্মী ঐতিহ্যিক আরবি কবিতার অনুরক্ত ছিলেন। তবে তার সাথে তিনি ফ্রান্সীয় রোমান্টিকতার সংমিশ্রণে প্রচ- আগ্রহী ছিলেন। তার কবিতা পাঠে ডি-মাসেট, লা-মারটিন, টি-গাশিয়ার প্রমুখ রোমান্টিক কবিদের প্রভাব অতিমাত্রায় লক্ষণীয়।
৩.
কবির অত্যল্পকালে আমাদের জন্য রেখে যাওয়া কবির শ্রেষ্ঠ সাহিত্যকর্মের মধ্যে রয়েছে-
ক. আগানি আল হায়াৎ (জীবন সঙ্গীত) ১৯৬৬ ২য় সংস্করণ
খ. আল খিয়াল আল শিরি ইনদাল আরব (আরবদের কাব্যকল্পনা) ১৯৬১
গ. রাসাইল আল শাবি (শাবির পত্রাবলী) ১৯৬৬
ঘ. মুজাক্কারাত (স্মরণ)
ঙ. সাদিকি (বক্তৃতা সংকলন)
কবি আবুল কাসেম আল শাবি সাহিত্যের প্রতি অতি মাত্রায় অনুরক্ত ছিলেন। বিশেষত আধুনিক সাহিত্যের প্রতি তার অনুরক্ততা ছিলো প্রবল। তবে তা কোনোভাবেই ক্ল্যাসিক সাহিত্য বা সাহিত্যিক ঐতিহ্যকে অস্বীকার করে নয়। তার লেখা প্রায় প্রতিটি কবিতাই যুগপৎ প্রাচীনত্ব ও আধুনিকতার সমন্বিতরূপ। আরবি প্রাচীন কবিতার মাত্রা, ছন্দ, বৃত্ত, তার কবিতায় রয়েছে আবার আধুনিক কবিতার বিষয়বস্তু, রসদ, ঢঙ প্রভৃতিও সেখানে মূর্তিমান। তিনি ছিলেন প্রকৃতপক্ষে প্রকৃতিপ্রেমী চির সবুজের কবি। প্রকৃতির প্রতি তার নিখাঁদ ভালোবাসার শেষ ঠিকানা দেশপ্রেম। তাই কবি আবুল কাসেম আল শাবিকে পোয়েট অফ ন্যাচার টু প্যাট্রিওটিওজম বলা হয়ে থাকে।
৪.
চির সবুজের কবি আবুল কাসেম আল শাবি প্রকৃতির বন্দনা করেছেন চিরায়ত। তিউনিসিয়ার প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের ভূগোলকে উপস্থাপন করেছেন কবি দেশপ্রেমের নব মাত্রায়। মিন আগানি আল রুয়াত (রাখাল সঙ্গীত) কবিতায় নিঃসীম প্রকৃতির সাথে দেশপ্রেমের যুগপৎ পথ চলার অনবদ্য দৃশ্য এঁকেছেন অনুপম নান্দনিকতায়। কবি বলেন:
জীবনের বন্দনা / আসে সুবহি সাদিক
দোল খায় গাছেরা / স্বপ্ন দেখে সুপ্রভাতের
শিশির সিক্ত গোলাপ পাত্রে /  নিত্য নাচে প্রভাত
আলো হয় উপত্যকা / কেটে যায় তমসা রাত
সুবহি সাদিকের আগমনে / দিগন্ত দীপ্যমান
ফুল পাখি হাই তোলে / সমুদ্রের কলতান
পৃথিবী সজীব হয় / জীবন বন্দনায়
সুখ নিদ্রা ছেড়ে ওঠো / পৌঁছে যাও স্বীয় ঠিকানায়।।
এভাবেই প্রকৃতির বন্দনায় নিরত কবি শাবি প্রকৃতিকে সৌন্দর্যম-িত ও কারুকার্যখচিত করে তোলেন পাঠক হৃদয়ে। তিউনিসিয়ার নিসর্গ প্রকৃতির বিমূর্ত প্রতিচ্ছবি তার অনেক কবিতায়ই আমরা দেখতে পাই। তবে নিতান্ত প্রকৃতি বন্দনা কবির কবিতার শেষ কথা নয়। বরং সেখানেও দেশ, দেশমাতৃকা কবির কাছে অনেক বড়ো বিষয়। উপর্যুক্ত কবিতায় আমরা প্রভাত, শিশির সিক্ত গোলাপ, উপত্যকা, সমুদ্রের কলতান এসবের নিঃসীম সৌন্দর্য অবলোকন করি। কিন্তু কবি দেশ গঠনে জাতিকে জাগাতে ভোলেননি। সুখ নিদ্রা ছেড়ে জাতি গঠনে মনোনিবেশের অকৃত্রিম আহ্বান কবির নিখাঁদ দেশপ্রেমের প্রতি ইঙ্গিত করে। এ কবিতার মাঝামাঝি দেশ গঠনে কবির আকুতি যেনো দেশের প্রতি কঠোর দায়বোধেরই আর্তি।
তুলে ফেলো আগাছা / চাষ করো নতুনের
নলখাগড়ার বাঁশীর ঐ/  ডাক শোনো গঠনের।।
কী চমৎকার কবির আহ্বান! প্রকৃতি প্রীতির পশ্চাতে দেশ প্রেমের কী অনবদ্য নমুনা। দেশের প্রতি প্রেম কতোটা নিখাঁদ হলে এভাবে জাতিকে দেশের উন্নয়নে আহ্বান করা যায়। কবির উপমা-উৎপ্রেক্ষাতেও রয়েছে চমৎকারিত্বের যাদু। আগাছা মুক্ত নতুনের চাষাবাদ, নলখাগড়ার বাঁশীর আহ্বান সত্যিই মনোমুগ্ধকর।
কবি আবুল কাসেম আল শাবি ছিলেন স্বল্পায়ু। তার জীবন ছিলো মাত্র পঁচিশ বছরের। তার সাহিত্যের খাজাঞ্চীও অতিকায় ছিলো না। তবে তার লেখা ছিলো মানোত্তীর্ণ। ডাক্তারী তথ্য মতে হার্টের অসুখে তার মৃত্যু হলেও মনে করা হয় তার মৃত্যুর কারণ তিনটি- ক. দুর্বল হার্ট খ. বাল্যবান্ধবীর অকাল মৃত্যু গ. ডাক্তারের পরামর্শ উপেক্ষা করা। কবি সত্যিই ভালোবাসার কাঙাল ছিলেন। মা’তাম আল হুব্ব (ভালোবাসার আর্তি) কবিতায় কবির আর্তনাদ:
হায় আমি! কোন পাখি
কান্না শুনি হৃদয় উৎসারিত
প্রত্যুষেও নির্বাক অউদ্বেলিত
বিন¤্র, বিষণœ সে পাখি।।
কী সে আমি জানি না!
নির্বাক বুলবুল শব্দহীন নিষ্প্রাণ
জগৎজোড়া সুখ্যাতি কলতান
নাকি মেঘের আড়ালে শুধুই কান্না।।
কেঁদেছি কতো / ঘোর অমানিশা
কবরের আলাপন /  দুঃখের আর্তি
আর্তির অনুরনন / শুনেছি সবই
দুঃখকাতর আমি সর্বদা।।
দুঃখ, কষ্ট, জ্বরা ইত্যাদিতে জাতি নিমজ্জিত। কবি জাতিকে নানাবিধ জ্বরা হতে মুক্তি দিতে উদগ্রীব। নতুন দিনের প্রতি, নতুন স্বপ্নের প্রতি কবির টান দুর্নিবার। আল সাবাহ আল জাদিদ (নতুন ভোর) কবিতায় নতুনের আহ্বানে কবির সুদীপ্ত আবেদন:
ভীরু কাপুরুষ এবার তুমি থামো
কান্নার সময় শেষ, আহাজারিরও
উদয় হয়েছে নতুন সূর্যের
দাফন করেছি কষ্টের
গেয়েছি জীবনের জয়গান
ছেড়েছি অশ্রু
জামানার অবদান।।
এভাবেই নতুনের জয়গান গেয়েছেন কবি আবুল কাসেম আল শাবি এ কবিতার প্রতিটি ছত্রে। খাফিফ ছন্দমাত্রায় রচিত এ কবিতা আধুনিক তিউনিসিয়ায় কোরাস গানের মর্যাদা পেয়েছে। উদ্দীপ্ত জনতার মুখে মুখে তার এ কবিতার কোরাস উচ্চারিত হতে শোনা যায়। কবিতার শেষে কবির আহ্বান:
বিদায় হে চিন্তাপর্বত
বিদায় হে কষ্টকুহেলি
বিদায় হে হাবিয়া গিরিপথ
নৌকার বাদাম তুলেছি মহাসমুদ্রে
নতুনের বিজয় সমাসন্ন
অস্পৃশ্য হোক পুরাতন, জ্বরা, জীর্ণ।।
দেশ ও জাতির জন্য নিবেদিত কবির কবিতাসমূহ এমন ঘন আবেগে জাতিকে আপ্লুত করে। উদ্যমী করে। তিউনিসিয়ার সবুজ প্রকৃতিকে আরো এক নতুন সবুজের আগমনের জন্য প্রস্তুত করে।
জীবনকে ভালোবাসে কে না? কবিও ভালোবাসতেন। তিনি জানতেন তার আর বেশিদিন বেঁচে থাকা হবে না। নিশ্চিত মৃত্যুতে জীবনের প্রতি উদগ্র ভালোবাসা কবিকে খানিকটা বিচলিত করে। জীবনের আর্তি দুমড়ে-মুচড়ে কবিকণ্ঠে বেরিয়ে আসে বিণা অবলীলায়:
ভালোবাসা! ভালোবাসা!!
তুমিই আমার বিষণœতা কিংবা বিস্ময়
বিপদ কিংবা সংশয়
তুমিই আমার সঙ্গীত মূর্চ্ছণা
কষ্ট যন্ত্রণা
তুমিই আমার আসক্তি কিংবা অশ্রু
রাগ, ক্রোধ, প্রত্যাশা, আভিজাত্য
আত্মসম্মান এমনকি আমার অস্তিত্ব
আমার সবই তোমার জন্য
হে ভালোবাসা।।
দেশ, জাতি ও জগতের প্রশ্নে কবি অবশ্যই আশাবাদী। তবে নিজের প্রশ্নে কবি ভুগতেন হতাশায়। তার জীবনের পরতে পরতে হতাশার ছায়া প্রলম্বিত। নিজের জীবন, পরিবার, সন্তানদের ভবিষ্যৎ ইত্যাদি প্রশ্নে হতাশা কবিকে করে আরো হতাশ। অসংখ্য কবিতার নাম করা যাবে যেখানে কবির হতাশা নানা মাত্রিকতায় রূপ পেয়েছে। শিকওয়া আল ইয়াতিম (ইয়াতিমের অভিযোগ) কবিতায় কবি নিজেকে ইয়াতিম হিসেবে উপস্থাপন করে অনুযোগ করেন:
বিলাপ করেছি অর্থহীন
মাকে ডেকেছি নিরুত্তর
কষ্টের রাজ্যে আমি একা
একাই কেঁদেছি
কান্নার গোঙানি শুনেছি
একাই থেকেছি
আর বলেছি নিজেকে-
তোমার চুপ থাকাই শ্রেয়।।
প্রকৃতির প্রতি দুর্বলতা কবি শাবির আজন্মের। এমনিতেই তিউনিসিয়া প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের লীলাভূমি। বাবার চাকুরির সুবাদে বাবার সাথে তিউনিসিয়ার বিভিন্ন অঞ্চলের প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের সাথে তার সখ্যতা গড়ে ওঠে। তিউনিসিয়ার নির্মল, নির্ঝর প্রকৃতির প্রতি ক্রমশ দুর্বল হতে থাকেন কবি শাবি। প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের বর্ণনায় প্রবৃত্ত হয় তার অবচেতন মন। তিউনিসিয়ার নিসর্গ প্রকৃতি যেনো সুন্দরের পুজারি কবির অস্তিত্বের অংশে পরিণত হয়। প্রকৃতি বৈ কবি তার অস্তিত্বকেই চিন্তা করতে পারতেন না। প্রকৃতির বর্ণনা সমৃদ্ধ তার শত সহ¯্র শ্লোক রয়েছে। কবি তার দেশের নিসর্গ প্রকৃতি দেখেছেন। তাই পৃথিবীর রূপ খুঁজতে চাননি তিনি। কবি বলেন:
একা আমি সুখী নই
পাহাড় বনানী বৈ
পাইন গাছের স্পর্শ বিনে
সুখ খুঁজে পাবো কই।।
কবি এভাবেই পাহাড়, উপত্যকা, বন-বনানীর নিঃসীম সৌন্দর্যের মাঝেই জীবনের অর্থ খুঁজে পান। কবির বাল্যবান্ধবীর মৃত্যুর কথা আমরা আগেই জেনেছি। বান্ধবীর প্রতি কবির ভালোবাসা ছিলো খনি আহরিত কাঁচা সোনার মতোই খাঁটি। তাদের প্রেম ও বয়সের পরিণতির আগেই বান্ধবীর অকাল মৃত্যু কবিকে চপেটাঘাত দেয়। কবি অসংলগ্ন জীবন যাপন শুরু করেন। যদিও তার বয়স তখনও কুড়ি পেরুয়নি। সে সময়ে তার লেখা কবিতাগুলো ছিলো অনেকটা কাঁচা হাতের। তবে মর্মবেদনা ও প্রেমানুভূতির যৌথ অনুপ্রবেশে তা ছিলো মধুসঞ্চারী। বান্ধবীর স্মরণে কবির অভিব্যক্তি:
মরে গেছে তোমার ভালোবাসা
এই তার সমাধি
কাঁদো রে মন কাঁদো
কান্নায় পাও স্বস্তি।।
কিংবা
আমার নয়ন দেখেছে তোমাকে
তোমার পদসঞ্চালনার মূর্চ্ছণা
ত্রস্ত হয়েছে বিক্ষত অন্তর
কেঁপেছে গোলাপ বৃন্ত।।
সমূহ সৌন্দর্যের আকর তুমি
স্ফীত বক্ষ, হরিণীর দৃষ্টি
বসনে-ভূষণে মাদকতা
কণ্ঠে দুরাগত শিঞ্জিনি।।
কবির বান্ধবীর সাথে অভিসারের বর্ণনায় ¯œাত হয় পাঠকসমাজ যখন তিনি বলেন:
এই বনতলে গাছের নিচে
জাইতুনের ছায়ায়
তোমাতে আমাতে হারিয়ে গেছি
দু’জন দু’জনায়।।
ডুবে যেতাম স্বপ্নজালে
আকাশের নিচে বনতলে
ভুলে যেতাম বাঁচা-মরা
আশা যতো ঢাকা মখমলে।।
কবি আবুল কাসেম আল শাবির মাঝে পাওয়া যায় দ্বৈতস্বত্ত্বার অস্তিত্ব। দেশ, জাতি, জাতীয়তা ইত্যাদি প্রশ্নে আমরা কবির মাঝে আশাবাদী স্বত্ত্বার উপস্থিতি টের পাই। কবি দেশকে নিয়ে স্বপ্ন দেখেন, দেশের উন্নয়নে স্বপ্নের জাল বুনেন। উন্নত জাতি হিসেবে তিনি তিউনিসিয়দের বিশ্বদরবারে উপস্থাপন করতে প্রয়াসী হোন। এ নিয়ে কবির স্বপ্ন অন্তহীন। আশা অফুরন্ত। কবির অসংখ্য কবিতায় এর দ্যোতনা বিদ্যমান। আবার নিজের জীবন, প্রেম, ভালোবাসা, চলৎ জীবনের আশু সমাপ্তির নিশ্চিত সম্ভাবনা, তীব্র আকাক্সক্ষা, অপূর্ণ বাসনা ইত্যাদি বিষয়ে তিনি চরম হতাশাবাদী একজন কবিপুরুষ। তার অনেক কবিতায় এ হতাশা ঝড়ে পড়েছে বারবার। হতাশা তার জীবনকে করেছে সংশয়াচ্ছন্ন। তার এ দ্বৈতসত্ত্বা আমাদেরকে মনে করিয়ে দেয় তিনি যতোটা ছিলেন কবি তার চেয়ে বেশি ছিলেন মানুষ। তিনি নিজেও তাই মনে করতেন। বলতেন-
আমার নিজস্ব অভিব্যক্তিই আমার কবিতা। আর আমার কবিতাই আমার আপণ অভিব্যক্তি।
কবির এ দ্বৈতস্বত্ত্বার মাঝেও একটি মজার বিষয় লক্ষণীয়। তা হলো- প্রত্যেক হতাশার শেষপ্রান্তে এসে তিনি আলোকের ফুলকি দেখতে পান। সে আলোকরেখায় তিনি হোন আশান্বিত। সবাইকে জাগতে বলেন, নতুনের চাষ করতে বলেন। এখানেই কবি শাবির স্বাতন্ত্রতা।
কবি আবুল কাসেম আল শাবির লেখার বয়স অত্যল্প। তবুও লিখেছেন প্রচুর। তার সমসাময়িক প্রায় সকল কবির মাঝে কবিতার মান ও সংখ্যা উভয় দিক বিচারে তার মর্যাদা সুপ্রতিষ্ঠিত। আশাবাদী বা হতাশাবাদী নয় আসলে তিনি ছিলেন জীবনবাদী কাব্যের প্রতিভূ। তিনি পাহাড়-বনানী, গাছ-পালা, তরু-লতা, পাখ-পাখালি, হেমন্ত-বসন্ত, গোধুলি-সন্ধ্যা, জীবন-মৃত্যু, প্রেম-ভালোবাসা, অভিসার-প্রণয়, দেশ-জাতি-ধর্ম, হতাশা প্রভৃতি বিষয়কে আশ্রয় করে লিখেছেন। কিন্তু সবার উপরে স্থান দিয়েছেন দেশকে। দেশের মানুষকে। দেশের জন্য তার ভালোবাসা ছিলো অবারিত। তার সব কবিতাই ছিলো দেশের জন্য উৎসর্গিত।

    Print       Email

You might also like...

6afed405318d4219e5ce1f58be1a4401-5a1580a4a4885

২৭ নভেম্বর লন্ডনে কারি শিল্পের ‘অস্কার’

Read More →