Loading...
You are here:  Home  >  সাহিত্য  >  Current Article

আরব সাগরে সন্দ্বীপের সাম্পানওয়ালা

efb343b9bd65e514901605d179b12b8b-598b0c8f96cd8
কাতারের রাজধানী দোহা আরব উপসাগরীয় অঞ্চলের ব্যস্ততম এবং আধুনিক নগরী। এই শহরে বিশুদ্ধ বাতাসে হেঁটে বেড়াতে চাইলে সবচেয়ে উপযুক্ত জায়গা কর্নিশ। দোহার এক প্রান্তজুড়ে যে অংশে আরব উপসাগরের মোহনা এসে মিশেছে, সেটাই কর্নিশ। সাত কিলোমিটার দীর্ঘ এই কর্নিশে হাঁটাচলার জন্য রয়েছে প্রশস্ত পথ। এর একপাশে সবুজ ঘাস এবং গাছগাছালি, অন্যপাশে সাগরের লবণাক্ত পানি। প্রতিদিন সকাল-সন্ধ্যায় নানা বয়সী নাগরিক, অভিবাসী ও পর্যটকদের পদচারণায় মুখর হয়ে ওঠে এই উন্মুক্ত কর্নিশ।

সাগরের ঢেউয়ে ছলাৎ ছলাৎ শব্দ আর নির্মল বাতাসের এমন মনোমুগ্ধকর প্রাকৃতিক পরিবেশ দোহায় আর কোথাও নেই। ফলে প্রাতর্ভ্রমণ ও বৈকালিক বিনোদনের অন্যতম স্থান হওয়ার পাশাপাশি আরব উপসাগরে ভেসে বেড়ানোর জন্য নৌকাভ্রমণের একমাত্র জায়গা এই কর্নিশ। বছরের যেকোনো দিন বিকেলের পর কর্নিশে গেলে দেখা মিলবে সারি সারি আরব সাম্পানের। সন্ধ্যা হতেই বর্ণিল আলোকসজ্জায় সাজানো এসব সাম্পান যেকোনো বয়সের দর্শনার্থীকে মুগ্ধ করবে।
নানা আকারের এসব সাম্পান কাঠের তৈরি। ওপরে ছাদ ও নিচে দুই পাশজুড়ে চেয়ার। আকৃতি অনুযায়ী ২০-৫০ জন যাত্রী বসতে পারেন একেকটি সাম্পানে। ভেতরে রয়েছে আধুনিক শব্দযন্ত্র। যাত্রীর পছন্দ অনুযায়ী চালকেরা আরবি গান বাজিয়ে শোনান। কেউ চাইলে নিজের মোবাইল থেকে পছন্দের গানও শুনতে পারেন। যাত্রীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে আছে পর্যাপ্তসংখ্যক লাইফ জ্যাকেট।
সাগর ভ্রমণের জন্য তৈরি ইঞ্জিনচালিত এসব কাঠের নৌকাকে আরবিতে বলা হয় সাফিনা, কাওয়ারেব অথবা মারকাব। যদিও স্থানীয় চালকেরা এগুলোকে ‘বোট’ বলে থাকেন। বর্তমানে দোহার কর্নিশে আছে মোট ১১০টি সাম্পান। এর মধ্যে ১০৫টি পরিচালনা করছেন বাংলাদেশিরা। প্রতিটি সাম্পানে রয়েছেন চালক, সহায়তাকারী ও ব্যবস্থাপক। তাঁদের বেশির ভাগই চট্টগ্রাম জেলার সন্দ্বীপ উপজেলা থেকে এসেছেন।
বেশ কয়েকজন সাম্পান কর্মীর সঙ্গে আলাপকালে জানা গেল, বছরের এই মৌসুমে প্রচণ্ড গরম থাকায় যাত্রীর সংখ্যা সাধারণত কম হয়ে থাকে। তবে আবহাওয়া সহনীয় হয়ে এলে এবং বিশেষ করে শীত ও বসন্ত মৌসুমে তাদের ব্যস্ত সময় কাটে। ২০ মিনিট, আধ ঘণ্টা কিংবা এক ঘণ্টার জন্য নির্ধারিত ভাড়ায় এসব সাম্পান সাগরে ভেসে বেড়ায়। যাত্রীদের কাছ থেকে ঘণ্টাপ্রতি সর্বোচ্চ তিন শ রিয়াল ভাড়া নিয়ে থাকেন ব্যবসায়ীরা। তবে কেউ সপরিবারে বেড়াতে চাইলে এবং যাত্রীর সংখ্যা কম হলে সে ক্ষেত্রে ২০০ রিয়ালেও এক ঘণ্টা সাগর ভ্রমণ করা যায়।
সন্দ্বীপের যুবক জনি গত ১১ বছর ধরে কর্নিশে সাম্পান ব্যবসায় জড়িত। প্রথম আলোকে তিনি বলেন, আমার বাবা মোহাম্মদ সিদ্দিক আলম ২১ বছর আগে এখানে ব্যবসা শুরু করেছিলেন। সেসময় পুরো কর্নিশে মাত্র আটটি নৌকা ছিল। এর মধ্যে বাবা ও কফিলের যৌথভাবে ছিল একটি। সেটি দিয়েই তাঁর যাত্রা শুরু। বর্তমানে আমাদের তিনটি নৌকা রয়েছে।

দোহার কর্নিশে সাম্পান

জনির ভাষায়, কাতারের অন্যান্য খাতে ব্যবসা-বাণিজ্যে ভারতীয় বা অন্যান্য দেশীয় ব্যবসায়ীদের সঙ্গে যে প্রতিযোগিতার মুখোমুখি হতে হয়, এখানে তেমন নেই। বরং নির্বিঘ্নে ঝামেলা ছাড়া ব্যবসা করা যাচ্ছে। কাতার সরকারের নীতিমালাও অত্যন্ত পর্যটনবান্ধব। ফলে কোনো বাড়তি ফি বা আইনি ঝামেলা নেই এখানে।
জনি প্রথম আলোকে বলেন, সর্বশেষ যে সাম্পান আমরা বানিয়েছি, এতে আমাদের খরচ হয়েছে চার লাখ বিশ হাজার রিয়াল। এটিও আমার বাবা ও কফিলের যৌথ বিনিয়োগ। জনির দাবি, কর্নিশে বর্তমানে সবচেয়ে বড় সাম্পানটি তাদের। এটির নাম ‘নুরুল কামার’ বা ‘চাঁদের আলো’। এ ছাড়া প্রত্যেক সাম্পানের রয়েছে এমন আলাদা আলাদা নাম।
বিশেষ জাতের কাঠ দিয়ে তৈরি এসব নৌযানের ইঞ্জিন ডিজেলচালিত। আকৃতিভেদে কখনো কখনো তিন শ লিটার ডিজেল খরচ হয় বড় আকারের সাম্পানে। পাশে থাকা ডিপো থেকে প্রতিদিন প্রয়োজনমাফিক জ্বালানি সংগ্রহ করে থাকেন চালকেরা।
তৈরির খরচ ও শ্রমিকদের নিয়মিত বেতন এবং জ্বালানির মূল্য ছাড়া বাড়তি তেমন খরচ নেই। প্রতিটি নৌযানের লাইসেন্স নবায়ন ফি বছরে দুই শ রিয়াল। এর সঙ্গে পৌর ফি হিসেবে দিতে হয় আরও এক হাজার পঞ্চাশ রিয়াল। ছাড়পত্র নবায়নের সময় পৌর মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা এসে বৈদ্যুতিক তার ও অন্যান্য সরঞ্জাম ঠিকমতো স্থাপন করা আছে কিনা, তা যাচাই করে দেখেন।
কফিলের ছয়টি সাম্পান দেখভাল করেন তাজুল ইসলাম। তাঁর বাড়িও সন্দ্বীপে। প্রথম আলোকে তিনি বলেন, ২০ বছর ধরে এই পেশায় আছি। বিকেল চারটা থেকে রাত দুটা পর্যন্ত আমাদের নৌকা যাত্রীদের সেবা দিয়ে থাকে। এখন গরম তাপমাত্রার কারণে যাত্রী ও পর্যটকের সংখ্যা কিছুটা কম, তবে অন্য সময় কাজের চাপ বেড়ে যায়।
আরেকটি সাম্পানে কাজ করেন সমর। সদ্য ২০ পেরোনো এই তরুণ প্রথম আলোকে বলেন, শুক্রবার আমাদের যাত্রীসংখ্যা বেড়ে যায়। ফলে সবার অবসর হলেও আমাদের দিন কাটে প্রচণ্ড ব্যস্ততায়। আমরা একই বয়সের আরও কয়েকজন আছি। আপাতত আমি হেলপার হিসেবে কাজ করছি। আমাকে আমার বাবা এই কাজে এনেছেন। আমার অনেক ভাই ও স্বজন এখানে আছেন। আমরা আমরা মিলে ভালোই আছি এই পেশায়।
দোহার কর্নিশ থেকে এক ঘণ্টা সময় ধরে সাগরপথে এগোলে দেখা মিলবে সাফিলিয়া দ্বীপের। এসব সাম্পানের সর্বোচ্চ সীমানা এটুকুই। আসা যাওয়ায় সময় লাগবে দুই ঘণ্টা। খরচ হবে ৫০০-৬০০ রিয়াল।
আরব সাগরের বুকে ঐতিহ্যবাহী এসব সাম্পানে একবার যিনি চড়েছেন, সাগরের প্রেম তাঁকে বারবার টেনে নিয়ে যাবে এমন আনন্দভ্রমণে। এই প্রেমে মুগ্ধ বলেই সাপ্তাহিক ছুটির দিন ও অন্যান্য অবসরে নানা বয়সের নাগরিক, অভিবাসী ও পর্যটকদের পদচারণায় মুখরিত হয়ে ওঠে কর্নিশের এই সাম্পান ঘাট।

    Print       Email

You might also like...

3d0dd8eec4bde731b028a8e79b11aa7a-5984c7a0dfb32

তাহমিমা আনামের নতুন উপন্যাস ‘দ্য বোনস অব গ্রেস’

Read More →