Loading...
You are here:  Home  >  ধর্ম-দর্শন  >  Current Article

আল্লাহ জুলুম পছন্দ করেন না

ডক্টর বি এম শহীদুল ইসলাম : ইসলাম ভারসাম্যপূর্ণ নীতিতে বিশ্বাস করে। ইসলাম কারো প্রতি অত্যাচার, অনাচার বা নির্যাতনকে কখনো প্রশ্রয় দেয় না। দুর্নীতিকে রাতারাতি সুনীতি এবং সুনীতিকে রাতারাতি দুর্নীতি বানিয়ে কাউকে আকাশে তোলা বা কাউকে মাটিতে মিশিয়ে ফেলার সংস্কৃতির চর্চা ইসলাম করে না। রাষ্ট্রীয় শৃঙ্খলা বাহিনীর মাধ্যমে হলেও সেটা ইসলাম সমর্থন করে না। রাষ্ট্রীয় শৃঙ্খলা বাহিনীর মূল কাজ হচ্ছেÑ রাষ্ট্রে বসবাসরত সব শ্রেণীর নাগরিকের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। তাদের জানমাল, সম্মান-সম্ভ্রমকে হেফাজত করা। নাগরিকদের প্যাঁচে ফেলে তাদের কাছ থেকে অবৈধ পারিতোষিক আদায় করা তাদের ল্য হওয়া কোনোভাবেই সঙ্গত নয়। এমনকি কোনো সবল ব্যক্তি বা গোষ্ঠী বা সম্প্রদায় অথবা দল অন্য কোনো দুর্বল ব্যক্তি বা গোষ্ঠী বা সম্প্রদায় অথবা দলের ওপর প্রভাব খাটিয়ে অত্যাচার বা নির্যাতন করা ইসলামে সম্পূর্ণ অন্যায়। পেশিশক্তির জোরে বা ঘুষ দিয়ে তৈরি করা অবৈধ কাগজপত্র দেখিয়ে সম্পদ দখলের পাঁয়তারা করাও সম্পূর্ণ অন্যায়। শুধু তাই নয়, এটা মানবাধিকারের চরম লঙ্ঘন। এসব অন্যায়, অত্যাচার, নির্যাতন ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করার অধিকার ইসলাম অত্যন্ত জোরালোভাবে সমর্থন করেছে।
অত্যাচারের বিরুদ্ধে কুরআনের নির্দেশনা : মজলুম যদি জালিমের বিরুদ্ধে অশ্লীল কথা বলে, তাহলে তাদের সে অধিকার আছে; কিন্তু তারপরও প্রকাশ্যে ও গোপনে সর্বাবস্থায় ভালো কাজ করে যাওয়া ও মন্দ কাজ পরিহার করাই উত্তম। কারণ, মানুষের চরিত্র আল্লাহর চরিত্রের নিকটবর্তী হওয়া উচিত। মানুষ যার নৈকট্য লাভ করতে চায় তার অবস্থা হচ্ছে যে, তিনি অত্যন্ত ধৈর্যশীল ও সহিষ্ণু। মারাত্মক অপরাধীদেরও তিনি রিজিক দান করেন ও বড় বড় পাপ ও ত্রুটি-বিচ্যুতি মা করে দেন। সুতরাং, তার নিকটবর্তী হওয়ার জন্য আমাদের উচ্চ মনোবল, বুলন্দ হিম্মত ও উদার হৃদয়ের অধিকারী হতে হবে।
অত্যাচারের বিষয়ে নবী করিম সা:-এর নীতি ও আদর্শ : যেকোনো জালিম ব্যক্তি বা শাসকের অত্যাচারের বিরুদ্ধে প্রতিবাদমূলক ন্যায্য কথা বলাও উত্তম জিহাদের সমতুল্য। এ প্রসঙ্গে নবী করিম সা:-এর একটি গুরুত্বপূর্ণ হাদিস বর্ণিত আছে। হাদিসটি হচ্ছেÑ ‘যে ব্যক্তি কোনো জালিম শাসকের বিরুদ্ধে ন্যায্য কথা বলে তার জিহাদই সর্বোত্তম জিহাদ’ (আবু দাউদ, তিরমিযি, ইবনে মাজা, নাসাঈ ও মুসনাদে আহমাদ)।
অত্যাচারী ব্যক্তি, গোষ্ঠী, দল বা শাসক যেই হোক না কেন, অত্যাচার তাদের জন্য মহাবিপদের কারণ হয়ে দাঁড়াবে। কিয়ামতের দিন তারা গভীর অন্ধকারে নিমজ্জিত থাকবে। এ থেকে রেহায় পাওয়ার কোনো উপায় তাদের থাকবে না। ‘হজরত আব্দুল্লাহ ইবনে ওমর রা: থেকে বর্ণিত, রাসূল সা: বলেছেনÑ ‘অত্যাচার ও নিপীড়ন কিয়ামতের দিন অত্যাচারীর জন্য ভয়ানক অন্ধকার হয়ে দেখা দেবে’ (বুখারি)।
আমাদর প্রিয় নবী হজরত মুহাম্মদ সা: গোটা পৃথিবীর জন্য ছিলেন রহমত স্বরূপ। তিনি জীবনে কোনো অবস্থাতেই কারো প্রতি কোনোরূপ অত্যাচার বা জুলুম-নির্যাতন করেননি। কখনো তাঁর বিরুদ্ধে কারো অভিযোগ থাকলে তিনি সেটা উপস্থাপনের সুযোগ দিতেন। তারপর তিনি বলতেন, ‘তোমাদের অভিযোগের প্রতিশোধ গ্রহণের জন্য আমি নিজেকে তোমাদের নিকট পেশ করছি। এ ব্যাপারে তোমাদের কোনো বক্তব্য থাকলে তোমরা তা ব্যক্ত করতে পার।’
নবী করিম সা:-এর একদিনের এমনই একটি ঘটনা সংেেপ তুলে ধরা হলো:
‘মহানবী সা: একদিন গনিমতের মাল সবার মধ্যে বণ্টনের কাজে ব্যস্ত ছিলেন। প্রচণ্ড ভিড়ের মধ্যে এক ব্যক্তি সামনে অগ্রসর হয়ে মুখ থুবড়ে মহানবী সা:-এর সম্মুখভাগে হুমড়ি খেয়ে পড়ে গেল। নবী করিম সা:-এর হাতে তখন একটি সরু কাঠের টুকরা ছিল। তিনি তা দ্বারা লোকটিকে মৃদু টোকা দিলেন। অপ্রত্যাশিতভাবে কাঠের সামান্য অগ্রভাগ তার মুখে লেগে কিছুটা রক্ত প্রবাহিত হতে লাগল। তখন নবী সা: বললেন, ‘তুমি আমার থেকে প্রতিশোধ নাও। লোকটি তখন বলল; হে রাসূলুল্লাহ! আমি আপনাকে মার্জনা করে দিলাম’ (আবু দাউদ)।
ইসলামের প্রথম যুদ্ধ বদর নামক প্রান্তরে সংঘটিত হয়। শৃঙ্খলা ঠিক রাখার জন্য বদর যুদ্ধের সময় নবী করিম সা: একটি ধনুকের সাহায্যে মুজাহিদিনের সারি সোজা করছিলেন। হজরত সাওয়াদ ইবনে গাযিয়াহ রা: সারির কিছুটা অগ্রভাগে অবস্থান করছিলেন। তিনি তীর দিয়ে সামান্য টোকা দিয়ে তাকে সমানভাবে দাঁড়াতে বললেন। তখন সাওয়াদ বলল, ‘হে রাসূলুল্লাহ! আপনি তো আমাকে ব্যথা দিলেন। অথচ আল্লাহ আপনাকে পাঠিয়েছেন ন্যায় ও ইনসাফ প্রতিষ্ঠার জন্য। সুতরাং, আপনি আমাকে বদলা নেয়ার সুযোগ দিন। নবী করিম সা: তৎণাৎ তার পেট মোবারক খুলে দিয়ে বললেন, সাওয়াদ! তুমি তোমার বদলা নাও। সাওয়াদ দৌড়ে এসে নবী করিম সা: এর গোটা দেহ জড়িয়ে ধরে তাঁর পবিত্র উদর মুবারকে চুম্বন করলেন।’ (সূত্র : হিফজুর রহমান: ইসলামকা ইকতিসাদী নিযাম; পৃষ্ঠা-৯২)।
অত্যাচারী শাসকের আনুগত্য প্রত্যাখ্যান : ইসলাম শুধু অত্যাচার-নির্যাতনের বিরুদ্ধে সরব প্রতিবাদের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকার অধিকারের কথাই বলেনি বরং প্রতিবাদ যদি সত্য ও ন্যায়সঙ্গত প্রমাণিত হয়, তাহলে জালেম শাসকের আনুগত্য প্রত্যাখ্যান করার অধিকারও ইসলাম দিয়েছে। এমনকি শাসককে শাসন কর্তৃত্ব থেকে অপসারণ করার অধিকারও ইসলাম নিশ্চিত করেছে। কারণ, শাসকের প্রাথমিক দায়িত্ব হচ্ছেÑ জনগণের প্রতি অত্যাচার বা জুলুমের অবসান ঘটানো ও ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করা। পবিত্র কুরআনুল করিমে মহান আল্লাহ তায়ালা ঘোষণা করেছেন।
‘আল্লাহ যখন ইবরাহীমকে বললেন, আমি তোমাকে মানব জাতির নেতা বানাতে চাই। ইবরাহীম তখন বলল, আমার সন্তানদের প্রতিও কি একই প্রতিশ্রুতি? আল্লাহ বললেন, আমার এ প্রতিশ্রুতি জালিম বা অত্যাচারীদের সম্পর্কে নয়’ (সূরা আল বাকারাহ : ১২৪)।
এ আয়াতের আলোকে আমরা পরিষ্কার উপলব্ধি করতে পারি যে, মহান আল্লাহ তায়ালার এ প্রতিশ্রুতি শুধু নেক সন্তানদের বেলায় কার্যকর হবে। যারা জালিম, যারা অত্যাচারী, যারা নির্যাতনকারী, এ প্রতিশ্রুতি তাদের জন্য আদৌ প্রযোজ্য নয়। পথভ্রষ্ট ইহুদি ও মুশরিক বনি ঈসরাইলদের েেত্রও এ ওয়াদা মোটেও কার্যকর হবে না। আল্লাহ তায়ালা আরো ঘোষণা করেছেন; ‘তোমরা সীমা লঙ্ঘনকারীদের আনুগত্য করবে না’ (সূরা শুআরা: ১৫১)।
অর্থাৎ অত্যাচার ও নির্যাতনকারীদের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করা যাবে তবে সীমা লঙ্ঘন করা যাবে না। প্রতিবাদ করা শুধু অধিকারই নয়, বরং ফরজ কাজ। তাই এ বিষয়ে অবহেলা করলে আল্লাহর নিকট কঠোর জবাবদিহি করতে হবে।
অতএব কোনো ব্যক্তি, পরিবার, সমাজ, গোষ্ঠী বা সম্প্রদায়, সংস্থা, অথবা ইসলামি সংগঠনের ওপর রাষ্ট্রীয় শাসক অথবা অন্য যে কেউ যদি যেকোনো ধরনের অত্যাচার, জুলুম বা নির্যাতন চালায় তাহলে তার জন্য ইসলাম জোরলোভাবে প্রতিবাদ করার অধিকার নিশ্চিত করেছে। এটা কুরআন ও হাদিসের উপযুক্ত দলিল দ্বারা প্রমাণিত। তাই যেকোনো ধরনের অত্যাচার, জুলুম বা নির্যাতনের বিরুদ্ধে শক্তিশালী ও তীব্র প্রতিবাদ ও প্রতিরোধ অব্যাহত রাখা মুসলমানদের অপরিহার্য ঈমানি ও নৈতিক দায়িত্ব।
লেখক : সহযোগী অধ্যাপক

    Print       Email

You might also like...

crmuslim

বছরে বাজার হাজার কোটি টাকা

Read More →