Loading...
You are here:  Home  >  ইউরোপ  >  Current Article

ইউরোপে ডানপন্থার উত্থানের হুমকি

জার্মানির সদ্য সমাপ্ত নির্বাচনে ‘এক্সট্রিম পপুলিস্ট’ বা উগ্র লোকরঞ্জনবাদী (পপুলিস্ট) ডানপন্থী দল অলটারনেটিভ ফর ডয়েচল্যান্ডের (এএফডি) উত্থানে অনেকেই চমকিত হতে পারেন। ক্রিশ্চিয়ান ডেমোক্র্যাট ইউনিয়নের (সিডিইউ) আঙ্গেলা ম্যার্কেল চতুর্থবারের মতো জার্মানির চ্যান্সেলর হতে যাচ্ছেন। মার্টিন শুলজের নেতৃত্বাধীন সোশ্যাল ডেমোক্র্যাটরা (এসপিডি) দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর সব থেকে কম ভোট পেয়েছেন। ৭০ বছরের ইতিহাসে সিডিইউ ও এসপিডি সম্মিলিতভাবে খারাপ ফল করেছে। কিন্তু এসব ছাপিয়ে আলোচনার মূল বিষয় এখন অভিবাসনবিরোধী এএফডির নির্বাচনে তৃতীয় হওয়া।

গত ১০ বছরের ইউরোপের রাজনীতি অনুসরণ করলে দেখা যাবে এএফডির ভোট প্রাপ্তি কোনো বড় ধরনের চমক নয়। শুধু জার্মানিই নয়, ইউরোপজুড়েই এমন উগ্র ডান লোকরঞ্জনবাদীদের সমর্থন দিন দিন বাড়ছে। গত বছরের জুনে অস্ট্রিয়ার প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের দ্বিতীয় দফায় ডান লোকরঞ্জনবাদী প্রার্থী নরবার্ট হফার ৪৯ শতাংশ ভোট পেয়েছিলেন। ব্রিটেনের ব্রেক্সিট ও যুক্তরাষ্ট্রে ডোনাল্ড ট্রাম্পের জয় ইউরোপে উগ্র ডানপন্থীদের সমর্থনের সেই পালে আরও হাওয়া লাগিয়েছে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর বর্তমানে অস্ট্রিয়া, নেদারল্যান্ডস ও ফ্রান্সে লোকরঞ্জনবাদী রাজনীতি চরমভাবে ফিরে এসেছে। ধারণা করা হচ্ছে, অস্ট্রিয়ায় অক্টোবরের নির্বাচনে লোকরঞ্জনবাদী ফ্রিডম পার্টি মধ্যডান পিপলস পার্টির সঙ্গে সরকার গঠন করতে পারে। হাঙ্গেরি ও পোল্যান্ডে লোকরঞ্জন ও জাতীয়তাবাদী দল ক্ষমতায়। ফিনল্যান্ড, লিথুনিয়া, লাটভিয়া ও সুইজারল্যান্ডে ক্ষমতার অল্প বিস্তর স্বাদ পেয়েছে লোকরঞ্জনবাদীরা। চরম অভিবাসন ও ইসলামবিরোধী ফ্রিডম পার্টি এখন নেদারল্যান্ডসের পার্লামেন্টে দ্বিতীয় বৃহত্তম দল। জার্মানি, ফ্রান্স ও ব্রিটেনে ক্ষমতার স্বাদ না পেলেও তারা ক্রমবর্ধমান জনপ্রিয়তা উপভোগ করছে।

লোকরঞ্জনবাদী এএফডির উত্থান জার্মান রাজনীতির এক নয়া মেরুকরণ। তাদের উত্থান জার্মানির রাজনীতির গতিধারা বদলে দেওয়ার ইঙ্গিত বহন করছে। চ্যান্সেলর আঙ্গেলা ম্যার্কেলও এই মেরুকরণ মেনে নিয়েছেন। তিনি বলেছেন, জনগণের কথা তিনি মনযোগ দিয়ে শুনবেন। তাদের মন জয় করার চেষ্টা করবেন। এসপিডির নেতা মার্টিন শুলজ ডানপন্থী উত্থান সম্পর্কে বলেছেন, এটি জার্মান রাজনীতির এক গুরুত্বপূর্ণ বাঁক।

কিন্তু জার্মানিতে বা ইউরোপে লোকরঞ্জনবাদীদের জনসমর্থন বৃদ্ধি পাচ্ছে কেন? ক্রমবর্ধমান অর্থনৈতিক বৈষম্য, বেকারত্ব, সামাজিক নিরাপত্তা খাতের কাটছাঁটসহ মূলত আর্থসামাজিক কারণেই ইউরোপজুড়ে লোকরঞ্জনবাদীদের উত্থান ঘটছে। লোকরঞ্জনবাদীরা মনে করছে, বিদ্যমান রাজনৈতিক দল বা নেতারা গুরুত্বপূর্ণ সমস্যাগুলো যথাযথভাবে মোকাবিলা করতে পারছেন না। বিশ্বায়ন ও ব্যাপক হারে অভিবাসনের কারণেই এমনটা হচ্ছে বলে লোকরঞ্জনবাদীরা মনে করছে। কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে, উদ্বাস্তু গ্রহণের কারণে জার্মানিতে বেকারত্ব বেড়েছে বা নাগরিকদের অর্থনৈতিক সুবিধা কমেছে, এমন কোনো তথ্য নেই। অবশ্য শ্রমবাজারে এর একটি প্রভাব অবশ্যই আছে। তাই লোকরঞ্জনবাদী দলগুলো তাদের বক্তব্যে সব সময়ই অভিবাসন, মুক্ত বাণিজ্য ও গোষ্ঠীবদ্ধ রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান যেমন ন্যাটো ও ইউরোপিয়ান ইউনিয়নের বিরোধিতা করে থাকে। বস্তুত লোকরঞ্জনবাদীদের সমর্থন বৃদ্ধির জন্য ভিন্ন ভিন্ন দেশে ভিন্ন ভিন্ন কারণ রয়েছে। সাম্প্রতিক অভিবাসন ও ইসলাম-ফোবিয়াকে লোকরঞ্জনবাদীদের উত্থানের কারণ মনে করা হলেও ইউরোপিয়ান ইউনিয়নের কেন্দ্রীভূত ক্ষমতার চর্চাও অন্যতম কারণ বলে অনেকে মনে করেন। সব মিলিয়ে বলা যায়, উদার গণতন্ত্রীদের কর্মসূচি এখন আর ভোটারদের আকৃষ্ট করতে পারছে না।

ইউরোপিয়ান পলিসি ইনফরমেশন সেন্টারের হিসাবমতে, ইউরোপে এখন প্রতি পাঁচজনের মধ্যে একজন লোকরঞ্জনবাদীদের সমর্থক। ইউরোপে উদার গণতন্ত্রীদের ভোট ১৯৮০ সাল থেকেই কমছে। বিপরীতে লোকরঞ্জনবাদীদের সমর্থন বেড়েছে। গোটা ইউরোপে এখন ১৫ শতাংশ ভোটার লোকরঞ্জনবাদীদের সমর্থন করছেন।

এর ফলে বেশ জোরালোভাবেই আলোচনা হচ্ছে, ইউরোপের বড় ও ক্ষমতাধর দেশগুলোতে উগ্র লোকরঞ্জনবাদীরা কি সরকারে চলে আসবে? পরিস্থিতি পর্যালোচনা করে এটা বলা উপায় নেই যে উগ্র লোকরঞ্জনবাদীরা ক্ষমতায় আসবে না। ফ্রান্সে উগ্র লোকরঞ্জনবাদী নেতা লি পেন ৩৩ শতাংশ ভোট পেয়েছিলেন। জার্মানিতে গত নির্বাচনের তুলনায় এবার তিনগুণ ভোট পেয়েছে উগ্র লোকরঞ্জনবাদীরা। ৬০ বছর পর এই প্রথম উগ্র লোকরঞ্জনবাদীরা জার্মানির সংসদে আসন পেতে যাচ্ছে। শুধু তা-ই নয়, যদি সিডিইউ ও এসডিপি সরকার গঠন করে, তবে লোকরঞ্জনবাদীরাই হবে সংসদে প্রধান বিরোধী দল।

এখন কম-বেশি ইউরোপের প্রতিটি দেশেই স্থানীয় বা জাতীয় সংসদে লোকরঞ্জনবাদীদের প্রতিনিধি আছে। ব্রিটেনের ইনডিপেনডেন্ট পার্টি, বেলজিয়ামের ভ্লামস বেলাং, ফ্রান্সের ন্যাশনাল ফ্রন্ট, গ্রিসের গোল্ডেন ডন, ইতালির লেগা নর্ড, ফ্রিডম পার্টি নেদারল্যান্ডসে, সুইডেন ডেমোক্র্যাট, সুইস পিপলস পার্টি ইউরোপের পরিচিত অভিবাসনবিরোধী উগ্র লোকরঞ্জনবাদী দল। আবার এদের বিপরীতের লোকরঞ্জনবাদী দলও আছে যেমন: দক্ষিণ ইউরোপ তথা গ্রিসের সিরিজা, ইতালির ফাইভস্টার বা স্পেনের পৌডেমোস। বাম ধারার এই লোকরঞ্জনবাদীরা অভিবাসীদের স্বাগত জানায়। তাদের মূল লড়াই রাজনৈতিক অভিজাতদের দুর্নীতির বিরুদ্ধে। মুনাফাভিত্তিক অর্থনীতিতে করপোরেট প্রতিষ্ঠানের কর্তৃত্ব ও ঢালাও বেসরকারীকরণকে তারা প্রতিহত করতে চায়। দক্ষিণ ইউরোপের লোকরঞ্জনবাদীরা কমিউনিজমকে মূলমন্ত্র মনে করলেও উত্তর ইউরোপের উগ্র লোকরঞ্জনবাদীরা জাতীয়তাবাদকে আঁকড়ে ধরে জনগণকে প্রভাবিত করছে। তবে দুই ধরনের লোকরঞ্জনবাদীরাই বিশ্বায়নবিরোধী ও বিদ্যমান রাজনৈতিক কাঠামোর বিরোধিতা করে।

লোকরঞ্জনবাদীদের উত্থান ইউরোপের রাজনীতিতে একটি বড় ধরনের চরিত্রগত পরিবর্তন এনেছে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকে পশ্চিম ইউরোপের দেশগুলোতে মূলত মধ্যডান ও মধ্যবাম দলগুলোর মধ্যে ক্ষমতার পালাবদল হয়েছে। কিন্তু এখন মধ্যডান ও মধ্যবামেরা মিলে লোকরঞ্জনবাদীদের মোকাবিলা করছে ক্ষমতা টিকে থাকার জন্য। বলা হচ্ছে, লোকরঞ্জনবাদীরা আধুনিক উগ্রবাদের ধারক। এরা উদার গণতন্ত্রের বিরোধী। জনপ্রিয় সার্বভৌমত্ব ও সংখ্যাগরিষ্ঠের শাসনকে লোকরঞ্জনবাদীরা সমর্থন করে কিন্তু বহুত্ববাদী সমাজের বিপরীতে অবস্থান করে। সংখ্যালঘুর অধিকার ও মতামতকে অস্বীকার করে। এরা কখনো ডানপন্থীও না বা বামপন্থীও না। আবার কখনো ডান-বাম উভয় পন্থায় এদের পাওয়া যায়।

এই লোকরঞ্জনবাদীদের উত্থান কিন্তু নতুন নয়। প্রাচীন রোমেও লোকরঞ্জনবাদীদের প্রভাব ছিল রাজনীতিতে। রোমের লোকরঞ্জনবাদীদের আন্দোলন ছিল রাজনৈতিক অভিজাতদের দুর্নীতির বিরুদ্ধে। আর মধ্যযুগের কৃষিভিত্তিক লোকরঞ্জনবাদীরা ছিল সামন্ততন্ত্রের বিরুদ্ধে। ফরাসি বিপ্লব বা ১৯ শতকের রাশিয়ার নারদনিকদেরও কোনো কোনো ঐতিহাসিক লোকরঞ্জনবাদী বলে চিহ্নিত করে থাকেন। আবার দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় জার্মান জাতীয়তাবাদী উগ্র লোকরঞ্জনবাদী দল নাৎসিদের কুকীর্তিও বিশ্ববিদিত।

এখন কথা হচ্ছে, এই উগ্র লোকরঞ্জনবাদের উত্থান কীভাবে মোকাবিলা করবে জার্মানিসহ উত্তর বা পশ্চিম ইউরোপের উদার গণতান্ত্রিক দলগুলো? আপাতদৃষ্টিতে অর্থনৈতিক সংকট, অভিবাসন, ইসলাম-ফোবিয়াকে কারণ মনে হলেও মূল সমস্যা হচ্ছে সমাজের একটা অংশের পরিচয়গত সংকট। এই সংকট মোকাবিলায় টেকনোক্র্যাট বা বুরোক্র্যাটের ওপর নির্ভর না করে জনগণের সঙ্গে আলোচনা করেই বিভিন্ন রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সংকটের সমাধান করতে হবে। বোঝাতে হবে, বিশ্বায়ন বা ট্রান্স ন্যাশনাল ও সুপার ন্যাশনাল প্রতিষ্ঠানের (যেমন ইইউ) জন্য যারা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, তারা আবারও লাভবান হবে। তাদের অধিকার সংরক্ষিত থাকবে। সমাজের কেউ যেন নিজেকে বিচ্ছিন্ন মনে না করে, সেই উদ্যোগ নিতে হবে।

আখেরে উগ্র লোকরঞ্জনবাদীদের সঙ্গে ইউরোপের উদার গণতন্ত্রীদের মোকাবিলা ও ফয়সালা কীভাবে হয়, সেই অবধি আমাদের অপেক্ষা করতে হবে।

ড. মারুফ মল্লিক: রিচার্স ফেলো, সেন্টার ফর কনটেমপোরারি কনসার্নস, জার্মানি

    Print       Email

You might also like...

6211cf95a9a5d20ef239f0141814a67a-5a0c53634c71d

তুরস্কে বাংলাদেশের ওষুধ শিল্পের সম্ভাবনা নিয়ে সেমিনার

Read More →