Loading...
You are here:  Home  >  এক্সক্লুসিভ  >  Current Article

ইমাম মালিক (রহ.) এর সংক্ষিপ্ত জীবনী

reliঅধ্যাপক ড. মুহাম্মাদ রঈসুদ্দীন: ইমাম মালিক (রহ.) ছিলেন মহানবী (সা.)-এর পূর্ণ অনুসারী। সমগ্র জীবনব্যাপী জ্ঞান-গবেষণা ও মহান আল্লাহর ‘ইবাদত বন্দেগীতে নিয়োজিত ছিলেন। তাঁর ছিয়াশি বছরের জীবন ছিল একটি আলোকোজ্জ্বল জীবন। নিম্নে তাঁর সংক্ষিপ্ত জীবনী তুলে ধরা হলো :
ইমাম মালিক (রহ.)-এর নাম ও বংশ পরিচয় : নাম- মালিক, উপনাম-আবূ আবদুল্লাহ। বংশপরম্পরা- মালিক ইবনু আনাস ইবনু আবূ ‘আমির ইবনু আমর ইবনু হারিস আল আসবাহী। তিনি আরবের প্রসিদ্ধ কাহত্বান গোত্রের উপগোত্র আসবাহ-এর অন্তর্ভুক্ত, এ জন্য তিনি ‘আল আসবাহী’ বলে পরিচিত। [তারতীবুল মাদারিক, ১/১০২ পৃষ্ঠা, সিয়ারু ‘আলামিন নুবালা, ৮/৪৮ পৃষ্ঠা, আল-আনসাব লিস সাম’আনী, ১/২৮৭ পৃষ্ঠা, আত-তামহীদ, ১/৮৯ পৃষ্ঠা, মানাকিব মালিক লিয যাওয়াবী, ১৬০-১৬২ পৃষ্ঠা, আল-ইনতিকা, ৯-১১ পৃষ্ঠা ইত্যাদি।
ইমাম মালিক (রহ.) –এর জন্ম ও প্রতিপালন : ইমাম মালিক (রহ.) পবিত্র মাদীনা নগরীতে এক সম্ভ্রান্ত শিক্ষানুরাগী মুসলিম পরিবারে জন্মলাভ করেন। জন্মের সন নিয়ে কিছু ভিন্নমত থাকলেও ইমাম যাহাবী (রহ.) বলেন, বিশুদ্ধ মতে ইমাম মালিক (রহ.)-এর জন্ম সন ৯৩ হিজরী, যে সনে রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর খাদিম আনাস ইবনু মালিক (রাযি.) মৃত্যুবরণ করেন। [তারতীবুল মাদারিক, ১/১১০ পৃষ্ঠা, মানাকিব মালিক লিয্্ যাওয়ারী, ১৫৯ পৃষ্ঠা]
তিনি পিতা আনাস ইবনু মালিক (রহ.)-এর কাছে মাদীনায় প্রতিপালিত হন। তাঁর পিতা তাবি-তাবিঈ ও হাদীস বর্ণনাকারী ছিলেন, যার বরাত দিয়ে ইমাম যুহরী (রহ.)সহ অনেকেই হাদীস বর্ণনা করেন। ইমাম মালিক (রহ.)ও পিতার নিকট থেকে হাদীস বর্ণনা করেন। [মানহাজু ইমাম মালিক, ২২ পৃষ্ঠা]
তাঁর দাদা আবু আনাস মালিক (রহ.) প্রসিদ্ধ তাবিঈ ছিলেন, যিনি উমার, ‘আয়িশাহ্্ ও আবূ হুরায়রাহ (রাযি.) থেকে হাদীস বর্ণনা করেন। [তারতীবুল মাদারিক, ১/১০৭ পৃষ্ঠা] তাঁর পিতামহ আমির ইবনু আমর (রাযি.) প্রসিদ্ধ সাহাবী ছিলেন। [আল ইসাবাহ-৭/২৯৮ পৃষ্ঠা] এ সম্ভ্রান্ত দীনী পরিবেশে জ্ঞানপিপাসা নিয়েই তিনি প্রতিপালিত হন।
ইমাম মালিক (রহ.)-এর শিক্ষা জীবন : রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর হিজরতের পর থেকে আজ পর্যন্ত দীনী জ্ঞান চর্চার প্রাণকেন্দ্র হলো মাদীনা। মাদীনাতে জন্মলাভ করার অর্থ হলো দীনী জ্ঞানচর্চার প্রাণকেন্দ্রেই জন্মলাভ করা। বিশেষ করে বংশীয়ভাবে তাদের পরিবার ছিল দীনী জ্ঞানচর্চায় অগ্রগামী। এজন্য তিনি শৈশবকাল থেকেই দীনী ‘ইলম চর্চা শুরু করেন। বিশেষ করে তাঁর মমতাময়ী মা তাঁকে শিক্ষার প্রেরণা যোগান। ইমাম মালিক (রহ.) বলেন : আমি একদিন মাকে বললাম, ‘আমি পড়ালেখা করতে যাবো! মা বললেন : আসো! শিক্ষার লেবাস পরিধান করো। অতঃপর আমাকে ভালো পোশাক পরালেন, মাথায় টুপি দিলেন এবং তার ওপর পাগড়ি পরিয়ে দিলেন, এরপর বললেন, এখন পড়ালেখার জন্য যাও।
তিনি বলেন, মা আমাকে ভালোভাবে কাপড় পরিয়ে দিয়ে বলতেন, যাও মাদীনার প্রসিদ্ধ আরিম রাবী’আহ্ ইবনু আবূ ‘আবদুর রহমান (রহ.)-এর কাছে এবং তাঁর জ্ঞানশিক্ষার আগে তাঁর আদব আখলাক শিক্ষা করো। [তারতীবুল মাদারিক, ১/১১৯ পৃষ্ঠা] এভাবে তিনি মাদীনার প্রসিদ্ধ মুহাদ্দিস এবং ফকীহগণের নিকট থেকে শিক্ষালাভ করেন।
ইমাম মালিক (রহ.)-এর শিক্ষকমন্ডলী : ইমাম মালিক (রহ.) অসংখ্য বিদ্বানের নিকট শিক্ষালাভ করেন। ইমাম যুরকানী (রহ.) বলেন, ‘ইমাম মালিক (রহ.) নয়শ’র অধিক শিক্ষকের কাছে শিক্ষা গ্রহণ করেন। বিশেষ করে ইমাম মালিক (রহ.) স্বীয় গ্রন্থ মুওয়াত্তায় যে সকল শিক্ষক থেকে হাদীস বর্ণনা করেছেন, তাদেরই সংখ্যা হলো ১৩৫ জন, যাদের নাম ইমাম যাহাবী (রহ.) ‘সিয়ার’ গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন। [সিয়ারু’ আলামিন নুবালা, ৮/৪৯ পৃষ্ঠা] তন্মধ্যে উল্লেখযোগ্য কয়েকজন নিম্নরূপ :
ইমাম রাবী’আহ ইবনু আবূ ‘আব্দুর রহমান (রহ.)।
ইমাম মুহাম্মাদ ইবনু মুসলিম আয্ যুহরী (রহ.)
ইমাম নাফি মাওলা ইবনু উমার (রহ.)।
ইবরাহীম ইবনু উকবাহ (রহ.)।
ইসমাঈল ইবনু মুহাম্মাদ ইবনু সা’দ (রহ.)।
হুমাইদ ইবনু কায়স আল আরয (রহ.)।
আইয়ুব ইবনু আবী তামীমাহ আস সাখতিয়ানী (রহ.) ইত্যাদি। [ সিয়ারু আলামিন নুবালা, ৮/৪৯-৫১ পৃষ্ঠা।]
ইমাম মালিক (রহ.)-এর ছাত্রবৃন্দ : ইমাম মালিক (রহ.) হলেন ইমামু দারিল হিজরা, অর্থাৎ মাদীনার ইমাম। অতএব মাদীনার ইমামের ছাত্র হওয়ার দুর্লভ সৌভাগ্য কে না চায়। তাই তাঁর ছাত্র অগণিত। ইমাম যাহাবী (রহ.) উল্লেখযোগ্য ১৬৬ জনের নাম বর্ণনা করেছেন। ইমাম খাতীব বাগদাদী ৯৯৩ ছাত্রের নাম উল্লেখ করেন। [তারতীবুল মাদারিক, ১/২৫৪ পৃষ্ঠা। সিয়ারুর আলামিন নুবালা, ৮/৫২ পৃষ্ঠা]
ইমাম মালিক (রহ.)-এর কয়েকজন প্রসিদ্ধ ছাত্রের নাম নি¤েœ প্রদত্ত হলো : ইমাম মুহাম্মাদ ইবনু ইদরীস আশ্ শাফি’ঈ (রহ.)। ২. ইমাম সুফইয়ান ইবনু উয়ায়নাহ (রহ.)। ৩. ইমাম আব্দুল্লাহ ইবনুল মোবারক (রহ.)। ৪. ইমাম আবূ দাউদ আত্্ তায়ালিসী (রহ.)। ৫. হাম্মাদ ইবনু যায়দ (রহ.)। ৬. ইসমাঈল ইবনু জা’ফর (রহ.)। ৭. ইবনু আবী আয-যিনাদ (রহ.) ইত্যাদি। [সিয়ারু আলামিন নুবালা, ৮/৫২-৫৪ পৃষ্ঠা]
জ্ঞান গবেষণায় ইমাম মালিক (রহ.) : ইমাম মালিক (রহ.) জন্মগতভাবেই অসামান্য প্রতিভার অধিকারী ছিলেন। মেধাশক্তি ছিল খুবই প্রখর। আবূ কুদামাহ (রহ.) বলেন, ‘ইমাম মালিক স্বীয় যুগে সর্বাধিক মেধাশক্তি সম্পন্ন ব্যক্তি ছিলেন। [আত-তাহমীদ, ১/৮১ পৃষ্ঠা]
হুসাইন ইবনু উরওয়াহ (রহ.) বর্ণনা করেন, ইমাম মালিক (রহ.) বলেন, একবার ইমাম যুহরী (রহ.) আমাদের মাঝে আগমন করলেন, আমাদের সাথে ছিলেন রাবী’আহ। তখন ইমাম যুহরী (রহ.) আমাদেরকে চল্লিশের কিছু অধিক হাদীস শুনালেন। পরের দিন আমরা ইমাম যুহরী (রহ.)-এর কাছে গেলাম, তিনি বললেন, কিতাবে দেখ, আমরা কি পরিমাণ হাদীস পড়েছি। আরও বললেন, গতকাল আমরা যে হাদীস বর্ণনা করেছি তোমরা কি তার কিছু পড়েছ? তখন রাবী’আহ  বললেন, হ্যাঁ, আমাদের মাঝে এমনও ব্যক্তি আছেন, যিনি গতকাল আপনার বর্ণনাকৃত সব হাদীস মুখস্থ শুনাতে পারবেন। ইমাম যুহরী (রহ.) বললেন, কে তিনি? রাবী’আহ বললেন, তিনি ইবনু আবী আমীর অর্থাৎ- ইমাম মালিক। ইমাম যুহরী (রহ.) বললেন, হাদীস শুনাও, ইমাম মালিক (রহ.) বলেন, আমি তখন গতকালের চল্লিশটি হাদীস মুখস্থ শুনালাম। ইমাম যুহরী (রহ.) বললেন, আমার ধারণা ছিল না যে, আমি ছাড়া এ হাদীসগুলো দ্বিতীয় কেউ মুখস্থ করেছে।আত তাওহীদ, ১/৭১ পৃষ্ঠা, তারতীবুল মাদারিক, ১/১২১ পৃষ্ঠা।
অতএব ইমাম মালিক(রহ.)-এর অসামান্য পান্ডিত্য, গভীর জ্ঞান, গবেষণা, সংরক্ষণ সম্পর্কে আর বেশী কিছু বলার অপেক্ষা রাখেনা।
হাদীস শাস্ত্রে ইমাম মালিক (রহ.) : হাদীস শাস্ত্রে ইমাম মালিক (রহ.) এক উজ্জ্বল নক্ষত্র, হাদীস সঙ্কলনের অগ্রনায়ক। যদিও তাঁর পূর্বে কেউ কেউ হাদীস সঙ্কলন করেছেন, যেমন- ইমাম যুহরী (রহ.)। কিন্তু ইমাম মালিক (রহ.)-এর সাধনা এবং সংগ্রহ ও সঙ্কলন ছিল বিশেষ বৈশিষ্ট্যপূর্ণ। আর এ জন্যই সহীহুল বুখারী ও সহীহ মুসলিম-এর মতো হাদীস গ্রন্থ প্রকাশ পাওয়ার পূর্বে তাঁর সঙ্কলিত গ্রন্থকে বলা হতো : ‘মহান আল্লাহর কিতাব আল-কুরআনের পর সর্বাধিক বিশুদ্ধ হাদীস গ্রন্থ ইমাম মালিকের মুওয়াত্ত্বা গ্রন্থ। [আত তামহীদ, ১/৭৬-৭৯ পৃষ্ঠা, আল-হুলিয়াহ, ৬/৩২৯ পৃষ্ঠা, অবশ্য এ মন্তব্য সহীহুল বুখারীর পূর্বে, সহীহুল বুখারী সঙ্কলনের পর সহীহুল বুখারী সর্ববিশুদ্ধ গ্রন্থ।]
তিনি হাদীস শিক্ষায় পারিবারিকভাবে উৎসাহিত হলেও তাঁর সাধনা এবং অক্লান্ত পরিশ্রমের ফলে অসাধ্য সাধন করেছেন। শয়নে স্বপনে সব সময় একই চিন্তা, কিভাবে তিনি হাদীস শিক্ষালাভ করবেন। মানুষ যখন অবসরে, তিনি তখন হাদীসের সন্ধানে। ইমাম মালিক (রহ.) একবার ইদের সালাতে ইমাম যুহরী (রহ.)-কে দেখে মনে করলেন, আজ মানুষ ঈদের আনন্দে ব্যস্ত, হয়তো ইমাম যুহরী (রহ.)-এর কাছে একাকী হাদীস শিক্ষার সুযোগ পাওয়া যাবে। ঈদের ময়দান থেকে চলে গেলেন ইমাম যুহরী (রহ.)-এর বাসায়, দরজার সামনে বসলেন; ইমাম ভিতর থেকে লোক পাঠালেন, গেটে কে দেখার জন্য, ইমামকে জানানো হলো যে, গেটে আপনার ছাত্র মালিক। ইমাম বললেন, ভিতরে আসতে বলো। ইমাম মালিক (রহ.) বলেন, আমি ভিতরে গেলাম। তিনি আমাকে জিজ্ঞেস করলেন, মনে হয় তুমি সালাতের পর বাড়িতে যাওনি? আমি বললাম, না যাইনি; জিজ্ঞেস করলেন, কিছু খেয়েছ কি? আমি বললাম, না। তিনি বললেন, খাও। আমি বললাম, খাওয়ার চাহিদা নেই। তিনি বললেন, তাহলে তুমি কি চাও? আমি বললাম, আমাকে হাদীস শিক্ষা দিন। অতঃপর তিনি আমাকে সতেরটি হাদীস শিক্ষা দিলেন। [তারতীবুল মাদারিক, ১/১২১ পৃষ্ঠা]
ইমাম মালিক (রহ.) অধিকাংশ সময় একাকী থাকা পছন্দ করতেন। তাঁর বোন পিতার কাছে অভিযোগ করলেন, আমাদের ভাই মানুষের সাথে চলাফিরা করে না। পিতা জবাব দিলেন যে, মা, তোমার ভাই রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর হাদীস মুখস্থ করায় ব্যস্ত, তাই সে একাকী থাকা পছন্দ করে। [তারতীবুল মাদারিক, ১/১১৯ পৃষ্ঠা]
ইমাম মালিক (রহ.) নিঃসন্দেহে হাদীস শিক্ষার ব্যাপারে খুবই তৎপর ছিলেন। যার কারণে তিনি ঈদের আনন্দ-উৎসব বাদ দিয়ে এবং পরিবারে সময় না দিয়ে হাদীস শিক্ষা ও মুখস্থকরণে ব্যস্ত থাকতেন। কাজেই তিনি ছিলেন এক বিরল ব্যক্তিত্বের অধিকারী এবং শয়নে-স্বপনে সর্বদা হাদীস শিক্ষা ও গবেষণায় ব্যস্ত ছিলেন।
হাদীস সংগ্রহে কঠোর সতর্কতা : ইমাম মালিক (রহ.) হাদীস শিক্ষা ও সংগ্রহে সর্বদা ব্যস্ত থাকলেও যার-তার নিকট থেকে যেনতেনভাবে তা গ্রহণ করতেন না- যতক্ষণ না তিনি হাদীস বর্ণনাকারীর ঈমান-আকীদাহ ও সততা সম্পর্কে অবগত হতে পারতেন। বিশ্বস্ত প্রমাণিত হলে হাদীস গ্রহণ করতেন, অন্যথায় নয়। ইমাম সুফইয়ান ইবনু ‘উয়ায়নাহ (রহ.) এ প্রসঙ্গে বলেন, ‘আল্লাহ তা’আলা ইমাম মালিক (রহ.) কে রহম করুন, তিনি হাদীস বর্ণনাকারী ও বিদ্বানগণের ব্যাপারে কতই না সতর্ক থাকতেন এবং কঠিনভাবে যাচাই বাছাই করতেন, সহজেই কারো হাদীস গ্রহণ করতেন না।’ আলী ইবনুল মাদীনী (রহ.) বলেন, ‘হাদীস গ্রহণে কঠোর নীতি ও সতর্কতায় ইমাম মালিক (রহ.)-এর ন্যায় আর কেউ আছে বলে আমি জানি না।’ [আল ইরশাদ লিল খালিলী, ১/১১০-১১২ পৃষ্ঠা] ইমাম মালিক (রহ.) বিদ’আতীদের থেকে হাদীস গ্রহণ করতেন না। [আল মুহাদ্দিস আল ফাসিল, (৪১৪-৬১৪) পৃষ্ঠা, আল ইনতিকা ১৬ পৃষ্ঠা, আত-তামহীদ, ১/৬৭ পৃষ্ঠা]। এই সতর্কতা শুধু নিজেই অবলম্বন করেননি, বরং তিনি অন্যদেরকেও এ ব্যাপারে সতর্ক করে দিয়েছেন। তিনি বলেন, ‘হাদীস হলো দীনের অন্যতম ভিত্তি। অতএব ভালোভাবে লক্ষ্য করো, তোমরা কার নিকট থেকে দীন গ্রহণ করেছো। আমি সত্তরজন এমন ব্যক্তি পেয়েছি, যারা রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর নামে হাদীস বর্ণনা করে। কিন্তু আমি তাদের কিছুই গ্রহণ করিনি। যদিও তারা অর্থ-সম্পদে আমানতদার। কিন্তু এ বিষয়ে তাদেরকে আমি নির্ভরযোগ্য মনে করিনি। অথচ আমাদের মাঝে ইমাম যুহরী (রহ.)-এর আগমন ঘটলে হাদীস শিক্ষা ও সংগ্রহে আমরা তাঁর দরবারে ভিড় জমাতাম। [আল মুহাদ্দিস আল ফাসিল, (৪১৪-৪১৬) পৃষ্ঠা, আল ইনতিকা ১৬ পৃষ্ঠা, আত-তামহীদ, ১/৬৭ পৃষ্ঠা।
সুতরাং ইমামু দারিল হিজরা বা মাদীনার ইমাম মালিক (রহ.) রাসূল (সা.)এর হাদীস শিক্ষা ও সংগ্রহে স্বীয় জীবন যেমন উৎসর্গ করেছেন, তেমনি হাদীস সংরক্ষণে খুব কঠোর ভূমিকা রেখেছেন। মহান আল্লাহ তাঁকে উত্তম প্রতিদান প্রদান করুন।
হাদীস পালনে ইমাম মালিক (রহ.) : ইমাম মালিক (রহ.) হাদীস শিক্ষা ও সংগ্রহ করেই ক্ষান্ত হননি, বরং বাস্তব জীবনে পালনের মাধ্যমেও অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন। ‘আবদুল্লাহ ইবনু বুকাইর (রহ.) বলেন, আমি ইমাম মালিক (রহ.) কে বলতে শুনেছি, তিনি বলেন, ‘আমি কোনো আলিমের কাছে যখনই বসেছি, অতঃপর বাড়িতে ফিরে সেসব শ্রুত হাদীস মুখস্থ করে ঐ হাদীসগুলোর মাধ্যমে মহান আল্লাহর ইবাদত বা আমল না করা পর্যন্ত পুনরায় ঐ আলিমের বৈঠকে ফিরে যাইনি। [ইতহাফুস সালিক দ্র. মানহাজু ইমাম মালিক, ৩৪ পৃষ্ঠা]
হাদীস শিক্ষা দান ও ফাতাওয়া প্রদান : ইমাম মালিক (রহ.) শুধু হাদীস শিক্ষা ও আমল করাই যথেষ্ট মনে করেননি, বরং মানুষকে শিক্ষা দান ও ফাতাওয়া প্রদানেও বিরাট অবদান রেখেছেন। এ প্রসঙ্গে ইমাম যাহাবী (রহ.) বলেন, ইমাম মালিক (রহ.) একুশ বছর বয়সে হাদীসের পাঠদান ও ফাতাওয়া প্রদানে পূর্ণ যোগ্যতা লাভ করেন। সিয়ারু আলামিন নুবালা, ৮/৫৫ পৃষ্ঠা]
ইমাম মালিক (রহ.) বলেন, ইচ্ছা করলেই শুধু হাদীস শিক্ষা ও ফাতাওয়া প্রদানের জন্য মসজিদে বসা যায় না, বরং এক্ষেত্রে যোগ্য ও বিজ্ঞ ব্যক্তিগণের পরামর্শ নিতে হবে; তারা যদি উপযুক্ত মনে করেন, তাহলে সে এ কাজের জন্য নিয়োজিত হতে পারে। সত্তর জন বিজ্ঞ পন্ডিত বা শাইখ আমার ব্যাপারে সাক্ষ্য প্রদানের পর আমি এ কাজে নিয়োজিত হই।  [আল হুলিইয়্যাহ, ৬/৩১৬ পৃষ্ঠা]
মুস’আব ইবনু আব্দুল্লাহ (রহ.) বলেন, ‘ইমাম মালিক (রহ.) কে কোনো হাদীস জিজ্ঞেস করা হলে, তিনি ওযু করে ভালো পোশাক পরিধান করে সুন্দরভাবে প্রস্তুতি নিতেন। তাঁকে এর কারণ জিজ্ঞেস করা হলে তিনি জবাবে বলেন, এ হলো রাসূল (সা.)-এর হাদীসের প্রতি সম্মান প্রদর্শন। [তারতীবুল মাদারিক, ১/১৫৪ পৃষ্ঠা] সে সময় মুসলিম বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে জ্ঞানপিপাসুগণ শিক্ষার প্রাণকেন্দ্র মাদীনায় জ্ঞানার্জনের উদ্দেশ্যে পাড়ি জমাতেন এবং ইমাম মালিক (রহ.)-এর মতো বর্ষীয়ান মুহাদ্দিসের নিকট থেকে হাদীসের জ্ঞান আহরণ করে ধন্য হতেন।
ইমাম মালিক (রহ.) ফাতাওয়া প্রদানেও যথেষ্ট সতর্কতার সাথে গুরুত্ব প্রদান করতেন। জটিল বিষয়গুলো দীর্ঘ গবেষণার পর ফাতাওয়া প্রদান করতেন। ইবনু ‘আব্দুল হাকীম (রহ.) বলেন : ইমাম মালিক (রহ.)-কে কোনো বিষয়ে জিজ্ঞেস করা হলে- তিনি প্রশ্নকারীকে বলতেন, “যাও আমি এ বিষয়ে চিন্তা-গবেষণা করি।” ‘আব্দুর রহমান ইবনু মাহদী (রহ.) বলেন : ইমাম মালিক (রহ.) বলেন, “কখনো এমন মাস’আলাও এসেছে যে, সে বিষয়ে চিন্তা-গবেষণা করতে আমার সারারাত অতিবাহিত হয়েছে।” আল ইনতিকা, ৩৭-৩৮ পৃষ্ঠা।
ইমাম মালিক (রহ.) কোনো বিষয়ে উত্তর না দেয়া ভালো মনে করলে, “জানি না” বলতেও কোনো দ্বিধাবোধ করতেন না। তাইইনুল মামালিক, ১৬-১৭ পৃষ্ঠা।
কারণ তিনি মনে করতেন, প্রশ্নের সম্মুখীন হওয়া মানে জান্নাত ও জাহান্নামের সম্মুখীন হওয়া। প্রশ্নের উত্তর দিতে গিয়ে যেন আখিরাতে জবাবদিহিতার সম্মুখীন হতে না হয়। আল ইনতিকা, ৩৭ পৃষ্ঠা।
সঠিক ‘আক্বীদাহ-বিশ্বাসে ইমাম মালিক (রহ.) : আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামা’আতের ‘আক্বীদাহ-বিশ্বাসের অন্যতম ইমাম হলেন- ইমাম মালিক (রহ.)। বিশেষ করে আল্লাহ তা’আলার সিফাত বা গুণাবলীর প্রতি মু’তায়িলাদের ‘আক্বীদাহ-বিশ্বাসের প্রতিবাদে ঈমান প্রসঙ্গে ইমাম মালিক (রহ.)-এর বর্ণনা-ই আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামা’আতের অনুসৃত নীতি। যেমন ইমাম ইবনু আবিল ইয আল হানাফী শারহুল ‘আক্বীদাহ্ আত তাহাবীয়ায় উল্লেখ করেন। শারহুল ‘আক্বীদাহ আত তাহাবীয়াহ, ১/১৮৮ পৃষ্ঠা।
ইমাম মালিক (রহ.) ঈমান ‘আক্বীদার সকল বিষয়ে কুর’আনুল কারীম ও সহীহ হাদীসের আলোকে হকপন্থীদের সাথে একমত ছিলেন। বি: দ্র: মানহাজুল ইমাম ফি ইছবাতিল ‘আক্বীদাহ- ড: সউদ ইবনু ‘আব্দুল ‘আযীয আদ দা’জান।
ইমাম মালিক (রহ.) সম্পর্কে যুগশ্রেষ্ঠ ‘আলিমগণের অভিমত : ১. ইমাম শাফি’ঈ (রহ.) বলেন, “আলিমকুল শিরোমণি ইমাম মালিক (রহ.) ‘ইলমের আকাশে এক উজ্জ্বল নক্ষত্র। কেউ ইমাম মালিক (রহ.)-এর স্মৃতিশক্তি, দৃঢ়তা, সংরক্ষণশীলতা ও জ্ঞানের গভীরতার সমপর্যায়ে পৌঁছেনি। আর যে ব্যক্তি সহীহ হাদীসের সন্ধান করে যেন ইমাম মালিক (রহ.)-এর কাছে যায়।” আল ইনতিকা, ২৩, ২৪ পৃষ্ঠা।
২. ইমাম আহমাদ ইবনু হাম্বার (রহ.) বলেন : “হাদীস ও ফিকহ শাস্ত্রের উপর বিরল পা-িত্যের অধিকারী ইমাম মালিক (রহ.) জ্ঞান-বুদ্ধি ও আদাব আখলাকসহ হাদীসের প্রকৃত অনুসারী ইমাম মালিক (রহ.)-এর মতো আর কে আছে?” তারতীবুল মাদারিক, ১/১৩৩ পৃষ্ঠা।
৩. ইমাম নাসাঈ (রহ.) বলেন : “তাবি’ঈদের পর আমার কাছে ইমাম মালিক (রহ.)-এর চেয়ে অধিক বিচক্ষণ আর কেউ নেই এবং হাদীসের ক্ষেত্রে তাঁর চেয়ে অধিক আমানতদার আর কে হতে পারে।” আল ইনতিকা, ৩১ পৃষ্ঠা।
ইামাম মালিক (রহ.)-এর গ্রন্থাবলী : ইমাম মালিক (রহ.)-এর বেশ কিছু গ্রন্থাবলী রয়েছে। তন্মধ্যে উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ হলো: ১. আল মুওয়াত্ত্বা। তানাবীরুল হাওয়ালিক, ১/৭ পৃষ্ঠা। হাদীসের জগতে কিছু ছোট ছোট সঙ্কলন শুরু হলেও ইমাম মালিক (রহ.)-এর ‘মুওয়াত্ত¦া’ হাদীসের সর্বপ্রথম উল্লেখযোগ্য ও নির্ভরযোগ্য সঙ্কলন। এ গ্রন্থে ইমাম মালিক (রহ.) রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর হাদীস, সাহাবী ও তাবি’ঈগণের হাদীস এবং মাদীনাবাসীর ইজমা’সহ অনেক ফিকহী মাস’আলা বিশুদ্ধ সনদের আলোকে সঙ্কলন করেন। দীর্ঘদিন সাধনার পর, কেউ বলেন চল্লিশ বছর সাধনার পর তিনি এ মূল্যবান গ্রন্থ সঙ্কলন করেন। সে সময় বিশুদ্ধতার দিক দিয়ে হাদীসের গ্রন্থ ‘মুওয়াত্ত¦া’ খুবই জনপ্রিয়তা লাভ করে। ইমাম শাফি’ঈ (রহ.) বলেন : “কিতাবুল্লাহ অর্থাৎ- আল-কুর’আনের পরই সর্বাধিক বিশুদ্ধ গ্রন্থ হলো ইমাম মালিক (রহ.)-এর ‘মুওয়াত্ত¦া।” তারতীবুল মাদরিক, ১/১৯১-১৯৬ পৃ:, আত তামহীদ, ১/৭৬-৭৯ পৃষ্ঠা।
এটা সর্বজন স্বীকৃত সত্য যে, সহীহুল বুখারী সঙ্কলনের পূর্বে মুওয়াত্ত্বাই সর্ববিশুদ্ধ গ্রন্থ ছিলো। সহীহুল বুখারী সঙ্কলনের পর সর্বমহলে সর্ববিশুদ্ধ হাদীস গ্রন্থ হিসেবে এটি প্রসিদ্ধি লাভ করে।
২. “কিতাবুল মানাসিক।” তায্ইনুল মামালিক, ৪০ পৃ:, মালিক লি আমীন আল কাওলী, ৭৪৫ পৃ:।
৩. “রিসালাতুন ফিল কাদ্র ওর্য়ারাদ্দ ‘আলাল কাদারিয়া।” তারতীবুল মাদারিক, ১/২০৪ পৃ:, সিরারু ‘আলামিন নুবালা, ৮/৮৮ পৃ:।
৪. “কিতাব ফিন্ নুজুমি ওয়া হিসাবি সাদারিয যামানি ওয়া মানাযিলিল কামার।” তারতীবুল মাদারিক, ১/২০৫ পৃ:, সিয়ারু ‘আলামিন নুবালা, ৮/৮৮ পৃ:।
৫. “কিতাবুস্ সিররি।” তারতীবুল মাদারিক, ১/২০৫ পৃষ্ঠা, সিয়ারু ‘আলামিন নুবালা, ৮/৮৯ পৃষ্ঠা।
৬. “কিতাবুল মাজালাসাত।” তাযইনুল মামালিক, ৪০ পৃষ্ঠা, মালিক লি আমীন আল খাওলী, ৭৪৬ পৃষ্ঠা। ইত্যাদি সহীহ্ সনদে প্রমাণিত যে, এ সব ইমাম মালিক (রহ.)-এর সঙ্কলিত ও রচিত গ্রন্থ। এগুলো ছাড়াও তাঁর আরো অনেক গ্রন্থ রয়েছে। মানহাজু ইমাম মালিক ফি ইছবাতিল ‘আক্বীদাহ্, ৫১-৫৫ পৃষ্ঠা।
ইমাম মালিক (রহ.)-এর মৃত্যুবরণ: ইমাম মালিক (রহ.) ১৭৯ হিজরী সনে রবিউল আউয়াল মাসে ছিয়াশি বছর বয়সে মাদীনা মুনাওয়ারায় মৃত্যুবরণ করেন। তাঁকে মাদীনার কবরস্থান ‘বাকী আল গারকাদে” দাফন করা হয়। আত্ তামহীদ, ১/৯২ পৃষ্ঠা, তারতীবুল মাদারিক, ২/২৩৭-২৪১ পৃষ্ঠা, সিয়ারু ‘আলামিন নুবালা, ৮/১৩০-১৩৫ পৃষ্ঠা। মহান আল্লাহ্ তাঁকে রহম করুন এবং জান্নাতুল ফিরদাউসে উচ্চস্থান দান করুন। আমীন।
ইমাম মালিক (রহ.)-এর ফাতাওয়া : ইমাম মালিক (রহ.) পবিত্র কুরআন ও সহীহ্ সুন্নাহর অনুসারী ছিলেন। কুরআন-সুন্নাহ্ অনুযায়ী জীবন পরিচালনা করার জন্য তিনি মানুষদেরকে উদ্বুদ্ধ করতেন এবং কুরআন-সুন্নাহ্ অনুযায়ী ফাতাওয়া প্রদান করতেন। ইমাম মালিক (রহ.) কোন বিষয়ে ফাতাওয়া প্রদান করে বলতেন: আমি একজন মানুষ মাত্র, আমি ভুল বলি সঠিকও বলি। অতএব তোমরা আমার মতামতকে চিন্তা করে দেখবে। যে সমস্ত কথা কুরআন ও সুন্নাহ্ অনুযায়ী হয়, তা গ্রহণ করবে। আর যে সমস্ত কথা কুরআন হাদীসের অনুযায়ী হয় না, তা পরিহার করবেন। জলবুল মানাফা’য়া-৪৭ পৃষ্ঠা, ফাতাওয়া-২য় খণ্ড, ৩৮৪ পৃষ্ঠা, ঈকাযুল হিমাম-১০২ পৃষ্ঠা।
ইমাম মালিক (রহ.)-এর এ বক্তব্যে প্রমাণিত হয় যে, পালনীয় বা গ্রহণীয় বিষয় হলো একমাত্র আল-কুরআন ও সহীহ্ হাদীস। কোন ব্যক্তির মত, পথ, মাযহাব বা ত্বরীক্বাহ্ নয়। কারো ফাতাওয়া যদি আল-কুরআন ও সহীহ হাদীস অনুযায়ী হয় তাহলে গ্রহণযোগ্য। আর যদি আল-কুরআন ও সহীহ হাদীস পরিপন্থী হয় তাহলে অবশ্যই তা বর্জন করতে হবে। তিনি যত বড়ই ইমাম ও মুজতাহিদ হোন না কেন। এটা শুধু ইমাম মালিক (রহ.)-এর কথা নয় বরং ইমামে ‘আযম, সাইয়্যিদুল মুরসালীন রাসূল মুহাম্মাদ (সাঃ)-এর অমীয় বাণী। মহানবী (সাঃ) ইরশাদ করেন : যে ব্যক্তি ইসলামে এমন নতুন কিছুর উদ্ভাবন ঘটাবে যা ইসলামে অর্থাৎ- আল-কুর’আন ও সহীহ হাদীসে নেই, তা প্রত্যাখ্যানযোগ্য। সহীহুল বুখারী হা: ২৬৯৭, সহীহ মুসলিম হা : ৪৪৬৭।
ইমাম মালিক (রহ.) আরো বলেন: সাধারণ সকল ব্যক্তির কথা হয় গ্রহণীয় অথবা বর্জনীয়, শুধু মহানবী (সাঃ)-এর সকল কথাই গ্রহণীয়, কোনভাবেই তা বর্জনীয় নয়। ইবনু ‘আবদিল বার- আল জামি’- ২/৯১ পৃষ্ঠা, ইবনু হাযাম-উসূলুল আহ্কাম-৬/১৪৫, ১৭৯ পৃষ্ঠা।
অর্থাৎ- শুধুমাত্র মহানবী (সাঃ)-এর সকল শার’ঈ নির্দেশ সম্বলিত কথা ওয়াহীভিত্তিক হওয়ায় নির্দ্বিধায় গ্রহণযোগ্য। আর সাহাবী, তাবি’ঈ বা কোন ইমাম অথবা ‘আলিম সমাজের কথা যদি আল-কুরআন ও সহীহ হাদীসভিত্তিক হয় তাহলে গ্রহণযোগ্য। আর যদি আল-কুরআন ও সহীহ হাদীস বিরোধী হয়, তবে তা অবশ্যই বর্জনীয়। সুতরাং কোন ইমাম বা ‘আলিমের কথা আল-কুরআন ও সহীহ্ হাদীসের নিরিখে যাচাই-বাছাই করা ছাড়া অন্ধ অনুকরণ বা অনুসরণ করা কোনভাবেই শারী’আত সম্মত কাজ নয়।
এ প্রসঙ্গে ইমাম মালিক (রহ.)-এর একটি ফাতাওয়া এখানে প্রণিধানযোগ্য : ইবনু ওয়াহাব (রহ.) বলেন, আমি ইমাম মালিক (রহ.)কে জিজ্ঞেস করতে শুনেছি ওযূর সময় পায়ের আঙ্গুল খিলাল করা সম্পর্কে? তিনি উত্তরে বলেন: ওযূর মধ্যে এমন কোন নিয়ম নেই। ইবনু ওয়াহাব (রহ.) বলেন : আমি একটু অপেক্ষা করলাম, তারপর মানুষ চলে গেলে ইমাম মালিক (রহ.)কে বললাম : পায়ের আঙ্গুল খিলাল করার ব্যাপারে আমাদের কাছে হাদীস রয়েছে। ইমাম মালিক (রহ.) বললেন : তা কি? আমি বললাম: লাইস ইবনু সা’দ মুসতাওরিদ ইবনু শাদ্দাদ আল কুরাইশী (রাযি.) বলেন: আমি রাসূলুল্লাহ (সাঃ)কে হাতের কনিষ্ঠ আঙ্গুল দিয়ে পায়ের আঙ্গুলের মাঝে খিলাল করতে বা ভালোভাবে ঘষতে দেখেছি।
ইমাম মালিক (রহ.) বলেন: এ হাদীসটি হাসান, তবে আমি ইতোপূর্বে কখনো এ হাদীস শুনিনি। ইবনু ওয়াহাব (রহ.) বলেন: এর পরবর্তীকালে ইমাম মালিক (রহ.)কে ঐ প্রশ্ন করা হলে তিনি উক্ত হাদীসের আলোকে আঙ্গুল খিলাল করার নির্দেশ দিতেন। ইবনু আবী হাতিম- মুকাদ্দামাতুল জারহ ওয়াত তা’দীল-৩১, ৩২ পৃষ্ঠা, ইমাম বায়হাকী- সুনান ১/৮১ পৃষ্ঠা।
উল্লেখ্য যে, ইমাম মালিক (রহ.)-এর এ সম্পর্কিত ফাতাওয়া হাদীস পরিপন্থী ছিলো, কিন্তু তখন তিনি ঐ হাদীসটি জানতেন না। যখনই হাদীসটি জানলেন এবং তা হাসান বা সহীহ নিশ্চিত হলেন, সাথে সাথে নিজের পূর্ব অভিমত বর্জন করে হাদীস অনুযায়ী ফাতাওয়া প্রদান শুরু করলেন। সহীহ হাদীস পাওয়ার পর নিজের মত প্রতিষ্ঠার জন্য কোন গোঁড়ামী প্রকাশ করলেন না। এরূপই হবে মহান আল্লাহভীরু ও তার রাসূল (সা.)-এর প্রকৃত অনুসারীর অবস্থান। তাঁরা কখনো মহান আল্লাহ্ ও তাঁর রাসূল (সাঃ)-এর মতের ওপর কোন ব্যক্তি এমনকি নিজের মতকেও প্রাধান্য দিতে পারে না। পক্ষান্তরে যারা মহান আল্লাহ্ ও তাঁর রাসূল (সাঃ)-এর মতের ওপর নিজের বা কোন ব্যক্তি ও দলের মতকে প্রাধান্য দিবে তারা প্রকৃত অর্থে মহান আল্লাহ্ ও তাঁর রাসূল (সাঃ)-এর পূর্ণ ঈমানদার ও আনুগত্যশীল হতে পারে না।
ইমাম মালিক (রহ:) আরো বলেন: যে ব্যক্তি কোন বিদ’আত চালু করে এবং মনে করে যে, এটা ভালো কাজ, সে যেন এ দাবি করে যে, মুহাম্মাদ (সা:) রিসালাতের খিয়ানাত করেছেন- [না’ঊযুবিল্লাহ]। কেননা আল্লাহ্ তা’আলা রাসূলুল্লাহ (সা:)-এর জীবদ্দশায় বলেন : “আজ আমি তোমাদের দীনকে পরিপূর্ণ করে দিলাম এবং তোমাদের প্রতি আমার নি’য়ামতকে সম্পূর্ণ করলাম এবং ইসলামকে তোমাদের দীন হিসেবে পছন্দ করে দিলাম। ৫নং সূরা আল-মায়িদাহ, আয়াত নং ৩।
রাসূলুল্লাহ (সা:)-এর জীবদ্দশায় যা দীন বলে গণ্য হয়নি আজও তা দীন বলে গণ্য হবে না। ইমাম শাতবী-ই’তিসাম-১/৩৩ পৃষ্ঠা, ‘মানহাজ ইমাম মালিক ফি ইসবাতিল ‘আক্বীদাহ-৯৯ পৃষ্ঠা। অর্থাৎ রাসূলুল্লাহ (সা:)-এর জীবদ্দশাতেই মহান আল্লাহ্ ইসলামকে পূর্ণতা দান করেছেন এবং মহানবী (সাঃ) তাঁর রিসালাত সঠিকভাবে প্রচার করেছেন, এরপরও যদি কেউ নতুন ‘ইবাদত আবিষ্কার করে যা রাসূলুল্লাহ (সা:)-এর যুগে ছিলো না তা কোনভাবেই গ্রহণযোগ্য হবে না, বরং তাদের আচরণে এটাই প্রমাণিত হয় যে, রাসূলুল্লাহ (সা:) দীনের এ উদ্ভাবিত অংশ প্রচার না করে রিসালাতের খিয়ানাত করেছেন [না’ঊযুবিল্লাহ]। ইমাম মালিক (রহ.) এ বক্তব্যের মাধ্যমে প্রমাণ করতে চান যে, ইসলামের সবকিছু রাসূলুল্লাহ (সা:)-এর আদেশ-নিষেধের মধ্যেই সীমাবদ্ধ। অতএব একমাত্র তার অনুসরণ করেই ইসলাম পালন করতে হবে। অন্য কোন ইমাম, দরবেশ, পীর বা মাযহাব ও ত্বরীক্বাহ্ নয়। মহান আল্লাহ্ আমাদের সহীহ পথে চলার তাওফীক্ব দান করুন, আমীন।

    Print       Email

You might also like...

3beacdcde2a669c2103e83ce980f3dd9-5a182942ec897

মিসরে মসজিদে হামলা, নিহত ২৩৫

Read More →