Loading...
You are here:  Home  >  কলাম  >  Current Article

ঈদ সম্প্রীতি ও সৌহার্দ্যের বার্তা বয়ে আনুক

BD-Protidin-15-06-2018-6

নূরে আলম সিদ্দিকী : আমাদের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম সর্বাধিক প্রসিদ্ধি ও জনপ্রিয়তা অর্জন করেছেন তার ‘বিদ্রোহী’ কবিতাটির মাধ্যমে। ‘মানুষ’ কবিতাটির মধ্যেও লোভী মোল্লাদের প্রতি তার প্রচণ্ড প্রতিবাদ শুধু তার চির উদ্বেলিত হৃদয়ের সমুদ্রের ঊর্মিমালায় উচ্ছ্বসিত ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ নয়, তার অনাবিল অনবদ্য স্নিগ্ধ মর্মস্পর্শী মানবতার প্রতি অদম্য ভালোবাসারও বহিঃপ্রকাশ। তার অসংখ্য কালজয়ী প্রেমের বন্দনাকে বাংলা সাহিত্যের সবাই এমনকি রবীন্দ্রনাথও বিমুগ্ধ চিত্তে প্রশংসা করেছেন। প্রেমের আকুতিকে অনবদ্য ভাষায় প্রতিভাত করার আত্মতৃপ্তিতেই তিনি নিঃসংকোচে বলতে পেরেছিলেন, ‘আমি চিরতরে দূরে চলে যাব, তবু আমারে দিব না ভুলিতে’। আমি এখানে জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের ওপর নিবন্ধের সূচনা করছি না। বরং তার অনেক অনবদ্য ও অতুলনীয় মর্মস্পর্শী পঙিক্তর মধ্যে মুসলিম সম্প্রদায়ের নানা ভিন্ন ভিন্ন মতের হৃদয়কে স্পর্শ করে যায়, এমন একটি উদ্ধৃতি প্রদান করার জন্যই এ উপক্রমণিকা।

ধর্মীয় কূপমণ্ডূকতার বিরুদ্ধে আঘাত, প্রত্যাঘাত, বিদ্রূপ, বিক্ষোভ, অযাচিত এবং অসংগত সমালোচনার নির্মম ও নিষ্ঠুর শিকার মুসলমান সম্প্রদায়ের মধ্যে তার ছোট্ট একটি পঙিক্ত সবার মনে এমন অনুভূতি ও আকুতি সৃষ্টি করে যে, গান ও কাব্যের জগতে এটি অনন্যসাধারণ ও বিরল। আবালবৃদ্ধবনিতা সবাই মুসলমানের হৃদয়কে উচ্ছ্বসিত করে উচ্চে তুলে ধরে ‘ও মন রমজানের ঐ রোজার শেষে এলো খুশির ঈদ’। পশ্চিম দিগন্তের বুক চিরে রমজানের শেষে সোনার থালার একটি কণার মতো যখন ঈদের চাঁদের সামান্য আভাও দেখা যায়, তখন সবার মনই গুনগুন করে গেয়ে ওঠে; যা তুলনাবিহীন। শিশু থেকে বৃদ্ধ সবারই হৃদয়ে নিজের জ্ঞাতে অজ্ঞাতে পঙিক্তটি মূর্ছিত হতে থাকে আপন মহিমায়। ঈদের কথা বলতে হলে এতটুকু উপক্রমণিকা কোনোভাবেই এড়ানো যায় না।

প্রতিটি মানুষের মতো আমারও জীবনে শৈশব থেকে শুরু করে জীবন সায়াহ্ন পর্যন্ত ৭৩-৭৪টি শুধু রোজার ঈদ এসেছে। একইভাবে কোরবানিরও। আমি বিস্ময়াভিভূত হয়ে উপলব্ধি করি, বয়সের তারতম্যে ঈদের আনন্দে কোনো মারাত্মক ব্যতিক্রম বা ব্যত্যয় আমি অন্তত অনুভব করি না (মুক্তিযুদ্ধকালীন একটি ব্যতিক্রম বাদে)। জীবনের প্রতিটি ঈদ আমার জীবনকে আনন্দিত করেছে, উদ্বেলিত করেছে, উচ্ছ্বসিত করেছে। এমনকি ধর্মবর্ণ-নির্বিশেষে সবার জন্য একটা মমত্ববোধ ও ভালোবাসার উন্মেষ ঘটিয়েছে। এ জীবন সায়াহ্নে সুদূর অতীত আমার শৈশবের দিকে যদি তাকাই, সেখানেও আনন্দের অজস্র ও অফুরন্ত স্মৃতি এখনো আমাকে রোমাঞ্চিত করে, বিমোহিত করে, বিমুগ্ধ করে। সচ্ছল ও সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে জন্মের সুবাদে কোনো ঈদেই আমাকে কোনো না পাওয়ার বেদনায় হৃদয়কে এতটুকু ভারাক্রান্ত করেনি। অনেক আত্মীয়স্বজন। তাদের কাছ থেকে জামা-কাপড়, জুতা, খেলনাসহ অফুরন্ত উপহার পেয়েছি। যতই উপহার পেতাম, সেগুলোকে আমার বিছানায় সাজিয়ে রাখতাম। আমার মা মুচকি হেসে বলতেন, উপহারেই বিছানা ভরিয়ে ফেললে শোবে কোথায়? বাবাও খুব খুশি হতেন আমার উচ্ছ্বাস অনুধাবন করে। বলতেন, ওর উপহারগুলো বিছানাতেই ঘুমাক, ও না হয় আমাদের বিছানায় ঘুমাবে।

কিন্তু মজার কথা হলো, উপহারগুলো তো পরতে হবে! নামাজের কিছু আগে ছাড়া ঈদের কাপড় মা পরতে দিতেন না। তার পরে যখন যেটা পরার অবাধ স্বাধীনতা। মনে হতো একেকটা মিনিট যেন একেকটা ঘণ্টা। ঈদের দিন অনেক ভোরেই ঘুম ভেঙে যেত। তখনো বাড়ির চারপাশে বিভিন্ন পাখির কলরব শুরু হতো না। সেই বয়সেও বুঝতাম, প্রভাত হতে এখনো বাকি। কিন্তু কী করব? ঘুম তো আসে না! আবেগ-উচ্ছ্বাসে ভরা মন সুনিবিড় আকাঙ্ক্ষায় অপেক্ষা করত— সূর্য উঠুক। তখনই না শুরু হবে ঈদের জামাতের প্রস্তুতি নেওয়া। সচ্ছল ও সম্ভ্রান্ত ঘরের সন্তান হিসেবে সুগন্ধি সাবান থেকে শুরু করে বিলাসী উপকরণের কোনো অভাব ছিল না। কিন্তু এ বয়সে এসেও অস্বীকার করব না, আমার শৈশবের ঈদ বন্ধুদের সঙ্গে কোলাকুলি, নামাজ আদায়, অস্থির চিত্তে অপেক্ষা করা কখন খুতবা ও মোনাজাত শেষ হবে। পূর্ণ স্বাধীনতায় বয়োজ্যেষ্ঠদের সালাম ও বন্ধুদের সঙ্গে কোলাকুলি করব। আমার শৈশবের বন্ধুরা প্রায় সবাই আমাদের বাসায় আসত। আমার স্নেহশীলা মমতাময়ী মা নিজের সন্তানের মতোই সবাইকেই ঈদের জন্য নিজ হাতে তৈরি করা সব ধরনের মিষ্টান্ন সবাইকেই খেতে দিতেন। এবং মজার বিষয় হলো, বন্ধুদের যাদের বাসায় যা কিছুই মিষ্টান্ন হোক না কেন, আমার মায়ের হাতে তৈরি মিষ্টান্ন না খেলে যেন তাদের ঈদ সম্পূর্ণই হতো না। অন্যদিকে বন্ধুদের কেউ একজন অনুপস্থিত থাকলে মায়ের চোখ এড়াত না। তার কথা আমাকে বার বার জিজ্ঞেস করতেন। বন্ধুদের নিয়ে খাচ্ছি, খেলছি, দৌড়াদৌড়ি করছি; এর মধ্যে অনুপস্থিত বন্ধুদের ব্যাপারে বার বার প্রশ্ন করায় বিরক্তই লাগত। মা তো মা-ই।

নতুন কাপড় বা ঈদের অন্যান্য প্রসাধনী মা-ও অফুরন্ত পেতেন। কিন্তু সেগুলো ব্যবহারের সুযোগ আসত কম। আপ্যায়নের মাধ্যমে তিনি যে অবর্ণনীয় আনন্দ লাভ করতেন, তার চোখ-মুখ খুশিতে জ্বলজ্বল করত, তা আজও আমার স্মৃতিতে ভাসে। আমি আবারও বলি, সবার মা-ই মা। কিন্তু আমার মাকে সবসময়ই আমার মনে হতো তিনি অনন্যা, তিনি অসাধারণ। এ বিশাল জগত্জুড়ে আমার মা এমন একজন স্নেহশীলা আবেগাপ্লুত জননী, যার কোনো তুলনা নেই। ঈদের দিনে যে বিরাট ধকল, তাতে তার কোনো ক্লান্তি কখনই আমার চোখে পড়েনি। আমাদের পরিবারটি ঠিক যৌথ না হলেও কার্যত আমার চাচাতো-ফুফাতো-খালাতো ভাইবোনেরা আমার মায়ের খুব কোল-নেওটা ছিল। সন্তান-সম্পর্কিত প্রায় সবাই মাকে কেউ মা, কেউ আম্মা, কেউ মা-জান বলে ডাকত। যদিও আমরা দুই সহোদর (এক ভাই, এক বোন) ভাইবোন ছিলাম। আমার মেজ খালা বা চাচি (আব্বা ও চাচা আপন দুই ভাই আম্মা ও খালা আপন দুই বোনের সঙ্গে বিবাহ সম্পর্ক স্থাপিত হয়। আমি শতভাগ নিশ্চিত এটা পারিবারিক প্রস্তাবে সংঘটিত হয়েছিল।) মাকে সবাই যখন মা বলে ডাকত, তিনি খুবই ক্ষুব্ধ হয়ে যেতেন। ক্রুদ্ধ হয়ে মাকে ভর্ত্সনা করে বলতেন, তুই কি নিঃসন্তান, বাঁজা? এত রুদ্রমূর্তিতে তীব্র বকাবকি করতেন যে, মা চুপসে যেতেন, ভয়ও পেতেন। কিন্তু নিতান্ত নির্বিকার ও নিশ্চুপ থাকতেন।

আমাদের ওইসব আত্মীয় এমনিতে কেউ না কেউ আমাদের বাসায় অনুষ্ঠান ছাড়াই খেতেন। মায়ের হাতের রান্না না খেলে তারা নিতান্তই অতৃপ্ত থাকতেন বলে আমি তাদের মুখেই শুনেছি। এতে আমার অনাগ্রহ ছিল না, কারণ একসঙ্গে বসে বেশ কজন মিলে খেতে এমনিতেই ভালো লাগে। পুকুরের রুই মাছের মাথাটি বা বিশেষ পছন্দনীয় মাছটি মা কখনই আমার পাতে তুলে দেননি। কিন্তু সৌভাগ্য আমার! যার পাতেই তুলে দিতেন, তিনিই ওটা আমাকে দিয়ে দিতেন এবং বাবা ও মা কেউ তাতে আর আপত্তি তুলতেন না। যৌথ পরিবার না হলেও ঈদ ছাড়াও দৈনন্দিন খাওয়াটা অনেকটা যৌথ পরিবেশেই হতো। সাংসারিক সচ্ছলতার কারণে এটা বোধহয় সবাইকেই শান্তি, স্বস্তি ও আনন্দ দিত। এ নিত্যনৈমিত্তিক স্বাভাবিকতার মধ্যে ঈদের সময়ে আমাদের বাড়ি মোটামুটি আত্মীয়স্বজনের কেন্দ্রবিন্দু ছিল, এটা আর বলার অপেক্ষা রাখে না। মাতৃকুল অর্থাৎ আমার খালা-মামারা আমাদের বসতি থেকে অনেক দূরে থাকতেন। তাই ঈদের দিনে চাচাতো ভাইবোনদের সমাগমই বাসাটা মুখর করে রাখত। অবশ্য কখনো কখনো খালাতো-মামাতো ভাইবোনেরাও ঈদ করতে আমাদের এখানে আসত। সেই সাবলীল এবং অকৃত্রিম আনন্দঘন পরিবেশের ঈদ আমাকে আজও রোমাঞ্চিত করে, বিমোহিত করে, বিমুগ্ধ করে। শৈশব-কৈশোর পেরিয়ে যৌবনের সোপানে যখন পা রাখলাম, পড়াশোনার জন্য আমাকে ঢাকায় চলে আসতে হলো। কিন্তু ঈদের সময় ঢাকায় থাকা আমার জন্য ছিল শ্বাসরুদ্ধ হয়ে মারা যাওয়ার মতো অবস্থা। কখনই তা করিনি। ঈদে বাড়ি যেতেই হতো। পঞ্চাশের দশকের ’৫৮-’৫৯ সাল থেকে প্রায় স্বাধীনতা পর্যন্ত আমাদের ওখানে (ঝিনাইদহ থেকে ঢাকায় আসার) রাস্তা সুগম ছিল না। অথচ ঝিনাইদহ থেকে কলকাতায় মাত্র সাড়ে তিন ঘণ্টায় যাওয়া যেত। ’৬৫ সালের পাক-ভারত যুদ্ধের আগে ভিসা পাসপোর্টেরও বালাই ছিল না। ঢাকা থেকে ঝিনাইদহ যেতে হলে ফুলবাড়িয়া স্টেশন থেকে প্রায় ২৩-২৪ ঘণ্টায় চুয়াডাঙ্গা হয়ে যেতে হতো। আমার জীবনের অন্যতম শখ বা বিলাসিতা ট্রেন বা প্লেনের উচ্চতর শ্রেণিতে ভ্রমণ করা। তাই টিফিনের খরচ বাঁচিয়ে হলেও আগে থেকেই ট্রেনের প্রথম শ্রেণির টিকিট কেটে রাখতাম। বলতে সংকোচ নেই, কোনোভাবেই প্রথম শ্রেণির দরজাও ঈদের সময় আটকে রাখা যেত না। অসংখ্য যাত্রী প্রথম শ্রেণিতে দরজা খুলে ঢুকে যেত। পুলিশও যেন নির্বিকার থাকত। তবে এটুকু সৌজন্যবোধ থাকত যে টিকিট কাটা যাত্রীদের তারা বসার সুযোগ দিত। আর বাকি পুরো কামরাটি একদম যাত্রীতে ঠাসা, তিল ধারণের ঠাঁইও থাকত না। যাত্রাপথে বাহাদুরাবাদ-সিরাজগঞ্জে ফেরি পারাপার; একটি অদ্ভুত সুন্দর বিলাসবহুল ফেরি। যখন ফেরিতে উঠতাম, তখন সমস্ত অন্তরটা আনন্দে, উচ্ছলতায় ভরে যেত।

ওখানে নিরাপত্তাব্যবস্থায় প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রেণিতে সাধারণ যাত্রীরা ঢুকতেই পারত না। সিরাজগঞ্জ থেকে ঈশ্বরদী হয়ে চুয়াডাঙ্গায় গিয়ে আমাদের নামতে হতো। চুয়াডাঙ্গায় নামতাম রাত ৯টা-১০টার দিকে। অনেক সময় ঝিনাইদহগামী শেষ বাসটি ছেড়ে দিত। চুয়াডাঙ্গা স্টেশনে উচ্চশ্রেণির যাত্রীদের বিশ্রামাগারটি ছিল সুসজ্জিত ও মার্জিত। শোয়ার জন্য কোনো খাট না থাকলেও কাঠ ও বেতের তৈরি অতি উচ্চমানের ইজি চেয়ার এতই সুন্দর ছিল যে ঘুমাতে কোনো অসুবিধা হতো না। আমি দুয়েকবার সকালের প্রথম বাসটি ধরতে পারিনি। এটি উল্লেখ করলাম এ কারণে যে, আব্বা এসে অপেক্ষা করতেন ঝিনাইদহের বাস স্টপেজে। প্রতি ঘণ্টায় চুয়াডাঙ্গা থেকে ঝিনাইদহে বাস যেত। এখন ভাবতে ভীষণ কষ্ট লাগে, ওই এক ঘণ্টা আব্বা কী উৎকণ্ঠার মধ্যে কাটাতেন। আবার এটি ভাবতে ভালো লাগে যে, ভাগ্যিস, তখন মোবাইল ফোন ছিল না! থাকলে মায়ের কী দশাটাই না হতো!

কলেজে থাকা অবস্থা থেকে শুরু করে ’৬৯ সাল পর্যন্ত আমার বেশ কয়েকটি ঈদ কেটেছে কারাগারের অভ্যন্তরে। ’৬৬-এর পর থেকে রাজবন্দী হিসেবেই জেল খেটেছি। আমার একটি ঈদের কথা মনে পড়ে। তখন আমি হাজতি। মামলায় জামিন না দিয়ে ওই কদিন আমাকে জেল খাটিয়ে একটা বিদ্বেষপ্রসূত আনন্দ (স্যাডিজম) পেতেন ম্যাজিস্ট্রেটদের কেউ কেউ। এ ব্যাপারে ঘাগু ছিলেন ম্যাজিস্ট্রেট মরহুম আফসার উদ্দিন। আল্লাহ তাকে বেহেশত নসিব করুন। এটা অপ্রাসঙ্গিক কিনা জানি না, আমাদের যে কোনো মামলায় ম্যাজিস্ট্রেট কোর্টে এসে দাঁড়াতেন তখনকার দিনে প্রথিতযশা ব্যারিস্টার ও অ্যাডভোকেটরা। আতাউর রহমান খান (সাবেক মুখ্যমন্ত্রী), জহিরউদ্দিন (সাবেক কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী), সালাম খান, শাহ আজিজুর রহমানসহ অনেকেই। তখন হাই কোর্টে যারা আইনজীবী হিসেবে শুধু প্রসিদ্ধই নন, আইন ব্যবসাও যাদের রমরমা তারাও একটা অনবদ্য আকর্ষণে এসে ম্যাজিস্ট্রেটের বারান্দায় ভিড় জমাতেন। আমার অনুভূতি আজও শিহরিত হয়, রাজনীতির সেই রোমাঞ্চিত ত্যাগের মহিমায় ভরপুর দিনগুলো কি আবার কখনো অবক্ষয়ের অতলান্তে অবলুপ্ত ক্ষয়িষ্ণু সমাজব্যবস্থায় মৌলিক অধিকারবিবর্জিত একনায়কতান্ত্রিকতায় আচ্ছাদিত এ বাংলাদেশে ফিরে আসবে?

সেবার হাজতি হিসেবে কারাগারে গেলেও আমাকে জেল হাসপাতালে রাখা হয়। যারা নিরাপত্তাবন্দী নন, অথচ রাজনৈতিক কর্মী, তাদের জন্য এ ব্যবস্থাটি আকাশছোঁয়া পরিতৃপ্তির। যতদূর মনে পড়ে, জেলের অভ্যন্তরে হাসপাতাল চত্বরেই ঈদের জামাত হতো। তাও একটি অদ্ভুত অনুভূতির ঈদ। জেলখানার একটি ঈদ আমার জন্য বেদনাদায়ক, মর্মান্তিক ও হৃদয়বিদারক ছিল। কারণ তার দু-তিন মাস আগে আমি কারারুদ্ধ অবস্থায় আমার মায়ের মৃত্যু ঘটে এবং কোনোভাবেই মৃত্যুশয্যায় শায়িত মাকে দেখার বা পরে মৃত মাকে দাফন করার জন্য শত চেষ্টা সত্ত্বেও আমাকে কোনো পেরোল দেওয়া হয়নি। সম্ভবত ওই ঈদের জামাতে আমি যাইনি। শৈশব-কৈশোর ও যৌবনে আমার মমতাময়ী মাকে ঘিরে বিজড়িত স্মৃতি আমার হৃদয়কে প্রচণ্ডভাবে ভারাক্রান্ত করে। মুক্তিযুদ্ধকালীন আরেকটি ঈদে আমি নামাজ তো পড়িইনি (আল্লাহ আমার গুনাহ মাফ করুন), বরং স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র থেকে আমি একটি প্রচণ্ড উত্তেজক বক্তৃতা করে বলেছিলাম— ঈদের চাঁদ, তুমি আকাশের বক্ষ বিদীর্ণ করে বাংলাদেশে উদিত হয়ো না। আমার ধর্ষিতা বোনের বুক নিংড়ানো আর্তনাদ তোমাকে ধিক্কার দেবে, সন্তান হারানো মায়ের বুকফাটা আর্তনাদ তুমি সহ্য করতে পারবে না। কোথায় দাঁড়াবে ঈদের জামাত? বাংলার মাটির সর্বত্রই তো রক্তের ছোপ ছোপ দাগ। এখানে খুশির জামাত দাঁড়ানোর কোনো অবকাশ নেই। আমার আবেগ, আমার উচ্ছ্বাস, আমার ক্ষোভ, আমার ক্রোধ আমাকে এতখানি আচ্ছন্ন করে যে, স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র থেকে ভাষণে আমি তরুণ প্রজন্মকে ঈদের জামাতে অংশ না নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছিলাম (আবার আমি মহান আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাইছি)।

আজ আমি জীবন সায়াহ্নে উপনীত। আমার একমাত্র গুণের দিক থেকে বিবেচনা করলে আমি আজ পঞ্চম প্রজন্মের সিঁড়িতে। আমার নিজের দৌহিত্র-দৌহিত্রী রয়েছে। এবারের ঈদে আমাকে সালামি দেওয়ার মতো কেউ নেই। বরং সালাম করলে প্রায় সবাইকেই আমার সালামি দিতে হবে। এটাও ভিন্ন ধরনের আনন্দ; বিচিত্র ধরনের আস্বাদন। আমার দৌহিত্রী-দৌহিত্র সবাই ঈদের জন্য নানারকমের সাজগোজের সামগ্রী ক্রয়ে এবং উপহার পেতে আহ্লাদিত এবং ব্যস্ত। এ বৃদ্ধ বয়সেও নিজের জন্য ঈদের জামাকাপড় কিনতে আমারও আগ্রহের ঘাটতি নেই। পৃথিবীর যেখানেই সুন্দর পাঞ্জাবির কাপড় অথবা পাঞ্জাবি পাওয়া যায়, সবসময়ের মতো এবারও সংগ্রহের চেষ্টায় আছি। মৌলিক অধিকারবিবর্জিত বাংলাদেশ একটা সংকটকাল অতিক্রম করছে। যে জঙ্গি-সন্ত্রাস ইসলামে সম্পূর্ণ হারাম, সেই আতঙ্কও ঈদের জামাতকে ঘিরে সমগ্র মানুষের মধ্যে কাজ করে। দুই বছর আগে শোলাকিয়ায় ঈদের জামাতে জঙ্গি হামলার চেষ্টা থেকে এ আতঙ্ক সৃষ্টি হয়েছে। আল্লাহর কাছে আমার আকুল ফরিয়াদ— হারাম এই জঙ্গি-সন্ত্রাস থেকে আল্লাহ বাংলাদেশসহ পৃথিবীর সব ঈদের নামাজ আদায়কারীকে রক্ষা করবেন। আমার আরও ফরিয়াদ, বিপথগামী বিভ্রান্ত ও বিপর্যস্ত মানসিকতার যুবক, যারা বিভ্রান্তির শিকার হয়ে মানুষ হত্যা করে একটা পৈশাচিক আনন্দ ও অনৈতিক পরিতৃপ্তি লাভের ঘনঘোর অমানিশার মধ্যে নিমজ্জিত, আল্লাহ তাদের হেদায়েত করুন।

সব মুসলমানের প্রতি আমার বিনম্র অনুরোধ— আসুন এবারের ঈদে আমরা পরম করুণাময় আল্লাহর কাছে ফরিয়াদ তুলে ধরি— রমজানের সম্মানে ঈদুল ফিতরের জামাতগুলো নিরাপদ রাখার স্বার্থে ওইসব ভ্রান্ত ও ইসলামের চেতনাবিচ্যুত সন্ত্রাসীর হাত থেকে মুসলিম উম্মাহকে রক্ষা করুন। ঈদ সব মুসলমানের জন্য আনন্দ, সম্প্রীতি ও সৌহার্দ্যের বার্তা বয়ে আনুক।

লেখক : স্বাধীন বাংলা ছাত্রসংগ্রাম পরিষদের অন্যতম নেতা।

    Print       Email

You might also like...

Saadat-hossain

বৈষয়িক তরক্কির পদ্ধতি প্রক্রিয়া বিকৃতি ভেজালে আক্রান্ত হওয়ার সমূহ আশঙ্কা থাকে

Read More →