Loading...
You are here:  Home  >  অর্থ ও বাণিজ্য  >  Current Article

ঋণের সুদ কমাতেই ব্যাংকারদের ছাড়

2356471_kalerkantho-2018-9-pic-6

বাংলাদেশে কারো অভাবে অনাহারে থাকার দিন শেষ হয়ে গেছে বলে দাবি করেছেন অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত। তিনি বলেছেন, অভাব শব্দটা এখন আর এ দেশে নেই। মঙ্গাও উধাও হয়ে গেছে। গ্রামগঞ্জের মানুষ এখন সুখে-শান্তিতে বসবাস করছে। তিনি আরো বলেন, দেশে গরিব মানুষ বাড়ছে না, কমছে। স্বাধীনতার পর দারিদ্র্যের হার ছিল ৭০ শতাংশ, এখন ২২.৪ শতাংশে নেমেছে। তাই ২০১৮-১৯ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটকে কোনোমতেই ‘গরিব মারা’ ও ‘ধনীদের তেল দেওয়া’ বাজেট বলা যাবে না। গতকাল শুক্রবার রাজধানীর ওসমানী স্মৃতি মিলনায়তনে আয়োজিত বাজেটোত্তর সংবাদ সম্মেলনে অর্থমন্ত্রী এসব কথা বলেন।

প্রস্তাবিত বাজেটকে ‘নির্বাচনী বাজেট’ হিসেবে স্বীকার করে অর্থমন্ত্রী বলেন, ‘আমার সব বাজেটই নির্বাচনী বাজেট। আমি একটি রাজনৈতিক দলের সদস্য। বাজেটের মাধ্যমে মানুষকে খুশি রাখার কাজটি তো আমি করবই। শুধু এবারের বাজেট নয়, আগের সব বাজেটেই আমি এ চেষ্টা করেছি।’

সংবাদ সম্মেলনে অর্থমন্ত্রীর একপাশে ছিলেন কৃষিমন্ত্রী মতিয়া চৌধুরী, তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনু, প্রধানমন্ত্রীর অর্থনৈতিক উপদেষ্টা ড. মসিউর রহমান আর অন্যপাশে ছিলেন পরিকল্পনামন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল, জ্বালানিবিষয়ক উপদেষ্টা তৌফিক-ই-এলাহী এবং অর্থ ও পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী এম এ মান্নান। বিকেল ৩টায় শুরু হওয়া সংবাদ সম্মেলন চলে পৌনে ৫টা পর্যন্ত।

ওই সময় অর্থমন্ত্রীকে সাচিবিক সহায়তা দিতে উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ড. ফজলে কবির, জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) চেয়ারম্যান মোশাররফ হোসেন ভূঁইয়া, পরিকল্পনা কমিশনের সদস্য ড. শামসুল আলম ও অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের সচিব কাজী শফিকুল আযম।

প্রস্তাবিত বাজেট ‘বাস্তবায়নযোগ্য’ বলে দাবি করেন অর্থমন্ত্রী। তিনি বলেন, ‘বাজেট দেওয়ার আগে এটা ভেবেই দিই যে বাস্তবায়ন হবে। প্রতিবছর রাজস্ব আয়ে লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় একটু ঘাটতি থাকে। অধুনা এই ঘাটতি বেড়েছে। তবে এবার ঘাটতি কমেছে। আগামী অর্থবছর রাজস্ব ঘাটতির পরিমাণ আরো কমে আসবে।’

ঋণের সুদহার কমানোর অঙ্গীকার করা ব্যাংক মালিকদের বাজেটের আগে সিআরআর কমিয়ে সুবিধা দেওয়া হয়েছে। সরকারি আমানতের ৫০ শতাংশ পাওয়ার ব্যবস্থা করে দিয়েছে সরকার। বাজেটে তাদের করপোরেট কর হার ২.৫ শতাংশ কমানোয় প্রশ্ন তোলেন সাংবাদিকরা।

সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে অর্থমন্ত্রী বলেন, ‘আমাদের করপোরেট করের সর্বোচ্চ হার ৪০ শতাংশ থেকে কমিয়ে ৩৭.৫ শতাংশে এনেছি। আন্তর্জাতিকভাবে ৪০ শতাংশ কর অনেক বেশি, তাই। প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে আলোচনা করেই এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। সঞ্চয়পত্রের সুদহার কমানোর জন্য চলতি জুন বা জুলাই মাসে পর্যালোচনা করা হবে বলেও জানান তিনি।

এ বিষয়ে পরিকল্পনামন্ত্রী বলেন, ব্যাংকঋণের সুদের হার এক অঙ্কে নামিয়ে আনার জন্য তাদের করপোরেট করহার কমানো হয়েছে। সুদের হার না কমালে ব্যবসা-বাণিজ্য পরিচালনা করা কঠিন হয়ে পড়ছে। ঋণের সুদ কমলে ব্যবসা-বাণিজ্য ভালো হবে। এর প্রভাব পড়বে অর্থনীতি ও সামাজিক ক্ষেত্রে।

এত সব সুবিধা দেওয়ার পরও ব্যাংক মলিকরা ঋণের সুদহার কমাচ্ছেন না। অদূর ভবিষ্যতে ঋণের সুদহার কমে এক অঙ্কে না নামলে এসব সুবিধা প্রত্যাহার করে নেওয়া হবে কি না, জানতে চাইলে সে প্রশ্নের জবাব দেননি কেউই।

ব্যাংকিং কমিশন এখন নয় : চলতি জুন মাসেই ব্যাংকিং কমিশন গঠন করে ব্যাংক খাতের সমস্যা চিহ্নিত করে তা সমাধান করার কথা আগে বলেছিলেন অর্থমন্ত্রী। গতকাল আচমকা সে অবস্থান পাল্টে তিনি বলেন, ‘কমিশন গঠনের কাজ অনেকটুকু করে রেখেছি; কিন্তু এটা এখন আর করব না। আমি যেসব প্রস্তুতি নিয়েছি তা পরবর্তী সরকারকে দিয়ে যেতে চাই। পরবর্তী সরকার কে হবে, তার ওপরই নির্ভর করবে ব্যাংক খাতের সংস্কার।’

মুহিত বলেন, ‘আমাদের ব্যাংক খাতটি আয়তনে অনেক বড় হয়েছে। এর পরও ব্যাংকিং সেবা এখনো দেশের অনেকেই পাননি। আকারে বাড়লেও সেবা সেভাবে বাড়েনি। ব্যাংকিং কমিশন আমি করতে চেয়েছিলাম; কিন্তু সেটা আর করছি না। এ জন্য কাগজপত্র সব তৈরি করে রেখে দিচ্ছি, আগামী সরকারের জন্য। আগামীতে যে সরকার আসবে তার জন্যই এটা রেখে যাচ্ছি।’

অনলাইন কেনাকাটায় ভ্যাট ছাপার ভুল : অনলাইন কেনাকাটায় ৫ শতাংশ ভ্যাট আরোপের প্রস্তাব সম্পর্কে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে এনবিআর চেয়ারম্যান বলেন, ফেসবুক, গুগল ও ইউটিউবে ৫ শতাংশ ভ্যাট আরোপ করা হয়েছে। অনলাইন কেনাকাটায় কোনো ভ্যাট বসানো হয়নি। বাজেট প্রস্তাবে এটি থেকে থাকলে তা ছাপার ভুল হতে পারে।

উবার, পাঠাওসহ রাইড শেয়ারিং সেবার ওপর ভ্যাট আরোপ করে নিম্ন-মধ্যবিত্তদের বাড়তি চাপে ফেলার চেষ্টা করা হয়েছে কি না, জানতে চাইলে উত্তর দেননি কেউ।

নির্বাচনের আগে নারীদের ব্যবহৃত প্রসাধনসামগ্রীর ওপর বাড়তি সম্পূরক শুল্ক আরোপের বিষয়ে কৃষিমন্ত্রী মতিয়া চৌধুরী বলেন, ‘একটু কম প্রসাধন ব্যবহার করলে খুব একটা অসুন্দর লাগবে, তা ঠিক নয়।’

চাকরিজীবীদের বিস্তর সুবিধা : নির্বাচনের আগে বাজেটে সরকারি চাকুরেদের জন্য কোনো ‘উপহার’ থাকছে কি না, জানতে চান একজন সাংবাদিক। জবাবে মুহিত বলেন, ‘চাকরিজীবীদের এই সরকার যেসব সুবিধা দিয়েছে, তা আগে তাঁরা কোনো দিন পাননি। এখন ৭৮ হাজার টাকা পর্যন্ত বেতন পাচ্ছেন তাঁরা। পেনশনসহ অন্যান্য সুবিধা বেড়েছে। আমার মনে হয়, একজন চাকরিজীবীর মধ্যেও কোনো ধরনের অসন্তোষ নেই।’

ঘাটতি বেশি মনে করেন না অর্থমন্ত্রী : প্রস্তাবিত বাজেটে সোয়া লাখ কোটি টাকার ঘাটতি রয়েছে। এত বিপুল পরিমাণ ঘাটতি আগামী দিনগুলোতে বাংলাদেশের জন্য বড় সংকটের কারণ হতে পারে কি না, জানতে চাইলে অর্থমন্ত্রী বলেন, ‘বাংলাদেশের এখন বৈদেশিক ঋণের পরিমাণ ৩২ বিলিয়ন ডলারের মতো। এর মধ্যে শুধু রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের ঋণই ১২ বিলিয়ন ডলার, যা ২০২৪ সাল পর্যন্ত পেতে থাকব। এই পরিমাণ বৈদেশিক ঋণ আমাদের দেশের জন্য খুবই নগণ্য। বাংলাদেশ কখনো ঋণের কোনো কিস্তি দিতে এক মুহূর্ত দেরি করেনি। এমন কৃতিত্ব পৃথিবীর আর কোনো দেশের নেই। বাজেট ঘাটতি সব সময় জিডিপির ৫ শতাংশের মধ্যে রাখার চেষ্টা করা হয়। এটি কখনো ৪.৭-এর বেশি হয়নি। এবার ৪.৯ শতাংশ প্রস্তাব করা হয়েছে।’

এ বিষয়ে ড. মসিউর রহমান বলেন, ঋণ নিয়ে সরকার যেসব প্রকল্পে বিনিয়োগ করছে তার সুফল অনেক বেশি। শিল্পায়ন ও বাণিজ্য বাড়বে, রপ্তানি বাড়বে। তখন এই ঋণ আর বোঝা মনে হবে না। তথ্যমন্ত্রী বলেন, ঋণ করে ঘি খেলে তাতে সংকট বাড়ে। কিন্তু সরকার ঋণের টাকা এমন প্রকল্পে ব্যয় করছে, যেখান থেকে আরো বেশি লাভবান হওয়া যাবে। বাংলাদেশিদের বর্তমানে মাথাপিছু বিদেশি ঋণ ১৯৮ ডলার বলে জানান ইআরডি সচিব।

এ বছরের শেষে বা জানুয়ারির শুরুতে জাতীয় সংসদ নির্বাচন হওয়ার কথা। নির্বাচনের পরে নতুন সরকার বাজেটের বাকি অংশ বাস্তবায়ন করবে। এতে বাজেট বাস্তবায়নে সমস্যা হবে কি না, জানতে চাইলে মুহিত বলেন, নির্বাচনের হাওয়া এ বছর এখনো লাগেনি। সাধারণত বছরের শেষে নির্বাচন হলে এপ্রিলের মধ্যেই হাওয়া লেগে যায়। এবার দেরি হচ্ছে। এটি অর্থনীতির জন্য ভালো। তবে নির্বাচনী ডামাডোল শুরু হলে বাজেট বাস্তবায়নে বিঘ্ন ঘটবে।

বাংলাদেশে বেসরকারি বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান কম, কর-জিডিপির অনুপাতও দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে সর্বনিম্ন, তা সত্ত্বেও কোন জাদুবলে বাংলাদেশ উচ্চ প্রবৃদ্ধি অর্জন করছে, তা জানতে চান সাংবাদিকরা। উত্তরে মুহিত বলেন, ‘কম বিনিয়োগ, কম রাজস্ব আয়ে উচ্চ প্রবৃদ্ধি অর্জনই আমাদের সাফল্য। যে রাজস্ব আহরণ হয় তার ব্যবহার এত ভালোভাবে হয় যে কম বিনিয়োগেও উচ্চ প্রবৃদ্ধি সম্ভব হচ্ছে।’

সর্বজনীন পেনশন ব্যবস্থা লম্বা প্রক্রিয়া : অর্থসচিব মোহাম্মদ মুসলিম চৌধুরী বলেন, ‘বাজেটে পেনশনের জন্য আলাদা অফিস ও সর্বজনীন পেনশন ব্যবস্থা চালুর কথা বলা হয়েছে। তবে মনে রাখতে হবে, এটি বাস্তবায়ন করতে দীর্ঘমেয়াদি সময় লাগবে। এটি আশা করা যাবে না যে আগামী অর্থবছরেই সবার জন্য পেনশন ব্যবস্থা হয়ে যাবে। আমরা রূপরেখা প্রণয়নসহ অন্যান্য কাজ শুরু করেছি। এটি একটি লম্বা প্রক্রিয়া। সরকারের আর্থিক ব্যয়ে স্বচ্ছতা আনতে তথ্য-প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানো হচ্ছে। এটি সম্ভব হলে বাজেট না বাড়িয়ে জনগণকে দেওয়া সরকারের সেবা ৪০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ানো সম্ভব।’

সঞ্চয়পত্রের সুদহার জুলাইয়ের মধ্যেই কমতে পারে : সঞ্চয়পত্রের মুনাফার হার জুলাইয়ের মধ্যেই কমিয়ে আনা হবে বলে জানান অর্থমন্ত্রী। তিনি বলেন, ‘সাধারণত দুই-তিন বছর পরপরই আমরা সুদহার পর্যালোচনা করি; কিন্তু এবার একটু দেরি হয়েছে। এবার বাজেটের মাসে বা বাজেটের পরের মাসেই এটা পর্যালোচনা করা হবে।’

সরকারের সুদ ব্যয় বেড়ে যাচ্ছে—এ অজুহাতে গত বছর বাজেটের আগে সঞ্চয়পত্রের সুদের হার কমানোর ঘোষণা দিয়েছিলেন অর্থমন্ত্রী। কিন্তু পরে বাজেট অধিবেশনে মন্ত্রী ও সংসদ সদস্যরা অর্থমন্ত্রীর ওই ঘোষণার তীব্র সমালোচনা করায় শেষ পর্যন্ত সুদের হার কমানো হয়নি। কিন্তু বাজেট ঘাটতি মেটাতে চলতি অর্থবছরে সঞ্চয়পত্র থেকে যে পরিমাণ অর্থ ধার করার লক্ষ্য ঠিক করা হয়েছিল, সরকার তার চেয়ে ৩৩ শতাংশ বেশি ঋণ নিয়ে ফেলেছে এপ্রিল মাসের মধ্যেই। এ কারণে সংশোধিত বাজেটে এ খাতের ঋণের লক্ষ্যমাত্রা বাড়িয়ে ৪৪ হাজার কোটি টাকা করা হয়। মূল বাজেটে এই লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৩০ হাজার ১৫০ কোটি টাকা।

    Print       Email

You might also like...

326503_146

সিঙ্গেল ডিজিট সুদে ঋণ দেবে ৬ রাষ্ট্রায়ত্ত বাণিজ্যিক ব্যাংক

Read More →