Loading...
You are here:  Home  >  কলাম  >  Current Article

একজন ইমামের আত্মত্যাগ

আলফাজ আনাম :
ভারতের ইতিহাসের সাথে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার ইতিহাসও জড়িয়ে আছে। প্রতি বছর দেশটিতে শতাধিক মানুষ শুধু ধর্মীয় পরিচয়ের কারণে হত্যাকাণ্ডের শিকার হচ্ছেন। যারা নিহত হচ্ছেন তাদের বেশির ভাগ সংখ্যালঘু মুসলমান কিংবা দলিত সম্প্রদায়ের মানুষ। ধর্মীয় উৎসব পালনের নামে ভারতে নতুন করে ভিন্ন ধর্মাবলম্বী মানুষ হত্যার নতুন প্রবণতা শুরু হয়েছে। সম্প্রতি রামের জন্মদিন পালনের নামে ভারতের বিভিন্ন প্রদেশে পালন করা হচ্ছে রামনবমী উৎসব। ক্ষমতাসীন বিজেপিসহ হিন্দুত্ববাদী সংগঠনগুলো অস্ত্রশস্ত্রসহ বিশাল মিছিল নিয়ে এই উৎসব পালন করছে। যেখানে শিশুরাও অংশ নিচ্ছে।

এবারের রামনবমী উৎসবে ভারতের বিভিন্ন প্রদেশে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার ঘটনা ঘটেছে। এর মধ্যে পশ্চিমবাংলা ও বিহারও রয়েছে। রামনবমীর মিছিল থেকে মর্মান্তিক হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে পশ্চিম বাংলার আসানসোলে। বাংলাদেশের মানুষের কাছে আসানসোল নামটি খুবই পরিচিত। জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের জীবনের সাথে জড়িয়ে আছে আসানসোলের নাম। ফলে তার জীবনী পড়তে গিয়ে এ দেশের শিশুরাও জানে শহরটির নাম। কাজী নজরুল ইসলাম এই ছোট শহরটিতে কৈশোরে চা-রুটির দোকানে কাজ করতেন।

এই শহরে রামনবমীর মিছিল থেকে ১৬ বছরের এক কিশোরকে ধরে নিয়ে হত্যা করা হয়। এই শিশুর পিতা স্থানীয় নূরানী মসজিদের ইমাম ইমদাদুল্লাহ রশিদি। কিভাবে হিন্দুত্ববাদী উগ্রপন্থীরা তার সন্তানকে হত্যা করেছে, বিবিসি বাংলা এর বিবরণ তুলে ধরেছে। এই ইমামের ১৬ বছরের ছেলে মোহাম্মদ শীবগাতউল্লাহ দাঙ্গা শুরুর পর দু’দিন ধরে নিখোঁজ ছিল। বৃহস্পতিবার প্রথম তার লাশের সন্ধান পান তারা। ইমদাদুল্লাহ বলছিলেন, ‘ছেলেটা মাধ্যমিক পরীক্ষা দিয়েছিল, একই সঙ্গে নানা জায়গায় কুরআন পড়তেও যেত। বুধবার যখন অশান্তি শুরু হয়, তখন নেহাতই কৌতূহলবশে দেখতে গিয়েছিল। আমার বড় ছেলে খবর দেয় যে একদল লোক ওকে টেনে নিয়ে যায়। পরের দিন জানলাম একটা মৃতদেহ পাওয়া গেছেÑ ওটাই আমার ছেলের দেহ।’ ‘খুব যন্ত্রণা দিয়ে মেরে তো ফেলেইছে ছেলেটাকে, তারপরে দেহটা জ্বালিয়েও দিয়েছিল। এটা কেন করল ওরা!’

এই হত্যাকাণ্ডের খবর জানাজানি হওয়ার পর স্বাভাবিকভাবে আসানসোল উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। সেখানকার পরিস্থিতি কেমন ছিল তার বিবরণ তুলে ধরেছেন সাংবাদিক জিম নওয়াজ। তিনি লিখেছেন, ‘আসানসোলের নূরানী মসজিদের ইমাম মাওলানা ইমদাদুল্লাহ রশিদির পুত্রকে হত্যা করেছে দাঙ্গাকারী সংঘীরা। অত্যন্ত নৃশংসভাবে হত্যা করা হয়েছে। বুক চিরে কলজে বের করে ইমাম সাহেবের পুত্রকে টুকরো টুকরো করে কেটে ফেলা হয়েছে। পোস্টমর্টেমের পরে আসরের নামাজের আগে নামাজে জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। জানাজায় অংশগ্রহণ করেছিলেন প্রায় দশ হাজারের বেশি মানুষ। পরিস্থিতি ছিল খুবই ভয়ানক এবং উত্তপ্ত। আসানসোলের ২৫ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর নাসিম আনসারীর বয়ান অনুযায়ী, ‘জানাজার ময়দানকে কারাবালার ময়দান বলে মনে হচ্ছিল। যুবকদের চোখেমুখে ফুটে উঠেছিল প্রতিশোধ গ্রহণের প্রতিজ্ঞা। আমি প্রায় হাল ছেড়েই দিয়েছিলাম। মনে মনে ভাবছিলাম, না আর আসানসোলকে রক্ষা করা গেল না।’

জানাজা শুরুর আগে মৃত সন্তানের পিতা ইমাম ইমদাদুল্লাহ রশিদি খুৎবা (বক্তব্য) দিতে উঠলেন। ইমাম সাহেবের উর্দু বক্তব্যের নির্যাসটুকু অনুলিখন করার চেষ্টা করলাম, ‘আল্লাহ্ আমার সন্তানের যতদিন আয়ু রেখেছিলেন, ততদিন সে বেঁচেছে। আল্লাহর ইচ্ছায় তার মৃত্যু হয়েছে। তাকে যারা হত্যা করেছে, আল্লাহ তাদের কেয়ামতের ময়দানে শাস্তি দেবেন। কিন্তু, আমার সন্তানের মৃত্যুর প্রতিশোধ নেয়ার অধিকার আপনাদের কারো নেই। আমার সন্তানের মৃত্যুর জন্য একটি মানুষের ওপরও আক্রমণ করা চলবে না। একটি মানুষকেও হত্যা করা যাবে না। বাড়িঘর, দোকানপাট কোথাও ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগ বা লুটপাট করা চলবে না। ইসলাম আমাদের নিরীহ কোনো মানুষকে হত্যা করতে শেখায় না। ইসলাম আমাদের শান্তিশৃঙ্খলা বজায় রেখে বসবাস করতে শেখায়। আমাদের আসানসোলে আজ শান্তিশৃঙ্খলার প্রয়োজন। আপনারা যদি আমায় আপন মনে করেন, তাহলে ইসলাম নির্দেশিত শান্তি বজায় রাখবেন। শান্তিশৃঙ্খলা বজায় রাখার দায়িত্ব আপনাদের। আর যদি, আপনারা শান্তি বজায় রাখতে না পারেন, তাহলে ভাবব- আমি আপনাদের আপন নই। আমি আসানসোল ছেড়ে চিরতরে চলে যাব।’

    Print       Email

You might also like...

Saadat-hossain

বৈষয়িক তরক্কির পদ্ধতি প্রক্রিয়া বিকৃতি ভেজালে আক্রান্ত হওয়ার সমূহ আশঙ্কা থাকে

Read More →