Loading...
You are here:  Home  >  এক্সক্লুসিভ  >  Current Article

কবি আল মাহমুদের সাথে এক ভিন্ন রকম আলাপচারিতা

Almahmudসাঈদ চৌধুরী
কবিতা চরের পাখি, কুড়ানো হাঁসের ডিম, গন্ধভরা ঘাস / ম্লান মুখ বউটির দড়ি ছেঁড়া হারানো বাছুর / গোপন চিঠির প্যাডে নীল খামে সাজানো অক্ষর / কবিতা তো মক্তবের মেয়ে চুলখোলা আয়েশা আক্তার। – – -
সোনার দিনার নেই, দেন মোহর চেয়ো না হরিনী / যদি নাও, দিতে পারি কাবিনহীন হাত দুটি / আত্মবিক্রয়ের স্বর্ন কোনকালে সঞ্চয় করিনি / আহত বিক্ষত করে চারদিকে চতুর ভ্রুকুটি ; / ছলনা জানিনা বলে আর কোন ব্যবসা শিখিনি ।

এমন অসংখ্য কালজয়ী কবিতার স্রষ্টা দেশের প্রধান কবি আল মাহমুদ। বাংলা কবিতাকে গৌরবোজ্জ্বল অবস্থানে নিয়ে এসেছেন তিনি।আমাদের কবিতায় যে ঐতিহ্য ও আধুনিকতার ঊণ্মেষ ঘটেছে তিনিই তার নায়ক। প্রখ্যাত সমালোচক অধ্যাপক শিবনারায়ণ রায়ের মতে, সমকালীন যে দুজন বাঙালী কবির দুর্দান্ত মৌলিকতা এবং বহমানতা আমাকে বারবার আকৃষ্ট করেছে তাদের মধ্যে একজন হলেন বাংলাদেশের আল মাহমুদ, অন্যজন পশ্চিমবঙ্গের শক্তি চট্রোপাধ্যায় ।
দুই বাংলার অপরাজেয় এই কবির জন্ম ১৯৩৬ সালের ১১ জুলাই।বার্ধক্য তাকে দমিয়ে রাখেনি, ডিকটেশনের মাধ্যমে এখনো চালিয়ে যাচ্ছেন লেখালেখি। স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ে পাঠ্য আল মাহমুদের কবিতা । দেশ-বিদেশে তাকে নিয়ে গবেষণা হচ্ছে। বইয়ের সংখ্যা শতাধিক। চল্লিশের বেশী কাব্যগ্রন্থ, বিশের অধিক উপন্যাস এবং দশটির মতো গল্পগ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে।তার শিশু সাহিত্য কিংবা কিশোর কবিতা বাংলা সাহিত্যে দুর্লভ। আট খণ্ডের রচনা সমগ্রও পাঠকের হৃদয় ছুঁয়েছে। বাংলা ভাষা ও সাহিত্য এবং আল মাহমুদ যেন এক ও অভিন্ন।
এমন একজন কবির চোখে দেখা জীবন ও জগতের অনেক কিছু জানতে ইচ্ছে হয়। তার সাধনা ও ভাবনা গুলো একত্রিত করতে পারলে আগামীতে লেখক-গবেশষকদের কাজ সহজ হবে। আর এই প্রত্যাশা থেকে দুই যুগ ধরে কাছে থেকে দেখা আল মাহমুদকে পাঠকের সামনে তুলে ধরার প্রয়াসে এক ভিন্ন রকম আলাপচারিতা।

এক বৃষ্টি ভেজা দুপুরে হাজির হলাম আল মাহমুদের বাসায়। কবি কন্যা আতিয়া মীর সাথে ছিলো। প্রাথমিক খুশ গল্পের পরই সাহিত্য নিয়ে আলোকপাত শুরু। কবি বললেন, আগের মতো লেখালেখির কাজ চালিয়ে যেতে পারছি না। আজ এক অস্বস্তির মধ্যে আকাশ-পাতাল ভাবছি। ভাবনাটিকে লিখে ফেলতে হয়। কিন্তু মন স্থির না থাকলে লেখাটা এলোমেলো হয়ে যায়। সব কিছুতেই একটা বৃষ্টির বিড়ম্বনা আমাকে জাপটে ধরে রাখে। এক ডুবন্ত ঢাকা শহর, ঘরে বসে লিখব এমন রুটিন লেখায় মন ভরছে না, নগরটাকে দেখতে ইচ্ছে করে। ঘরে বসে কিছু লিখতে গেলে সব ঘটনাই চলে যায় ঢাকার বাইরে। অদ্ভুত সব মানুষ আমার স্মৃতিতে এসে ভিড় করে।এ সব তো আর সেভাবে অক্ষরে বিম্বিত হতে চায় না। তবু আমি গল্প বানাই এবং গল্পটি এক জায়গায় শেষ করতে হয়। কিন্তু আমার কাহিনী তো সীমানা মানতে চায় না।

জানতে চাইলাম, সারা জীবন কবিতার সাথে ঘর-সংসার করলেন। এখন এ নিয়ে ভাবতে কেমন লাগে?
আল মাহমুদ বললেন, জীবনের পড়ন্ত বেলায় কবিতা নিয়ে ভাবতে ভালো লাগে।অতীতকে স্মরণ করে আমি ভীষণ আনন্দ বোধ করি। একসময় কবিতাই ছিল আমার একমাত্র আরাধনার বিষয়। আর এখনকার সময়টা একটু ভিন্ন- বয়সের পরিণত অবস্থায় ডিকটেশন দিয়ে লেখাতে হয়। চোখে দেখে লিখতে পারলে কতই না ভালো হতো! আফসোস না করে বলি- আমি তো লিখেই পুরো জীবন পার করলাম, সময় সাক্ষী। এখন আর তেমন লিখতে ইচ্ছে হয় না। তবু স্বজন-শুভাকাঙ্ক্ষীদের আবদারে একটু-আধটু লিখতে হয়, তারা একটা নতুন লেখার জন্য সদা তৎপর। আমার ব্যাপারে পাঠকের এই আগ্রহের একটা মূল্য আছে, তাই এখনো কাউকে নিয়ে লিখতে বসি।

কবি আল মাহমুদের সাথে এভাবেই শুরু হয় কথোপকতন।এ এক ভিন্ন রকম আলাপচারিতা। ভিন্ন ভিন্ন সময়ে ঢাকায় ও সিলেটে কবির সাথে নানা বিষয়ে আলোচনা বা সাক্ষাৎকারের খন্ডচিত্র পৃথক পৃথক ভাবে পাঠকদের সামনে তুলে ধরার ক্ষুদ্র প্রয়াস এটি।

সাঈদ চৌধুরী: জীবনে স্বপ্ন ও স্মৃতিগুলো কবিতার চেয়ে গদ্যে সহজে তুলে এনেছেন বলে কি মনে করেন?
আল মাহমুদ: আমার অনেক স্বপ্ন আছে, স্মৃতি আছে। চোখের সামনে সৃস্টি কিংবা ধ্বংস হয়ে যাওয়ার অনেক ইতিহাস আমি জানি। আমার পাঠকদের ভারাক্রান্ত করতে চাই না বলে বেদনাময় ইতিহাস লেখা হয়না। আমি এমন গল্প বলি, যা মানুষকে দুঃখ দেয় না। অনুতাপে দগ্ধ করে না। আমি ইচ্ছে করলেই কিছু বানিয়ে তুলতে পারি না। যখন কোন কাহিনীসূত্র আমার মনে পড়ে তখনই গল্পটি তৈরী করি।এজন্য আমার গল্পে অশ্রুজল নেই, ধৈর্য ধারণের দৃষ্টান্ত আছে।

সাঈদ চৌধুরী: আপনি এখন ডিকটেশন দিয়ে লেখাতে হয়। ইচ্ছে মতো লিখতে না পারায় কেমন লাগে?
আল মাহমুদ: আমি কিছু না লিখলে আমার নিদ্রার বেঘাত ঘটায়। কিন্তু কি করব! কারো সাহায়্যে ডিকটেশন দিয়েই লেখাতে হয়। সবসময় মনে হয় পেছনে এমন কিছু ফেলে এসেছি, যা না থাকলে মানুষ মরীচিকার হাতছানিতে কেবল স্থান থেকে স্থানান্তরে ঘুরে বেড়াতে থাকে। কোনো গন্তব্যে পৌঁছায় না। আমি কবি, আমার প্রতিজ্ঞা হলো বাস্তব হোক বা স্বপ্নই হোক, আমাকে গন্তব্যে পৌঁছতে হবে। আমার বিশ্বাস, আমার কবিতা সেখানে ঠিকই পৌঁছে যাবে।

সাঈদ চৌধুরী: আপনি কবিতায় না গল্পে অমর হতে চান?
আল মাহমুদ: কবিরা সত্য ও স্বপ্ন মিলিয়ে কবিতা তৈরি করেন। মানুষ নিন্দায় উত্তেজিত হয় এবং দুঃখে দারিদ্র্যে ভেঙে পড়ে।আর এই কাহিনীই হলো মহাকাব্য। কবির রচনায় মানুষ মহাকাব্যের অমরতার স্বাদ আস্বাদন করে।

সাঈদ চৌধুরী: আপনার অনেক লেখায় নর-নারির প্রেম প্রাধান্য পেয়েছে।আপনার মূল্যায়ন কি?
আল মাহমুদ: নর-নারী একে অন্যকে বিশ্বাস করে ঘর বাঁধে, এই বিশ্বাসটুকু না থাকলে জগৎ অরণ্যে পর্যবসিত হতো। আর এই বিশ্বাসের নামই হলো প্রেম। একে অন্যের জন্য পাগল হওয়ার নাম প্রেম নয়। প্রেম হলো এক স্বর্গীয় অনুভূতি। এর ওপর দাঁড়িয়ে আছে জগতের শ্রেষ্ঠ সৃজনশীল কর্ম। সব শিল্পীই এই জায়গায় একবার নীরবে দাঁড়ায়। মানবিকতাকে প্রেমকে একই সাথে প্রেমের পরিণতিকে শ্রদ্ধা জানায়।

সাঈদ চৌধুরী: বিষয় নির্ধারণ করে লিখেন নাকি লিখতে বসে ঠিক করেন?
আল মাহমুদ: আমার বিষয় কী হবে, তা আগে থেকে স্থির করে নিতে পারি না। আমি লিখি কোনো তাৎক্ষণিক উদ্দীপনায় কিংবা লিখি অন্তরের তাগিদে। আমি বহুদ্রষ্টা একজন বয়স্ক ব্যক্তি, এই জীবনে অনেক ঘটনা ও দুর্ঘটনার সাক্ষী। মানুষের সুখ-দুঃখ নিয়ে অনেক পুস্তক রচনা করেছি, এর মধ্যে কবিতার বইও আছে; যেমন আছে উপন্যাস।

সাঈদ চৌধুরী: পাঠকদের প্রত্যাশা পুরণে কি সক্ষম হয়েছেন?
আল মাহমুদ: আমি সাহিত্যের অঙ্গনে যাকে যে কথা দিয়েছিলাম তা রক্ষা করার চেষ্টা করেছি, তা মোটামুটিভাবে সন্তোষজনকই হয়েছে। এখন হয়তো মউতের দোলনায় দুলছি, এখন আমার প্রভু যদি আমাকে সাহায্য করেন তাহলে আমার দিনগুলো আমি স্বস্তিকরভাবে পার হয়ে যেতে পারব ইনশাআল্লাহ। তার পরও মানুষের কিছু দাবি আমার ওপর থেকেই যাবে। এ ব্যাপারে আমার কথা হলো আমি একজন কবি বৈ আর কিছু নই। মানুষের যেটুকু সাধ্যে কুলায় সেটুকু আমি পরিপূরণের প্রয়াসী ছিলাম।

যেহেতু আমি কবি ছাড়া আর কিছু নই, সে কারণে বাংলাদেশের সাহিত্যের ইতিহাসে একটি দৃষ্টান্ত স্থাপন করে যেতে চেয়েছি। কেমন হয় কবিরা? কোথায়, কিভাবে জন্মায় একজন কবি? কবির কী প্রয়োজন একটি দেশের জন্য? এসব প্রশ্নের জবাব অতীতে দেয়ার চেষ্টা করেছি। অনেক কথা লিখেছি, যা অন্য কবিরা লিখতে সম্মত হবেন না। আমি লিখেছি; কারণ আমি আমার পাঠকদের কাছে সততার দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে চাই।

সাঈদ চৌধুরী: আপনার গল্প-উপন্যাস কি জীবন থেকে নেয়া?
আল মাহমুদ: অনেকে প্রশ্ন করেন, আমার উপন্যাসগুলো কি আমার জীবনেরই কোনো রঙ চড়ানো? আমি জবাব দিই না। কারণ এর কোনো জবাব হয় না। আমি মনে করি, উপন্যাস রচয়িতাদের নিজের জীবন ছাড়া লেখার আর কোনো বিষয়বস্তু থাকে না। থাকলেও সেটা শেষ পর্যন্ত নিজের জীবনেই এসে মিশে যায়। আমিও এর ব্যতিক্রম নই।

যখন ধারাবাহিকভাবে উপন্যাস রচনা করতাম, তখন আমার কিছু বন্ধু জুটেছিল। তারা সবাই সাংবাদিক, এখনো পেশায় নিয়োজিত। আবার কেউ এই লেখালেখির জগৎ থেকেই দূরে সরে গেছেন। কিন্তু তাদের স্মৃতি আমার মতো এক অযোগ্য কবির ঘাড়ে চাপিয়ে দিয়ে তারা অন্তর্হিত হয়েছেন। সাধ্যমতো তাদের কথাও আমার রচনাবলির কোথাও না কোথাও জমা করে রেখেছি। বলা যায় আমি তাদের এককালীন স্মৃতিকে বিস্মৃত হইনি।

সাঈদ চৌধুরী: আপনার লেখালেখিতে কোন দায়বদ্ধতা আছে কি?
আল মাহমুদ: দায়বদ্ধতা একটি অদৃশ্য বিবেক। আমি বিবেকের তাড়নায় লিখি এবং বিবেকের তাড়নায় এই বয়সেও শিখি।আমাদের সমকালীন সাহিত্যে নানা বিষয়ে আমাকে সজাগ থাকতে হয়।

সাঈদ চৌধুরী: এক সময় আপনি বিপ্লবী বলয়ে ছিলেন। কবি হিসেবে ভয় হতোনা?
আল মাহমুদ: মানুষ মৃত্যুর সামনেও মেরুদণ্ড সোজা করে দাঁড়িয়ে থাকতে পারে।কবিরা এটা পারে বলেই কবিতা লেখে এবং মৃত্যুতে কাতর হয় না। আমি সব সময় আমার প্রভুর ওপর ভরসা করে থেকেছি। এখনো আছি।

সাঈদ চৌধুরী: কবিরা অনেক কিছু স্বপ্ন দেখেন, বাস্তবে কতটা প্রতিফলিত হয়?
আল মাহমুদ: আমার পথ হলো কবির পথ। খানিকটা স্বপ্নে, খানিকটা বাস্তবে হাঁটাচলা করাই আমার কাজ। আমি অনেক দিন পর্যন্ত এই কাজটি করে চলেছি। যে পথে কেউ হাঁটেনি আমি সে পথে হাটে-বাটে-ঘাটে একদা বিচরণ করেছি। আমার মনেও প্রশ্ন জেগেছে¬ এত দিন লিখছি, সমাজে কতটা প্রতিফলিত হয়েছে।এর পাঠক আছে কি না। লেখকের পরমাত্মীয় হলো একজন পাঠক বা পাঠিকা। আকস্মিকভাবে আমার ঘরে টেলিফোন বেজে ওঠে। তারা আমার পাঠক।কণ্ঠস্বর পুরুষেরই হোক কিংবা কোনো নারীর, খুবই বিমোহিত হই। আনন্দে হৃৎপিণ্ড দুলতে থাকে। ভাবি এই তো লেখকের সার্থকতা।

হঠাৎ যখন কোনো অজ্ঞাত স্থান থেকে কিংবা বলা যায় এক মহাদেশ থেকে অন্য মহাদেশ পর্যন্ত বিস্তৃত এই যে আমাদের পৃথিবী, এরই একটি গৃহকোণে হঠাৎ বেজে উঠেছে টেলিফোন; কী বার্তা, তা যখন জিজ্ঞেস করি তখন উত্তর আসে¬ আপনি লিখে যান, শুধু লিখে যান। এ কথায় আমার অন্তরাত্মায় আনন্দের ফোয়ারা উদ্ভাসিত হতে থাকে। ভাবি আমার লেখা পৌঁছে গেছে। আমি যেখানে যেতে পারিনি কোনো দিন, যেখানে ছিলাম না সেখানেও আমার কলমের কালি মাখা অগ্রভাগটি কাজ করা শুরু করেছে। আমার মন প্রফুল্লতায় একদম ভরে যেতে থাকে। আমি যাইনি; কিন্তু আমার আত্মার শক্তি বিশ্বব্যাপী আত্মীয়তা বৃদ্ধি করে চলেছে। এর চেয়ে বড় সার্থকতা কবির জন্য আর কী হতে পারে?

লেখকের বা একজন কবির সার্থকতা হলো সৃজন রীতির মধ্যে বসবাস করতে করতে তিনি একদিন অলৌকিকতার ছোঁয়া পান এবং নিজেকে চিনতে পেরে এমন অবস্থায় পৌঁছে যান যখন তার প্রতিটি বাক্যই তার জীবনের মহাকাব্য তৈরি করতে থাকে।

লেখার কাজটা সবার কাজ নয়, তা যদি হতো তাহলে তো কেরানিরাই জগতের শ্রেষ্ঠ লেখক হতেন। কবিকে অবশ্যই আলাদা মানুষ হিসেবে, স্বপ্নের সৃজনকর্তা হিসেবে বিবেচনা করতে হবে। যে দেশে কবি জন্মায় না সেখানে প্রকৃতিও আক্ষেপের ধ্বনি তুলতে থাকে। সৌভাগ্য সেই দেশের যেখানে, যে মাটিতে একজন কবির জন্ম হয়েছে।

সাঈদ চৌধুরী: প্রবাসেও আপনার বইয়ের কাটতি ভাল। এতে লেখকের না প্রকাশকের সার্থকতা বেশি?
আল মাহমুদ: বই লিখেছি প্রচুর, এই বই কোনো আন্তর্জাতিক সীমা মানে না। তা ছাড়া বইয়ের কোনো দেশ-বিদেশ নেই। সে চলে যায় আপন মনে উড়াল দিয়ে বিশ্বের নানা জায়গায় ছড়িয়ে থাকা নিবৃত পাঠকের কাছে। বইয়ের এই শক্তি চিরকালীন।

যখন লিখেছি তখন তা কেউ না কেউ পড়বেই। প্রতিক্রিয়া হয়তো জানব না, কিন্তু আমার প্রতিষ্ঠা জগৎব্যাপী ঘুরে বেড়াবে। এটুকুই তো লেখকের সার্থকতা, আর যদি তিনি কবি হন তাহলে তার স্বপ্নের ভেতর থেকে স্বপ্ন জন্ম নেবে। এভাবেই তৈরি হয় প্রকৃত আত্মীয়তা, যা রক্তের সম্পর্ককেও তুচ্ছজ্ঞান করে অনাত্মীয়কে একান্ত আপন করে তোলে। এ জন্যই তো বেঁচে থাকা। কলমের কালি শুকায় না। কারণ জীবনের উৎসমুখ সিক্ত হয়ে আছে আমারই আত্মার রসে লাল হয়ে।

সাঈদ চৌধুরী: চলে যাওয়া কোন মানুষটি আপনার স্মৃতিতে সমুজ্জ্বল?
আল মাহমুদ: আমার মায়ের মুখটি স্মৃতিতে সমুজ্জ্বল হয়ে আছে। মনে পড়ে, এই ঢাকা থেকে বাড়ি ফিরে আমাদের আঙ্গিনার সিঁড়ি ভেঙে ওপরে উঠতে উঠতে চিৎকার করে মাকে ডাকতাম। মায়ের শব্দ শুনতে পেতাম, আমার নাম ধরে বলতেন, ‘এসেছিস¬ দাঁড়া, দরজা খুলে দিচ্ছি।’ দরজা খুলে দিলে পেতাম আমার মাকে। চিরকালের এ কথা। ভাত-তরকারি গরম করে সাজিয়ে দিতেন আমার সামনে। ক্ষুধার্ত বালক, আমার মা ভাবতেন আমি বহু দিন কিছু খাইনি। ঘরে যা ছিল সবটাই আমার জন্য সাজিয়ে পাশে বসে থাকতেন। এই তো আমার মা, চিরকালীন মাতৃ প্রতিচ্ছবি।

এই ছবি কিছুতেই আমার স্মৃতি থেকে সরে যায় না। আমার মা জানতেন, তার একটি ছেলে কবি হৃদয় নিয়ে জন্মেছে। আর সব ছেলের মতো নয় সে। বিষয় বুদ্ধিহীন এই বালকটির জন্য আমার মায়ের দুশ্চিন্তার সীমা ছিল না। তিনি জানতেন, একে সবাই ঠকাবে। আর আমি জানতাম, সবার কাছে ঠকেও কিভাবে জিতে যাবো।

সাঈদ চৌধুরী: আত্মজীবনী লেখার কোন আগ্রহ আছে কি?
আল মাহমুদ: একটি আত্মজীবনীর খসড়া তৈরি করতে মাঝে মধ্যে আমার ভেতর থেকে প্ররোচনা আসে। তবে আমি অনেক কিছু লিখেছি, যা আমার ওপর দিয়ে একদা প্রবাহিত হয়ে গেছে। তাই আমার লেখাতেই আমাকে খুঁজলে পাওয়া যাবে।

আমার কৌশোরে এই দেশটিকে আমি ভালোবেসে পর্যবেক্ষকের মতো বারবার পায়ে হেঁটে দশ দিক ঘুরে চিনেছিলাম। কতভাবে যে আমি বাংলাদেশকে প্রত্যক্ষ করার সুযোগ পেয়েছি, সে কথা বলতে গেলে অফুরন্ত এক মহাকাব্যের উপাদান আমার ভেতর থেকে বেরিয়ে আসবে।

আবার বিস্মৃতিতেও মিলিয়ে গেছে এমন বহু মুখের কথা বিদ্যুতের ঝলকের মতো আমার অকস্মাৎ মনে পড়ে যায়। কিছু দিন আগেও বেশ কিছু প্রতিভাবান মানুষ আমার সংস্পর্শে ছিলেন। এই মুহূর্তে তারা পৃথিবীর নানা প্রান্তে ছড়িয়ে আছেন। ভেবেছিলাম তারা অনেক দূরে চলে গিয়ে আমার স্মৃতি মন থেকে মুছে ফেলেছেন। কিন্তু তাদের আকস্মিক টেলিফোনে আমার ঘুম ভেঙে গেলে আমি ছুটে গিয়ে টেলিফোন ধরতেই তাদের কণ্ঠস্বর শুনতে পাই। পৃথিবীর বহু দূর দেশ থেকে তারা তাদের ব্যাকুলতাসহ ভালোবাসার আহ্বান ছড়িয়ে দিয়ে আমার কুশল জানতে চায়। আমি জবাবে যতই বলি ভালো আছি, তবুও প্রশ্ন করে কেবল একটাই¬, কেমন আছেন? তাদের তো আর বলতে পারি না আমি ভালো নেই। একটা দেশের সাথে একজন কবির রক্ত-মাংস জড়িত। দেশ যেমন থাকে একজন কবিও তেমনি থাকেন, তার অন্য কোনো ভালো-মন্দ নেই।

সাঈদ চৌধুরী: এদেশের সাধারণ মানুষের ব্যাপারে আপনার মূল্যায়ন কি?
আল মাহমুদ: সাধারণ মানুষের প্রতি আমার রয়েছে অগাধ শ্রদ্ধাবোধ। তারা হাল-বলদের চাষের জমিতে সোনার শস্য ফলিয়েছে।

    Print       Email

You might also like...

b01c8e0fdd54d48c68ebf1085003cbb9-5a119ec59360d

নিউইয়র্কে বিতাড়নের খড়গে আরও এক বাংলাদেশি

Read More →