Loading...
You are here:  Home  >  অর্থ ও বাণিজ্য  >  Current Article

কাশ্মীরি কার্পেট যেন সুন্দরের চেয়েও সুন্দর

01-393
আখতার হামিদ খান : বহির্বিশ্বে ‘প্রাচ্যদেশীয় কার্পেট’কে শিল্পের সূক্ষ্মতম ও চিন্তন আবেদনসমৃদ্ধ কাজ হিসেবে গণ্য করা হয়। আদিকালের এশিয়ার যাযাবর উপজাতিগুলোর প্রাচীন শিল্পকর্ম হিসেবেই এর বিকাশ। বলা বাহুল্য, এ শিল্পের আদিরূপ অনেক যুগের পরিবর্তনের ভেতর দিয়ে বিকশিত হয়ে বর্তমান আদলে এসেছে। যখন যুথবদ্ধ জাতিগুলো তাদের তল্পিতল্পা নিয়ে মধ্য এশিয়ার উঁচু মালভূমিগুলো চষে বেড়াতেন, বলা যায়, তখনই তারা তাদের মেষ চমড়ার তাঁবুগুলোর তাপ অপরিবাহিতা ও সৌন্দর্য বৃদ্ধির বিষয়টি ভাবতে থাকেন। সেলাইকৃত বহুরঙা কাপড়গুলো ব্যবহার করা হত তাপ অপরিবাহী দেয়াল ঝোলান, দরজার ঢাকনা এবং বিভিন্ন ধরনের ব্যাগ হিসেবে। মেঝের শক্ত মাটির কাঠিন্য থেকে আরাম দিত পশমের মোটা কম্বল আর কুশন। সংক্ষেপে যদি বলি, তাহলে এটাই ছিল আদিকালের আভ্যন্তরীণ গৃহসজ্জা।
আদিমযুগের মেঝে ঢাকার নৈপুণ্য এবং শিল্পভাবনা থেকেই প্রাচ্যদেশীয় কার্পেটের ঐতিহ্যের সূচনা হয়েছিল। গুণগত মানসম্পন্ন প্রাচ্যদেশীয় কার্পেটগুলো সেই আদিম সারল্য, নিসর্গ থেকে নেয়া রঙ ভাবনা, সহজাত শিল্পবোধ এবং নিপুণ কারিগরি ক্ষমতা ধারণ করে আছে, যা পাওয়া যায় যাযাবর যুগের ছোট ছোট কার্পেটগুলোতে।
প্রাচীনকালের তাঁতগুলোর কাঠামো ছিল আনুভূমিক। এগুলো সহজে গুটিয়ে নিয়ে চলাচল করতে পারত যাযাবর মানুষগুলো।
কাপড়গুলোর প্রশস্ততা সীমিত হলেও সেগুলোর দৈর্ঘ্য বাড়ানো যেত ইচ্ছে মত। একদিকে সঙ্গে নেয়া প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র তৈরির কাঁচামালের পরিমাণ যেমন ছিল অপ্রতুল তেমনি অন্যদিকে চারপাশ থেকে পাওয়া উপকরণও যথেষ্ঠ ছিল না। সহচর পশুগুলো যোগাত পশম এবং সবি জবা সহজলভ্য কোন পশুর উচ্ছিষ্ট থেকে নেয়া হত রং। শেঁকড়, ফুল, বাকল, ফল, রক্ত এবং শুকনো মাকড় দিয়ে তৈরি করা হত ‘উদ্ভিজ্জ’ রং। রঙের কারিগর যারা ছিলেন তারা এইসব উপকরণ পবিত্র সম্পদ হিসেবে গণ্য করত এবং এই জ্ঞান প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে হস্তান্তরিত হত। এ সব তথ্য কখনোই লিথে রাখা হত না। রং করার আগে সুতাগুলোর সঙ্গে গোবর মিশিয়ে বিশেষ ভাবে প্রক্রিয়াজাত করা হত। এতে রঙ একদিকে যেমন পাকা অন্যদিকে তেমন উজ্জ্বল হত। একটি ছোট তাঁতেও অনেক কাপড় উৎপাদিত হত। সুতার ঘনত্ব ও আঁটসাট বুননের ওপর নির্ভর করে কাপড়ের পুরুত্ব। যদি উৎপাদিত কাপড়টি খুব পুরু হয় তাহলে তা আরামের জন্যে মেঝেতে বিছানো হবে ছোট গালিচা হিসেবে। বিভিন্ন রঙের সুতা পরপর বুনে বিভিন্ন রকমের নকশা আঁকা হত। এ ধরনের মসৃণ পশমের কম্বলগুলোতে বলা হয় কিল্লিম। একটি ছোট গালিচা তৈরির পর তা ঠাণ্ডা প্রবহমান স্রোতধারায় ধোয়া হয় যাতে এর রঙ ঠিক থাকে।
কার্পেট তৈরির কাজে শেষ এবং চূড়ান্ত পদক্ষেপটি হচ্ছে যখন একজন বুননকারী ছোট মাপের সুতার সঙ্গে পেঁচানো সুতার মিশ্রণ ঘটান। যদিও একে ‘জোড়া’ বলে প্রকৃতপক্ষে এগুলো কোন জোড়া নয়। এমন জোড়া রয়েছে দুই রকমের। একটি হচ্ছে ঘিওরডেস (তুর্কি) পূর্ণ জোড়া, অপরটি আধাপূর্ণ জোড়া। ফুল, পাখি, পশু অথবা জ্যামিতিক আকৃতির নকশাগুলো তৈরি করা হয় বিভিন্ন রঙের সুতা ব্যবহার করে। এ ধরনের প্রকৃত শিল্পকর্মগুলোকে পাশ্চাত্যে ‘ফলিত শিল্প’ হিসেবে গণ্য করা হয়।
যদিও খুব সহজভাবে কথাগুলো বলা হল আসলে এটাই হচ্ছে প্রাচ্যদেশীয় কার্পেট তৈরির কাহিনী। এই সহজ বুনন রীতি শত শত বছরেও পরিবর্তিত হয় নি। কেন-না, এই বিস্ময়কর শিল্পরীতি স্বাভাবিকভাবে বিকশিত হয়েছিল এবং পৃথিবীময় ছড়িয়ে পড়েছিল। এমনকি, এটি আজ মানবজাতির অংশীদারিত্বমূলক সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে গিয়েছে। ইউরোপে যখন অন্ধকার যুগ চলছিল তখন এই কার্পেট শিল্প পশ্চিমে গিয়েছিল আলোকবর্তিকা হিসেবে। রেনেসাঁ চিত্রকলাগুলো যেখানে ঝুলিয়ে রাখা হয় প্রাচুর্য ও শক্তিমত্তা হিসেবে সেখানে মেঝে এবং টেবিল ঢেকে রাখা হয় প্রাচ্যদেশীয় কার্পেট দিয়ে।
গ্রামীণ অবস্থা থেকে বের হয়ে শহুরে জীবনে প্রতিষ্ঠিত হবার প্রতিনিয়ত প্রচেষ্টা যাযাবর জাতিগুলোর জীবনধারাকে ব্যাহত করেছে। এর ফলে কার্পেট ও কম্বল শিল্প গ্রাম থেকে শহরে এসেছে। স্থায়ী আবাস তৈরি হবার পর এসব পণ্যের উপকরণে আসে বিভিন্ন পরিবর্তন এবং মানও বৃদ্ধি পায়। কারখানা প্রতিষ্ঠিত হবার প্রথম দিককার দিনগুলোতেও বিশাল বিশাল কার্পেট তৈরি হত।
ব্যবহৃত গ্রাফ পেপারের প্রতিটি স্কয়ার একটি করে নট বোঝায়। বিভিন্ন স্টাইল এবং মোটিভ রক্ষা করার জন্যে বিভিন্ন প্যাটার্ন তৈরি করা হত। এসব দিয়ে পছন্দনীয় কার্পেটগুলোর অবিকল আদলে নতুন নতুন কার্পেট তৈরি করা হত। একজন ‘কথক’ একটি পুরনো রঙের তালিকা দেখে দেখে সুর করে বিভিন্ন রকম রঙের নাম পড়তেন আর তাঁতিরা সেই রঙগুলো ব্যবহার করে সুর তুলে তার প্রত্যুত্তর দিত।
কার্পেট শিল্প বিকাশের ক্ষেত্রে দুইটি বিষয় খুব গুরুত্বপূর্ণ ছিল। একটি হচ্ছে, শহুরে এলাকায় ধনী এবং সম্ভ্রান্ত লোকেরা এটি কিনে ব্যবহার করতে পারতেন এবং অপরটি হচ্ছে, এশিয়ার বিস্তীর্ণ অঞ্চলে ইসলামের বিস্তারের ফলে প্রার্থনার জন্যে জায়নামাজ ব্যবহারের ব্যাপক প্রচলন হয় ব্যক্তিগত পর্যায়ে ও মসজিদগুলোতে। প্রকৃতপক্ষে, এর ফলে সূক্ষ্ম ও বড় বড় কার্পেটের বিশাল বাজার তৈরি হয়েছিল।
কাশ্মীরে কার্পেট বোনার কৌশল প্রবেশ করে পনের শতকে সুলতান জয়নুল আবেদীনের আমলে। তিনি পারস্য ও মধ্য এশিয়া থেকে তাঁতিদের এনেছিলেন এই শিল্প বিষয়ে স্থানীয় লোকদের শিক্ষা দিতে। তাঁর শাসনামলে কার্পেট তৈরির জন্যে অনেক কারখানা প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল এবং এই শিল্প খুব সমৃদ্ধি লাভ করেছিল। সুতা কাঁটা ও বোনার ক্ষেত্রে দীর্ঘ ঐতিহ্যের ফলে কাশ্মীর সফলতার সাথে এই নতুন কৌশল আয়ত্ব করেছে। এ কারণে কাশ্মীর কার্পেট বোনা এবং ইরানে কার্পেট বোনা একই কথা। বহুকাল কাশ্মীরা কার্পেটকে ইরানী কার্পেট বলে বিক্রি করা হয়েছে। শত শত বছর সিল্ক রোড ধরে কাশ্মীরি কার্পেট বিভিন্ন অঞ্চলে এর খ্যাতি বিস্তার করেছে।
কাশ্মীরের শাসকদের বিভিন্ন প্রভাব রয়েছে এই শিল্পে। মুঘল শাসনামলে বতেহ শিল্পরীতিটা কার্পেট ও শাল বুননে প্রধান নকশা হিসেবে পরিগণিত হত। ১৯ শতকে পাশ্চাত্যে মোচাকৃতির নকশা ব্যাপক খ্যাতি অর্জন করেছিল। এটি পাইসলে নামে পরিচিত। নামটি এসেছে স্কটল্যান্ডের একটি শহরের নামে যা নকল কাশ্মীরি শাল বোনার কেন্দ্র হিসেবে পরিগণিত হত। মহারাজা গোলাব সিংয়ের সময় গোলাপ প্রতীকের ব্যবহার বেড়ে যায়। পাঠানদের সময় আসে ত্রিভুজাকৃতি, ছেলে-মেয়ে এবং পশুপাখিদের প্রতীক। স্থানীয় উপজাতীয়দেরও রয়েছে বিভিন্ন মনভোলা মটিফ। অভিজ্ঞদের চোখে এই রকম নকশার উপকরণের মাধ্যমে কার্পেটের উৎসমূল।
তাঁতিদের দক্ষতা এবং কাশ্মীরি উলের উৎকৃষ্টতা কার্পেটের সূক্ষ্মতার পেছনে অবদান রেখেছে। এসব উল সংগ্রহ করা হয় স্থানীয় ভেড়া ও ছাগল থেকে। সূক্ষ্মতার আরেকটি কারণ হচ্ছে, কার্পেটে রেশমের ব্যবহার। ছোট ছোট বিচিত্র ফুটকি এর ঔজ্জ্বল্য বাড়িয়ে দেয়। যেহেতু কাশ্মীর নানাবিধ প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে ও রঙে ভরপুর তাই এগুলো কার্পেটের নকশায় প্রতিফলিত হয়েছে। এই রঙগুলো হালকা ও দৃষ্টিগ্রাহী। ঠিক যেন ফুলের মত। পর্বতের বিশালতাও অনেক প্রাকৃতিক রঙের রেখা টেনে দিয়েছে। কাশ্মীরি কার্পেট এইসব সৌন্দর্য নানাভাবে নানা মাত্রায় ফুটিয়ে তুলেছে।

    Print       Email

You might also like...

1531921088_6

এরদোগানের প্রশংসায় ট্রাম্প

Read More →