Loading...
You are here:  Home  >  এক্সক্লুসিভ  >  Current Article

চট্টগ্রামের ঐতিহ্য পরীর পাহাড় থেকে আদালত ভবন

CTGডা. বরুণ কুমার আচার্য বলাই: ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি ভারতবর্ষে তাদের আধিপত্য বিস্তারে এতদ্বাঞ্চলে কলকাতার পর চট্টগ্রামকে খুবই গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করতো। ২৩ জুন ১৭৫৭ খৃস্টাব্দে পলাশী যুদ্ধে নবাব সিরাজদ্দৌলার পরাজয়ের পূর্বে তারা দুইবার চট্টগ্রাম বিজয়ের চেষ্টা করে। প্রথমবার ১৬৮৬ খৃ. মি. নিকোলাস আর দ্বিতীয়বার ১৬৮৮ খৃ. মি. চারনাক ও হিথ নামক ইংরেজ সেনাপতি চট্টগ্রাম আসার চেষ্টা করেন। কিন্তু সময়ের পরিবর্তন ও অন্য নানা কারণে তা হয়ে ওঠেনি। অতঃপর ১৭৬০ খৃ. তৎকালীন বাংলার নামমাত্র নবাব মীর কাশিম সনদ নং-৬১৬২ তাং-১৫ অক্টোবর মূলে মেদিনীপুর, বর্ধমান ও চট্টগ্রামসহ তিনটি জেলা ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানিকে দান করেন। সূত্র : (চট্ট. ইতি., পূর্ণচন্দ্র চৌধুরী, পৃ: ৭৩-৭৪)। আবদুল হক চৌধুরী রচিত ‘বন্দর শহর চট্টগ্রাম’ পাঠে জানা যায়, বার্ষিক ১ লাখ টাকা রাজস্বের বিনিময়ে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি চট্টগ্রামে দেওয়ানী শাসনভার লাভ করে, (পৃ: ৬১)। তখন চট্টগ্রামের শাসনকর্তা ছিলেন মোহাম্মদ রেজা শাহ। আর এরই সাথে চট্টগ্রামের মুসলমানদের ৯৬ বছরের (১৬৬৬-১৭৬০) শাসনের পরিসমাপ্তি ঘটে।
ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি ১৭৬০ সালের ডিসেম্বর Hr. Harry Verlest কে প্রধান করে চট্টগ্রামে তিন সদস্যবিশিষ্ট কাউন্সিল ফোর্ট উইলিয়মের গভর্নর গঠন করে। Hr. Harry Verlest এর সঙ্গে Mr. Wilkins মেম্বার ও এসিস্ট্যান্ট হয়ে চট্টগ্রাম আসেন, ৫ জানুয়ারি ১৭৬১ খৃ.। তারা মোহাং রেজা খাঁ হতে শাসনভার গ্রহণ করেন।
প্রশাসন চালুর জন্য তারা সর্বপ্রথম তৎকালীন মাদরাসা পাহাড় নামে পরিচিত পাহাড় শীর্ষে জজ ও আলাসদর আদালত স্থাপন করেন। এর সংলগ্ন পশ্চিম পাহাড়ে সদর মুন্সেফি ও অন্য একজন আলাসদর আমীনের কাচারি ছিল, আর লাল কুঠিতে ছিল ম্যাজিস্ট্রেট, কালেক্টরের কাচারি ও তেরজুরি। ক্রমে ব্যবসা বাণিজ্য বৃদ্ধি হেতু কর্তৃপক্ষ সরকারি অফিস, জজ আদালত, সদর মুন্সেফি আদালত, পর্তুগিজ ফিরিঙ্গি মারকট সাহেবের পাহাড়ের কুঠিতে, কমিশনারের অফিসে টেম্পেস্টহিলের পূর্ব পাহাড়ে আনা হয়। এরপর নব স্থাপিত সড়ক দফতরসহ ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা সকল অফিস আদালত কাচারি একত্র করে ফেয়ারি হিলে আনার সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়।
ফেয়ারি হিলের ইতিকথা : চট্টগ্রাম যখন মগ রাজাদের শাসনাধীন ছিল, তখন ফেয়ারিহিল ও টেম্পেস্টহিল নামক দুটি পাহাড় পর্তুগিজ ফিরিঙ্গিদের দখলে ছিল। তখন এই স্থান দুর্গের অভ্যন্তরে ছিল ও জন হেরী নামক জনৈক পর্তুগিজের দখলে ছিল। কাপ্তান টেকসরা সাহেব তার নিকট থেকে ঐ দুটি পাহাড় খরিদ করেন। টেকসরা সাহেব থেকে ফেয়ারিহিল পেরাডা সাহেব প্রাপ্ত হন। তার নিকট থেকে পটিয়ার ছনহরা গ্রামের খ্যাতনামা জমিদার বাবু অখিলচন্দ্র সেন ৯০০০/- টাকা (নয় হাজার) মূল্যে ক্রয় করেন এবং দখলদার হন। এর উত্তর অংশের টেম্পেস্টহিল টেকসরা সাহেব হতে হস্তান্তরিত হয়ে নোয়াখালীর বাঁশপাড়ার জমিদার রাজকমল, রাজবল্লভ সাহাদের হস্তাগত হয়। ইতিহাস থেকে জানা যায়, ফেয়ারিহিলে পর্তুগিজ আমলে ডাক্তারখানা ছিল, তখন অনেকগুলো অতি প্রাচীন ঝাউগাছ সারিবদ্ধভাবে দৃষ্ট হতো যেগুলোর এক একটি বেড় আনুমানিক ২০-২৫ হাত পর্যন্ত ছিল বলে ঐতিহাসিক শ্রী পূর্ণচন্দ্র চৌধুরী তার লেখায় উল্লেখ করেন। মুসলিম আমলে এ স্থান অব্যবহৃত থাকায় জঙ্গলে পরিপূর্ণ ছিল এবং এতে মাত্র একটি ভগ্ন কুঠির বিদ্যমান ছিল। এখানে পরীর বাসস্থান ছিল বলে সেকালের লোকজন বিশ্বাস করতো। ওই সময় থেকে ঐ পাহাড় ফেয়ারিহিল পরী বা অপ্সরা পর্বত নামে পরিচিতি লাভ করে। আরও জানা যায়, একসময় ফেয়ারিহিলের ওপর দক্ষিণাংশে একখানা পুরাতন কুঠি ছিল, যেখানে বুলক ব্রাদার্সের এজেন্ট সাহেব থাকতেন। গভীর ও ভয়ানক জঙ্গলে জ্বীন, পরী, বাঘ-ভালুকসহ হিংস্র জানোয়ারের আস্তানায় একজন ইউরোপিয়ান আত্মহত্যা করেছিলেন আর দিনের বেলায় ফিরিঙ্গি বাজারের একজন মুসলমানকে বাঘে হত্যা করে। সূত্র : (চট্ট. ইতি. পূর্ণচন্দ্র চৌধুরী, পৃ: ৯২)। গোটা চট্টগ্রাম শহর জ্বীন-পরীর আস্তানা ছিল বলে যে জনশ্রুতি আছে- তারই সূত্র ধরে সত্য মিথ্যা কল্পকাহিনীর বদৌলতে ফেয়ারিহিল পরীর পাহাড় ছিল বলে মানুষ বিশ্বাস করতো, এতে বিচিত্র হওয়ার কিছু নেই। সারা চট্টগ্রাম থেকে জ্বীন-পরী, দৈত্য-দানব, পীর-আউলিয়ার পদচারণায় তিরোহিত হয়েছে এরই ধারাবাহিকতায় এবং মানুষের প্রয়োজনেই ফেয়ারিহিলে কথিত পরীর স্থান দখল করেছে মানুষ।
আদালত ভবন নির্মাণ : ইংরেজ শাসনের ১২৮ বছর অতিক্রান্তে ১৮৮৯ সালে জেলা ও বিভাগীয় প্রশাসন ফেয়ারিহিলের ভূমি জমিদার অখিলচন্দ্র সেন থেকে অধিগ্রহণ করে। ইংরেজ প্রশাসন চালুর ১৩২ বছরের মাথায় ইংরেজ গভর্নমেন্ট ফেয়ারিহিলের শীর্ষে ১৮৯৩-৯৪ সালে কলকাতার প্রশাসনিক ভবন রাইটার্স বিল্ডিংয়ের আদলে ইংরেজ ও মুসলিম স্থাপত্যশৈলীর সমন্বয়ে ৫,৬৫,৩৭২/- টাকা ব্যয়ে ১০১০০০ বর্গফুট আয়তনের এতদ্বাঞ্চলের সর্ববৃহৎ দ্বিতল ইমারত নির্মাণ করেন। নানান কারুকার্য খচিত অপূর্ব স্থাপত্যশৈলীর নিদর্শন এই ভবন দক্ষিণ দিক থেকে দুই গম্বুজবিশিষ্ট অংশ বিশেষ অনেকটা ইংরেজি ‘W’ আকারের দ্বিতল, উত্তর দিক থেকে ‘T’ আকারের, অংশবিশেষ ত্রিতল, পূর্বদিক থেকে ‘L’ আকারের মনে হয়। বিভিন্ন দিক থেকে এই ভবনকে ভিন্ন ভিন্ন ভবন বলে মনে হয় এবং এর নির্মাণশৈলীর অপূর্ব সৌন্দর্য ফুটে ওঠে। এই বিশাল ভবনে ১৫০টির মতো কক্ষ আছে। কক্ষগুলো এক একটি এতবড় যে, যেগুলোর আয়তন ৩৫০০-৪০০০ বর্গফুট হবে। আপনি যদি চারদিক থেকে আদালত ভবন দেখেন তবে এর অনুপম সৌন্দর্যে বিমোহিত হয়ে বলে উঠবেন চট্টগ্রাম কোর্ট বিল্ডিং, একইসঙ্গে এতরূপ!
নির্মাণ কাজ সমাপনাস্তে মাদরাসা পাহাড়, লালকুঠিসহ বিভিন্ন স্থানে ছড়ানো ছিটানো সরকারি দফতরগুলো কোর্ট বিল্ডিং এ এনে সুবিন্যস্তভাবে সাজানো হয়। এর দক্ষিণাংশে সিভিল কোর্ট, দোতলা পূর্ব জেলা দায়রা জজ, মধ্যাংশে দোতলা উকিল খানা, দোতলা পশ্চিমাংশে জেলা প্রশাসক কার্যালয়, নিচতলা পশ্চিমাংশকে মহাফেজখানা, দোতলা সর্বপশ্চিমে কমিশনার অফিসসহ পুরো ভবনে মুন্সেফি ম্যাজিস্ট্রেট কোর্ট, কেরানীখানা, ল্যান্ড রিকুইজিশন, ইনকাম ট্যাক্স, ফরেস্ট, ট্রেজারি, একাউন্টস, সার্টিফিকেট, তৌজিখানাসহ অল্পকিছু সরকারি দফতর ছাড়া সব সরকারি দফতর এই ভবনে স্থানান্তরিত হয়। কোর্ট বিল্ডিং হয়ে উঠে চট্টগ্রামের প্রশাসনিক প্রাণকেন্দ্র রূপে। এই ভবন শুধু বিচার ও প্রশাসনিক বিভাগের নানা দফতরই নয়, এখানে রক্ষিত আছে সিপাহী বিদ্রোহ, বিদ্রোহী সুবেদার রজব আলী, চট্টগ্রাম যুব বিদ্রোহের নায়ক মাস্টারদা সূর্যসেনের ফাঁসি, ১৯০৫-১১ সাল পর্যন্ত স্বদেশী আন্দোলন, আইন অমান্য আন্দোলন, চট্টগ্রাম যুববিদ্রোহ, প্রাচীন আরাকান, ত্রিপুরা রাজ্য, মোগল, পাঠন-বৃটিশ ও পাকিস্তান আমলের মূল্যবান ঐতিহাসিক দলিলপত্র। কোর্ট বিল্ডিংয়ের মূল প্রবেশদ্বার বরাবর উঁচুতে শ্বেতমর্মরে উৎকীর্ণ আছে, আল্লাহ তালার শাশ্বত বাণী- ‘বল, তোমার প্রতিপালক নির্দেশ দিয়েছেন ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার।’
আদালত ভবন রক্ষা আন্দোলন : বৃটিশ আমলে অবিভক্ত বাংলায় কলকাতয় রাইটার্স বিল্ডিং, ঢাকার কার্জন হল, চট্টগ্রামের সিআরবি ও কোর্ট বিল্ডিংয়ের নির্মাণশৈলীতে অনেক মিল থাকলেও চট্টগ্রাম কোর্ট বিল্ডিংই অবিভক্ত বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় ইমারত। ১৯৪৭ সালে ভারত বিভক্তির পর সময়ের চাহিদার কোর্ট বিল্ডিংয়ে স্থান সংকুলান না হওয়ায় পাকিস্তান সরকার অনেকটা অবিবেচনাপ্রসূত পরিকল্পনাহীনভাবে ৬০ বছরের পুরাতন কোর্ট বিল্ডিংকে ত্রিতল ভবনে রূপান্তর করে। বয়স, দায়সারা গোছের রক্ষণাবেক্ষণ এবং মাথার ওপর চাপিয়ে দেয়া বোঝার কারণে শতায়ু পেরোনের অনেক আগেই এই ভবন ক্ষয়িঞ্চু ভবনের কাতারে এসে দাঁড়ায়, ছাদ ও পলেস্তরা খসে পড়তে শুরু করে এবং ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে ওঠে। অথচ কলকাতার রাইটার্স বিল্ডিংয়ের অনেক পূর্বে আর কার্জন হল ও সিআরবি সমসাময়িক কালে নির্মিত হলেও এসব ভবন পরিচর্যা ও যতেœর কারণে তাদের অস্তিত্ব ও সৌন্দর্য ধরে রাখতে সক্ষম হয়েছে। প্রথম ধাপে ১৯৮৫ ইং এই ঐতিহ্যসমৃদ্ধ আদালত ভবনকে ব্যবহারের সম্পূর্ণ অনুপযোগী ঘোষণা করে গণপূর্ত বিভাগ। একই বছরের ৪ মে গণপূর্ত প্রকল্প অধিদফতরের ৫ প্রকৌশলীই আদালত ভবনকে পুরাকীর্তি হিসেবে ছাড়পত্র প্রদান করেন। তারা কোর্ট বিল্ডিংয়ের ব্যাপারে দুটি প্রস্তাব পেশ করেন। একটি হলো ৩৬ কোটি টাকা ব্যয়ে পুরাতন আদালত ভবন ভেঙে নতুন আদালত ভবন তৈরি; আর অন্যটি হলো বর্তমান ভবনটির কাঠামো ও স্থাপত্যশৈলী অটুট রেখে এর গঠন কাঠামো আরও মজবুত করার লক্ষ্যে আমূল সংস্কার ও মেরামত। ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০০১ সালে নতুন আদালত ভবন নির্মাণ ও পুরাতন আদালত ভবন ভাঙার জন্য দরপত্র বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ ও প্রচার করে গণপূর্ত বিভাগ। ইতোমধ্যে বুয়েটের ৫ সদস্যবিশিষ্ট টেকনিক্যাল কমিটির বিশেষজ্ঞ কমিটি সরেজমিন পর্যবেক্ষণ চালিয়ে বৃটিশ আমলের পুরাকীর্তি হিসেবে ঘোষণা ও তা সংরক্ষণের দাবি জানানো হয়। এ দাবিতে স্মারকলিপি প্রদান, মানববন্ধন কর্মসূচি পালন করে চট্টগ্রামের সুশীলসমাজ, পেশাজীবী, বরেণ্য ব্যক্তিবর্গ, গুণীজনসহ সর্বস্তরের মানুষ। বাংলাদেশ সুপ্রিমকোর্টের হাইকোর্ট বিভাগে রিট মামলা করা হয়, যার নং-৫৮২৮/২০০১। মামলায় চট্টগ্রাম আদালত ভবনকে পুরাকীর্তি ঘোষণা ও তা সংরক্ষণ এর আদেশ দান ও নতুন আদালত ভবন নির্মাণসহ যাবতীয় উদ্যোগকে বাতিল ঘোষণার আবেদন জানানো হয়। ৯ সদস্যবিশিষ্ট বিশেষজ্ঞ কমিটি আদালত ভবন পুরাকীর্তি হিসেবে সংরক্ষণের মতামত দেন। রক্ষা পেয়ে যায় শতাব্দী প্রাচীন চট্টগ্রামের ইতিহাসের অনন্য স্মারক চট্টগ্রাম আদালত ভবন।

    Print       Email

You might also like...

6afed405318d4219e5ce1f58be1a4401-5a1580a4a4885

২৭ নভেম্বর লন্ডনে কারি শিল্পের ‘অস্কার’

Read More →