Loading...
You are here:  Home  >  প্রবন্ধ-নিবন্ধ  >  Current Article

চিরস্মরণীয় হুমায়ূন রশীদ চৌধুরী

হুমায়ূন রশীদ চৌধুরী

সাঈদ চৌধুরী:

সফল কুটনীতিক, জাতীয় সংসদের সাবেক স্পীকার ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী, জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৪১তম অধিবেশনের সভাপতি হুমায়ূন রশীদ চৌধুরী ছিলেন একজন আলোকিত মানুষ। বহু ভাষাবিদ, মেধাবী ও প্রজ্ঞাবান ব্যক্তিত্ব। আমাদের স্বাধীনতা সংগ্রামে ও সমৃদ্ধ জাতি গঠনে অনন্য অবদানের জন্য তিনি চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবেন।

১৯৭১ সালে মহান স্বাধীনতা সংগ্রামে বিশ্ব জনমত সৃষ্টির জন্য বিভিন্ন দেশের সাথে কাজ করেছেন হুমায়ূন রশীদ চৌধুরী। পরাধীনতার শৃঙ্খল থেকে দেশকে মুক্ত করতে আন্তর্জাতিক মহলের সমর্থন ছিল অপরিহার্য। সর্বত্রই তিনি বিচক্ষণতার সাথে সাফল্য অর্জন করেছেন। বহু ভাষায় দক্ষতা ও রাষ্ট্রদর্শনে পাণ্ডিত্যের কারনে কূটনৈতিক পাড়ায় তাঁর সামনে প্রশ্ন তোলার মানুষ নেহাত কমই ছিল।

রক্তের বিনিময়ে অর্জিত স্বাধীন দেশের স্থায়ী সমৃদ্ধির জন্য দাতা দেশ সমূহের দৃষ্টি আকষর্ণ করাও ছিল তাঁর একটি বড় কাজ। এক্ষেত্রেও তিনি উদাহরণ সৃষ্টি করেছেন। হুমায়ূন রশীদ চৌধুরী ছিলেন যোগ্য প্রশাসক ও মহৎ রাজনীতিক। ব্যক্তিগত জীবনে তাঁর মহানুভবতা ও আতিথেয়তায় সবাই ছিল্ মুগ্ধ ও বিমোহিত।

হুমায়ূন রশীদ চৌধুরী একজন নিখাদ সিলেটপ্রেমি। সিলেটের উন্নয়নে ছিলেন উদার ও আন্তরিক। তাঁর সাথে কেউ ব্যক্তিগত স্বার্থ বা লাভালাভ নিয়ে ভাবার অবকাশ ছিল না। তাঁর উন্নয়ন ছিলো জনমানুষের স্বার্থে। মানুষের দুর্ভোগ যাতে লাঘব হয় সেই প্রচেষ্টাই তিনি চালিয়েছেন নিরন্তর।

ছোটবেলা থেকে তাঁকে খুব কাছে থেকে দেখেছি। আমার বাবা পাকিস্তান আমলে কয়েকবার উত্তর সিলেটের সার্কেল আট-এ স্যারপঞ্চ ছিলেন। তিনি সাবেক চট্রগাম বিভাগীয় স্যারপঞ্চ এসোসিয়েশনের সভাপতি ছিলেন। চট্রগাম, কুমিল্লা ও সিলেট নিয়ে ছিল এই বিভাগ। তখন হুমায়ুন রশীদ চৌধুরীর সাথে বাবার গভীর সম্পর্ক ছিল।

সিলেট-১ আসনে সংসদ সদস্য হিসেবে হুমায়ুন রশীদ চৌধুরী যখন নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দিতা করেন তখন আব্বা তাকে বেশ সহায়তা করেছেন। আমার মামা জালালাবাদ, তেলিখাল ও ইছাকলস ইউনিয়নে বার বার নির্বাচিত চেয়ারম্যান আসম আব্দুল্লা (শায়েস্তা মিয়া)ও জনাব চৌধুরীর পাশে দাড়িয়ে ছিলেন। সে হিসেবে একধরনের সামাজিক বন্ধন ছিল। পরবর্তী কালে দরগাপাশায় আমার বিয়ের সুবাদে নতুন আত্বীয়তা হয়। এভাবে পারিবারিক, সামাজিক ও রাজনৈতিক ভাবে হুমায়ূন রশীদ চৌধুরীকে দেখেছি। অবলোকন করেছি তাঁর সমাজসেবা ও রাষ্ট্রদর্শন। আজীবন সিলেটের উন্নয়নের কথা ভেবেছেন এবং কাজও করে গেছেন তিনি।

আসকপের সেক্রেটারি জেনারেল হিসেবে উত্তর সিলেটের শিক্ষা ও যোগাযোগের উন্নয়নে বহুবার সাক্ষাৎ করেছি তাঁর সাথে। এরই অংশ হিসেবে সিঙ্গেল খাল নদীতে বাদাঘাটের ব্রীজ তৈরির জন্য তাঁকে নিয়ে গনসমাবেশ করেছি। এরপর এলাকাবাসীর উদ্যোগে শিবের বাজারে তাঁকে সংবর্ধনা প্রদান করেছি। তৎকালীন খাদ্য প্রতিমন্ত্রী মেজর (অব.) ইকবাল হোসেন চৌধুরীও সেদিন অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন।

Humayun Rashid Choudhury3

আমাদের অনুরোধে উত্তর সিলেটকে নিয়ে একটি ট্যুরিজম জোন তৈরী করার প্রয়াস চালিয়ে ছিলেন হুমায়ূন রশীদ চৌধুরী। ভারত থেকে নেমে আসা সিঙ্গেল খাল নদী কেন্দ্রিক একটি অসাধারণ পরিকল্পনা ছিল তাঁর। সালুটিকর থেকে বাদাঘাট পর্যন্ত স্পিড বোট দিয়ে নানন্দনিক প্ররিভ্রমনের ব্যবস্থা সহ অনেক আয়োজন ছিল। নদীর এপারে বিশ্ববিদ্যালয় আর অপর পারে ইকোনমিক জোন তৈরির জন্য তাঁকে নিয়ে আমরা একটি রোড ম্যাপ তৈরী করেছিলাম।

Humayun Rashid Choudhury2

বাদাঘাট থেকে শিবের বাজার হয়ে ছাতক এবং বাদাঘাট থেকে শিবের বাজার হয়ে কোম্পানীগঞ্জ সড়ক তাঁর সেই পরিকল্পনার অংশ। কোম্পানীগঞ্জে এখন যে আইসিটি পার্ক হচ্ছে একটু ভিন্ন আদলে এই জায়গাতেই তিনি চেয়েছিলেন আধুনিক পর্যটন নগরী গড়ে তুলতে। আরো কিছু দিন সময় পেলে এবং তাঁর রোড ম্যাপ বাস্তবায়িত হলে জাতীয় ক্ষেত্রে উত্তর সিলেট একটি উন্নয়নের মডেল হতে পারতো।

আজকের শাহ জালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় তাঁরই গৌরবময় অবদান। ২৫ আগষ্ট ১৯৮৬ সালে এটি প্রতিষ্ঠিত হয়। বাংলাদেশের শ্রেষ্ঠ পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় অন্যতম। এটি শাবিপ্রবি এবং সাস্ট নামে পরিচিত এশিয়া মহাদেশের অন্যতম বড় একটি বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়।

এই বিশ্ববিদ্যালযয়ের জন্য তিনি কতটা আন্তরিক ছিলেন তা অনুধাবন করা যায় কমনওয়েলথ জার্নালিষ্ট এসোসিয়েশনের সভাপতি হাসান শাহারিয়ারের বক্তব্যে। হুমায়ূন রশীদ চৌধুরী একবার ইসলামী পররাষ্ট্রমন্ত্রী সম্মেলনে প্রতিনিধি দলের সদস্য করেন হাসান শাহারিয়ারকে। সে সময় ইয়ামেনে যাওয়ার পথে জেদ্দায় কয়েকদিনের যাত্রাবিরতি ছিলো। সে সময় হুমায়ূন রশীদ চৌধুরী সিদ্ধান্ত নেন পবিত্র উমরাহ পালনের। যাবার পথে কথা প্রসঙ্গে হাসান শাহারিয়ারকে তিনি বলেন, কুয়েত থেকে একটা বিশেষ তহবিল এসেছে। আমি চেষ্টা করছি এই তহবিলটি যাতে সিলেট বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠায় ব্যয় হয়। তিনি বললেন, আল্লাহর ঘরে গিয়ে তুমি দোয়া কর যাতে এই তহবিলটি আমি সিলেট বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য বরাদ্দ করাতে পারি।

হাসান শাহারিয়ার বলেন, আমি তাঁর কথায় সায় দিলাম এবং সত্যি সত্যি দোয়াও করলাম। কিন্তু আমার মনে একটি প্রশ্ন থেকে গেলো। সবাই মহান আল্লাহর ঘরে অর্থাৎ কাবা শরিফ যায় নিজের সমস্যা নিয়ে। মহান আল্লাহর কাছে মোনাজাত করে নিজের জন্য, নিজের পরিবার-পরিজনের জন্য; ক্ষমা চায় অতীত কর্মকাণ্ডের জন্য। কিন্তু এমন লোক তো আমি দেখিনি যিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থ প্রাপ্তির জন্য আল্লাহর দরবারে হাত তুলেছেন। আল্লাহ তাঁর মোনাজাত কবুল করেছিলেন। সিলেটে বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠায় হুমায়ূন রশীদ চৌধুরীর অবদান ছিলো অপরিসীম।

হুমায়ূন রশীদ চৌধুরীর মতো যোগ্য জনপ্রতিনিধির অভাব এখন দিবালোকের মতো প্রস্ফূটিত হচ্ছে। তিনি যে কত অগ্রসর চিন্তার মানুষ ছিলেন, যত দিন যাচ্ছে ততই স্বমহিমায় ভাস্বর হয়ে উঠেছেন আমাদের মাঝে। তাঁর এই অবস্থান ও অবদান সিলেট তথা দেশবাসী চিরদিন শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করবে। তাঁর এই উন্নয়ন সাফল্যের পেছনে নীরবে ভূমিকা রেখেছেন তাঁর স্ত্রী মাহজাবিন চৌধুরী। তাঁকেও আমরা কখনই ভুলবোনা।

হুমায়ূন রশীদ চৌধুরী সিলেট-১ আসন থেকে ১৯৮৬ সালে তৃতীয় জাতীয় সংসদে, ১৯৮৮ সালে চতুর্থ জাতীয় সংসদে এবং ১৯৯৬ সালে সপ্তম জাতীয় সংসদে সদস্য নির্বাচিত হন। ১৯৮৪ সালে তৎকালীন রাষ্ট্রপতির পররাষ্ট্র বিষয়ক উপদেষ্টা নিযুক্ত হন। ১৯৮৫ সালে পররাষ্ট্রমন্ত্রীর দায়িত্ব লাভ করেন। এসময় সারা দেশের উন্নয়নের পাশাপাশি উত্তর সিলেটের অর্থনৈতিক বৈষম্য দূরীকরণে প্রানান্ত প্রচেষ্টা চালিয়েছেন। তাঁর সময়ে সিলেট সদর উপজেলার হাটখোলা ও জালালাবাদ ইউনিয়ন এবং কোম্পানীগঞ্জ এলাকার যাতায়াতে অভূতপূর্ব উন্নয়ন সাধিত হয়েছে।

উত্তর সিলেট নিয়ে হুমায়ূন রশীদ চৌধুরীর আগ্রহে উদ্বুদ্ধ হয়ে আমরা তাঁর জন্য একজন খন্ডকালিন স্টাফ নিযুক্ত করি। তখন আমার অফিসে কাজ করতো তরুন সাংবাদিক আসম হোসাইন। আমি তাকে জনাব চৌধুরীর সাথে সংযুক্ত করে দেই। পরবর্তীতে সে জাতীয় সংসদে চাকুরি নিয়েছে। সে সময় সিরাজুল ইসলাম বাদশা নামে হুমায়ূন রশীদ চৌধুরীর একজন ব্যক্তিগত কর্মকর্তা ছিলেন। এরা স্থানীয় সমস্যা সমাধানে অত্যন্ত আন্তরিকতার সাথে কাজ করেছেন।

একথায় সিলেটের সামগ্রীক উন্নয়নে হুমায়ূন রশীদ চৌধুরীর ভূমিকা ছিল অতূলনীয়। সিলেটে এমন প্রতিষ্ঠান খুব কমই আছে যেখানে তিনি যাননি বা যেখানে তাঁর তত্বাবধানে পৌছেনি সরকারী সহায়তা। এক্ষেত্রে সাবেক অর্থমন্ত্রি এম সা্ইফুর রহমানের কথা উল্লেখ করতে হয়। সিলেট-১ আসনের সংসদ সদস্য হিসেবে পৃথক পৃথক সময়ে তাঁরা দু’জনে দায়িত্ব পালন করেছেন। উভয়ে সিলেট প্রেমী ছিলেন। ফলে সিলেটের উল্লেখযোগ্য অনেক প্রকল্পের সূচনায় অথবা বাস্তবায়নে হুমায়ূন রশীদ চৌধুরী কিংবা সা্ইফুর রহমান জড়িত ছিলেন।

হুমায়ূন রশীদ চৌধুরী ১৯৯৬-২০০১ সালে জাতীয় সংসদের স্পীকারের দায়িত্ব পালন করেন। সে সময় তাঁর নেতৃত্বে সিলেটে ব্যাপক উন্নয়ন হয়। সিলেটকে পূর্ণাঙ্গ বিভাগের প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেয়া, সিলেট শিক্ষা বোর্ড, সিলেট টিচার্স ট্রেনিং কলেজ প্রতিষ্ঠা, আধুনিক রেলওয়ে স্টেশন নির্মাণ, বন্ধ হয়ে যাওয়া সিলেটের টেক্সটাইল মিল পুনরায় চালু, অবহেলিত কোম্পানীগঞ্জের সাথে সিলেটের সরাসরি সড়ক যোগাযোগ স্থাপনের লক্ষ্যে সালুটিকর, কাটাখাল ব্রীজ ও রাস্তা নির্মাণ, সদর উপজেলার টুকের বাজারে সুরমা নদীর উপর শাহজালাল ব্রীজ-৩, সিঙ্গেল খাল নদীর উপর বাদাঘাট ব্রীজ নির্মাণ সহ সিলেট নগরী ও নগরির বাইরে অসংখ্য ব্রীজ-কালভার্ট নির্মাণ, গ্রামীণ অবকাঠামো উন্নয়ন, বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ভবন নির্মাণ সহ এ অঞ্চলের বৈপ্লবিক উন্নয়ন সাধিত হয় তাঁর তত্বাবধানে।

Humayun Rashid Choudhury1

ওসমানী আন্তর্জাতিক বিমান বন্দর বাস্তবায়ন পরিষদের অর্গানাইজিং সেক্রেটারি হিসেবে সিলেটে আন্তর্জাতিক বিমান বন্দর বাস্তবায়নেও তাঁর সাথে আমরা মতবিনিময় করেছি। তিনি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সাথে আলোচনা করেছেন এবং তাঁর সময়েই বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে।

Gias Kamal Chowdhury 1

সিলেট বিভাগ বাস্তবায়নের আন্দোলনকে বেগবান করার জন্য জাতীয় প্রেস ক্লাবের প্রেসিডেন্ট ও ভয়েস অব আামেরিকার বাংলাদেশ প্রতিনিধি গিয়াস কামাল চৌধুরীকে সিলেট নিয়ে এসেছিলাম। তিন দিন ধরে সিলেটে অবস্থান করে তিনি সিলেট বিভাগের প্রয়োজনীয়তা ও গণমানুষের প্রত্যাশা তুলে ধরেন। সিলেটের উন্নয়নের রূপকার হুমায়ুন রশীদ চৌধুরী ও সাইফুর রহমানের সাথে গিয়াস কামাল চৌধুরীর বেশ সখ্যতা ছিল। উভয়কেই তিনি সরাসরি সহায়তা করেছেন বিশেষ করে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক মিডিয়ায় প্রচারের মাধ্যমে জনমত গড়ে তুলেছেন।

সিলেটের সুরমা নদীর উপর একটি ঝুলন্ত সেতু নির্মাণের পরিকল্পনা ছিলো হুমায়ূন রশীদ চৌধুরীর। এছাড়া সে সময় তাঁর ঐকান্তিকতায় ঢাকা-সিলেট মহাসড়ককে চার লেনে রূপান্তরিত করার একটি প্রকল্প অনুমোদিত হয়েছিল, কিন্তু পরবর্তীতে সেই প্রকল্পকে চার লেনের পরিবর্তে দুই লেন করা হয়।

হুমায়ুন রশীদ চৌধুরীর জন্ম ১৯২৮ সালের ১১ নভেম্বর সিলেট শহরের দরগা গেইট রশিদ মঞ্জিলে। সুনামগঞ্জের দরগাপাশা তাঁর গ্রামের বাড়ি। পিতা আব্দুর রশিদ চৌধুরী ছিলেন অবিভক্ত ভারতের কেন্দ্রীয় বিধান সভার সদস্য এবং মাতা সিরাজুন নেছা চেীধুরী ছিলেন পাকিস্তান জাতীয় পরিষদের সদস্য।জনকল্যানমুখি রাজনীতি ছিল তাদের মর্মমূলে। নম্রতা, উদারতা, মমত্ববোধ ও মানবিক মূল্যবোধের বিকাশের চেতনা লালনকারী এই দম্পতির মতো হুমায়ূন রশীদ চৌধুরীও আলোকিত মানুষ হয়ে ওঠেন। তাঁর জীবনের পুরোটাই সাফল্যে ভরপুর। ব্যর্থতা খুব একটা ছিলোনা তাঁর জীবন অভিধানে।

হুমায়ূন রশীদ চৌধুরী সিলেট সরকারী আলিয়া মাদ্রাসায় পড়াশোনা শেষে ১৯৪৪ সালে ৮টি ক্রেডিটসহ সিনিয়র ক্যামব্রিজ পাশ করেন। উচ্চ শিক্ষা অর্জনের জন্য ভর্তি হন ভারতের আলীগড় মুসলিম বিশ্ববিদ্যালয়ে। সেখান থেকে ১৯৪৭ সালে মৃত্তিকা বিজ্ঞান, রসায়ন ও ভূগোল বিষয় নিয়ে স্নাতক ডিগ্রি লাভ করেন। এরপর তিনি ইংলিশ বার-এ আইন শাস্ত্র অধ্যয়ন শুরু করেন এবং লন্ডন ইনার টেম্পোলের সদস্য হন। তিনি লন্ডনে ইন্সটিটিউট অব ওয়াল্ড এফেয়ার্স থেকে লাভ করেন আন্তর্জাতিক বিষয়ে ডিপ্লোমা। ছাত্র রাজনীতির সাথেও সম্পৃক্ত ছিলেন তিনি। ১৯৫১ সালে বিলেতে অধ্যয়নকালে পাকিস্তান ছাত্র ফেডারেশনের সম্পাদক এবং ১৯৫২ সালে এই সংঘটনের সভাপতি নির্বাচিত হন তিনি।

১৯৫৩ সালে হুমায়ূন রশীদ চৌধুরী ফরেন সার্ভিসে যোগদান করেন। অত্যন্ত দক্ষতা এবং সততার সাথে পাকিস্থান ফরেন সার্ভিসে দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছিলেন। কিন্তু বাঙালিদের উপর পাক সরকারের দমন নিপীড়ন দেখে ব্যথাতুর হয়ে উঠে তাঁর হৃদয়। পূর্ববাংলার অর্থনৈতিক বঞ্চনায় ক্ষুব্ধ হতে থাকে তাঁর সত্তা। বাঙালিরা যখন পাক সরকার বিরোধী আন্দোলন শুরু করে তখন তাতে সমর্থন দেন তিনি। ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ রাতে নিরস্ত্র বাঙালিদের উপর ঝাপিয়ে পড়ে পাক বাহিনী। বাঙালি নিধনযজ্ঞ দেখে তাৎক্ষনিকভাবে পাকিস্তান ফরেন সার্ভিসের চাকুরি ছেড়ে মুক্তিসংগ্রামে যোগ দেন হুমায়ূন রশীদ চৌধুরী। নতুন দিল্লীর বাংলাদেশ মিশন প্রধানের দায়িত্ব গ্রহন করেন তিনি।

বাংলাদেশকে স্বীকৃতিদানের জন্য বিশ্বের বিভিন্ন দেশের সাথে তিনি শুরু করেন আলোচনা। তাঁর সফল কুটনৈতিক তৎপরতায় ভারত ও ভুটান চূড়ান্ত বিজয় লাভের পূর্বেই বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দেয়। ১৯৭১ সালের ডিসেম্বরে ভারতের সংসদে এক যৌথ অধিবেশনে ভাষণ দেয়ার বিরল কৃতিত্ব অর্জন করেন তিনি। বাংলাদেশের সহায়তা সংক্রান্ত প্রথম চুক্তির ব্যাপারেও আলোচনা করেন হুমায়ূন রশীদ চৌধুরী।

দীর্ঘ ৯ মাসের রক্তক্ষয়ী সংগ্রামের পর স্বাধীন হয় বাংলাদেশ। স্বাধীনতা অর্জনের পর তিনি আত্মনিয়োগ করেন দেশ পুনর্গঠনে। ১৯৭২ সালে তাঁকে জার্মানীতে বাংলাদেশের প্রথম রাষ্ট্রদূত হিসেবে নিযুক্ত করা হয়। এসময় তিনি বাংলাদেশের জন্য প্রথম জার্মান অর্থনৈতিক সহায়তার ব্যাপারে ফলপ্রসু আলোচনা চালান। একই সাথে তিনি সুইজারল্যান্ড, অস্ট্রিয়া হলিসী’র রাষ্ট্রদূতের দায়িত্ব পালন করেন। তিনি আন্তর্জাতিক আনবিক শক্তি সংস্থা (আইএইএ) এবং জাতিসংঘ আন্তর্জাতিক উন্নয়ণ সংস্থায় (ইউনেস্কো) বাংলাদেশের স্থায়ী প্রতিনিধি ছিলেন। এই দুটি সংস্থার স্থায়ী প্রতিনিধির দায়িত্বপালনের সময় তাকে নানা চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করতে হয়। কারন যুদ্ধ বিধ্বস্ত দেশের অগ্রগতিতে দাতাদের সাহায্য সহযোগিতা আদায়ে দূরদর্শীতার সাথে তাকে নানা পদক্ষেপ গ্রহন করতে হয়েছিল।

বঙ্গবন্ধুর সাথে হুমায়ূন রশীদ চৌধুরীর খুবই ঘনিষ্ট সম্পর্ক ছিলো। বঙ্গবন্ধুর প্রিয়পাত্রদের মধ্যে অন্যতম একজন ছিলেন তিনি। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান স্বপরিবারে নিহত হলে তাঁর দুই কন্যাকে আশ্রয় দেন। এ প্রসঙ্গে তাঁর বক্তব্য ছিলো ‘‘আমি শেখ মুজিবুর রহমানের মেয়েদের আশ্রয় দিয়েছি। এটা আমার কর্তব্য। এর জন্য আমি ভীত নই। বিপদেই তো মানুষ মানুষকে সাহায্য করে। এটাই তো মানবিকতা।’’

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে যখন স্বপরিবারে হত্যা করা হয়, তখন শেখ হাসিনা ও শেখ রেহানা ছিলেন বেলজিয়ামে। দেশে না থাকায় বেঁচে যান তারা। তবে জীবন সংশয় ছিল দেশের বাইরেও। ওই সময় ঝুঁকি নিয়ে বঙ্গবন্ধুর দুই মেয়েকে জার্মানিতে (তখনকার পশ্চিম জার্মানি) আশ্রয় দেন। ’৭৫ সালে তিনি সেখানকার রাষ্ট্রদূত ছিলেন। শুধু তাই নয়, তাদের নিরাপত্তার কথা চিন্তা করে ভারতে পাঠানোর ব্যবস্থাও করেন তিনি। ১৬ আগস্ট ইন্দিরা গান্ধীর সঙ্গে টেলিফোনে কথা বলেন হুমায়ুন রশীদ চৌধুরী। ইন্দিরা গান্ধীকে তিনি টেলিফোন করে বলেন- আপনি তো সব কিছু জানেন ম্যাডাম। ইন্দিরা গান্ধীর জবাব ছিল, হুমায়ূন, তুমি শীঘ্রই ওদের পাঠিয়ে দাও আমার কাছে। ইন্দিরা গান্ধীর নির্দেশে ভারতীয় রাষ্ট্রদূতের ব্যবস্থাপনায় হাসিনা ও রেহানা যান নয়া দিল্লীতে।

শেখ হাসিনা ও রেহানাকে আশ্রয় দেওয়ার জন্য হুমায়ূন রশীদ চৌধুরীকে বিড়ম্বনার সম্মুখীন হতে হয়। সংকটে পড়ে তাঁর জীবন। খন্দকার মোশতাক আহমেদ একটি মার্ডার লিস্ট তৈরী করেছিলো তাতে পাঁচ নম্বরে নাম ছিলো হুমায়ূন রশীদ চৌধুরীর। তাঁকে রিকল করে দেশে এনে মেরে ফেলার পরিকল্পনা ছিল। কিন্তু নানা পটপরিবর্তনের কারনে পরিস্থিতি সেদিকে ধাবিত হয়নি। তারপর, ওএসডি করে তাঁকে দেশে নিয়ে আসা হয়। ১১ মাস ওএসডি ছিলেন তিনি।

সবকিছু হঠাৎ করেই উলট-পালট হয়ে গেল। কি করবেন বুঝে উঠতে পারছিলেন না। তাঁকে যখন সৌদি আরবের রাষ্ট্রদূত নিযুক্ত করা হলো তখন তিনি সিদ্ধান্ত নেন প্রজাতন্ত্রের একজন হিসেবে নিজ দায়িত্ব পালন করে যাবেন। সেই উদ্দেশ্যে সফলও হন। বাংলাদেশের জন্যে সৌদি অর্থনৈতিক সহায়তা অর্জনে পথিকৃতের ভূমিকা পালন করে সৌদি সহায়তাকে এমন পর্যায়ে নিয়ে যান, যার ফলে বাংলাদেশের প্রধানতম দাতাদেশ হিসেবে সৌদি আবির্ভূত হয়। সৌদি আরবে বিপুল পরিমাণ বাংলাদেশী শ্রমিক পাঠানোর উদ্যোক্তাও তিনি।

১৯৮১ সালে তাকে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সচিবের দায়িত্ব দেওয়া হয়। ১৯৮২ সাল থেকে ১৯৮৪ সাল পর্যন্ত তিনি যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূতের দায়িত্ব পালন করেন। একই সাথে মেক্সিকো, কলাম্বিয়া ও ইকুয়েডরের রাষ্ট্রদূতের দায়িত্বও ছিলো তাঁর উপর। তিনি কলাম্বিয়া ও ইকুয়েডরের সাথে সম্পর্ক স্থাপনে অগ্রনী ভূমিকা পালন করেন। যুক্তরাষ্ট্রে এবং অন্যান্য পশ্চিমা দেশে বাংলাদেশের তৈরী পোশাক রপ্তানীর ক্ষেত্রেও উদ্যোগ গ্রহন করেন। এর মধ্যদিয়ে বাংলাদেশে পোশাক শিল্প প্রতিষ্ঠার পরিবেশ সৃষ্টি হয়।

জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৩৯তম অধিবেশনে তিনি বাংলাদেশ প্রতিনিধি দলের নেতৃত্ব দেন। এ সময় সাধারণ পরিষদের বেশ কটি অধিবেশনে তিনি ভাইস প্রেসিডেন্ট হিসেবে সভাপতিত্ব করেন। ওআইসির চতুর্দশ পররাষ্ট্রমন্ত্রী সম্মেলনে চেয়ারম্যান হিসেবে তিনি জাতিসংঘের ৩৯তম নিয়মিত অধিবেশনে অংশগ্রহণকারী ওআইসি পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের সমন্বয় সভায় সভাপতিত্ব করেন। হুমায়ূন রশীদ চৌধুরী জাতিসংঘের ৪১তম সাধারণ পরিষদের সভাপতির দায়িত্ব গ্রহন করেন ১৯৮৬ সালের ১৬ সেপ্টেম্বর। ইউএনজি-এ সভাপতি হিসেবে তিনি জাতিসংঘ প্রশাসন ও বাজেট সংস্কারক বিষয়ে সর্বসম্মত প্রস্তাব গ্রহণের পদক্ষেপ নেন।

স্বীয় কর্মকান্ডের জন্য তিনি বহুবার সম্মানিত হয়েছেন জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পরিমন্ডলে। ১৯৮৬ সালের আন্তর্জাতিক শান্তিবর্ষ উদযাপনে তাঁর ভূমিকার স্বীকৃতি স্বরূপ জাতিসংঘ মহাসচিব তাঁকে জাতিসংঘ শান্তি পদক দিয়ে সম্মানিত করেন। ১৯৮৭ সালে ফিলিপাইনের মিন্দানাও স্টেট ইউনিভার্সিটি তাঁকে সম্মানসূচক ডক্টরেট ডিগ্রি প্রদান করে। এছাড়া তিনি যুক্তরাষ্ট্রের ভার্জিনিয়ার উইলিয়াম এন্ড মেরি কলেজের দেয়া মহাত্মা গান্ধী শান্তি পুরস্কারে ভূষিত হন। স্বাধীনতা ও মুক্তিযুদ্ধে বিশেষ অবদানের জন্য তিনি ২০১৮ সালে (মরনোত্তর) স্বাধীনতা পুরস্কার লাভ করেন।

হুমায়ুন রশীদ চৌধুরী বাংলা, ইংরেজি, উর্দু, হিন্দু ভাষায় অনর্গল কথা বলতে পারতেন । দখল ছিলো স্পেনিস, ইটালিয়ান, ফরাসি, জার্মান, আরবিসহ নানা ভাষায়। কিন্তু ২০০১ সালের ১০ জুলাই তাঁর মুখের ভাষা স্তব্ধ হয়ে যায়। হৃদযন্ত্রের ক্রিয়া বন্ধ হয়ে ঢাকায় মৃত্যুবরণ করেন এই কৃতী ব্যক্তিত্ব।৭২ বছর বয়সে তিনি পাড়ি জমান না ফেরার দেশে।

১০ জুলাই ২০১৮ ক্ষণজন্মা এই কৃতি পুরুষ মরহুম হুমায়ূন রশীদ চৌধুরীকে নিয়ে স্মরণীয় বরণীয় অনুষ্ঠানের আয়োজন করেছে রোটারি ক্লাব অব সিলেট সিটি।

    Print       Email

You might also like...

326957_112

পলাশি : ইতিহাসের কালো অধ্যায়

Read More →