Loading...
You are here:  Home  >  প্রবন্ধ-নিবন্ধ  >  Current Article

জেলার নাম সংশোধন প্রসঙ্গে

ড. সাখাওয়াৎ আনসারী

অতি সম্প্রতি প্রশাসনিক পুনর্বিন্যাস সংক্রান্ত জাতীয় বাস্তবায়ন কমিটির এক সভায় দেশের পাঁচটি জেলার নামের ইংরেজি বানান পরিবর্তনের সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়েছে। জেলা পাঁচটি হলো- চট্টগ্রাম, কুমিল্লা, বগুড়া, যশোর ও বরিশাল। এগুলোর পূর্বতন বানান Chittagong, Comilla, Bogra, Jessore এবং Barisal-এর স্থলে নতুন বানান নির্ধারণ করা হয়েছে যথাক্রমে Chattogram, Cumilla, Bogura, Jashore ও Barishal। জেলাগুলোর ইংরেজি বানান উচ্চারণ ও বাংলা বানানের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ ছিল না বিবেচনায় সমস্যার প্রতিবিধান হিসেবে কমিটি এই সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এই কমিটির সভাপতি মাননীয় প্রধানমন্ত্রী। এমন কর্মের মাধ্যমে আমরা কমিটির ভাষিক সচেতনতা এবং দায়িত্বশীলতার প্রমাণ পাই। আমরা মাননীয় প্রধানমন্ত্রীসহ সংশ্নিষ্ট সবাইকে এ জন্য অভিনন্দন জানাচ্ছি।

পাঁচটি পরিবর্তিত বানানের মধ্যে Barishal-এর সঙ্গে আমরা একমত পোষণ করলেও সবিনয়ে বলতে চাই, বাকি চারটি বানান নিয়ে আমাদের কিছু বক্তব্য রয়েছে। Chattogram ও Bogura না হয়ে কাঙ্ক্ষিত ছিল যথাক্রমে Chattagram ও Bagura। প্রস্তাবও ছিল এমনটাই। ধারণা করছি, উচ্চারণ ‘চট্‌টোগ্রাম’ এবং ‘বোগুড়া’ বিবেচনায় উভয় ক্ষেত্রে a-এর স্থলে o ব্যবহার করা হয়েছে। মৌলিক প্রশ্ন- ‘ইংরেজি বানান উচ্চারণ-নির্ভর নাকি বাংলা বানান-নির্ভর হবে’। পত্রিকায় বিস্তারিত আলোচনার সুযোগ নেই বলে শুধু এটুকুই বলছি যে, নতুন জটিলতা এড়াতে চাইলে বানান-নির্ভর হওয়াই ভালো। ‘a’-এর উচ্চারণ ‘অ’ (যেমন : all,, উচ্চারণ্ত অক্‌খয়) এবং ‘ও’ (যেমন : অতি, উচ্চারণ্ত ওতি)। ইংরেজি ধ-এর উচ্চারণ ‘অ’ (যেমন : ধষষ, উচ্চারণ্ত অল্‌) এবং ‘ও’ (যেমন : Karim,, উচ্চারণ ্ত কোরিম্‌) দুই-ই হয়। এ জন্যই a ব্যবহারেই আমরা ‘ও’ উচ্চারণ পেয়ে যাই। এ নিয়মেই Chattagram এবং Bagura হওয়া বাঞ্ছনীয়। এই নিয়ম বহুল প্রচলিতও বটে। এ দুটিতে ড় ব্যবহার করলে বহু বানানই প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়ে। লিখতে হয় : Foridpur, Hobiganj, Potuakhali, Shoriatpur ইত্যাদি। শ্রেষ্ঠ উদাহরণটি হলো- পরিবর্তিত বানান Borishal করা হয়নি, করা হয়েছে Barishal। ইংরেজি প-এর উচ্চারণ ‘ক’ (যেমন : Cat,, উচ্চারণ- ক্যাট্‌), ‘স’ (যেমন : Cinema, উচ্চারণ- সিনেমা) এবং ‘চ’ (যেমন: Chain, উচ্চারণ- চেইন্‌)। আবার c-এর পর u দিলে উচ্চারণ হয় কখনও ‘কা’ (যেমন : Cum, উচ্চারণ- কাম্‌), কখনও ‘কিউ’ (যেমন : Cure, উচ্চারণ- কির্উ‌); cu-এর উচ্চারণ কখনোই ‘কু’ হয় না। পক্ষান্তরে ইংরেজি k-এর উচ্চারণ সর্বত্রই ‘ক’। আবার k-এর পর u দিলে উচ্চারণ হয় ‘কু’ (যেমন :Cumis, উচ্চারণ- কুমিস্‌)। সবকিছুকে বিবেচনায় নিলে Cumilla-এর বদলে Kumilla-ই যৌক্তিক। Jashore-এর বদলে Jashor-ই প্রত্যাশিত। শব্দটির shore অংশটুকুর উচ্চারণ কিন্তু ‘শোর’ নয়, বরং ‘শৌর’ (যেমন : Sea-shore- সমুদ্রসৈকত; তেমনই লক্ষণীয় More, উচ্চারণ- র্মৌ‌)। Bat-এর উচ্চারণ ‘ব্যাট্‌’ হলেও Bat-এর পর e-যুক্ত Bate-এর উচ্চারণ কিন্তু ‘ব্যাট’-ই থাকে না, ‘ব্যাটে’-এও হয় না, হয়ে যায় ‘বেইট’। এমন নানা বিবেচনায় কাঙ্ক্ষিত বানান Jashor। সমস্যা শুধু এই পাঁচ জেলার বানানেই আছে, এমন নয়। সমস্যা আছে আরও বেশ কয়েকটি জেলার বানানেও। প্রাসঙ্গিক বলে এবার যাচ্ছি সে আলোচনায়। প্রথমেই ইংরেজি বানান প্রসঙ্গ।

বাংলাদেশে এমন কয়েকটি জেলা রয়েছে, যেগুলোর দুটি করে বানানও দুর্লক্ষ্য নয় : Chapainababganj, Chapainawabganj; Jhinaidah, Jhenaidah; Laksmipur, Lakshmipur; Netrakona, Netrokona; Panchagar, Panchagarh; Pirojpur, Perojpur; Sirajganj, Serajganj ইত্যাদি। কোনো কোনো ক্ষেত্রে হয়তো দুইয়ের অধিক বানানও লভ্য। ‘নবাব’ শব্দটি বাংলায় এসেছে আরবি ‘নওয়াব’ থেকে। এ জন্য nabab লেখা যেতে পারে। শব্দটি ‘চাপাইনবাবগঞ্জ’ নয়, ‘চাঁপাইনবাবগঞ্জ’। চোখ যতই জ্বালা করুক না কেন, এ জন্যই n-যোগে Chanpainababganj লেখা উচিত। উচ্চারণটি ‘ঝিনাইদহ্‌’ বা ‘ঝেনাইদহ্‌’ নয়, বরং ‘ঝিনাইদহ’ বলে Jhinaidaha লেখাই সঙ্গত। ‘লক্ষ্মীপুর’-এর উচ্চারণ ‘লোক্‌খির্পু‌’ হলেও বাংলায় সর্বাংশে উচ্চারণ-নির্ভর বানান সম্ভব নয় বলে Lakshmipur-ই আদর্শ বিবেচিত হতে পারে। ‘নেত্র’-র জন্য পূর্বালোচিত নিয়মেই Netra বাঞ্ছনীয়। এ জন্যই কাম্য Netrakona। ‘ড়’-র জন্য rh নয়, r-ই যথেষ্ট। ‘ঢ়’-র জন্য rh ব্যবহার্য। ফলে আমরা লিখতে পারি Panchagar। কি উচ্চারণ, কি বানান- উভয় বিচারেই বর্জিত হওয়া উচিত Perojpur এবং Serajganj,, যেমনটি প্রস্তাব করেছি Jhinaidaha। Cox’s Bazar, Gazipur এবং Moulvibazar থেকে z বাদ দিয়ে j লেখা বাঞ্ছনীয়। ফারসি থেকে ‘বাজার’ এবং আরবি থেকে ‘গাজি’ এলেও বাংলায় দুটিরই উচ্চারণ তালব্য [জ্‌], ইংরেজি বা আরবি-ফারসির মতো দন্ত্যমূলীয় [ু] নয়। এ জন্যই তিনটিতে ‘বাজার’ অংশটুকু লেখা কাম্য bajar। অনুবাদ (Translation) কাম্য নয়, কাম্য প্রতিবর্ণীকরণ (Transliteration)। এ কারণেই Cox’s Bazar স্থলে লেখা যেতে পারে একশাব্দিক Coxbajar। প্রসঙ্গক্রমে উদাহরণ টানছি ভারতের ‘উত্তর প্রদেশ’ ও ‘মধ্যপ্রদেশ’-এর। এ দুটিকে যথাক্রমে North/Northern Province ও Central Province না লিখে Uttar Prades ও Madhya Prades লেখা হয়। মৌলভীবাজারের ‘ভ’ ধ্বনিটি দন্তৌষ্ঠ্য [v] ধ্বনি নয়, বরং এটি উভ-ওষ্ঠ্য [ভ্‌] ধ্বনি বলে এটির v স্থলে bh লেখা বাঞ্ছনীয়। ‘ভোলা’-র বানান bhola কিন্তু ঠিকই আছে। স্বরধ্বনির উপস্থিতির কারণে l-এর পর a বর্ণযোগ কাম্য। ফলে এর বানান দাঁড়াবে Moulabhibajar। ‘নীলফামারী’, ‘ফরিদপুর’ এবং ‘ফেনী’-র ‘ফ’ দন্তৌষ্ঠ্য [f] ধ্বনি নয়, উভ-ওষ্ঠ্য [ফ্‌] ধ্বনি বলেই লেখা উচিত Pharidpur এবং Pheni| Nilphamari কিন্তু ঠিকই আছে। এতে চোখ হয়তো খচখচ করবে, কিন্তু কাম্য কর্মটি ঠিকই সম্পাদিত হবে। ‘কিশৌরগঞ্জ’ এবং ‘নাটৌর’ নয় বলেই Kishoreganj এবং Natore লেখা অসঙ্গত। Jashore আলোচনা প্রসঙ্গেও তা বলা হয়েছে। e ফেলে দিয়ে লিখতে হবে Kishorganj এবং Nator। ভুল Pirojepur কিন্তু লেখা হচ্ছে না, শুদ্ধ Pirojpur-ই লেখা হচ্ছে। Jhalokati, Joypurhat এবং Lalmonirhat থেকে o বর্জন এবং a যোগ করে লেখা উচিত Jhalakathi, Jaypurhat এবং Lalmanirhat। ‘ঝালকাটি’ নয় বলে এখানে h যুক্ত করা উচিত। ‘নওগাঁ’তে ‘গাঁ’ হয়েও ‘ঠাকুরগাঁও’-এর ‘গাঁও’-এর মতো এটি মধড়হ। লক্ষ্য করলে দেখা যাবে, চন্দ্রবিন্দুর ব্যবহার দুই ক্ষেত্রেই ‘গা’-এর ওপর। অর্থাৎ ‘আ’ স্বরধ্বনিটিই আনুনাসিক, তাহলে চন্দ্রবিন্দু-নির্দেশক n বর্ণটি কী করে a পাড়ি দিয়ে, o পাড়ি দিয়ে সাত সমুদ্দুরের ওপারে গিয়ে Naogaon, Thakurgaon হয়? এই দুই হতে পারত Naogan এবং Thakurgano। অনভ্যস্ততাহেতু এতে চোখ খচখচ নয়, একেবারে কটকট করে উঠলেও সত্যকে স্বীকার করে নেওয়াই উত্তম পুরুষের কাজ। Bogra, Chittagong, Comilla এবং Jessore-এর চারটি উদ্ভট বানানে চোখ আটকে গেলেও আরও দুটি উদ্ভট বানানও তো রয়েছে। Mymensing এবং Sylhet-এর বদলে Maymansingha
এবং Silet-ও যে কাঙ্ক্ষিত, তা না বললেও চলে।

আমরা ইংরেজি বানানে নজর দিলাম, ভালো। কিন্তু বাংলা বানানের কী অবস্থা, সেদিকটায় কি একটু নজর দিতে পারি না? বাংলা বানান থেকেই তো আমাদের উচিত ইংরেজি বানানে যাওয়া। আগে সমাধেয় বাংলা বানান। এবার সে প্রসঙ্গ।

এমন দুটি জেলার নাম আমরা লক্ষ্য করি, যে দুটির বানান দুটি করে :চাঁপাইনবাবগঞ্জ চাঁপাইনওয়াবগঞ্জ; যশোর, যশোহর। আরবি ‘নওয়াব’ থেকে বাংলা ‘নবাব’ হওয়ায় ‘নবাব’-ই অধিকতর গ্রহণযোগ্য। স্মরণীয় যে ইংরেজিতে ‘হসপিটাল’ হলেও বাংলায় আমরা ‘হাসপাতাল’-ই বলি। ‘যশোহর’-এর তুলনায় ‘যশোর’ অনেক বেশি প্রচলিত। অধিকন্তু ‘যশোহর’ কেতাবি। এ জন্যই ‘যশোহর’ বর্জনীয়। কর্তৃপক্ষ যে ঔধংযড়ৎব বানান গ্রহণ করেছে, তা-ও ‘যশোহর’ বর্জনের ইঙ্গিতবাহী। এই বানানটি গ্রহণের পরও আমরা যে ‘যশোহর’ বর্জনের সিদ্ধান্ত পাইনি, এটিও অবাক লাগছে। বেশ কয়েকটি জেলা রয়েছে, যেগুলোতে ‘ ী’ রয়েছে। যেমন : ‘গাজীপুর’, ‘ঝালকাঠী’, ‘নরসিংদী’, ‘নীলফামারী’, ‘নোয়াখালী’, ‘পটুয়াখালী’, ‘ফেনী’, ‘মাদারীপুর’, ‘মুন্সীগঞ্জ’, ‘মৌলভীবাজার’, ‘রাজবাড়ী’, ‘রাজশাহী’। এগুলোর মধ্যে ‘গাজি’, ‘মুনশি’ ও ‘মৌলভি’ আরবি থেকে এবং ‘শাহি’ ফারসি থেকে আসায় জেলার বানানগুলো হতে পারে : ‘গাজিপুর’, ‘মুনশিগঞ্জ’, ‘মৌলভিবাজার’ এবং ‘রাজশাহি’। ‘বাড়ি’ এবং ‘বাড়ী’ উভয়ই ব্যাকরণসিদ্ধ হওয়ায় কাঙ্ক্ষিত বিবেচিত ‘রাজবাড়ি’। বাকিগুলো তদ্ভব তথা বাংলা বলে ‘ঝালকাঠি’, ‘নরসিংদি’, ‘নীলফামারি’, ‘নোয়াখালি’, ‘পটুয়াখালি’, ‘ফেনি’, ‘মাদারিপুর’ বানানে লেখাই সঙ্গত। প্রথম প্রথম চোখ হয়তো পীড়া দেবে, পরে এক সময় ঠিকই চোখ এবং মন সওয়া হয়ে যাবে।

বাংলাদেশের জেলাগুলোর বাংলা ও ইংরেজি বানানে লিখিত নামগুলোর রয়েছে দীর্ঘ অতীত, এ কথা যেমন সত্য, তেমনই সত্য এগুলো টিকে থাকবে আরও বহু বহু বছর। ভাষা আন্দোলনের বয়স সত্তর বছর পার হয়ে গেছে; স্বাধীনতার বয়সও পঞ্চাশ ছুঁই-ছুঁই। সংশোধন কামনা করে ২০০৮ সালের ৯ ফেব্রুয়ারি প্রথম আলোতে লিখেছিলাম ‘জেলাগুলোর কাঙ্ক্ষিত উচ্চারণ ও বানান’ শীর্ষক নিবন্ধ। সেও হয়ে গেছে এক দশক। আর বিলম্ব না করাই উত্তম। বিশেষজ্ঞদের নিয়ে একটি ছোট্ট কমিটির সুপারিশের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নেওয়া হলে কাজটি যথাযথ হয়। বহু ক্ষেত্রেই বিস্তারিত ব্যাখ্যা প্রত্যাশিত হলেও পত্রিকার অপরিসরের কারণে সংক্ষেপে আমরা আমাদের মত প্রকাশ করতে বাধ্য হয়েছি। ভিন্নমত থাকলে সুধীজন কলমও ধরতে পারেন। আমরা গৃহীত সিদ্ধান্তের পুনর্বিবেচনা প্রত্যাশা করছি। উদ্যোগটি নিঃসন্দেহে প্রশংসনীয় হলেও আরও যা করণীয়, তা ফেলে রেখে জেনেও ভুলে বসবাস আমাদের সুস্থ রুচির পরিচয়বাহক নয়। রবীন্দ্রনাথের শরণ নিয়ে শেষ কথাটি বলছি :’পুরোনো জুতায় পা সহজেই ঢোকে। নতুন জুতায় পায়ে প্রায়ই ফোসকা পড়ে। ব্যবহারে ব্যবহারেই কিন্তু নতুন জুতা পুরোনো হয়। তখন পা খুব সহজেই ঢোকে, ফোসকাও পড়ে না’।

অধ্যাপক, ভাষাবিজ্ঞান বিভাগ
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

    Print       Email

You might also like...

Al Mahmud 83A

৮৩তম জন্মদিনে শুভেচ্ছায় সিক্ত কবি আল মাহমুদ

Read More →