Loading...
You are here:  Home  >  ফিচার  >  Current Article

কোটি টাকা ছাড়িয়ে যাবে মানিকপুরের লিচু : ছড়িয়ে পড়েছে গ্রাম থেকে গ্রামে

600x4001527108324_2

সৈয়দ হারুন অর রশিদ ছাতক-(সুনামগঞ্জ) থেকে ॥ ছাতক শহর থেকে সুরমা নদী পেরুলে নোয়ারাই বাজার। বাজার থেকে ৫কিলোমিটার উত্তর-পশ্চিমে গেলে মানিকপুর গ্রাম। এই মানিকপুর এখন লিচুর গ্রাম নামে পরিচিত।
স্থানীয়দের মুখ থেকে লিচু আবাদের ইতিহাস জানা যায়, গৌরীপুর জমিদারের (ছাতক-দোয়ারা এস্টেটের নায়েব) হরিপদ রায় ও শান্তিপদ রায়ের কাচারি বাড়ি ছিলো মানিকপুরে। শখের বশে কাচারি বাড়িতে তারা কয়েকটি লিচুগাছ রোপণ করেন। জমিদারি প্রথা বিলুপ্ত হওয়ার পর কাচারি বাড়িটিও ধীরে ধীরে ধ্বংস হয়ে যায়। কিন্তু রয়ে যায় শখের লিচু গাছ। সেই কাচারি বাড়ির লিচু থেকে দুটি তিনটি করে চারা এনে নিজ বাড়ির আঙিনায় রোপণ করেন গ্রামের মানুষ। দেখতে দেখতে গ্রামের প্রতিটি বাড়িতে লিচুর আবাদ হয়।
গত কয়েক বছর থেকে মানিকপুরের লিচু আশপাশ গ্রাম ছাড়িয়ে পাশের দোয়ারা উপজেলায়ও ছড়িয়ে পড়ে। এখন ছাতকের লিচু সিলেট অঞ্চলের বিভিন্ন বাজারে পাওয়া যাচ্ছে। লিচু চাষ করে লাভবান হওয়ায় স্থানীয় কৃষকরা লিচু চাষের প্রতি ঝুঁকছেন। ছাতকের কমলালেবুর হারানো অতীত ঐতিহ্যকে লিচু চাষের মাধ্যমে ফিরিয়ে আনার প্রত্যয়ও ব্যক্ত করছেন স্থানীয় কৃষকরা। এবার লিচু বিক্রি কোটি টাকা ছাড়িয়ে যাবে বলেও জানান তারা।
মানিকপুরে গিয়ে দেখা যায়, গ্রামে প্রায় দুইশ’টির মতো বাড়ি রয়েছে। প্রতিটি বাড়িতে ৩০ থেকে নিম্নে ৫টি পর্যন্ত লিচু গাছ রয়েছে। গাছে লটকে আছে থোকা থোকা লিচু। আবার কোনো গাছ দেখলেই বুঝা যায়, এ গাছ থেকে লিচু পাড়া হয়েছে।
গ্রামের প্রবীণ কৃষক রুস্তুম আলী জানান, লিচুর বাণিজ্যিক চাষ সম্পর্কে তাদের জ্ঞান ছিলো না। কয়েক বছর আগে ছাতকের বিভিন্ন সমস্যা ও সম্ভাবনা নিয়ে সরকারি কর্মকর্তাদের সাথে এক মতবিনিময় সভা করেন স্থানীয় সংসদ সদস্য মুহিবুর রহমান মানিক। এ সভায় মানিকপুরের লিচুচাষীদের নিয়ে তিনি আগ্রহ প্রকাশ করেন। লিচু চাষ বাড়াতে কি কি প্রয়োজন, এ ব্যাপারে উপজেলা কৃষি অফিসে খোঁজ নিয়ে ও কৃষকদের সাথে কথা বলে তাকে জানাতে নির্দেশ দেন। এরপর কৃষকদের উপযুক্ত প্রশিক্ষণ, বাঁদুড়ের আক্রমণ থেকে লিচুকে রক্ষার জন্য প্রতিটি বাড়িতে সোলার প্যানেল স্থাপনের ব্যবস্থা করে দেন তিনি। পাশাপাশি লিচু চাষের প্রসার বৃদ্ধির জন্য তিনি উন্নত জাতের ৫ হাজার লিচুর চারা বিনামূল্যে বিতরণ করেন। এর পর থেকে মানকিপুরসহ আশপাশ এলাকায় লিচু চাষ ছড়িয়ে পড়ে।
মানিকপুর গ্রামের পাশেই চৌমুহনি বাজার। লিচু মৌসুমে প্রতিদিন সকাল ৮টা থেকে ১০টা পর্যন্ত বাজারে লিচুর পাইকারি হাট বসে। সিলেটের বিভিন্ন স্থানের ব্যবসায়ীরা গিয়ে পাইকারি দরে লিচু ক্রয় করে নিয়ে আসেন।
কৃষক কামাল মিয়া জানান, লিচু পাকার আগেই অনেক পাইকাররা গাছশুদ্ধ কিনে নেয়। জ্যৈষ্ঠ মাসের শুরু থেকেই লিচু পাকা শুরু হয়। তখন থেকে পাইকারি বাজারও জমে উঠে।
আগের দিন বিকালে গাছ থেকে লিচু পেড়ে বাজারজাত করার উপযোগী করে রাখা হয়। বিভিন্ন এলাকা থেকে পাইকাররা বাজারে এসে লিচু কিনে নিয়ে যায়। এ বছর প্রথম দিকে প্রতি হাজার লিচু ১৫শ’ টাকায় বিক্রি হয়েছে। বর্তমানে এক হাজার লিচু ১২শ’ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।
কামাল মিয়া জানান, তার ২০ থেকে ২৫টি লিচু গাছ আছে। তিনি এবার লক্ষাধিক টাকার লিচু বিক্রির আশা করছেন। কৃষকরা জানান, মানিকপুরের আশাপাশে ছাতক ও দোয়াবাজারের প্রায় ১০টি গ্রামে এখন বাণিজ্যিক ভিত্তিতে লিচু চাষ হচ্ছে। কলম পদ্ধতির মাধ্যমে লিচু গাছের চারাও বিক্রি করছেন কৃষকরা। একেকটি লিচু গাছের চারা ৪শ” থেকে ৫শ’ টাকায় বিক্রি করা যায়।
কচুদাইড় গ্রামের কৃষক আব্দুর রশিদ জানান, স্থানীয় জাতের লিচুর পাশাপাশি তারা চায়না-ত্রি ও বোম্বে-ত্রি জাতের বিদেশি লিচু চাষ করেও লাভবান হচ্ছেন। উপজেলা কৃষি অফিস তাদের এসব লিচুর চারা দিয়ে থাকে।
মানিকপুরসহ আশপাশ এলাকার লিচু বাগানের তদারকির দায়িত্বপ্রাপ্ত ছাতক উপজেলা উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা আলা উদ্দিন জানান, এলাকার মানুষ একসময় সনাতন পদ্ধতিতে লিচু চাষ করতেন। ফলে লিচুর ভালো ফলন হতো না। এখন তারা আধুনিক পদ্ধতিতে চাষ, সার ও কীটনাশক ঔষধের ব্যবহার শিখেছেন। ফলে, এখানকার লিচু অত্যন্ত পুষ্ট ও সুস্বাদু হচ্ছে। পাশাপাশি তারা অধিক লাভবান হচ্ছেন।
ছাতক উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা কে এম বদরুল জানান, ছাতকে গতবছর ৯৬ লাখ টাকার লিচু বিক্রি হয়েছে। এবছর লিচুর বাম্পার ফলন হয়েছে। তাই, এবছর কোটি টাকার উপরে লিচু বিক্রি হবে। তিনি জানান, আগামী বছর থেকে তারা লিচু চাষের পাশাপাশি মধু চাষেও কৃষকদের উৎসাহিত করবেন। কারণ, প্রতিটি লিচু গাছে একেকটি মুধুর চাক তৈরি করা যায়। আর লিচু থেকে যে মধু হয় সেটা অত্যন্ত ভালো মানের।

    Print       Email

You might also like...

122647_b7

সিলেটে পুলিশ ছাত্রদল সংঘর্ষ, গুলি, আহত ১৫, আটক ২০

Read More →