Loading...
You are here:  Home  >  কলাম  >  Current Article

ট্রাম্প ও পুতিনের কাছে হেলসিংকি বৈঠক কেন এত জরুরি

045947Pic-34

গাজীউল হাসান খান : চলতি বছরের প্রায় শেষ প্রান্তে যুক্তরাষ্ট্রে অনুষ্ঠেয় মধ্যবর্তী নির্বাচন সামনে রেখে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এখন অনেকটা হন্যে হয়ে উঠেছেন তাঁর সমর্থকদের আরো চাঙ্গা করে তোলার উদ্দেশ্যে। বহিরাগতদের, বিশেষ করে প্রতিবেশী মেক্সিকো থেকে আগত শিশুসহ তাদের মাতা-পিতা, অশ্বেতাঙ্গ অন্যান্য সম্প্রদায় এবং পূর্বে ঘোষিত কয়েকটি মুসলিমপ্রধান দেশের নাগরিকদের যুক্তরাষ্ট্রে আসা কিংবা সফর নিয়ে নতুন করে হুমকি-ধমকি ও কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন ট্রাম্প। তা ছাড়া অবৈধভাবে আসা মেক্সিকোর শিশুদের এক ধরনের বন্দিশালায় আবদ্ধ করে রাখা হয়েছে। এসব অমানবিক কার্যকলাপ ও মানুষকে হেয়প্রতিপন্ন করার মানবিক বৈষম্যমূলক আচরণের বিরুদ্ধে খেপে উঠেছে যুক্তরাষ্ট্রের গণতন্ত্রমনা মানুষ ও প্রগতিশীল নাগরিকরা। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের উল্লিখিত কার্যকলাপের বিরুদ্ধে প্রতিবাদে যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন রাজ্যে রাস্তায় নেমেছে অগণিত মানুষ। উত্তপ্ত হয়ে উঠেছেন কংগ্রেসের বিরোধীদলীয় ডেমোক্রেটিক পার্টির রাজনীতিক ও আইনপ্রণেতারা। কিন্তু তাতে কোনো পরোয়া নেই সংখ্যাগরিষ্ঠ শ্বেতাঙ্গদের সমর্থনপুষ্ট ও শ্রেষ্ঠত্ববাদে বিশ্বাসী ডোনাল্ড ট্রাম্পের। তিনি মনে করেন বৃহৎ নগর ও শহরাঞ্চলের বাইরে অর্থাৎ দেশের অভ্যন্তরে বসবাসকারী সংখ্যাগরিষ্ঠ শ্বেতাঙ্গদের সমর্থন ধরে রাখতে পারলে ক্ষমতা কিংবা রাজনৈতিক ক্ষেত্রে প্রভাব-প্রতিপত্তি বজায় রাখা তাঁর জন্য কঠিন হবে না। ট্রাম্প মনে করেন, তাঁর সে ধারণা ফলপ্রসূ হচ্ছে।

প্রেসিডেন্ট হিসেবে ডোনাল্ড ট্রাম্প মনে করেন আগের তুলনায় অর্থাৎ উত্তর কোরিয়ায় অনুষ্ঠিত কিম জং উনের সঙ্গে বৈঠকের পর তাঁর জনপ্রিয়তা কিছুটা বেড়েছে। তা ছাড়া শ্বেতাঙ্গদের শ্রেষ্ঠত্ব কিংবা ভিন্ন অর্থে শ্বেতাঙ্গ আমেরিকানদের জাতীয়তাবাদে বিশ্বাসীরা মনে করেন ট্রাম্পের শাসনামলে তাঁদের সুযোগ-সুবিধা কিছুটা হলেও বেড়েছে। এবং ট্রাম্পের অধীনে তাঁদের আশা-আকাঙ্ক্ষা মোতাবেকই দেশ চলবে। আমেরিকাব্যাপী শ্বেতাঙ্গদের আধিপত্য বজায় থাকবে। কিন্তু দেশের মধ্যবর্তী নির্বাচন সামনে রেখে ট্রাম্পের রাজনৈতিক অপকৌশল ও অপশাসনের বিরুদ্ধে নতুন কর্মসূচি নিয়ে মাঠে নেমেছে ডেমোক্র্যাট দলীয় নেতাকর্মীরা। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের বিরুদ্ধে ব্যাপক বিক্ষোভকে রাজনৈতিক শক্তিতে পরিণত করার চেষ্টা করছে তারা। যুক্তরাষ্ট্রের বাইরে অর্থাৎ যুক্তরাজ্য, জার্মানি, ফ্রান্সসহ মুক্তবাজার অর্থনীতির পক্ষের দেশগুলো ট্রাম্পের বহুপাক্ষিক বাণিজ্যের পরিবর্তে দ্বিপক্ষীয় দর-কষাকষির বাণিজ্যের উদ্যোগ এবং গ্রুপ-৭ (জি-সেভেন)-এর প্রতি বিচ্ছিন্নতাবাদী দৃষ্টিভঙ্গির কারণে বৈষম্যমূলক রাজনীতি তাঁকে দেশ-বিদেশে এরই মধ্যে অত্যন্ত বিতর্কিত করে তুলেছে। প্রথাগত রাজনীতির বাইরে থেকে আসা ডোনাল্ড ট্রাম্প শুধু গণতান্ত্রিক মূল্যবোধই নয়, বিশ্বের অর্থনৈতিক ব্যবস্থাকে (ডাব্লিউটিও) অনেকটা বিপদগ্রস্ত করে তুলেছেন।

এমন একটি অবস্থায় যুক্তরাজ্যে সফরে আসছেন যুক্তরাষ্ট্রের বহুল আলোচিত প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তাঁর লন্ডনে পৌঁছার কথা ১৩ জুলাই। লন্ডনে তাঁর ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী টেরেসা মের সঙ্গে বৈঠক এবং রানি দ্বিতীয় এলিজাবেথের সঙ্গে সাক্ষাতের কথা রয়েছে। এটি ট্রাম্পের কোনো রাষ্ট্রীয় সফর নয়। তবুও তাঁর সফর নিয়ে ব্রিটেনে বিরাট বিক্ষোভ সৃষ্টি হয়েছে। প্রতিবাদ মিছিল হয়েছে লন্ডনে। প্রতিবাদকারীরা চায় না ট্রাম্পের মতো কোনো প্রেসিডেন্ট যুক্তরাজ্যে আসুন। তারা তাঁকে সাম্প্রদায়িক, বৈষম্যবাদী ও মানবতাবিরোধী বলে উল্লেখ করেছে। ফিনল্যান্ডের রাজধানী হেলসিংকিতে ১৬ জুলাই ডোনাল্ড ট্রাম্প মিলিত হবেন রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের সঙ্গে। বহু অপেক্ষা ও বহু কাঠখড় পুড়িয়ে শেষ পর্যন্ত অনুষ্ঠিত হচ্ছে দুই নেতার মধ্যে এ সভা। বলা হয়েছে দুই দেশের মধ্যে বিরাজিত বিভিন্ন সংকট নিরসনের লক্ষ্যেই এ সভা আয়োজন করা হয়েছে। ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হওয়ার পর থেকেই রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে সাক্ষাৎ ও দ্বিপক্ষীয় সভা করার বাসনা প্রকাশ করেছিলেন। তবে এরই মধ্যে রাশিয়ার ক্রিমিয়া দখল ও ইউক্রেনের সঙ্গে যুদ্ধ এবং যুক্তরাষ্ট্রের গত প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে রাশিয়ার অভিযুক্ত সাইবার হস্তক্ষেপ ও গুপ্তচরবৃত্তির কারণে বিশ্বব্যাপী কঠোর বিরোধিতার সম্মুখীন হয়েছেন মস্কোর শাসক ভ্লাদিমির পুতিন। যুক্তরাষ্ট্র বিভিন্ন কারণে অর্থনৈতিক অবরোধ ব্যবস্থা জারি করেছে রাশিয়ার বিরুদ্ধে। এরই মধ্যে এ দেশ দুটি তাদের কূটনীতিকদেরও প্রত্যাহার করেছে বিভিন্ন পর্যায়ে। কিন্তু সমালোচকদের মতে এর সব কিছুই লোকদেখানো। প্রকৃত ঘটনা হচ্ছে ডোনাল্ড ট্রাম্পের পুতিনপ্রীতি। তিনি পুতিনের সঙ্গে শেষ পর্যন্ত ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক স্থাপন করতে চান। ট্রাম্প যেন পুতিনের কাছে এক অদৃশ্য সুতায় বাঁধা। তা ছাড়া পশ্চিমা দেশগুলোর কোনো রাজনীতিক নয় বরং রাশিয়ার পুতিন, চীনের শি চিনপিং ও তুরস্কের এরদোয়ানের মতো প্রভাব-প্রতিপত্তি ও আধিপত্যবাদী নেতাদের প্রতি দুর্বলতা রয়েছে ট্রাম্পের। গণমাধ্যমের একটি অংশের মতে ডোনাল্ড ট্রাম্প তাঁদের মতো ব্যক্তিতান্ত্রিক, আধিপত্যবাদী ও শক্তিশালী নেতা হতে চেয়েছিলেন। কিন্তু পশ্চিমা গণতান্ত্রিক ধারা পদে পদে তাঁর পথে বাধার সৃষ্টি করলে তিনি বেশ ক্ষুব্ধ হয়ে উঠেন। জবাবদিহি কিংবা মুক্ত গণমাধ্যমের পৃষ্ঠপোষক উল্লিখিতরা কেউ নন। তদুপরি ট্রাম্পের রয়েছে অত্যন্ত বিতর্কিত নিজস্ব রাজনৈতিক এজেন্ডা, যা অত্যন্ত জটিল, ভয়াবহ এবং সর্বোপরি অপরিণামদর্শী। ট্রাম্প উত্তর কোরিয়ার নেতা কিম জং উনকে মনে করেন একজন শক্তিশালী নেতা, অপরদিকে প্রাজ্ঞ, প্রবীণ ও বিচক্ষণ রাজনীতিক অ্যাঙ্গেলা মার্কেলকে মনে করেন জার্মানির জন্য বিপর্যয়কর। সিরিয়ার যুদ্ধবিধ্বস্ত মুসলিম উদ্বাস্তুদের ট্রাম্প জার্মানি এবং এমনকি পশ্চিম ইউরোপের জন্য বিপজ্জনক মনে করেন।

চীন ও রাশিয়ার সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য, পরমাণু অস্ত্র বিস্তারের ক্ষেত্রে কঠোর নীতি এবং কিছু কিছু ক্ষেত্রে নিরস্ত্রীকরণ, পশ্চিমা প্রতিরক্ষা জোট ন্যাটোর ভূমিকা সীমিতকরণ ও যুক্তরাষ্ট্র এবং রাশিয়ার মধ্যে বিরাজিত সংকট নিরসনকে ডোনাল্ড ট্রাম্প ব্যক্তিগতভাবে তাঁর নিজের এবং বৃহত্তরভাবে যুক্তরাষ্ট্রের ভবিষ্যতের জন্য গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করেন। দুই নেতার প্রস্তাবিত হেলসিংকি বৈঠক সামনে রেখে যুক্তরাষ্ট্র ও রাশিয়ার অতি উচ্চপর্যায়ের কর্মকর্তাদের এক সভা গত ৩ জুলাই মস্কোয় অনুষ্ঠিত হয়েছে। তাতে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিয়ে আলোচনা হয়েছে বলে উল্লেখ করা হলেও তার বিষয়বস্তুর সবকিছু বিস্তারিতভাবে প্রকাশ করা হচ্ছে না। নেতারা যুক্তরাষ্ট্রের গত প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে রাশিয়ার সাইবার কারসাজির অভিযোগ নিয়ে আলোচনা করলেও তাতে মস্কো প্রশাসনের কোনো সম্পৃক্ততার কথা রুশ নেতারা অস্বীকার করেছেন। ২০১৩ সালের পর যুক্তরাষ্ট্রের উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধি কিংবা আইনপ্রণেতাদের সেটিই ছিল প্রথম মস্কো সফর। তবে সিরিয়া পরিস্থিতিসহ মধ্যপ্রাচ্যে বিরাজমান বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু নিয়ে দুই নেতা হেলসিংকি বৈঠকে সরাসরি আলোচনা করবেন বলে জানা গেছে। তাতে সিরিয়ার প্রেসিডেন্ট বাশার আল আসাদ ও সিরিয়ায় শান্তি প্রতিষ্ঠার বিষয় নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ কিছু পদক্ষেপের সূচনা হতে পারে। এ সম্পূর্ণ বিষয়টির সঙ্গে ইরান ও তুরস্ক সরাসরি জড়িত রয়েছে। তাদের পাশ কাটিয়ে এ বিষয়ে আলোচনা শেষ পর্যন্ত কতটুকু ফলপ্রসূ বা কার্যকর হতে পারে, তা বলা কঠিন। ইসরায়েলের বন্ধু যুক্তরাষ্ট্র এবং বিশেষ করে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প সিরিয়া প্রশ্নে ইরানকে কতটুকু বরদাশত করবেন, তাও বলা অত্যন্ত দুঃসাধ্য। এ ব্যাপারে ইরান, তুরস্ক ও রাশিয়ার যে ন্যূনতম একটা বোঝাপড়া রয়েছে তা এরই মধ্যে গণমাধ্যমে বিভিন্ন সময়ে কিছুটা আভাস দেওয়া হয়েছে। তবে বিষয়টি খুব সহজ নয়। কারণ সিরিয়া যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের বিরাট কোনো অংশগ্রহণ বা সম্পৃক্ততা ছিল না। তা ছাড়া সৌদি আরব ও তার নেতৃত্বাধীন জঙ্গিবাদবিরোধী ইসলামী জোটের ভূমিকা ও তাদের গৃহীত বিভিন্ন পরিকল্পনার কিছুই এখনো দর-কষাকষির পর্যায়ে পৌঁছেনি।

যত অদ্ভুতই হোক, সিরিয়া নিয়ে ডোনাল্ড ট্রাম্পের বেশ কিছু পরিকল্পনা রয়েছে। কিন্তু ১১ ও ১২ জুলাই অনুষ্ঠেয় ন্যাটো শীর্ষ সম্মেলনের আগে তিনি সেসব কিছু পরিষ্কার করছেন না। ট্রাম্পের ধারণা, পশ্চিমা প্রতিরক্ষা জোট ন্যাটো এবং বিশ্ববাণিজ্য সংস্থা ডাব্লিউটিওর কাছ থেকে যুক্তরাষ্ট্র তার অব্যাহত উচ্চ ব্যয় নির্বাহের তুলনায় তেমন কোনো প্রতিদানই পাচ্ছে না। জার্মানি, বেলজিয়াম, নরওয়ে, কানাডা এবং এমনকি ব্রিটেন পর্যন্ত প্রতিরক্ষা খাতে তাদের জিডিপির ২ শতাংশও ব্যয় করছে না বলে মার্কিন প্রেসিডেন্টের অভিযোগ। জার্মানিতে যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থানরত ৩৫ হাজার সৈন্যের একটি বিরাট অংশকে সরিয়ে নেওয়া হবে বলে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা সেক্রেটারি জিম মাতিস আভাস দিয়েছেন। কিন্তু এর আগে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প পোল্যান্ড ও স্লোভেনিয়াসহ রুশ সীমান্তবর্তী পূর্ব ইউরোপের দেশগুলোর নিরাপত্তার বিষয়টি নিয়ে প্রেসিডেন্ট পুতিনের সঙ্গে একটি সমঝোতায় পৌঁছতে চান। ট্রাম্প ন্যাটোভুক্ত পশ্চিমা জোটের দেশগুলোকে নিজেদের নিরাপত্তার বিষয়গুলো ভেবে দেখা এবং নিজ উদ্যোগে ব্যবস্থা নেওয়ার কথা উল্লেখ করেছেন। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ও পুতিন উভয়েই মনে করেন পশ্চিমা প্রতিরক্ষা জোট ন্যাটো, ইউরোপীয় ইউনিয়ন কিংবা এমনকি বিশ্ববাণিজ্য সংস্থা ডাব্লিউটিও ভেঙে গেলে তাঁদের দেশের কোনো ক্ষতি হবে না। তাঁরা বরং লাভবানই হবেন বেশি। কারণ তাঁরা দ্বিপক্ষীয় দর-কষাকষির বাণিজ্য এবং দ্বিপক্ষীয় রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক সম্পর্কের পক্ষপাতী।

পঞ্চাশের দশক থেকে দুই শিবিরে বিভক্ত বিশ্ব এক ঠাণ্ডা লড়াই বা শীতলযুদ্ধে লিপ্ত হয়ে পড়েছিল। রাশিয়ায় সোভিয়েত পদ্ধতির সরকারের পতন ঘটলেও ইউরোপীয় দেশগুলোর নিরাপত্তার প্রশ্নে দুই শিবিরের মধ্যে সে অবস্থার অবসান ঘটেনি। সে অবস্থায়ই রাশিয়ার রাষ্ট্রক্ষমতায় এসেছিলেন ভ্লাদিমির পুতিন। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রে ক্ষমতাসীন সাবেক প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার সময় পর্যন্ত নিরাপত্তা বিষয়ে বিরাজমান সংকটের কোনো সমাধান হয়নি। কিন্তু ডোনাল্ড ট্রাম্প যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে প্রার্থী হওয়ার সময় থেকেই এ বিষয়ে রুশ নেতা পুতিনের সঙ্গে আলোচনার একটি ভিত্তি স্থাপিত হয়েছিল বলে জানা গেছে। তাঁদের মধ্যে এক নতুন বিশ্ব ও নতুন প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা চালু করার ব্যাপারে সমঝোতা হলেও তা অত্যন্ত গোপন রাখা হয়েছে। তা ছাড়া ডোনাল্ড ট্রাম্প রাশিয়া ও যুক্তরাষ্ট্রের পরমাণু অস্ত্র সীমিতকরণ এবং কিছু কিছু ক্ষেত্রে নিরস্ত্রীকরণের প্রস্তাব পেশ করেছেন বলেও প্রকাশ পেয়েছে। ইউক্রেনের বিরুদ্ধে রাশিয়ার যুদ্ধ এবং ক্রিমিয়া দখলকে কেন্দ্র করে যুক্তরাষ্ট্র ও রাশিয়ার মধ্যে উল্লিখিত প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা নিয়ে আলোচনা তেমন আর অগ্রসর হয়নি বলে মনে করা হয়। ডোনাল্ড ট্রাম্প ইউক্রেনের বিরুদ্ধে রাশিয়ার যুদ্ধ এবং ক্রিমিয়া দখলের ঘোরতর বিরোধী বলে কখনো প্রতীয়মান হয়নি। ট্রাম্প বরং বলেছেন যে ক্রিমিয়া হচ্ছে রাশিয়ার সাবমেরিন রাখার মূল ঘাঁটি। তা ছাড়া সে অঞ্চলের মানুষও রুশভাষী। ক্রিমিয়া ও ইউক্রেন অঞ্চলটি প্রাচীন রাশিয়ার একটি অংশ বলে ভ্লাদিমির পুতিন যে দাবি করেছেন ডোনাল্ড ট্রাম্প কখনো তার বিরুদ্ধাচরণ করেননি। তদুপরি বিভিন্ন পরিস্থিতিতে রাশিয়ার বিরুদ্ধে আরোপিত মার্কিন অর্থনৈতিক অবরোধ ভবিষ্যতে প্রত্যাহার করা হতে পারে বলেও আভাস দিয়েছেন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প। তবে দুই নেতার মধ্যে হেলসিংকিতে কী আলোচনা ও চূড়ান্ত সমঝোতা হয়, তার ওপরই নির্ভর করছে সবকিছু।

দুই নেতা শেষ পর্যন্ত কিসের বিনিময়ে কী চাইবেন, তা এখনো তাঁদের দুজনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ রয়েছে বলে জানা গেছে। যুক্তরাষ্ট্রের গণমাধ্যমের একটি বিশেষ অংশের মতে রাজনীতি, কূটনীতি কিংবা রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে দুই নেতার বিভিন্ন চিন্তাভাবনা আদান-প্রদানের বাইরেও আর যে ব্যক্তিগত বিষয়টি রয়েছে তা হচ্ছে, যুক্তরাষ্ট্রের গত প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে ডোনাল্ড ট্রাম্পকে জেতানোর জন্য পুতিনের অভিযুক্ত প্রচেষ্টা। এ ব্যাপারে রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন কিংবা ডোনাল্ড ট্রাম্প যতই ধরাছোঁয়ার বাইরে থাকার চেষ্টা করুন না কেন, নির্বাচনকালীন রাশিয়ার সাইবার কারসাজি এরই মধ্যে পরিষ্কারভাবে ধরা পড়েছে। এ ব্যাপারে নির্বাচনের অব্যবহিত আগেও তৎকালীন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের কাছে সাক্ষাতে ব্যক্তিগতভাবে অভিযোগ করেছেন। কিন্তু তাতে কিছুই থেমে থাকেনি। ভ্লাদিমির পুতিন ছিলেন ডেমোক্র্যাটদলীয় প্রেসিডেন্ট পদপ্রার্থী হিলারি ক্লিনটনের কট্টর বিরোধী। তা ছাড়া ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে পুতিনের আগে থেকেই কিছুটা সম্পর্ক গড়ে উঠেছিল, যা ক্রমে ক্রমে আরো ঘনিষ্ঠ হয়ে ওঠে বলে জানা যায়। ট্রাম্পের নির্বাচনের পেছনে রাশিয়া ও ইউক্রেনের অর্থ রয়েছে বলেও অভিযোগ উঠেছে। ডোনাল্ড ট্রাম্পের পুতিনপ্রীতি বহু কারণেই গড়ে উঠেছে বলে প্রকাশ। এ বিষয়টি আমেরিকান রক্ষণশীলরা কোনোভাবেই গ্রহণ করতে পারে না যে আমেরিকার চিরশত্রু রাশিয়ার সঙ্গে তাদের দেশটির প্রশ্নাতীত পর্যায়ের সখ্য ও নির্ভরশীলতা কিংবা আস্থা গড়ে উঠবে।

হেলসিংকিতে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের প্রস্তাবিত সভা নিয়ে তোড়জোড়ের পেছনে ওয়াশিংটন ডিসিতে ফেডারেল ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনের (এফবিআই) সাবেক পরিচালক, আইনজীবী রবার্ট মুলারের নেতৃত্বে ট্রাম্পের বিরুদ্ধে নীরবে এগিয়ে যাচ্ছে এক আইনি তদন্ত। প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে কারচুপি, রাশিয়ার সাইবার কারসাজি, অবৈধ অর্থের জোগান এবং ডোনাল্ড ট্রাম্পের নির্বাচনী কর্মকর্তাদের সেগুলোর সঙ্গে সম্পৃক্ততার বিষয় নিয়ে চলছে সে তদন্ত। এ ব্যাপারে ডোনাল্ড ট্রাম্পের এক সাবেক আইনজীবী রবার্ট মুলারের কাছে বিভিন্ন বিষয়ে সাক্ষ্য দিতে রাজি হয়েছেন। এ ঘটনায় পুরো তদন্তটি অন্যদিকে মোড় নিতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। অভিযুক্ত বিষয়ের যেকোনো কিছুতে ট্রাম্পের সম্পৃক্ততা প্রমাণিত হলে তাঁর প্রসিডেন্টের পদটি চলে যেতে পারে। এ বিষয়টি ট্রাম্প যেমন জানেন, তেমনি জানেন ভ্লাদিমির পুতিন। সে কারণেই এই দুই শক্তিশালী ব্যক্তির সামনাসামনি সাক্ষাতের এই বিশেষ আকুতি। প্রেসিডেন্ট পুতিনের পদ হারানোর ভয় নেই। কিন্তু সমূহ ভয় রয়েছে ডোনাল্ড ট্রাম্পের। তার পরও বিভিন্ন অসংগতিপূর্ণ ও বৈষম্যমূলক রাজনৈতিক পদক্ষেপ নিয়ে যাচ্ছেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। দেশ-বিদেশে গণতন্ত্রমনা ও মানবাধিকারে বিশ্বাসী মানুষ ডোনাল্ড ট্রাম্পের বিরুদ্ধে ক্রমে ক্রমে অত্যন্ত ক্ষুব্ধ হয়ে উঠেছে। ট্রাম্পের শক্তির উৎস যুক্তরাষ্ট্রের একটি বিশেষ শ্বেতাঙ্গ গোষ্ঠীর সমর্থন। কিন্তু তারা কি যুক্তরাষ্ট্রের মতো একটি গণতান্ত্রিক দেশে আইনি তদন্ত কিংবা তার ফলাফলকে আটকে রাখতে পারবে? সে কারণেই ট্রাম্পকে নিয়ে চিন্তাগ্রস্ত হয়ে পড়েছেন রুশ প্রেসিডেন্ট পুতিন। কারণ ট্রাম্পকে সঙ্গে নিয়ে তিনিও অনেক অসমাপ্ত কাজ সম্পন্ন করতে চেয়েছেন।

লেখক : বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থার (বাসস) সাবেক প্রধান সম্পাদক ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক এবং যুক্তরাষ্ট্রস্থ বাংলাদেশ দূতাবাসের সাবেক মিনিস্টার (প্রেস ও তথ্য)
gaziulhkhan@gmail.com

    Print       Email

You might also like...

Saadat-hossain

বৈষয়িক তরক্কির পদ্ধতি প্রক্রিয়া বিকৃতি ভেজালে আক্রান্ত হওয়ার সমূহ আশঙ্কা থাকে

Read More →