Loading...
You are here:  Home  >  এশিয়া  >  Current Article

ধূসর মরুর বুকে : সাঈদ চৌধুরী

SC Soudi ধূসর মরুর বুকে

(পর্ব-৩) ১৯৮৬ সালের এক ঐতিহাসিক ক্ষণে আবহা থেকে পবিত্র মদীনায় এসে পৌছি। আমার জন্য অপেক্ষমান ছিলেন ভাইজান মাওলানা রশীদ আহমদ চৌধুরী। তিনি তখন মদীনায় আমাদের পারিবারিক ব্যবসা পরিচালনা করেন। আর আমরা থাকি খামিস মতির মাহাইল আল আবহা। বড় ভাইজান ডা. শাব্বির আহমদ চৌধুরী ১৯৭২ সাল থেকে সাউদী আরবে বসবাস করেন। প্রায় এক যুগ ছিলেন মক্কা মুকাররমায়। তারপর চলে আসেন মদীনা মুনাওয়ারায়। খামিস মতির বানিজ্য সম্প্রসারিত হয়েছে, খুব বেশি দিন হয়নি। সেখানে তিনি আমাদের কন্সট্রাকশন ব্যবসা তদারকি করেন। মেঝো ভাইজান হাফেজ মাসউদ আহমদ চৌধুরী ডিপার্টমেন্টাল স্টোর ও গাওয়া দেখাশোনা করেন। সেঝো ভাইজান মাওলানা ফায়্যাজ আহমদ চৌধুরী ওয়েল্ডিং এবং আমি ইঞ্জিনিয়ারিং ওয়ার্কশপ পরিচালনা করি।

Fahd_bin_Abdul_Aziz

বাদশাহ ফাহাদ আসবেন মদীনা মুনাওয়ারায়। তিনি আসছেন খাদেমুল হারামাইন শরিফাইন উপাধি ধারণ করে অর্থাৎ কাস্টোডিয়ান অফ টু হলি মস্কস বা দুই পবিত্র মসজিদের অভিভাবক হিসেবে। হিজ ম্যাজেস্টি উপাধি বাদ দিয়ে নতুন উপাধি গ্রহণের পর এটি তাঁর প্রথম মদীনায় আগমন।

বাদশাহ ফাহাদকে কাছ থেকে দেখা এবং তাঁর প্রতিষ্ঠিত কুরআন প্রিন্টিং কমপ্লেক্স পরিদর্শন এবং মক্কা-মদীনা জিয়ারত ও সরেজমিন ফিচার তৈরী করাই আমার মুখ্য উদ্দেশ্য। বিশ্বব্যাপী পবিত্র কুরআনের বিশুদ্ধ চর্চা ও অনুশীলন ছড়িয়ে দেয়ার ব্রত নিয়ে আগের বছর (১৯৮৫ সালে) ২ লাখ ৫০ হাজার বর্গ মিটার এলাকা জুড়ে মদীনায় এ কমপ্লেক্স প্রতিষ্ঠা করেছেন বাদশাহ ফাহাদ। যেখান থেকে অনুবাদ ও অনুবাদ ছাড়া দু’ধরনের কুরআন মুদ্রণ ও বিতরণ করা হয়। অন্ধজনও যাতে কুরআন তেলাওয়াত করতে পারেন সেজন্য রয়েছে ব্রেইল পদ্ধতির সংস্করণ। এ প্রকল্পে বিশুদ্ধ তেলাওয়াতের অডিও ও ভিডিও ফর্মে কুরআনের সিডি, ডিভিডি তৈরি ও সরবরাহ করা হয়। প্রতিষ্ঠার পর থেকে এ পর্যন্ত ২৭ কোটি কুরআন ছেপে বিশ্বব্যাপী বিনামূল্যে বিতরণ করা হয়েছে।

fouad-abdulhameed-alkhateeb-bec0049b-32df-4401-b8a5-345315a9ec2-resize-750

বাংলাদেশে সাউদি আরবের সাবেক রাষ্ট্রদূত ফুয়াদ আব্দুল হামিদ আল খতীব কর্তৃক আমন্ত্রণের সুযোগ পেয়ে নিজেকে খুব প্রসন্ন মনে হল। খতীবের প্রতি কৃতজ্ঞতায় ভরে ওঠে মন। ইসলামী ব্যাংক, ইবনেসিনা হাসপাতাল সহ বাংলাদেশে তার অনেক সৃষ্টিশীল কর্মকান্ড ইতিহাস হয়ে আছে। তারপরও একজন রাষ্ট্রদূত হিসেবে তাকে যেভাবে জেনেছি, এখানে এসে মনে হল তিনি তার চেয়ে অনে বড় মাপের মানুষ।

আবহার খামিস মতির থেকে মদীনা অনেক দীর্ঘ পথ। প্রায় সারা রাত কেটেছে রাস্তায়। লম্বা জার্ণি খুব ক্লান্তিকর হলেও প্রাপ্তির পরিমাণটা বেশিই ছিল।

দূরন্ত গতিতে দু’ঘন্টা চলার পর গাড়ি থেমেছে একটি পেট্রোল স্টেশনে। আধ ঘন্টার যাত্রা বিরতি। প্রচন্ড গরম আর গাড়ির ঝাকুনিতে খানিকটা ক্লান্তি আর গলায় খুশখুশে কাশি ধরেছে। নিকটস্থ গাওয়া তথা আরবীয় কফি শপে ঢুকেছি আমরা।

kahwa-recipe

গাওয়া সাউদি আরবে বহুল প্রচলিত পানীয়। গরম পানিতে এলাচির গুঁড়া, লবঙ্গের গুঁড়া সহ নানা রকম মসলা দিয়ে এটা তৈরি করা হয়। ছোট কাপে বেশ সময় নিয়ে ছোট ছোট চুমুকে খেতে হয়। এতক্ষণে তিন কাপ খাওয়া হয়ে গেছে।

গাওয়া খেয়ে শরীর মন বেশ চাঙা মনে হল। গলায় খুশখুশে ভাবও সরে গেছে। আমার সাথে আব্দুল্লাহ আবু জাহের। মদীনা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র। তার সাথে গল্পে মশগুল হয়ে পড়ি। গাড়ির ড্রাইভার মনে করিয়ে দিলেন দশ মিনিটের মধ্যে যাত্রা শুরু হবে। জানতে চাইলাম পরবর্তী বিরতি কোথায়, কথন? ড্রাইভার সালিম বললেন বাওবাব। এখান থেকে ষাট মা্ইল হবে।

পাথুরে পাহাড়ের মধ্য দিয়ে পথঘাট। অপেক্ষাকৃত ঢালে কোথাও কোথাও বসতি রয়েছে। মাঝে মাঝে ঝোপ আর গুল্ম। ক্যাসেট প্লেয়ারে চলছে আরবী হামদ। কখন যেন তন্দ্রাচ্ছন্ন হয়ে গেছি। হঠাৎ সালিমের কন্ঠস্বর। স্যার, আমরা বাওবাব এসে গেছি।

এটা কোন জায়গার নাম নয়। অধিক সংখ্যক একই জাতের বাওবাব গাছ এখানে রয়েছে বলে ড্রাইভারদের কাছে এ নামেই পরিচিত। যাত্রিদের জন্য ভাল খাবারের বৃহদাকার রেষ্টুরেন্ট রয়েছে এখানে।

146301_173

এক আজব গাছ বাওবাব। এদের গোড়া হয় ড্রামের মত গোল আর বেশ মোটাও। সাত-আট মিটার গোড়ার বেড়। তবে উচ্চতা খুব বেশি নয়, দশ-বার মিটার। বাওবাব গাছের ফল খুব মজার। দেখতে লাউ’র মতো। বানরের খুব প্রিয় ফল।

মহানবী সা. এর সময় থেকে এই গাছগুলো ঠাঁয় দাঁড়িয়ে আছে, হাজার বছরের ইতিহাসের সাক্ষী হয়ে। জানালেন দোকান কর্মচারী পাকিস্তানি বংশদ্ভুত সোলাইমান খান। তার কথায় সায় দিয়ে অপর কর্মচারী নোয়াখালির মিজান বললেন, বাওবাব বৃক্ষকে আমাদের লোকেরা বলে বোতল গাছ। একেকটি গাছের লক্ষ লিটার পানি ধারণ ক্ষমতা রয়েছে।

অতি প্রাচীন কাল থেকে মরুভূমির মানুষের কাছে এটি খুবই প্রয়োজনীয়। অধিক তাপমাত্রায় মরুভূমি প্রায় পানি শুন্য হয়ে পড়ে। তখন কিছু বৃক্ষ আর ক্যাকটাস পানি সংরক্ষণ করে- এর মধ্যে বাওবাব অন্যতম। এর বাকল দিয়ে তৈরী হয় রশি ও কাপড়ের সুতা। গাছের ফল ও পাতার চাটনি বেশ মজাদার। পাতা থেকে বিভিন্ন ধরনের ওষুধ তৈরি করা হয়। মরু ঝড়ে মানুষ এই গাছের গোড়ায় গর্তের মত জায়গায় আশ্রয় নিয়ে থাকে। বাওবাব গাছের নিচের অংশ গোলাকার। উপরের দিকে কিছু শাখা প্রশাখা রয়েছে।

স্থানীয় মানুষের ধারনা, বাওবাব গাছ পৃথিবীর প্রথম ডাঙ্গার গাছ। এরপর আসে তাল, নারিকেল ও পাম। পাম গাছগুলো যখন সরু কাণ্ড নিয়ে তরতর করে লম্বা হয়, তখন বাওবাব পাম গাছের মতো লম্বা হওয়ার জন্য বনস্পতির কাছে আকুতি জানায়। শিমুল গাছ যখন লাল ফুলের শোভা ছড়ায় তখন বাওবাব গাছ চায় তার ডালেও যেন ওরকম ফুল ফোটে। মিষ্টিজাতীয় ফল ডুমুর দেখে বাওবাব চায় তারও ডুমুরের মতো ফল হোক। এত ইচ্ছার কথা শুনে বনস্পতি ওটাকে ছুড়ে ফেলে এবং সেই থেকে নাকি উল্টো হয়ে জন্মাচ্ছে বাওবাব! বেশ মজা করে বললো, আব্দুল্লাহ আবু জাহের।

5-19

এরই মাঝে দেখা গেলো কয়েকটা বানর দল বেধে রুটি খাচ্ছে। গাড়ি থামিয়ে কেউ কেউ তাদের খাবার দিচ্ছে। আমরাও এগিয়ে গেলাম। লাফ দিয়ে একটি বানর ড্রাইভারের হাতের বেগটি নিয়ে গেল। এতে রয়েছে তার ড্রাইভিং লাইসেন্স ও আকামা। বেচারা সালিম বেশ অসহায় বোধ করছে। আমরা বানরকে বিস্কুট দিলাম। দোকান থেকে কলা এনে দিলাম। এদিকে ভ্রুক্ষেপ না করে গাছের মগডাল থেকে বাঁদরামি করছে আমাদের সাথে। কোথা থেকে আরেকটি বিশালাকার বানর এসে কি যেন বললো, এমনি বেগটা মাটিতে ছুড়ে কলাগুলো নিয়ে গেল। আমরাও হাফ ছেড়ে বাচলাম।

আব্দুল্লাহ খুবই সৌখিন এবং বেশ খাবার প্রিয় মানুষ। বাবা আবু জাহের আবহার গোত্র প্রধান। অর্থনৈতিক ভাবে স্বাবলম্বী ও শিক্ষিত পরিবার। অন্যান্য বেদুইনদের চেয়ে কিছুটা আলাদা প্রকৃতির। আরবীয় সংস্কৃতির সবই তার মাঝে বিদ্যমান। সেই সাথে আধুনিক দুনিয়ার তথ্য প্রযুক্তির সাথেও নিজেকে আপ-টু-ডেট রাখার প্রয়াস লক্ষণীয়।

আব্দুল্লাহ বললো, সাঈদ চৌধুরী আর পারছিনা। ভীষণ ক্ষিদে পেয়েছে। কালক্ষেপণ না করে আমরা ঢুকে পড়ি বড় সামিয়ানা টানানো রেস্তোরাঁয়। আরবীয় নকশার বর্ণিল সব কার্পেট আর ম্যাট। কোনায় কোনায় জ্বলছে রঙিন কাঁচের লণ্ঠন। এই সাজসজ্জা তাদের শত বছরের ঐতিহ্য।

আরবের মানুষদের প্রিয় খাবার জয়তুন, পনির আর হালুয়া। কালো রঙের জয়তুন অনেকটা আমাদের জলপাইয়ের মত। আব্দুল্লাহ অনেক খাবারের অর্ডার দিল।

1200px-Kabsa

তাহরিদ তথা পাতলা রুটির ওপর ঝোলসহ মাংস আর এলাচি মাখানো কিজা নামের এক ধরনের সেঁকা রুটি ও গার্লিক চিকেন। সাথে আল ফাহাম। আল ফাহাম বড় থালায় বিশেষ ধরনের রান্না করা ভাতের মধ্যে ঝলসানো মুরগি।

1449688816231

মিষ্টির মধ্যে কাজু বাদাম ও সুজি মিশ্রিত বাসবুসা কেক, মাখন ও পনির দিয়ে তৈরি কাতায়েফ, পনির দিয়ে তৈরি কুনাফা, দুধের পুডিং জাতীয় মায়ামোল, বামিয়েহ ও মুহালবিয়া। বাসবুসা হালুয়া দেখতে আমাদের দেশের সমুচার মতো। ত্রিকোনাকার ওপরের আস্তরণটি তৈরি হয় ময়দা দিয়ে। ভেতরে এলাচি, পেস্তা বাদাম, জাফরান গুঁড়া, গোলাপ পানি আর চিনির মিশ্রণ।

কঞ্জুস মনে করে কিনা ভেবে তাকে বারণ করতে পারিনি। অপচয়ের বিষয়টি মনকে ভাবিত করছিল। হঠাৎ দু’জন লোক প্রবেশ করলেন এই রেস্তোরাঁয়। দেখে মনে হল স্বদেশী। তাফাদ্দাল বলে তাদের স্বাগত জানালাম। ইসরাফ থেকে বাচার একটা সুরাহা পেয়ে গেলাম। চট্টগাম নিবাসী আব্দুস সালাম তার বন্ধু আবুল কালামকে পর্যটন নগরি আবহা দেখাতে নিয়ে ছিলেন। এখন ফিরিয়ে দেবার জন্য মদীনার পথযাত্রী।

কালাম সাউদী আরবে নতুন এসেছেন। হাড় থেকে নরম মাংস ছাড়িয়ে নিয়ে এক এক লোকমা খাবার মুখে দেয়ার পর মুগ্ধতায় ফর্সা হয়ে ওঠে তার চেহারা। বাহারি খাবারের বৈচিত্রে মুগ্ধ ও পরিতৃপ্ত হয়ে সিলেটি আতিথেয়তার ভূয়সী প্রশংসা করলেন। জবাবে বললাম, আমাদের সংস্কৃতি হলেও এটা আরবীয় আভিজাত্যও বটে।

মদীনার আবহাওয়া একেবারেই আলাদা। মরুভুমীয় পরিবেশেও এখানে মাঝে মধ্যে বৃষ্টিপাত হয়। আজো বৃষ্টি হয়েছে। কনকনে ঠাণ্ডা বাতাসে প্রশান্তির ছোঁয়া লাগছে হৃদয় মনে। শান্ত স্নিগ্ধ পরিবেশ। আল্লাহ রাব্বুল আলামীন কী অপার শিল্পকলায় আমাদের মনকে স্পর্শ করে তাঁকে বুঝার সুযোগ করে দিয়েছেন। তাঁর প্রিয় হাবীবকে প্রচন্ডভাবে অনুভব করছি। হৃদয়ের গভীর থেকে উৎসারিত হলো সৃষ্টির শ্রেষ্ট মানব মহানবী মোহাম্মদের প্রতি দরুদ ও সালাম।

Madina-Sharif-inn-0220160819010654

অনেক দূর থেকে চোখের সামনে ভাসছে সবুজ গম্বুজ বিশিষ্ট মসজিদে নববী। চোখ জুড়ানো সৌন্দর্য আর হৃদয় কাড়া মনোমুগ্ধকর দৃশ্য। দুই স্তর বিশিষ্ট মসজিদে ২৭টি চলাচল সক্ষম গম্বুজ রয়েছে। গম্বুজের নিচে নামাজের জায়গা। গম্বুজ সরিয়ে এবং স্তম্ভের সাথে যুক্ত ছাতাগুলো খুলে দিয়ে ছায়ার ব্যবস্থা করা হয়।

দক্ষিণ দিকে আমরা প্রবেশ করলাম। পশ্চিম দিকে মসজিদের দ্বিতীয় প্রবেশ পথ, বাবে রহমত। তৃতীয় প্রবেশ পথটি পূর্ব দিকে, বাব উন নবী। মুহাম্মদ সা. যেদিকে প্রবেশ করতেন। দক্ষিণ পশ্চিম কর্নারে সবুজ রঙের গম্বুজ ও নবীজির রওজা মোবারক। এটি ছিল হয়রত আয়েশা রা. এর ঘর। পাশেই রয়েছে হয়রত আবু বকর রা. ও হয়রত উমর রা. এর কবর।

মসজিদের মধ্যে রিয়াদুল জান্নাহ বা জান্নাতের বাগান নামে রয়েছে বিশেষ একটি স্থান। মুহাম্মদ সা. এর রওজা থেকে মিম্বর পর্যন্ত বিস্তৃত। আমরা সেখানে নামাজ আদায় করলাম। রাসূল সা. প্রদর্শিত পথে জীবন পরিচালনার জন্য সিজদাবনত প্রার্থনায় কায়মনোবাক্যে আল্লাহর সাহায্য চেয়ে নিলাম।

66930db2eca8b531fc2f6fb0f1288c26

এখানে রয়েছে তিনটি মিহরাব। একটি মুহাম্মদ সা. এর সময় নির্মিত এবং বাকিগুলো হয়েছে পরবর্তী সময়ে। মুহাম্মদ সা. কর্তৃক ব্যবহৃত মূল মিম্বরটি খেজুর গাছের কাঠ দিয়ে নির্মিত হয়েছিল। পরে এর স্থলে অন্য মিম্বর বসানো হয়। ৬২৯ খ্রিষ্টাব্দে তিন ধাপ বিশিষ্ট সিড়ি যুক্ত হয়েছে। খলিফা আবু বকর রা. ও উমর রা. হযরত মুহাম্মদ সা. এর প্রতি সম্মান দেখিয়ে তৃতীয় ধাপে পা রাখতেন না। খলিফা উসমান রা. সিড়ির উপর একটি গম্বুজ বসান এবং বাকি ধাপগুলো আবলুস কাঠ দিয়ে মুড়ে দেন। ১৩৯৫ খ্রিষ্টাব্দে প্রথম বাইবার্স মিম্বরটি সরিয়ে নতুন মিম্বর স্থাপন করেন এবং ১৪১৭ খ্রিষ্টাব্দে শাইখ আল মাহমুদি নতুন মিম্বর স্থাপন করেন। ১৫শ শতাব্দির শেষের দিকে কাইতবে মার্বেলের মিম্বর স্থাপন করেন।

আর গম্বুজ নির্মিত হয় ১৮১৭ খ্রিষ্টাব্দে সুলতান দ্বিতীয় মাহমুদের শাসনামলে। ১৮৩৭ খ্রিষ্টাব্দে একে সবুজ রং করা হয়। মিনারগুলো দেখার মত। উমর রা. কর্তৃক নির্মিত প্রথম মিনার ২৬ ফুট উচু ছিল। ১৩০৭ খ্রিষ্টাব্দে মুহাম্মদ ইবনে কালাউন বাব আল সালাম নামক মিম্বর স্থাপন করেন। পরে চতুর্থ মুহাম্মদ এটি সৌন্দর্য মন্ডিত করেন। ১৯৯৪ খ্রিষ্টাব্দের সংস্কারের পর মোট মিনারের সংখ্যা দাঁড়ায় দশ। যেগুলো ১০৪ মিটার উচু। মিনারগুলোর উপর, নিচ ও মধ্যম অংশ যথাক্রমে সিলিন্ডার, অষ্টাভুজ ও বর্গাকার।

king-fahd-quran-complex

প্রিয় নবীর রওজা জেয়ারত শেষে আমরা চলে আসি মদিনা ইসলামি বিশ্ববিদ্যালয়ের নিকটবর্তী ফাহাদ কুরআন প্রিন্টিং কমপ্লেক্সে। পুরোটা ঘুরে দেখানো হল। সামনে বাদশাহ ও তার পারিষদ, এরপর মুসলিম দুনিয়ার উল্লেখযোগ্য গবেষক ও সাংবাদিক, তারপর দেশি বিদেশি মুসলিম শিক্ষার্থী।

মিশর, জর্দান, তুরস্ক, দুবাই, কাতার, কুয়েত, লিবিয়া, আলজেরিয়া, মালয়েশিয়া, পাকিস্থান ও ভারত সহ বিভিন্ন দেশের গবেষকদের সাথে মেলার সুবর্ণ সুযোগে নিজেকে খুবই ভাগ্যবান মনে হল। আমন্ত্রিত লেখক হিসেবে সম্ভবত আমিই ছিলাম সর্বকনিষ্ঠ।

মদিনা মুনাওয়ারার তাবুক রোডের পাশে ২ লাখ ৫০ হাজার বর্গমিটার জমির ওপর মুজাম্মা আল মালিক ফাহ্দ লিতাবাআতিল মুসহাফ আশ শারীফ বা বাদশাহ ফাহদ কুরআন প্রিন্টিং প্রেস ১৪০৫ হি. (১৯৮৫ সাল) থেকে কার্যক্রম শুরু করে।

এই প্রিন্টিং কমপ্লেক্সে পৃথিবীর সর্ববৃহৎ আল কুরআন ছাপাখানায় রূপ নিয়েছে। এখানে হাদিস চর্চার জন্যও আলাদা বিভাগ রয়েছে। হাফেজদের জন্য বিশেষ প্রশিক্ষণ কোর্সের আয়োজন করা হয়। ছাপার কাজটি পরিচালিত হয় অত্যন্ত যত্ন ও আন্তরিকতা সহকারে। বছরে ১২ মিলিয়ন কপি মুদ্রণ হয়। ২০১৮তে প্রতি ঘণ্টায় আড়াই হাজার কপি কুরআন ছাপা হয়। তাফসির প্রকাশ করা হয় ৫৬টি ভাষায়। সহস্রাধিক আলেম ও প্রকৌশলী এই কমপ্লেক্সে এখন কাজ করেন।

অনুষ্ঠান শেষে সাক্ষাৎ হয় ভাইজানের (মাওলানা রশীদ আহমদ চৌধুরী) সাথে। আমাকে কাছে পেয়ে আনন্দে বিহবল হয়ে পড়েন। জড়িয়ে ধরে আরবীয় কায়দায় মুখখানি চুম্বন করেন। তার প্রগাঢ় বাহুবন্ধন খানিকটা অসস্তিকর হলেও ভালবাসার আবেগে আমার দু’চোখ দিয়ে তখন আনন্দাশ্রু ঝরছে।

আমরা ৮ ভাই ও ২ বোন। আরো ১ ভাই ও ১ বোন ছোট বেলায় ইহলোক ত্যাগ করেন। সব মিলে ১২ জন। আব্বা ডা. এম এম সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী পাকিস্তান আমলে কয়েকবার সিলেট সার্কেল আট-এ স্যারপঞ্চ ছিলেন। তিনি সাবেক চট্রগাম বিভাগীয় স্যারপঞ্চ এসোসিয়েশনের সভাপতি ছিলেন। চট্রগাম, কুমিল্লা ও সিলেট নিয়ে ছিল এই বিভাগ। খুবই মেধাবী ও দূরদর্শী মানুষ ছিলেন। সন্তানদের আদর্শ মানুষ হিসেবে গড়ে তুলতে ছিলেন সদা সচেষ্ট। রশীদ আহমদ চৌধুরী ক্লাস টু-তে ২য় হওয়ায় আব্বা তাকে রেখে দিলেন ১ম হওয়ার জন্য। এতে আমি তার ক্লাসমেইট হয়ে যাই। ভাইদের মধ্যে তিনি ৫ম ও আমি ৬ষ্ঠ। পড়ালেখা করেছি একই স্কুলে। ফলে ক্লাস ফাইভ পর্যন্ত আমার কারণে তিনি আর ১ম হতে পারেননি। তবে ভালবাসার দিক থেকে আজন্ম তিনিই ছিলেন প্রথম।

মসজিদে নববী থেকে ১০ মিনিট দূরত্বে তার বসবাস। বাবুল কুমার মহল্লায়। পরিবার নিয়ে আসেননি তখনো। বাসায় একা থাকেন। ৭ মিনিট দূরত্বে পেইন্ট এন্ড হার্ডওয়ার শপ ও আগর-আতর সেন্টার। এরই পাশে গ্রোসারি স্টোর। সেখান থেকে বাসার জন্য কিছু খাবার নিয়ে দোকান বন্ধ করে দিলেন। বললেন, এসপ্তাহ তোমাকে নিয়েই ঘুরব।

74762285c053ca623448cf872f78f18f-khebsa

বাসায় গিয়ে তিনি রান্না শুরু করলেন। যেকাজে আমি একেবারে আনকোরা। তাকিয়ে তাকিয়ে দেখা ছাড়া কিছুই করার নেই। ভাইজান বাসমতি চাল ও বিশেষ ভাবে তৈরি মাংসের মিশ্রণে খেবসা পাক করলেন। শুরুতে আমাকে জিজ্ঞেস করলেন, চিকেন না বিফ? বললাম চিকেন। মুরগি সহযোগে তৈরি করলেন খেবসা দুজাজ। বললেন, কালকে হবে ভেড়া বা দুম্বা দিয়ে খেবসা লাহাম। সময় পেলে একদিন মাছ দিয়েও খেবসা খাওয়াবো। খেবসা মূলত ইয়েমেনি খাবার, তবে গলফ দেশগুলোতে সবাই এটা পছন্দ করে।

46295574_l

রাতের খেবসা তৈরির পর নাস্তার জন্য বানালেন তামিয়া। এটি মিক্সড স্যান্ডউইচের মতো। অর্ধেক খবুজের ভেতর ডিমের ফালি, শসা, টমেটো, সস ও মেয়োনেজ দিয়ে মজাদার জিনিস খাবালেন। সাথে দিলেন তমিজ। এটি এক ধরনের রুটি। তন্দুর রুটির চাইতে কয়েকগুন বড়। সঙ্গে এক বাটি ঘন মসুর ডাল। দুই ভাই পেট পুরে খেয়ে নিলাম সারাটা।

মসজিদে নববীতে মাগরিব ও এশার সালাত আদায় করে বহু রাত পর্যন্ত আমরা ঘুরে বেড়াই গোটা শহরময়। সাথে ছিলেন মদীনা বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নরত একজন মিয়ানমারের ও একজন মিশরীয় উচ্চ শিক্ষার্থী। আরব জাতির ইতিহাস নিয়ে তারা গবেষণা করেন। তারা ছিলেন আমার ভাইয়ের ভালো বন্ধু।

9631260b0f1b2e2b87eab05cb9805d06

পরদিন সকাল থেকে মদীনার পুরাতন ম্যাপ হাতে নিয়ে আমরা গাড়িতে ঘুরে ঘুরে দেখার চেষ্টা করেছি। এবং লিখে পাঠিয়েছি আমার ওস্তাদ হযরত মাওলানা মুহাম্মাদুল্লাহ্ হাফেজ্জী হুজুরের কাছে। তার জাগো প্রহরি পত্রিকায় আমার মনের সেই অনুভূতিগুলো ছাপা হয়েছে খুবই গুরুত্ব সহকারে।

ধূসর মরুর বুকে শীরোনামে পর্যায়ক্রমে সময় পাঠকদের জন্য তুলে ধরা হবে তখনকার ঘটনাবলির সাথে বর্তমান বাস্তবতার মিশেলে এক নতুন আরব জাহান।

    Print       Email

You might also like...

dav

থাইল্যান্ডে বাংলাদেশিদের ব্যবসা ও বিয়ে

Read More →