Loading...
You are here:  Home  >  প্রবন্ধ-নিবন্ধ  >  Current Article

ধৈর্যের গর্ভে ঐশ্বর্যের স্বর্গ নির্মিত হয়

অধ্যক্ষ ডা. মিজানুর রহমান : বিপদ-মুসিবত, দুঃখ-কষ্টে পতিত না হলে ছবর বা ধৈর্যের পরিমাণ নিরূপণ করা যায় না। আবার ধৈর্যের পরিমাণ পরিমাপ করা না গেলে পুরস্কার প্রদানের ধরন-মূল্যায়ন নির্ধারণ করা মুসকিল হয়ে পড়ে। ধৈর্যের আরেক নাম প্রশান্তি। এক্ষেত্রে তৌহিদ বা একত্ববাদী মুমিন ব্যক্তির মানসিক প্রশান্তির সবচেয়ে বড় হাতিয়ার হলো তাকদীর এর উপর পূর্ণ বিশ্বাস স্থাপন করা। ভাল-মন্দ, কল্যাণ-অকল্যাণ, সুখ-দুঃখ, বালা-মুসিবত যাই আপতিত হোক না কেন এসব ক্ষেত্রে যদি একজন মুমিন মানুষ ভাগ্যলিপির উপর নিজেকে সোপর্দ করতে পারেন তবে যত বিপদ মুসিবত আসুক না কেন সে অধৈর্য হবে না, পরাজিত হবে না।

ধৈর্যের সবচেয়ে বড় মাপকাঠি হলো ঈমান। যার যত ঈমানিয়াত মজবুত তার ততই ধৈর্য ক্ষমতা বিদ্যমান। হাজারো দুঃখ বেদনায় সে নিপতিত হলে তার মাঝেও সে শুভফল দেখতে পায়। বান্দা যখন বিপদে আপদে পতিত হয় তখন সে ইন্নালিল্লাহি ওয়া ইন্নাইলাইহি রাজিউন পড়ে ধৈর্য ধারণ করে। তখন মহান আল্লাহ তায়ালা তার জন্য তিনটি পুরস্কার নির্ধারণ করেন। ১. বিপদে দুঃখ দূর করে দেন। ২. পরিণামে উত্তম পুরস্কার দান করেন। ৩. প্রতিদানে তাঁর পছন্দনীয় বস্তু দান করেন।

পৃথিবীতে যত নবী ও রাসূল এসেছেন তাদের প্রত্যেকেই উপরোক্ত তিনটি পুরস্কারে ভূষিত হয়েছেন। এর মূলে রয়েছে ধৈর্য। একজন বিখ্যাত সাধক হাসান বসরী (রহ.) বলেন- মানুষ যত ঢোক গিলে তন্মধ্যে দুটি ঢোকই আল্লাহর নিকট অধিক প্রিয়। ১. বিপদে ধৈর্য্য ধারনের ঢোক আর ক্রোধ সংবরনের পর ঢোক গিলা।

মহানবী (সা.) বলেন- যে ব্যক্তি স্বীয় বিপদের কথা সবার নিকট জানায় সে ধৈর্য্য ধরেনি। এক্ষেত্রে নীরবে বিপদে ধৈর্যের চেষ্টা করা মহত্বের লক্ষণ। তবে বিশেষ ক্ষেত্রে কঠিন বিপদের বিষয়ে একান্ত বিশ্বস্ত শুভাকাক্সক্ষী আপনজনের নিকট মত বিনিময়ের মাধ্যমে দোয়া ও সহযোগিতা কামনা করায় দোষের কিছু নেই। এতে করে সমস্যা ও দুর্ভোগের বিষয়ে সামর্থ্যবানদের সহযোগিতা নিলে নিজের কল্যাণ সাধিত হয়, অপরদিকে যিনি সহযোগিতা করেন তিনি মানবতাবাদী হয়ে আল্লার রহমত প্রাপ্ত হন।

পরিবার ও সমাজ জীবনে দুঃখী মানুষের পাশে এসে দাঁড়ানো এবং সাহায্য করা প্রকারান্তরে আল্লাহকে সাহায্য করার নামান্তর। ধৈর্যধারণের এক উত্তম পস্থা হলো আন্তরিকতার সাথে সালাত আদায় করা। সবর ও সালাত হলো যাবতীয় বরকত ও কল্যাণের দরজা। সালাত ও সবরকারীরা আল্লাহর সান্নিধ্য ও নৈকট্য লাভ করে থাকে। ধৈর্যের আরো পাঁচটি ধাপ বিদ্যমান। ১. নফসকে হারাম থেকে বিরত রাখা। ২. এবাদতে আনুগত্যে মনোযোগী হওয়া। ৩. বিপদে আপদে ধৈর্য ধারণ করা। ৪. সবসময় আল্লাহর যিকির (কার্য সম্পাদনে আল্লাহর ভয়) করা। ৫. ধৈর্যের মাধ্যমে যাবতীয় বিপদ ও মুসিবত দূর করার সংগ্রামে নিয়োজিত থাকা।

অসুস্থ হয়ে রোগী হাসপাতালে বিছানায় পড়লে মানুষ যে কত অসহায় হয়ে পড়ে তা অনুধাবন করার মতো। পাশাপাশি অসুস্থ অবস্থায় নার্সদের অতুলনীয় অনুপম সেবার দৃষ্টান্ত আরো বেশি অনুধাবন করার মতো। যে নার্সের সাথে জীবনে দেখা নেই কথা নেয় সেই নার্সকে মনে হয় যুগযুগান্তের অসাধারণ বন্ধু। তার অভুতপূর্ব ভালোবাসার নিদর্শন তথা রোগীর সেবার যাবতীয় নমুনা দেখে রোগী কষ্টের মাঝেও ধৈর্যের অনুপম নিদর্শন দেখে নিজেকে ধৈর্যের দৃষ্টান্ত স্থাপনের চেতনা বাড়ায়।

মানুষের জীবনে প্রতিটি বাঁকে কষ্ট, সংগ্রামের বিকল্প নেই। হাজারো কষ্টের মাঝে মানুষ স্বপ্ন দেখে শান্তির। এক্ষেত্রে যারা জেগে জেগে যেসব স্বপ্ন দেখেন তারাই সত্যিকারের স্বপ্নদ্রষ্টা। জেগে জেগে স্বপ্ন দেখার মধ্যে হতাশা নেই, নিরাশা নেই, নেই পরাজয়ের গ্লানি। কাজেই হাজারো দুঃখের মাঝে আমাদের মুক্তির ও শান্তির স্বপ্ন দেখতে হবে। তাহলে হতাশা দূর হয়ে স্বপ্নগুলো বাস্তবে রূপ দান করতে সহজ হবে। একাগ্রতা, বুদ্ধিমত্তা, দৃঢ়তা, ও আপ্রাণ প্রচেষ্টাই পারে স্বপ্নের লক্ষ্যে পৌঁছাতে। মানসপটে মানুষ যে সুন্দর সুন্দর স্বপ্ন দেখেন সে লক্ষ্য নির্ধারণ করে অনুশীলনে ব্রত হলে নিজের শক্তি, কর্মদক্ষতা, কর্মক্ষমতা ও অনুশীলনের মাত্রা বহুগুণে বেড়ে যায়। মোটকথা স্বপ্ন ও কর্মহীন জীবন মূল্যহীন।

কাজের প্রতি অত্যন্ত মনোযোগ, পরিশ্রম, সুশৃঙ্খল জীবন যাপনের অভ্যস্ত অধ্যাবসায় ইচ্ছে শক্তির প্রাণ সঞ্চার করে থাকে। নিজের প্রতি বিশ্বাস, আত্মশক্তির জন্য দর্শন শাস্ত্রের সম্যক জ্ঞান লাভের পাশাপাশি নিজ নিজ ধর্মীয় অনুশীলন মানুষকে সোনার মানুষ তৈরী করে।

পরিশ্রম ছাড়া সফলতা আসে না। ধাপে ধাপে পরিশ্রম এবং অবস্থান পরিবর্তনের মাধ্যমে অজ্ঞতা ও অন্ধকার থেকে সহজেই বেরিয়ে আসা যায়। কাজের প্রতিদান ও ফলাফলের প্রতি ভ্রুক্ষেপ না করে কাজ করে যাওয়াই বুদ্ধিমানের কাজ। ন্যায়পরায়ণতা, দয়া, সাহস, নৈতিকতা, সততা, সহমর্মিতা, বিনয়, আনুগত্য এবং ভদ্রতা ও শিষ্টাচারের মাধ্যমে জীবনকে গঠন করে আমাদের মানবিক মূল্যবোধসম্পন্ন আলোকিত মানুষ হতে হবে। সমস্যা, ব্যর্থতা , দুর্ভোগ এড়িয়ে নয় বরং এগুলোর সাথে যুদ্ধ করেই যে জীবন রচিত হয় সে জীবনই মূলত কালজয়ী জীবন। জীবনের বিফলতার মধ্যেই সফলতা লুকিয়ে থাকে। আমাদের কাজ হলো সেটি বের করে আনা। যেমন নারকেলের শক্ত আবরণ না ফাটিয়ে সু-পানীয় ও সুভ্র খাবার বের করা সম্ভব হয় না তেমনি কষ্টের বরফ না ফাটালে সুখের সন্ধান পাওয়া যায় না।

সকল ধর্মের মৌল বিশ্বাস হলো পরকালে পুনর্জনম, জবাবদিহিতা, পুরস্কার ও তিরস্কার। এক্ষেত্রে প্রতিটি মানুষের দৈনন্দিন জীবনের বিশেষ বিশেষ সময়ের হিসাব নিকাশের ওপর ভিত্তি করে পরকালে সুখ-দুঃখ পুরস্কার-তিরস্কার নির্ধারিত হয়। এ বিশ্বাস যাদের অন্তরে দৃঢ়ভাবে প্রতিস্থাপিত হয় তাদের দারা সৃষ্টিকুলের কল্যাণ বই অকল্যাণকর কার্যসম্পাদন করা সম্ভব নয়।

পৃথিবীর জীবনে ইনসাফ ও যুলুম একে অপরের দুশমন। পৃথিবী যতদিন আছে সত্য-মিথ্যার দন্দ¦ ততদিন চলবে। এটি একটি চলমান প্রক্রিয়া। এক্ষেত্রে মাজলুমরা ধৈর্যের সাথে বুদ্ধিভিত্তিক কর্ম সম্পাদনে নিজেদের নিয়োজিত রাখবেন। ধৈর্যের মাধ্যমে তিলে তিলে লক্ষ্যের দিকে এগিয়ে যাবেন, এটিই তাদের বৈশিষ্ট্য। তবে লক্ষ্যে পৌঁছতে হলে বহু ধরনের পরীক্ষা নিরীক্ষায় অংশগ্রহণ করতে হয়। সম্পদ, সন্তান, প্রাকৃতিক দুর্যোগ, পরিবেশ দুর্ভোগ, শত্রুর আক্রমণ, হিংসুকদের ষড়যন্ত্র, লোভ, হিংসা, অহংকার ইত্যাদি বিষয়ে আমাদের পরীক্ষা করা হয়। এসব পরীক্ষায় আমাদের হতাশা আক্রমণ করলে আমরা পরাজিত হবো। আর হতাশা এবং ধৈর্য অটুট থাকলে আমরা পরীক্ষায় সফলতার সাথে কৃতকার্য হবো।

মুসলিম জিন্দেগী হলো আল্লাহর বন্দেগীর পরীক্ষা কেন্দ্র, পবিত্র কুরআন হলো সিলেবাস। রেফারেন্স বই হলো হাদিস। হযরত মুহাম্মদ (সা.) হলো কেন্দ্র সচিব ও শিক্ষক। এ বিশ্বাসগুলোর ভিত্তিতে আমরা যদি সিলেবাস অধ্যয়ন ও অনুশীলন করতে পারি তাহলে আমাদের পৃথিবীর জীবনের পরীক্ষার ফলাফল আখিরাতে ঘোষিত হবে এবং যথোপযুক্ত পুরস্কার প্রদান করা হবে।

দুনিয়ার অনুরাগই সমস্ত রোগের মূল কারণ। দুনিয়ার প্রতি আসক্ত, মোহ, অনুরাগ থেকে মানুষের অন্তরে স্বার্থপরতা বাসা বাঁধে।

এক্ষেত্রে অনিবার্য মৃত্যুর কথা স্মরণ করার মধ্যেই ধৈর্যের পরিচয় বহন করা সহজতর হয়। সুখী হলে শুকরিয়া, দুঃখী হলে সবর, উভয়টি কল্যাণকর ও বরকতময়। পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ মহামানব হযরত মুহাম্মদ (সা.) যখন কোন আনন্দদায়ক পরিবেশ ও সংবাদ পেতেন তখন তখনই তিনি আল্লাহ তায়ালার কৃতজ্ঞায় সেজদায় লুটিয়ে পড়তেন। তেমনি দীর্ঘদিন অনাবৃষ্টির জন্যেও তিনি ইসতিস্কা বা বৃষ্টির পানির জন্যে ঈদের নামাযের ন্যায় ঈদগাহের খোলা মাঠে দু-রাকাত সালাত আদায় করতেন, খুতবা পড়তেন এবং দোয়া করতেন।

বিপদাপদের মাধ্যমে পরীক্ষার সম্মুক্ষীণ হওয়া আমাদের সকল নবী আম্বীয়া কেরামের ঐতিহ্যের ধারাবাহিকতা সবর ও তাকওয়া সমস্ত বিপদের প্রতিকারের রাস্তা প্রসস্থ করে দেয়। এ দুটি বিশেষ ও অসাধারণ গুণ মানুষের দোজাহানের সাফল্যের চাবিকাঠি।

সবর শোকর ও তাকওয়া অর্থাৎ ধৈর্য, কৃতজ্ঞতা ও আল্লাহভীতি অবলম্বনকারীরা আপাতদৃষ্টিতে পরীক্ষার জন্য সাময়িক মসিবতে নিপতিত হলেও ভবিষ্যতে তাদের সফল্যতা অনিবার্য। ধৈর্যের চূড়ান্ত পুরস্কার এমন হয় যে হযরত ইয়াকুব (আ.) স্বীয় শিশু পুত্র ইউসুফ (আ.) কে হারিয়ে কাঁদতে কাঁদতে অন্ধ হয়েও ধৈর্য্য হারাননি । প্রতিদানে তিনি শহীদ না হয়ে ও শহীদের মর্যাদা লাভ করেছিলেন। সুতারাং ধৈর্য্যরে প্রতিদান বর্ণনা করা শেষ হবার নয় বিধায় বলা যায়, ধৈয্যের গর্ভেই ঐশ্বর্য্যরে স্বর্গ নির্মিত হয়।

* লেখক : প্রাবন্ধিক সাংবাদিক ও গবেষক।

    Print       Email

You might also like...

224258Kalerkantho_18-05-20-03

জেরুজালেমে মার্কিন দূতাবাস ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যপ্রাচ্য নীতি

Read More →