Loading...
You are here:  Home  >  সাহিত্য  >  Current Article

নজরুলের সেই গান ‘মসজিদেরই পাশে আমার কবর দিও ভাই’ এবং কিছু কথা

9FB2AE40-7947-4DB7-A70E-974F31F14754

শফি চাকলাদার : নজরুল ইসলামী গান অসংখ্য রচেছেন। তিনশত নাকি সাড়ে তিনশত? ঠিক সংখ্যাটি এখনো বলা যাবে না, কারণ নজরুলের হারিয়ে যাওয়া চুরি হওয়া অবদানগুলো মাঝে মধ্যেই উদ্ধারের খবর পাওয়া যাচ্ছে। তবে যে সংখ্যা উল্লেখ করা হলো শুধু একটি বিষয়ে ‘ইসলামী গান’ তা কি অবাক করার বিষয় নয়? যে বিষয়-গান বাংলা সঙ্গীত ভা-ারেই ছিল না, সে গান লিখলে তার বাণী কেমন হবে, সুর কেমন হবে কেউ জানত কি। জানত না। নজরুল সকল মীমাংসা করে দিলেন, ইসলামী গানগুলো শুনলে এর সমাধান ফুটে উঠবে। অসাধারণ একেকটা গান। যেমন বাণী তেমন সুর। গানগুলো শুনলে একজন নিজেকে পরিশুদ্ধ করে নিতে পারে। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লাম নিয়ে নাত, মহান আল্লাহতা’লাকে নিয়ে হামদসহ ইতিহাস, আদর্শ, ধর্ম, ঈদসহ বিভিন্ন ইসলামিক পর্ব নিয়ে নজরুল তাঁর কলমকে যেভাবে ব্যবহার করেছেন তা এক কথায় অসাধারণ, অনবদ্য। নজরুলের ইসলামী গানগুলো শুনলে একজন মুসলমান নিজেকে ধর্মের সকল দিকে অনুপ্রাণীত করে তুলতে পারে অনায়াসে। যে মুসলমান ধর্ম সম্পর্কে অজ্ঞ সেও অনেককিছু জেনে নিতে পারবেন। নজরুল ইসলামী গান রচনা শুরু করেন ১৩৩২ এর ১৩ অগ্রহায়ণ ২৯ নভে. ১৯২৫ সাল থেকে। ‘নবজীবনের নব উত্থান আজান ফুকারি এসো নকীব। শিরোনাম ছিল ‘নকীব’। দ্বিতীয়টি ‘আসিলে কেগো অতিথি উড়ায়ে নিশান সোনালী’ শিরোনাম ‘খোশ আমদেদ’। ভৈরবীতরঙ্গ। ১৯২৭-এর ২৭ ফেব্রু. ফালগুন ১৫/১৩৩২। তৃতীয়টি ‘বাজল কিরে ভোরের সানাই নিঁদ মহলার আঁধারপুরে’- শিরোনাম ‘ভোরের সানাই’। রচনা অগ্রহায়ণ ১৩৩৫ নভে-ডিসে ১৯২৮। তবে উল্লেখিত তিনটি গান নজরুল বিভিন্ন অনুষ্ঠানে গেয়েছেন। আর রেকর্ড প্রথম প্রকাশিত হয় ‘ও মন রমজানের ঐ’ ও ‘ইসলামের ঐ সওদালয়ে’ রেকর্ড হয় ১৩৩৮ এর ফালগুন ১৯৩২ এর ফেব্রুয়ারিতে। আর আজ এ লেখায় যে গানটি নিয়ে কথা বলছি ‘মসজিদেরই পাশে আমায় কবর দিও ভাই’- এটি রেকর্ডবদ্ধ হয় জুলাই ১৯৪০-এ। আমি মনে করি, নজরুল যদি আর কোন ইসলামী গান না রচে যেতেন তবে এই একটি গানই নজরুলকে অনন্তকাল অবধি বাঁচিয়ে রাখত। গানটির আবেদন, ভাষা, শব্দ চয়ন এবং সুরের গগনচুম্বি আকর্ষণ তো তাই প্রমাণ রাখে। তিনটি অন্তরাতে নিবদ্ধ এই অসাধারণ গানটি। গানটির অস্থায়ী বা মুখরাটিই একজন মুসলমানের জন্য আকর্ষণ বৃদ্ধি করে। কি সুর কি বাণী। মুখরাটি এমন-

মসজিদেরই পাশে আমায় কবর দিও ভাই

যেন গোরে থেকেও মুয়াজ্জিনের আজান শুনতে পাই॥

একজন মুসলমানের হৃদয়ে গানটির শুরুটা ঢেউ না তুলে পারে না। কত আন্তরিক এই আবেদনটুকু। কত আকুল আবেদন, কত অনুরাগ এই দুই লাইনে। মসজিদেরই পাশে কবর দিতে আকুল অনুরোধ-কারণ মুয়াজ্জিনের আযান শোনার আকুলতা। জীবদ্দশায় এই আজান তাকে কতইনা আবেগপ্রবণ করে তুলতো। কবরেও তার এই আজান শোনা চাই এবং তারই জন্য এই আজান শোনার আকুলতা, ব্যাকুলতা।

কাহারবা তালে নিবদ্ধ এই হৃদয় আকুল করা গানটির প্রথম অন্তরাটিতে এবার লক্ষ্য করি-

আমার গোরের পাশ দিয়ে ভাই নামাজীরা যাবে,

পবিত্র সেই পায়ের ধ্বনি এ বান্দা শুনতে পাবে।

গোর আজাব থেকে এ গুনাহগার পাইবে রেহাই॥

পাপ বা গুনাহ্্ থেকে সকল মুসলমানই মুক্তি চায়। এভাবেও মুক্তি হতে পারে যে মসজিদের পাশে কবর হলে মুসুল্লিরা নামাজে দিনে পাঁচবার নামাজ আদায়ের জন্য তার কবরের পাশ দিয়ে মসজিদে যাবে। পাশ দিয়ে যাওয়া পায়ের যে পদচারণার আওয়াজ শোনা যাবে এবং তার দুর্বল হৃদয়ের প্রবল আকাক্সক্ষা তিনি গোর আজাব থেকে মুক্তি পাবে, নিজেকে সেতো গুনাহগার মনে করে তার এমন আকুলতা।

দ্বিতীয় অন্তরাটি একজন মুসলমানকে আরো ব্যাকুল করে তোলে যেন। নজরুল তার এই গানটির এইটুকুতে তেমনি শব্দ চয়ন করে হৃদয়-আকুল করা অন্তরাটি গেঁথেছেন-

কত পরহেজগার খোদার ভক্ত নবীজীর উম্মত,

ঐ মসজিদে করে রে ভাই কোরান তেলাওয়াৎ।

সেই কোরান শুনে যেন আমি পরান জুড়াই ॥

প্রথম অন্তরাতে নজরুল নামাজীদের পায়ের ধ্বনি শোনার মাধ্যমে গোর আজাব থেকে মুক্তি পেতে চাওয়ার প্রবণতা লক্ষ্য করা গেছে। দ্বিতীয় অন্তরাতে কবি নজরুল আকুল হয়ে ওঠেনÑ বাণী তৈরি করে বলতে চান নবীজীর (সা.) অসংখ্য উম্মত দৈনিক ঐ মসজিদে কোরান পাঠ করেন সেই কোরান পাঠের আওয়াজ তার গোরে পৌঁছবে। উম্মত কোরানের সেই আওয়াজ শুনে হৃদয়ে শান্তি পাবেÑ এমনি আকুলতা একজন মুসলমান হৃদয়কে যেন উদ্বেলিত করে রাখে।

তৃতীয় অন্তরাতে নজরুল অপর একটি আকুলতার প্রসঙ্গ সুন্দর হৃদয়কে মোহিত করে তুলেছেÑ

কত দরবেশ ফকির রে ভাই মসজিদের আঙিনাতে

আল্লার নাম জিকির করে লুকিয়ে গভীর রাতে।

আমি তাঁদের সাথে কেঁদে কেঁদে নাম জপতে চাই

আল্লার নাম জপতে চাই ॥

এখানে এই তৃতীয় অন্তরাটিতেও একজন ধর্মপ্রাণ মুসলমানের হৃদয় নিঙরানো আকুলতা প্রকাশ পেয়েছে। সকল মুসলমানের জন্যই গানখানি একান্ত প্রয়োজনীয়। মসজিদের আঙিনাতে আল্লাহর নাম জিকির করার অসংখ্য মুসুল্লি রয়েছেনÑ সদা সর্বদাই তারা মসজিদের আঙ্গিনাতে থাকেন। নজরুল এই গানের মাধ্যমে একান্ত আকুল হয়ে তাদের সাথে কান্নাকাটি করার ব্যাকুলতা প্রকাশ করেন আল্লাহতালার নাম জিকির করতে। এমন হৃদয় নিঙরানো আকুলতা প্রতিটি হৃদয়ে অবস্থান করে। এমন একটি গান যে সঙ্গীত ভা-ারে আছে সে সঙ্গীত ভা-ারটি অবশ্যই সমৃদ্ধ। এমন একটি গান যদি না-ই থাকত তবে একজন মনে করতেই পারে কি যেন এক অভাব ভা-ারটিতে। কোরানে পাওয়া যায় যে তুমি একটি পাপ অপরাধ করলে একটা পূণ্য কাজ করে তা মিটিতে দাও। নজরুলকে অনেকেই নানারূপ দোষারোপ করে আনন্দ পান। তাদের জন্য বলা দরকার যে নজরুল যতগুলো ইসলামী গান রচেছেন এমন হৃদয় নিঙরানো বাণী-সুর যুক্ত করে সে গুলোর প্রতি তাদের লক্ষ্য করতে বলি। নজরুল ধর্মকে সর্ব্বোচ্চে স্থান দিয়েছেন। তিনি কোরআন অনুবাদ করেছেন। নবী করিম (সা.) এর জীবনী পদ্যে ও গদ্যে রচনা করেছেন। ইসলাম ধর্মের অমীয় বাণী নিয়ে গান রচেছেন বিভিন্ন লেখায় যুক্ত করেছেন। ধর্মকে সঠিকভাবে জানানোর জন্য দায়িত্ব মনে করতেন। গুরুত্ব দিয়েছেন ধর্মকে সবার উপরে। আর তাইতো নজরুল বলতে পেরেছেন দৃঢ়তার সাথেÑ “ইসলাম ধর্ম এসেছে পৃথিবীতে পূর্ণ শান্তি সাম্য প্রতিষ্ঠা করতেÑ কোরান মজিদে এই মহাবাণীই উত্থিত হয়েছে।… এক আল্লাহ ছাড়া আমার কেউ প্রভু নাই্ তাঁর আদেশ পালন করাই আমার একমাত্র মানবধর্ম। আমি যদি আমার অতীত জীবনে কোনো ‘কসুর’ বা ‘গুনাহ’ করে থাকি তবে শাস্তি আমি আমার প্রভু আল্লাহর কাছ থেকে নেবো, তার শাস্তি কোনো মানুষের দেওয়ার অধিকার নাই। আল্লাহ লা-শরিক, একমেবাদ্বিতীয়ম। কে সেখানে ‘দ্বিতীয়’ আছে যে আমার বিচার করবে? কাজেই কারও নিন্দাবাদ বা বিচারকে আমি ভয় করি না। আল্লাহ আমার প্রভু, রাসূলের আমি উম্মত, আল-কোরান আমার পথÑ প্রদর্শক।

এছাড়া আমার কেহ প্রভু নাই, শাফায়াত দাতা নাই, মুর্শিদ নাই। আমার আল্লাহ আল ফাদালিল আজিম- পরম দাতা। তিনিই আমাকে জাতির কাছ থেকে, কৌমের কাছ থেকে, কোনো দান নিতে দেননি।”

নজরুল সকল সময়ে সত্যে বিশ্বাসী ছিলেন। তাই যা কিছু করেছেন তা কখনো কাউকে ঠকানোর উদ্দেশে করেননি। তিনি বলেন, “আমার যখন পথ ফুরাবে, আসবে গহীন রাতি (খোদা)/ যখন তুমি হাত ধরো মোর হয়ো পথের সাথী (খোদা)।” সকল সময়ে তিনি তাঁর পরম প্রভু আল্লাহতালার সাহায্য-প্রার্থী ছিলেন। শত শত ইসলামী গান, রচনা তো রয়েছেই তাঁর অন্যান্য রচনাতেও এমন অসংখ্য বাণী পাওয়া যায়, যা জাতিকে সকল সময়ে সত্য পথে, পথ চলার দিক নির্দেশনা দিয়ে চলেছে। আর ‘মসজিদেরই পাশে আমার কবর দিও ভাই’ গানটি রচনার মাধ্যমে নজরুল মানুষের অন্তিম এক সত্যÑ ইচ্ছার প্রতিফলন ঘটিয়েছেন যা প্রত্যেক মুসলমানের জন্য এক নিত্যদিনের সঙ্গী হয়ে থাকবে অনন্তকাল। হয়তো কথাগুলো গুছিয়ে বলার ক্ষমতা কারো নেইÑ নজরুলই সেই গুছিয়ে বলার কথাগুলো গানের বাণীর মাধ্যমে শিখিয়ে রাখলেন। তাই শেষ করছি এই বলে যে নজরুল-সঙ্গীত চার সহ¯্রাধিক না হয়ে যদি এই একটি গানই হত তাহলে নজরুল- সঙ্গীত এই একটি গান দিয়েই অমরত্ব লাভ করত। একজন মুসলমানের মনের নিভৃত কোণে যে আকাক্সক্ষা বসবাস করে সে আকাক্সক্ষাটির প্রতিফলন সহজ সরল বাণী এবং গ্রহণীয় সুর এ গানটিতে অসাধারণভাবে প্রকাশ পেয়েছে।

    Print       Email

You might also like...

ABD0E478-13C2-431E-AA32-C31BF203733D

নজরুল ও জসীমউদ্দীন

Read More →