Loading...
You are here:  Home  >  এক্সক্লুসিভ  >  Current Article

নববর্ষের অনুভূতি

Matiurঅধ্যাপক মুহম্মদ মতিউর রহমান: সময়ের আবর্তনে দিন-ক্ষণ-মাস পাড়ি দিয়ে নতুন বছরের আগমন ঘটে। মূলত সময় অন্তহীন। তার শুরু কোথায়, শেষই বা কোথায়- কেউ জানে না। সময়ের আবর্তনে দিন-মাস-বছর অতিক্রম করে জীবনের চক্র বিবর্তিত হয়। কিন্তু সময় অন্তহীন হলেও জীবনের যাত্রা একটি বিশেষ সীমা পর্যন্ত। তবে এক জীবন অতিক্রান্ত হলেও নতুন নতুন জীবনের উদ্ভব ঘটে পৃথিবীতে। এভাবে পৃথিবীতে মানুষের জীবনের যাত্রা থাকে অব্যাহত। নানা বৈচিত্র্যে, বৈভবে পূর্ণ এ জীবন। নানা বৈচিত্র্যে, বৈভবে, আয়োজনে জীবনকে সাজাতে আমরা নিরন্তর ব্যস্ত থাকি। এভাবে জীবনের বিকাশ ঘটে, সভ্যতার অগ্রগতি সাধিত হয়। সময়ের সাথে জীবনের অবিচ্ছেদ্য সম্পর্ক বিদ্যমান। জীবন মূলত সময়েরই সমষ্টি। জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত সময়টাই জীবন। অন্তহীন প্রবহমান সময়ের একটি নির্দিষ্ট ক্ষণে দুনিয়ায় আবির্ভূত হয়ে আরেকটি নির্দিষ্ট ক্ষণে আমরা দুনিয়া থেকে বিদায় নেই। হয়তো বা রেখে যাই কিছু স্মৃতি-মহাকালের বুকে যা সঞ্চিত হয় ইতিহাসের বারিবিন্দু হিসাবে। এ স্মৃতিকে রবীন্দ্রনাথ ‘জীবনের কীর্তি’ বলে উল্লেখ করেছেন। এ কীর্তি একরকম নয়। নানা ধরন, রূপ ও বৈচিত্র্যে পূর্ণ এ কীর্তি। বাগানে যেমন নানা বর্ণ-গন্ধ-সুরভীযুক্ত পুষ্পরাজির সমাবেশ ঘটে, মানবসমাজও তেমনি নানা রূপ-ধরন ও বৈচিত্র্যময় কীর্তিরাজির সমাবেশে মানবজাতির ইতিহাস নির্মিত হয়।
সময়ের সাথে তাই জীবনের যেমন সম্পর্ক, ইতিহাসেরও তেমনি একটি সম্পর্ক বিদ্যমান। সময়ের অতীত ধারাবাহিকতা বা ঘটে যাওয়া বিভিন্ন বিষয় ও ঘটনার বিবরণকে ইতিহাস বলা হয়। এ ইতিহাসে বিধৃত হয় মানুষের অতীত জীবন ও অতীতে ঘটে যাওয়া মানুষের অসংখ্য কৃতি। মানবকৃতির মধ্যে রয়েছে- ঐতিহ্য-সভ্যতা, জ্ঞান-বিজ্ঞান, সাহিত্য-সংস্কৃতি-শিল্প, নানা আবিষ্কার-উদ্ভাবন ও বিচিত্র সৃষ্টিকর্ম। সে হিসাবে সময় মানুষের জীবন ও কৃতির একান্ত সারথি। সময়ের সাথে ঘনিষ্ঠ হৃদ্যতা সৃষ্টি করে মানুষের জীবনের অনন্ত ধারা প্রবাহিত।
সময়ের গুরুত্ব অপরিসীম। এক অর্থে সময়ই জীবন। সময় কখনো নিয়ে আসে দুঃখ-বেদনা, মর্মান্তিক চিত্তবিদারী রোদন, আবার কখনো নিয়ে আসে হাসি-আনন্দ, প্রেম-ভালোবাসা, মহত্তম-মনোরম-সৌন্দর্যময় অনুভূতি। এসব মিলেই জীবন। এ কান্না-হাসি-আনন্দ-বেদনা মিশ্রিত জীবনের প্রতিটি মুহূর্ত আমাদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। রাত্রির নিরবচ্ছিন্ন অন্ধকারে আমরা যেমন ভোরের দীপ্ত আলোর উন্মেষ ঘটার জন্য উন্মুখ চিত্তে অপেক্ষা করি, জীবনের বেদনার্ত মুহূর্তেও তেমনি আনন্দময় উচ্ছ্বল জীবনের প্রত্যাশায় অধৈর্য প্রতীক্ষায় প্রহর গুনি। এটাই জীবনের স্বভাব। সময়ের ধর্ম এটাই। সময় অতিবাহিত হয় নদীর মত। নদী যেমন বর্ষার ফেনায়িত জলরাশিতে পূর্ণ হয়ে দু’কূল প্লাবিত করে মনের উদ্বেলিত আনন্দে দূর সমুদ্রের দিকে প্রতিনিয়ত অগ্রসর হয়, সময়ও তেমনি কোনকিছুর পরওয়া না করে প্রতি মুহূর্তে দ্রুত প্রবাহিত হয়ে মহাকালের অনন্ত গভীরে বিলীন হয়। সবকিছুর মধ্যেই এক গতিময়তা বিদ্যমান। অন্যকথায়, গতিই জীবন। এ গতি কি লক্ষ্যহীন?
সৌরজগতের দিকে তাকালে দেখা যায়, লক্ষ-কোটি বছর ধরে অযুত-নিযুত গ্রহ-তারা-নক্ষত্র প্রত্যেককে নির্দিষ্ট গতিপথ ধরে নিরন্তর ছুটে চলেছে। প্রকৃতির দিকে তাকালেও দেখা যায়, পাহাড়-সমুদ্র, নদী-নালাবেষ্টিত সবুজ পৃথিবীও প্রতিনিয়ত তার রূপ বদলাচ্ছে। ঋতুর পরিক্রম, গ্রহ-তারা-নক্ষত্রের আবর্তন এ সবকিছুর প্রভাব প্রকৃতির মধ্যে অনুভূত হয়। প্রাণীজগৎও এক অদৃশ্য সুনির্দিষ্ট নিয়মে প্রকৃতি ও সৌরজগতের এ নিয়মকে ধারণ ও মান্য করে চলেছে। সব মিলিয়ে এক অবিচ্ছিন্ন, অখ- সত্তা। সবকিছুর মধ্যেই গতিময়তা রয়েছে। এ গতির কারণে কোটি কোটি গ্রহ-তারা-নক্ষত্র শূন্যে ভেসে বেড়াচ্ছে। গতির কারণেই তা সম্ভব হচ্ছে। প্রকৃতির মধ্যে যে রূপ-বৈচিত্র্য ও নিরন্তর ঋতু-পরিক্রম তার মূলেও রয়েছে গতি। প্রাণিজগতে যে চাঞ্চল্য, জন্ম-মৃত্যু, শৈশব-যৌবন-বার্ধক্য তার মূলেও রয়েছে গতি। অবশ্য জীবনের ক্ষেত্রে আমরা এ গতিকে বলি হায়াত বা আয়ু। কিন্তু সর্বত্রই গতির প্রাধান্য। এ গতি যদি কোন মহাশক্তির নিয়ন্ত্রণে না থাকতো, তাহলে সমূহ বিপর্যয় ঘটতো। এ গতির যিনি স্রষ্টা, নিয়ন্তা ও ধারক প্রকৃতপক্ষে তিনি এক সর্বময় ক্ষমতার অধিকারী। তিনি এককভাবে সৌরজগৎ, প্রকৃতিজগৎ, প্রাণিজগৎ এ সবকিছু নিয়ন্ত্রণ করেন বলেই সবখানে শৃঙ্খলা বিরাজমান। অন্যথায়, সব বিশৃঙ্খল ও বিপর্যস্ত হয়ে পড়তো। মহাবিশ্বের এ মহান স্রষ্টা ও নিয়ন্ত্রককে যে নামেই ডাকি, প্রকৃতপক্ষে, তিনি এক, অদ্বিতীয় ও মহামহিমান্বিত। সবকিছুর সৃষ্টি, বিলয় ও পরিণতি একমাত্র তাঁরই করায়ত্ত। তিনি নিজে তাঁর পবিত্র নামের উল্লেখ করেছেন ‘আল্লাহ্’ বলে। তাঁকে এ নামে ডাকাই উত্তম। তবে এটা তাঁর মৌলিক নাম। এ মৌলিক নাম ব্যতিরেকে তাঁর অসংখ্য বিশেষণবাচক নাম রয়েছে। সে নামেও তাঁকে ডাকা যায়।
আমরা সময়ের কথা বলছিলাম। গুরুত্বের বিষয় বিবেচনা করে সময়কে একটি নির্দিষ্ট নিয়ম ও হিসাবের মধ্যে আনার জন্য একে নানা ক্ষুদ্র-বৃহৎ পরিধিতে বিভক্ত করা হয়েছে। পল, অনুপল, ক্ষণ, অনুক্ষণ, সেকেন্ড, মিনিট, ঘণ্টা, দিন, সপ্তাহ, মাস, বছর, যুগ, শতাব্দী, সহস্রাব্দ ইত্যাদি নানা ভাগে ও পরিচয়ে সময়কে বিভক্ত করা হয়। ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র বারিবিন্দু নিয়ে সৃষ্টি হয় বিশাল অতল বারিধি, ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র বালিকণার সমষ্টিতে গড়ে ওঠে বিস্তীর্ণ ধূসর মরুভূমি। সময়ের এ ক্ষুদ্র-বৃহৎ মুহূর্তগুলো নিয়েও তেমনি সৃষ্টি হয় সীমাহীন অনন্ত কাল-মহাকাল। ইতিহাস সৃষ্টির পেছনেও রয়েছে শত-সহস্র-কোটি পল-অনুপল-মুহূর্তের ঘন সন্নিবদ্ধ সাঁকো-বন্ধন। আমাদের জীবনও পল-অনুপল-মুহূর্তের সমষ্টি মাত্র। পদ্ম-পত্রে অস্থির, চঞ্চল নীরের মত তার অবস্থান। তবু ক্ষণস্থায়ী জীবনের সাথে সময় ও ইতিহাসের নিরবচ্ছিন্ন সম্পর্ক বিদ্যমান।
এজন্যই বলা হয়, সময়ের গুরুত্ব অপরিসীম। বিশেষত জীবন যেখানে সম্পূর্ণ অনিশ্চিত, সীমাবদ্ধকালের গণ্ডিতে আবদ্ধ সেখানে জীবনের প্রতিটি মুহূর্তই মূল্যবান এবং যথাযথভাবে তার পূর্ণ সদ্ব্যবহারের মধ্যেই এর প্রকৃত সার্থকতা। প্রতিদিন প্রত্যুষে নিদ্রাভঙ্গের সঙ্গে সঙ্গে যে দিনটি শুরু হয়, সূর্যাস্তের পর সেটি আর কখনো ফিরে আসে না। পরের দিন সূর্যোদয়ের সাথে আরেকটি নতুন দিনের সূচনা ঘটে, পূর্বের দিনটি অতীতের তথা মহাকালের অন্তহীন বুকে হারিয়ে যায়। এভাবে ক্রমাগত একটির পর একটি নতুন দিন আসে এবং বিগত দিনগুলো স্মৃতিময় অতীত বা ইতিহাসে পর্যবসিত হয়।
এভাবে বর্তমান মুহূর্তগুলো প্রতিনিয়ত অতীত বা ইতিহাসের অন্তহীন গর্ভে বিলীন হচ্ছে। একইভাবে দিন-রাত্রির পর্যায়ক্রমিক আবর্তনের এক পর্যায়ে নশ্বর জীবনের পরিসমাপ্তি ঘটে। অন্যদিকে নতুন জীবনের আগমন ঘটে। ফলে মানবসৃষ্টির ধারা অব্যাহত রয়েছে। এজন্য অনেকে জীবনকে নদীর সাথে তুলনা করেন। খরস্রোতা নদী যেমন প্রবাহিত হয়- তার এক কূল ভাঙে, অন্য কূলে নতুন বালুচর গড়ে ওঠে। এ ভাঙা-গড়ার মধ্য দিয়ে নদী তার চলমানতা অক্ষুণ্ন রাখে। তবে নদীর সাথে জীবনের পার্থক্য এই যে, নদীর প্রবাহ কখনো থামে না, কিন্তু মানুষের মৃত্যুর সাথে সাথে তার জীবনের রথ থেমে যায়, জীবন চলিষ্ণুতা হারায়। হয়তো নতুন আরেকটি বা একাধিক জীবন এসে তার স্থান পূরণ করে। মানব সৃষ্টির ধারা এভাবে অব্যাহত থেকে চলমান পৃথিবীকে প্রাণ-চাঞ্চল্যে পূর্ণ করে তোলে।
অন্যান্য প্রাণিকুলের মধ্যেও একই অবস্থা। সময়ের ধারা যেমন অব্যাহত, জীবনের ধারাও তেমনি। কিন্তু একটি জীবনের অবস্থান পদ্ম-পত্রে নীর সদৃশ সময়ের পক্ষপুটে অস্থির, চঞ্চল নীরের মতই অস্থির, ক্ষণস্থায়ী। অতএব সময়ের আবর্তন, দিন-রাত্রির আগমন-নির্গমন অতিশয় তাৎপর্যপূর্ণ, জীবনে এর গুরুত্ব সীমাহীন। এ থেকে যেমন শিক্ষা গ্রহণ করার আছে, তেমনি জীবনের প্রতিটি মুহূর্ত সঠিকরূপে কাজে লাগানোর অনুপ্রেরণা লাভের তাগিদও রয়েছে। তাই প্রতিটি বিবেকবান মানুষের এ ব্যাপারে বিশেষ যত্নবান হওয়া কর্তব্য। এ বিষয়ের প্রতি ইঙ্গিত করেই মহান আল্লাহ্ বলেন :
‘আকাশমণ্ডল ও পৃথিবীর সৃষ্টিতে, দিন ও রাত্রির পরিবর্তনে নিদর্শনাবলী রয়েছে বোধশক্তিসম্পন্ন মানুষের জন্য।’ (সূরা আল ইমরান : আয়াত-১৯০)। এভাবে বিশ্বজগতের সৃষ্টি, দিন-রাত্রির আগমন-নির্গমন, গ্রহ-নক্ষত্রের আবর্তন-বিবর্তন, ঋতু-পরিবর্তন ইত্যাদি বিষয় অভিনিবেশ সহকারে চিন্তা করলে আমরা বিস্ময়াভিভূত হই, অনেক কিছু শিখতে ও জানতে পারি, সময়ের গুরুত্ব উপলব্ধি করে সময়ের সদ্ব্যবহারে যত্নবান হতে পারি। আল্লাহর সৃষ্টি-মাহাত্ম্য সম্পর্কে সম্যক জ্ঞান লাভ করতে পারি।
জীবন মূলত সময়ের সমষ্টি। দিন-রাত্রির বিবর্তনের এক পর্যায়ে মানুষ দুনিয়ায় আবির্ভূত হয়, আবার নির্দিষ্ট আয়ু শেষে বিদায় গ্রহণ করে। এ আবির্ভাব ও বিদায় মহান স্রষ্টার বিধান ও নির্দেশানুযায়ী এমন নীরবে-সংগোপনে সংঘটিত হয় যে, আমরা সর্বদা তা উপলব্ধি করতেও সক্ষম হই না। অথচ এ আবির্ভাব ও বিদায়ের মধ্যবর্তী সময় যেটাকে আমরা ‘হায়াত’ বলি, তা প্রত্যেকের জীবনে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আজকের দিনটি কেমন কাটলো, দিনের প্রতিটি মুহূর্ত কীভাবে ব্যয়িত হলো, এ দিনটিতে কতটা অর্জন বা সঞ্চয় হলো, এ অর্জন বা সঞ্চয় জীবনে কতটা সাফল্য বা ব্যর্থতা নিয়ে এলো, অধিকাংশ সময় তা আমরা খতিয়ে দেখি না। সময়ের গুরুত্ব বোঝানোর জন্য মহান স্রষ্টা স্বয়ং সময়ের শপথ নিয়ে বলেন :
‘কসম সময়ের, নিশ্চয় মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত; কিন্তু তারা নয়, যারা ঈমান আনে ও সৎকর্ম করে এবং পরস্পরকে হকের দাওয়াত দেয় ও ধৈর্যধারণের উপদেশ দেয়।’ (সূরা আল আছর, আয়াত : ১-৩)।
সময়ের সমষ্টিই জীবন, সে সময়ের শপথ নিয়ে আল্লাহ মানুষকে দুই শ্রেণীতে বিভক্ত করেছেন। প্রথম শ্রেণী দ্বিতীয় শ্রেণীর বিপরীত। প্রথম শ্রেণীর সুষ্পষ্ট পরিচয় না দিয়েই আল্লাহ্ দ্ব্যর্থহীনভাবে তাদের সম্পর্কে বলেছেন যে, তারা অবশ্যই ক্ষতিগ্রস্ত। দ্বিতীয় শ্রেণীর পরিচয়ের মধ্যেই প্রথম শ্রেণীর পরিচয় সুস্পষ্ট হয়ে উঠেছে। অর্থাৎ দ্বিতীয় শ্রেণীর লোক যেসব গুণে গুণান্বিত তার বিপরীতটাই প্রথম শ্রেণীর পরিচয়-জ্ঞ্যাপক। দ্বিতীয় শ্রেণীর পরিচয় দিতে গিয়ে মহান আল্লাহ্ বলেন- তারা ঈমানদার (স্রষ্টায় বিশ্বাসী), সৎকর্মশীল, পরস্পরকে অর্থাৎ অন্য সকলকে হকের (সত্য দ্বীন) দাওয়াত দেয়, নিষ্ঠার সাথে হকের পথে চলার জন্য জীবন পথের সকল বাধা-বিপত্তি উপেক্ষা করে ধৈর্য ও সাহসের পরিচয় প্রদান করে থাকে। অন্য শ্রেণীর মানুষ এর বিপরীত। আল্লাহ্ এ দুই শ্রেণীর মানুষের পরিচয় দিতে গিয়ে এবং উভয়ের চরম পরিণতির কথা উল্লেখ করতে গিয়ে সময়ের কসম খেয়েছেন। এতে সময়ের গুরুত্ব ও তাৎপর্য সুস্পষ্ট হয়ে ওঠে।
শৈত্য-প্রকোপে অসংখ্য ক্ষুদ্র বালিকণা জমাট বেঁধে বরফের আকার ধারণ করে। আবার সামান্য তাপদাহে জমাট বাঁধা বরফ ধীরে ধীরে গলে স্বচ্ছ তরল পানিতে পরিণত হয়। তেমনি হায়াতের ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র পল-অনুপল জমাট বেঁধে একটি জীবনের অস্তিত্ব গড়ে তোলে, পৃথিবীর আলো-হাওয়া, রৌদ্র-স্নাত দিনের তাপ-দাহে তা গলতে গলতে একদিন সবুজ মৃত্তিকার সাথে মিশে মহাকালের গভীর অতলে হারিয়ে যায়। এজন্য পারস্যের জনৈক প্রখ্যাত মনীষী জীবনকে বরফের সাথে তুলনা করেছেন। বরফ তার বিক্রেতার নিকট এক মূল্যবান পুঁজি। কিন্তু সময় অতিক্রান্ত হবার সাথে সাথে সে পুঁজি একসময় গলে পানি হয়ে যায়, তার পুঁজিও হাওয়ায় মিলিয়ে যায়। জীবনও তেমনি সময়ের অদৃশ্য ভেলায় চড়ে একসময় নিঃসীম অনন্তের পথে বিলীন হয়। আমাদের মরদেহও তখন বরফগলা পানির মতোই মূল্যহীন হয়ে পড়ে। তাই সময় থাকতে জীবনের প্রতিটি মুহূর্ত সত্য ও ন্যায়ের পথে পরিচালনা করা কর্তব্য। সময়ের গুরুত্বটা এখানেই। এ প্রসঙ্গে একটি হাদীসের উল্লেখ করা যায়। রাসূলুল্লাহ্ (সা.) বলেন :
‘পাঁচটি বিষয়ের প্রতি (সময় থাকতেই) গুরুত্ব আরোপ কর- বার্ধক্য আসার পূর্বে যৌবনের, রোগাক্রান্ত হবার পূর্বে স্বাস্থ্যের, দারিদ্র্য আসার পূর্বে সচ্ছলতার, ব্যস্ত হবার পূর্বে অবসর সময়ের এবং মৃত্যু আসার পূর্বে জীবনের।’ মহান স্রষ্টা কোন কিছ্ইু অনর্থক সৃষ্টি করেননি। সব সৃষ্টির বিশেষ মূল্য ও গুরুত্ব রয়েছে। সময়ের প্রতিটি মুহূর্তও তেমনি গুরুত্বপূর্ণ। ‘আশরাফুল মাখলুকাত’ অর্থাৎ সৃষ্টির সেরা মানুষর জীবনের প্রতিটি মুহূর্ত গুরুত্বপূর্ণ। এর অন্য অর্থ- জবাবদিহিতা। মানুষকে তার কাজের হিসাব দিতে হবে, অর্থাৎ জীবনের প্রতিটি মুহূর্ত কীভাবে ব্যয়িত হলো, তার নিকাশ হবে ‘ইয়াউমুল আখিরাত’-এ। উপরোক্ত হাদীসে বিভিন্নভাবে তাই সময়ের গুরুত্বটাই বিশেষভাবে বোঝানো হয়েছে।
হিসাবের সুবিধার জন্য নানা যতিচিহ্ন দিয়ে অখণ্ড সময়কে আমরা নানা ক্ষুদ্র-বৃহৎ পরিসরে বিভক্ত করেছি। ইতিহাস পর্যালোচনার জন্য শতাব্দী, সহস্রাব্দ ইত্যাদির হিসাবটা স্বাভাবিক, কিন্তু একটি জীবনের জন্য তা অতিশয় দীর্ঘ। সহস্রাব্দ তো অকল্পনীয়, শতায়ু হবার নসীবই ক’জনের ভাগ্যে ঘটে? দশক, বছর, মাস বা তার চেয়েও ক্ষুদ্র সময়-পরিসরকে কেন্দ্র করে জীবনের সকল ভাবনা, পরিকল্পনা ও কর্মায়োজন। জীবনের বিভিন্ন পরিকল্পনা ও কর্মায়োজনকে একটি সুষ্ঠু নিয়ম ও নিয়ন্ত্রণের মধ্যে আনার জন্য সেকেন্ড, মিনিট, ঘণ্টা, দিন, সপ্তাহ, মাস, বর্ষ, দশক, শতাব্দী ইত্যাদি গণনার সূত্রপাত।
জীবনে বেঁচে থাকার তাগিদে, জীবনকে বিকশিত ও নানাভাবে সমৃদ্ধ করে তোলার অভিপ্রায়ে আমাদের ক্ষুদ্র-বৃহৎ নানা আয়োজনে সারাক্ষণ ব্যাপৃত থাকতে হয়। কিন্তু মানুষের জীবনের আয়ু সীমাবদ্ধ। তাই হিসাব করে নিয়মমাফিক সবকিছু না করলে জীবনে সাফল্য আসে না। সেজন্য মানুষ সময় নিরূপণের জন্য ঘড়ি আবিষ্কার করেছে, দিন-তারিখ মেলাবার জন্য পঞ্জিকা, ক্যালেন্ডার ইত্যাদি তৈরি করেছে। আধুনিক যুুগের মানুষ এখন ঘড়ি, পাঁজি-পুঁথির হিসাব অনুযায়ী চলতে অভ্যস্ত হয়ে পড়েছে। এসব আবিষ্কারের পূর্বে মানুষ দিন-রাত্রির আবর্তন, সূর্য, চন্দ্র, গ্রহ-নক্ষত্রের পরিক্রমণ, ঋতুর বিবর্তন, প্রকৃতির মধ্যকার পরিবর্তন, জোয়ার-ভাটার আগমন-নির্গমন ইত্যাদির ওপর নির্ভরশীল ছিল। এখন মানুষ বিজ্ঞান সম্মতভাবে সময়কে অতি সূক্ষ্ম নিয়ন্ত্রণের মধ্যে নিয়ে এসেছে। সময়কে নিয়ন্ত্রণ করতে গিয়ে মানুষ অনেকটা সময়ের নিয়ন্ত্রণে নিজেকে আবদ্ধ করে ফেলেছে।
নববর্ষের শুভাগমন অর্থ জীবন থেকে একটি মূল্যবান বছরের অবসায়ন। এভাবে একটি একটি করে নববর্ষ উদযাপনের মধ্য দিয়ে মহাকালের দিকে আমাদের অবিশ্রান্ত মহাযাত্রা। তাই নববর্ষ শুধু আনন্দ নয়, আনন্দের মধ্য দিয়ে জীবনের পরিণতির কথাই আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয়। আমরা এ হাসি-কান্না, আনন্দ-বেদনাপূর্ণ বৈচিত্র্যময় সুন্দর পৃথিবী থেকে বিদায়ের মহামুহূর্তের দিকে প্রতিক্ষণ এগিয়ে চলেছি। নববর্ষে সে উপলব্ধি আমাদের মনে গভীর চাঞ্চল্য সৃষ্টি করে। এ চাঞ্চল্য যতই উদ্বেগ-উৎকণ্ঠার সৃষ্টি করুক না কেন, জীবনের আসল তাৎপর্য ও পরিণতি উপলব্ধি করতে তা আমাদের গভীরভাবে অনুপ্রাণিত করে। নববর্ষে এ উপলব্ধি সর্বব্যাপক হোক- সেটাই একান্ত প্রত্যাশা।

    Print       Email

You might also like...

6afed405318d4219e5ce1f58be1a4401-5a1580a4a4885

২৭ নভেম্বর লন্ডনে কারি শিল্পের ‘অস্কার’

Read More →