Loading...
You are here:  Home  >  প্রবাস  >  Current Article

প্রবাসে বিয়ে বাড়ির ডামাডোল

তামান্না ইসলাম : এই বাড়িতে এসে যে কেউ বলে দিতে পারবেন এটা বিয়ে বাড়ি। বাড়ি ভর্তি মানুষ গিজগিজ করছে। অ্যাপার্টমেন্ট ভর্তি—মনে হয় শ খানিকের কাছাকাছি মানুষ। আমেরিকা ও কানাডার বিভিন্ন অংশ থেকে এবং বাংলাদেশ থেকে অতিথিরা এসেছেন। একেক জনের ঘুমের সময়ও একেক রকম। ক্লান্ত–বিধ্বস্ত, কিন্তু সবার মুখে হাসি, কথায় ফুর্তির জোয়ার।
বিভিন্ন বয়সী নারীরা একই রঙের শাড়ি পরে হাসিমুখে ছোটাছুটি করছেন। রান্নাঘরে তিল ধারণের জায়গা নেই। মেয়ের মা সেখানে কাজ করার সুযোগ না পেয়ে হাসিমুখে সবাইকে আপ্যায়ন করছেন। আমি এই বাড়ির ঠিক সরাসরি সম্পর্কিত আত্মীয় নই। তবে, আমার একটি বিশেষ পরিচয় আছে, আমি এই বিয়ের ঘটক।
ঘরে ঢোকার পরই ড্রয়িংরুমে বসা একজন ভদ্রলোক পরিচিত হাসি দিলেন এবং আমি আমার অভ্যাসবশত চিনতে না পেরে আরেকটা পাল্টা হাসি দিলাম। অনেকেই দেখি ঘটককে চেনেন এবং পরিচয় করিয়ে দিচ্ছেন। সারা দিন জার্নি করে আমেরিকার এক মাথা থেকে কানাডার আরেক মাথায় এসেছি। ঘুমে চোখ বন্ধ হয়ে আসছিল। দৌড়ে গেলাম গোসল করতে। তখনো বুঝিনি, এই গোসল করতে পারার সুযোগটাও বিয়ে বাড়িতে এক বিরাট সৌভাগ্য।
এসে দেখি মেয়ে হাত–পা ছড়িয়ে চিতপটাং। বেচারি খুব টায়ার্ড। ছয় ঘণ্টা ধরে মেহেদি লাগিয়ে বসে আছে। মধুর অত্যাচার। আমি আবার শুরু করলাম আরেক অত্যাচার, অর্থাৎ ছবি তোলা। নিজের বিয়ের কথা মনে হয়ে গেল এবং উপদেশ দেওয়ার সুযোগটা হাতছাড়া করলাম না। ওর সব কাজিনরা, চাচি, ফুপুরা মিলে কেউ মেহেদিতে লেবুর রস দিচ্ছে, কেউ চুল শুকানোর যন্ত্র দিয়ে মেহেদি শুকাচ্ছে।
এর মধ্যে জানা গেল ছেলের মা কিছু আত্মীয়স্বজন নিয়ে এসেছেন হলুদের তত্ত্ব দিতে। তাদের জন্য রাতে খাওয়ার বিরাট আয়োজন করা হয়েছে। মেয়ের বাবাকে বলতে শোনা গেল, ছেলের মাকে তিনি অনুরোধ করছেন রাতের খাবার খেতে, আর ছেলের মা তালবাহানা শুরু করেছেন রাতে তাদের ছেলের তরফের আরেকটা অনুষ্ঠান হবে।
আপা (ছেলের মা) ঢোকার সঙ্গে সঙ্গে আমি গিয়ে তাঁকে জড়িয়ে ধরলাম। তিনি আমাকে চিনলেনই না, মুখের দিকে তাকালেন না পর্যন্ত। তিনি তখন দারুণ ব্যতিব্যস্ত তার আত্মীয়স্বজনের সঙ্গে হবু বউমাকে পরিচয় করিয়ে দিতে। আমি তো পুরাই অপদস্থ, শোকাহত। ভাবছি ‘দেব নাকি একটা গন্ডগোল লাগিয়ে? গন্ডগোল না হলে আবার বিয়ে বাড়ি কীসের? ইতিমধ্যে তার আমার ওপরে নজর পড়েছে। ‘তা–আ–আ–মান্না’ বলে ছুটে এসেছেন, ‘তুমি এখানে কখন আসছ?’ আমি তো কল্পনাই করি নাই যে তোমাকে এখানে দেখতে পারব।’
মেয়ের চারদিকে শাড়ি, চুড়ি, গয়নার পাশাপাশি আছে হরেক রকমের মিষ্টি ও হাতে বানানো পিঠা। এত রকমের পিঠা হয়, তা আমার জানাই ছিল না। ছেলের মা নিজ হাতে সব সাজিয়ে এনেছেন। নয়নাভিরাম সেই আয়োজন। মেয়ের খালা, চাচি, ফুফু, ভাইবোনেরা সব ঘুরে ঘুরে দেখছে আর ছেলের মায়ের মুখে পরিতৃপ্তির হাসি। আমি মনে মনে ভাবছি, এই পিঠাগুলো কখন খাওয়া যায়?
বাংলাদেশি স্টাইলের বিয়ে বাড়ির কাচ্চি, রোস্ট, বোরহানি খেয়ে আমি এবার রওনা দিলাম ছেলের হোটেলে ওর মেহেন্দির অনুষ্ঠানে। ভাগ্যিস এখানে এসেছিলাম, না হলে এই শাহিভোজ মিস হয়ে যেত। আমার সারা দিনের ক্লান্তি কোথায় চলে গেছে ততক্ষণে। সেখানে গিয়ে দেখি ছেলের কাজিনেরা আয়োজন করেছে এক দারুণ ঘরোয়া অনুষ্ঠান। সব চেয়ে বেশি উৎসাহ ছেলের মামার নাচানাচি করার। সব বাড়িতেই কি আমার ছোট মামার মতো একজন মজাদার মামা থাকেন, যাকে ছাড়া বিয়ে বাড়ি জমে না?
আমার ঘটকের চোখ, এক পাত্রীর ওপরে আটকে গেল। পাত্র–পাত্রীদের মা–বাবা যতই আমার সঙ্গে মধুমাখা ব্যবহার করে, দুষ্টু ছেলেমেয়েগুলো ততই পালিয়ে বেড়ায়, বিশেষ করে পাত্রীগুলো।
রাত দুইটায় আমাকে জানানো হলো, আমাকে ওই হোটেলেই থাকতে হবে। আমি তো কিছুতেই সেটা করতে পারব না। অবশেষে এক সদ্য পরিচিত ভাই দয়া পরবশ হয়ে আমাকে নিয়ে রওনা দিলেন আমার গন্তব্যে। পথিমধ্যে আমি আইওএস সিস্টেম সম্পর্কে, প্রোগ্রামিং সম্পর্কে গভীর জ্ঞান অর্জন করলাম। কোনো অবস্থাতেই আমার জ্ঞান অর্জন করতে খারাপ লাগে না, লম্বা জার্নিটাকে কাজে লাগালাম।
পরদিন হলুদ। আমার যাওয়ার কথা মেয়ের পক্ষের সঙ্গে। মেয়ের বাবা এক্স ক্যাডেট। আগের রাতেই আমি তাকে পররাষ্ট্র মন্ত্রীদের মতো করে ছেলের মায়ের সঙ্গে বিয়ের অনুষ্ঠানের সময়সূচি নিয়ে দেন দরবার করতে দেখেছি। ‘আপনারা আসবেন ঠিক ৬টা ২৫ মিনিটে টাইপ অবস্থা। আমি আমার বর আর এই বড় ভাইকে সময়ানুবর্তিতার জন্য দারুণ ভয় পাই। এদিকে আমার তো টরন্টো শহর ঢুঁ মারতে গিয়ে, আড্ডা মারতে গিয়ে সাজ কমপ্লিট হয়নি। তিনি বারবার ফোন করেন, আর আমি বলি, ‘আর দশ মিনিট’। গলা শুকিয়ে কাঠ, পরিণামে রাস্তার এক্সিট মিস এবং দেরি করে (তাদের আধা ঘণ্টা দেরি করিয়ে দিয়ে) পৌঁছানো। অবশ্য তাঁর হাসিমুখ দেখে আমি জানে পানি পেলাম।
ওখানে গিয়ে মেয়েকে দেখার আগে দৌড়ে নিজের সাজ শেষ করলাম। অতঃপর জানতে পারলাম তাড়াহুড়ায় মেয়ের ওড়না ফেলে রেখে আসা হয়েছে। হবু বউ অতি সাধারণ ওড়নার নিচ দিয়ে হেঁটে আসবে এই দৃশ্য দেখে আপার (ছেলের মা) প্রেশার বেড়ে যায় কিনা সেই চিন্তায় এইবার আমি অস্থির। তিনি এই বিয়ে নিয়ে ছেলে ও মেয়ে, দুজনের চেয়েই বহুগুণ স্বপ্ন দেখেছেন, এ ব্যাপারে আমি পুরোপুরি নিশ্চিত। গত প্রায় পাঁচ–ছয় মাস ধরে রাতের ঘুম হারাম করে ব্যাপক প্রস্তুতি নিয়েছেন।
এর চেয়েও বড় সমস্যা ছিল সামনে। আপা ঢোকামাত্র দেখেছেন আমি মেয়ের পক্ষের দেওয়া শাড়ি পরে তাকে রিসিভ করছি।
—তুমি এই হলুদ শাড়ি পরা কেন? আর তুমি আমাকে রিসিভ করতেছ কেন?’
বড় আপা বলে কথা, কোনোমতে বললাম, ‘আপনি তো কালকে রাতে আমাকে শাড়ি দিতে ভুলে গেছেন।’
—আরে আমার হুঁশ আছে নাকি? মনে করায় দাও নাই কেন?’
যাই বলি, সব দোষ আমার। ধুত্তরি, আর ঘটক হব না। হলেও এক পক্ষের শাড়ি, আর এক পক্ষের ব্লাউজ পরে আসব, আমার ফ্যাশনের বারোটা।
আমার জন্য আরও বিরাট চমক অপেক্ষা করছিল সামনে। পাঠক, সেই চমক জানতে পারবেন আগামী পর্বে।

তামান্না ইসলাম: কালিফোর্নিয়া, যুক্তরাষ্ট্র।

    Print       Email

You might also like...

6E9CDCB1-BD6A-4EF0-B757-0FA600FF9A44

মালয়েশিয়া থেকে ফিরতে পারে লক্ষাধিক বাংলাদেশি

Read More →