Loading...
You are here:  Home  >  এক্সক্লুসিভ  >  Current Article

প্রসঙ্গ বাংলা নববর্ষ

Banglanewডা. বরুণ কুমার আচার্য বলাই: বাংলা নববর্ষের প্রাচীন ইতিহাসে ১লা জানুয়ারি যেমন খ্রিস্টানদের নববর্ষ দিবস, তেমনি মুসলমানদের চন্দ্র হিজরি সালের ১ মহররম নববর্ষ দিবস। সৌর বাংলা বর্ষের ১ বৈশাখ বাঙালির বাংলা নববর্ষ দিবস। বর্তমানে প্রচলিত বাংলা সৌর সনের ইতিহাস ঐতিহ্যসমৃদ্ধ। কাহিনীর নানা উল্লেখযোগ্য দিক রয়েছে যা বর্ণনা করার জন্য বিরাট পরিসর দরকার, যা এখানে ব্যক্ত করা সম্ভব নয়। বর্তমানে প্রচলিত এবং সরকারিভাবে বলবৎ ও কার্যকর বাংলা সনের বয়স চার দশকও হবে না, তবে এর যোগসূত্রের ধারা মুঘল সম্রাট জালাল উদ্দীন মোহাম্মদ আকবরের যুগের সাথে সংযুক্ত। কয়েক শতাব্দীর সুদীর্ঘ বাংলা সনের কোনো সংস্কার অতীতে হয়েছিল কি না তা জানা যায় না, তবে সব শেষ সংস্কারকৃত বাংলা সন পূর্বের মতোই আমাদের ব্যবহৃত ও পরিচিত। ১৯৬৮ সনে বাংলা একাডেমির উদ্যোগে ড. মুহাম্মদ শহীদুল্লাহর নেতৃত্বে গঠিত একটি কমিটি কর্তৃক সংস্কারকৃত আধুনিক বাংলা সনের উদ্ভাবক ছিলেন মোগল সম্রাট আকবর। হযরত মুহম্মদ (সাঃ)-এর ৬২২ সালে মক্কা থেকে মদীনার হিজরতের ঘটনার স্মরণে খলিফা হযরত উমর (রাঃ) তাঁর উপদেষ্টা পরিষদ কর্তৃক সর্বসম্মতভাবে স্বীকৃত হিজরি সন এবং সম্রাট আকবরের সিংহাসনে আরোহণের (১৫৫৩ খ্রিস্টাব্দে) স্মারক হিসেবে পরিচিত এই সনের ইতিহাস অতি চমৎকার। এলাহী, জালালী ও খাসলী হিসেবে পরিচিত সেই আকবরী ক্যালেন্ডার এবং প্রচলিত বাংলা সনের ক্যালেন্ডারের কথা এখানে তুলে ধরা হচ্ছে। সন আরবি শব্দ। এর অর্থ বর্ষ বা পঞ্জি। বর্ষপঞ্জি থেকে সাধারণত বছরের দিনক্ষণের পরিচয় পাওয়া যায়। বাংলা সন বলতে আমরা বাংলাদেশে প্রচলিত এমন একটি বর্ষপঞ্জি বলে থাকি যা থেকে আমরা মাস বা দিনের হিসাব একটি বিশেষ পদ্ধতিতে করে থাকি। এ সনের উল্লেখ করতে  আমরা সাধারণত এভাবে লিখি: সন, ১৪০৩, তারিখ, ১লা বৈশাখ। তারিখ মানে দিন। এটিও একটি আরবি শব্দ। এখানেই স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে, বাংলা সনের সঙ্গেই এগুলো বাংলায় প্রচলিত হয়েছে। বাংলা সনের উৎপত্তি সম্পর্কে অনুসন্ধান করতে গেলে দেখা যায়, আরবি চান্দ্র সনের বিবর্তনের ফলে রাজকার্য নির্বাহের নানা অসুবিধা দেখা দেয়। বিশেষ করে এ সময় বাংলাদেশ মুঘল সাম্রাজ্যের অনুসৃত সনের অন্তর্ভুক্ত হয়। আমাদের দেশ কৃষিনির্ভর। সে সময় অধিকাংশ মানুষের জীবন নির্বাহ হতো একমাত্র কৃষিজাত ফসল থেকে। রাজ্যের খাজনা আদায় করা হতো হিজরি সনের তারিখ হিসাবে আর সেজন্যই নতুন সন প্রবর্তনের প্রয়োজনীয়তা দেখা যায়। কারণ, চৈত্র- বৈশাখ মাসেই কৃষকদের ঘরে সাধারণত নানা রকমের কৃষিজাত ফসল ওঠে। সেই ফসল দিয়েই খাজনা পরিশোধ করা হতো। কিন্তু হিজরি সন চান্দ্র সনের অনুযায়ী হওয়ার কারণে নির্দিষ্ট তারিখ নির্ধারণ করার অসুবিধা দেখা দেয়। খাজনা আদায়ের বেলায় দেখা যায়, প্রজাদের দেয়া খাজনা ফসলের মাধ্যমে আদায় করতে হলে প্রতি বছর একটি নির্দিষ্ট ফসলের মৌসুমে তা আদায় করা প্রয়োজন। কিন্তু চান্দ্র সন তথা হিজরি সনে তা সম্ভব হয়ে উঠে না। তাই সৌর সনের প্রয়োজনীয়তা দেখা দেয়। বাংলা ও হিজরি সন মূলত একই সন এবং এ দুটির উৎসও একই। ৬২২ খ্রি. বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মদ (সা.) জন্মভূমি মক্কা ত্যাগ করেন এবং মদীনায় আশ্রয় গ্রহণ করেন। তাঁর এই গমনকে হিজরত বলা হয়। এই হিজরতের স্মৃতি রক্ষার্থে ইসলামের দ্বিতীয় খলিফা হযরত ওমর (রাঃ) একটি বিশেষজ্ঞ উপদেষ্টা পরিষদের সর্বসম্মত মতামতের ভিত্তিতে সরকারি ফরমান জারির মাধ্যমে হিজরি প্রবর্তন করেন যা সমগ্র মুসলিম জাহানের সর্বত্র বলবৎ রয়েছে। কোনো প্রকারের পরিবর্তন, পরিবর্ধন বা সংস্কার চান্দ্র হিজরি সনের এ অনন্য বৈশিষ্ট্য ক্ষুন্ন করতে পারেনি। সম্রাট আকবর কর্তৃক সৌর সন (বর্তমান বাংলা সন) সংক্রান্ত ফরমান কোন সালের কোন তারিখে জারি করা হয় এবং উদ্ভাবক কে ছিলেন, এসব বিষয়ে মতবিরোধ পরিলক্ষিত হয়। তবে সাধারণত ঐতিহাসিকগণের অভিমত হচ্ছে, ১৫৫৬ খ্রিস্টাব্দের ১০ মার্চ বঙ্গে আমীর ফাতেহ উল্লাহ সিরাজী উদ্ভাবিত বাংলা সন সংক্রান্ত ফরমান জারি করা হয়। অবশ্য কেউ কেউ ১১ মার্চও বলেছেন। ইদানীংকালে বাংলাদেশ থেকে প্রকাশিত বিভিন্ন ডায়েরিতে ১৫৮৫ খ্রিস্টাব্দের ১০ মার্চ উল্লেখ করা হয়েছে। কোনো কোনো ঐতিহাসিকের মতে, ১৫৮০ সালে সব বিরোধী শক্তিকে পরাস্ত করে আকবর অত্যন্ত জাঁকজমকপূর্ণভাবে ‘জশনে নওরোজ বা নববর্ষ’ অনুষ্ঠান পালন করেন এবং সেদিন ওই গুরুত্বপূর্ণ শাহী ফরমান জারি সন চালু করেন। এর চার বছর পর প্রশাসনিক সুবিধার জন্য সৌর সন চালু করেন, যাকে এলাহী সন বলা হতো। এটি হিজরি সনের সাথে লেখা হতো। এ সম্পর্কে ঐতিহাসিক বিবরণ সংক্ষিপ্তভাবে এরূপ: আইন-ই-আকবরী গ্রন্থ থেকে জানা যায়, সম্রাট আকবরের দরবারে কতিপয় প্রভাবশালী কর্মচারী সম্রাটের নিকট একটি নতুন সনের জন্য আবদার করেন। সম্রাট স্বয়ং হিজরি সনের তারিখের ভিন্নতা সম্বন্ধে অবগত ছিলেন। চান্দ্র পদ্ধতির হিসাবে প্রতি সৌর বছরের হিসাব থেকে ১০/১১ দিনের পার্থক্য ঘটে। উল্লেখ্য, আমাদের দেশে সৌর ও চান্দ্র এ দু’টি সন আলাদা গণনার পদ্ধতি থাকলেও সে সময়ে মিশ্র রীতিতে তার হিসাব রাখা হতো। ফলে ১০/১১ দিন পার্থক্য বাড়তে বাড়তে যখন তিন বছরে সাড়ে বত্রিশ দিন পার্থক্য দেখা দিত তখন একটি চান্দ্র মাসকে একেবারে বাদ দেয়া হতো। হিন্দুগণ এই বাদ দেয়া মাসকে বলত মল মাস বা অধিক মাস। তারা এই মাসকে কোনো মাস বলেই গ্রাহ্য করত না। ‘তারিখে আলফী’ মূলত মোগল সম্রাট আকবর কর্তৃক দ্বীনে এলাহী নামক একটি নতুন ধর্মমত প্রবর্তনের সর্বজনবিদিত ইতিহাস। এই উদ্ভট ধর্মমত চরমভাবে ব্যর্থ হয়ে অচিরেই বিলুপ্ত হয়। এই দ্বীনে এলাহী প্রবর্তন পরিকল্পনা বাস্তবায়নের জন্য সম্রাট আকবর প্রথমেই একটি নতুন ইতিহাস রচনার কাজে হাত দেন এবং তার সিংহাসনারোহণ পর্যন্ত বিগত এক সহস্র বছরের ঘটনাবলী সংবলিত একটি নতুন ইতিহাস রচনা করেন। এই গ্রন্থের নামকরণ করা হয় ‘তারিখে আলফী’ বা সহস্র বছরের ইতিহাস। তারিখে আলফীর চমৎকার ইতিহাসিক বর্ণনা পাওয়া যায় আকবর শাহী দরবারের বিশিষ্ট লেখক মেল্লা আবদুল কাদের বিন মালিক শাহ বদায়ুনীর রচিত ‘মোনাতাখাবাতুৎ তাওয়ারীখে’। এটি মেল্লা আবদুল কাদের বদায়ুনীর একটি বিখ্যাত গ্রন্থ। এই গ্রন্থের পা-ুলিপি মেল্লা সাহেবের জীবদ্দশায় গোপন রাখা হয় এবং তার ইন্তেকালের পর এটা প্রকাশ করা হয়। এই গ্রন্থে আকবরী যুগের চল্লিশ বছর ব্যাপী রাজত্বকালের ঘটনাবলী বর্ণিত হয়েছে। তাওয়ারীখের উর্দু অনুবাদ করেন মাহমুদ আহমদ ফারুকী। এই গ্রন্থে মেল্লা আবদুল কাদের সম্রাট আকবরের সিংহাসনারোহণকে ২৮তম সালের ঘটনাবলীর আলোচনা প্রসঙ্গে বিশদ বিবরণ লিপিবদ্ধ করে গেছেন। মেল্লা আবদুল কাদের লিখেছেন, একই বছর সম্রাট আকবর একটি ফরমান জারি করলেন যে, হিজরতের হাজার বছর যেহেতু শেষ হয়ে গেছে এবং এ যাবৎ লোক হিজরি তারিখই লিখে আসছে, অতএব এখন থেকে একটি ইতিহাস রচনা হওয়া আবশ্যক যাতে বর্তমান সময় পর্যন্ত সাম্রাজ্যের সকল ঘটনাবলী অন্তর্ভুক্ত হবে। এই নতুন বইটি অন্যান্য ভুল ঘটনাবলীকে খ-ন ও রহিত  করবে এবং এই ইতিহাসের নাম হবে তারিখে আলফী। এই গ্রন্থে সনগুলোর সাথে হিজরতের পরিবর্তে ওফাত শব্দ লিখতে হবে। এই উদ্দেশে হযরত ওফাত থেকে বর্তমান সময় পর্যন্ত এর ঘটনাবলী লেখার জন্য সাত ব্যক্তিকে নিযুক্ত করা হয়। প্রথম সনের ঘটনাবলী লিপিবদ্ধ করার জন্য নজীবখান, শাহ ফতেউল্লাহ, হাকীম আলী, হাজী ইব্রাহীম, সরাহিদী, নেজামুদ্দিন আহমদ, আবদুল কাদের বদায়ুনী, জাফর বেগ এবং আশেফের নাম রয়েছে। তারিখে আলফী প্রনয়ণের কাজ আরম্ভ হয় হিজরি ১০০০ সনে। মেল্লা আবদুল কাদেরের সম্পাদনায় এই গ্রন্থ পূর্ণাঙ্গ রূপ লাভ করে। মতান্তরে এটা তিন খ-ে, চার খ-ে ও ছয় খ-ে বিস্তৃত। সম্রাট আকবরের নবরতেœর অন্যতম আবুল ফজল রচিত বিখ্যাত গ্রন্থ আকবরনামায় আছে : হিজরি ৯৬৩ সালের ২ রবিউস সানী, রোজ শুক্রবার মোতাবেক ১৪ ফেব্রুয়ারি ১৫৫৬ খ্রিস্টাব্দে দ্বিপ্রহরের সময় আকবর সিংহাসনারোহণ করেন এবং ২৫ দিন পর ২৬তম দিবসে ২৮ রবিউস সানী তারিখ থেকে এলাহী সনের নতুন বছর আরম্ভ হয়। এই ২৫ দিন বিলম্বে এলাহী সন চালু করার কারণ হিসেবে বলা হয়ে থাকে যে, তৎকালে প্রচলিত ফারসী সনের ২৫ দিন বাকি ছিল, এই ২৫ দিন অন্তে ফারসী সনের প্রথম তারিখ থেকে ফারসী সনের মাসগুলো নিয়ে এলাহী সনের যাত্রা শুরু হয়েছিল খ্রিস্টীয় সন হিসেবে। এই তারিখটি ছিল ১৫৫৬ সনের ১০ মার্চ। অর্থাৎ এলাহী সন চালু হয় হিজর ৯৬৩ সনের ২৮ রবিউস সানী মোতাবেক ১০ মার্চ ১৫৫৬ সন। নতুন ক্যালেন্ডার সন ও মাসগুলোর নাম যথাক্রমে এলাহী সন ও এলাহী মাস নামে অভিহিত করা হয়। আকবরের নাম ও তার তথাকথিত ধর্মের সাথে মিল রেখে আকবরী সন চালু করা হয়। এলাহী, জালালী বা আকবরী সনের অপর এক নাম ফসলী সন। সৌর ফসলী সন সম্পর্কে বলার অনেক কথাই আছে। সংক্ষেপে জেনে রাখা দরকার যে, বাংলা সনের প্রচলন হয় সম্রাট আকবরের নির্দেশে হিজরী ৯৯২ সাল মোতাবেক ১৫৮৪ খ্রিস্টাব্দে। প্রচলিত হিজরী সনের সাথে সমন্বয় করে আমীর ফতেহ উল্লাহ শিরাজী এ বাংলা সনের উদ্ভাবন করেন। তখন থেকে ১লা বৈশাখ বাংলা নববর্ষ হিসেবে উদযাপিত হয়ে আসছে বলে মনে করা হয়। এ হিসাব নির্ভুল ও সঠিক হলে বাংলা সনের ইতিহাস অতি প্রাচীন, এতে সন্দেহ নেই। প্রচলিত বাংলা মাস সম্পর্কেও অনেকে লিখেছেন এবং অনেক মাসের নাম চান্দ্র মাসগুলোর ন্যায় তিথির নামে নামকরণ করা হয়েছে বলে মনে করা হয়। মোট কথা, বাংলা সন সৌর ও ফসলী সন হিসেবে আমাদের দেশে প্রচলিত এবং রাজস্ব, খাজনা ইত্যাদির বার্ষিক হিসাব বৈশাখ মাস হতে গণনা করার রীতি এখনো অনুসৃত হতে দেখা যায়।

    Print       Email

You might also like...

3beacdcde2a669c2103e83ce980f3dd9-5a182942ec897

মিসরে মসজিদে হামলা, নিহত ২৩৫

Read More →