Loading...
You are here:  Home  >  কলাম  >  Current Article

প্রসঙ্গ : সৌদি আরবের নতুন ক্রাউন প্রিন্স

গৌতম দাস

বর্তমান সৌদি বাদশা হলেন সালমান বিন আবদুল আজিজ আল সৌদ, সংক্ষেপে সালমান। গত ২০ জুনের আগে পর্যন্ত তার উত্তরসূরি হিসেবে ঘোষিত ক্রাউন প্রিন্স ছিলেন মোহাম্মদ বিন নায়েফ। ২১ জুন সকালে সারা দুনিয়া জানতে পারে নতুন ক্রাউন প্রিন্সের নাম ঘোষণা করা হয়েছে। আগের ক্রাউন প্রিন্স মোহাম্মদ বিন নায়েফ ছিলেন বাদশাহ সালমানের ভাইয়ের ছেলে। তার বদলে এখন উত্তরসূরি বা ক্রাউন প্রিন্স হয়েছেন ৩১ বছর বয়সের মোহাম্মদ বিল সালমান (এখানে সংক্ষেপে মোহাম্মদ লেখা হবে), যিনি বর্তমান বাদশাহ সালমানের বড় ছেলে। তিনি ২০১৫ সাল থেকেই ছিলেন প্রতিরক্ষামন্ত্রী এবং একই সাথে ক্ষমতাবান সৌদি ইকোনমিক কাউন্সিলের দায়িত্বপ্রাপ্ত; যে সংগঠনের প্রধান কাজ হলো ‘সৌদি আরামকো’ দেখাশোনা করা। সৌদি আরবের সব তেলের মালিকানা যে রাজকীয় কোম্পানির অধীনে তার নাম ‘আরামকো’। ঐতিহ্য অনুসারে বাদশাহ মারা গেলে পরে স্থলাভিষিক্ত কে হবেন সেই উত্তরসূরির নাম বাদশাহ জীবিত থাকতেই ঘোষণা করা থাকে। তিনিই ক্রাউন প্রিন্স। সে হিসেবে নায়েফের নাম ক্রাউন প্রিন্স হিসেবে প্রকাশ্যই ছিল। কিন্তু এবার ব্যতিক্রম ঘটিয়ে মধ্য মেয়াদে নতুন উত্তরসূরি হিসেবে বাদশাহর বড় ছেলে মোহাম্মদ বিন সালমান বা মোহাম্মদের নাম ঘোষিত হলো।

এটা স্বাভাবিক ঘটনা, নাকি আসলে এটা একটা ‘রক্তপাতহীন ক্যু’? কারণ এ ঘটনার সাত দিন পর ২৮ জুন নিউ ইয়র্ক টাইমস এক রিপোর্ট প্রকাশ করে যে, এটা স্বাভাবিক ঘটনা নয়। কারণ ক্রাউন প্রিন্সের নাম বদলের পর থেকেই প্রিন্স নায়েফকে ‘বন্দী’ করে রাখা হয়েছে। প্রাসাদ থেকে নাকি বের হতে দেয়া হচ্ছে না, ভেতরেও তার নড়াচড়া সীমিত। এই খবরের উৎস হিসেবে বলা হয়েছিল রাজপরিবারের সাথে আমেরিকান প্রশাসনের সম্পর্ক বা বন্ধুত্ব আছে, এমন চারজন আমেরিকান অফিসার। আর এই খবরের তিন সপ্তাহ পরে ১৮ জুলাই নিউ ইয়র্ক টাইমস আরো বিস্তারিত এবং খোলাখুলি রিপোর্ট করে জানায়, ওটা এক ‘রক্তপাতহীন ক্যু’ ছিল। কিভাবে জোর করে ক্রাউন প্রিন্স নায়েফের (নায়েফ ও মোহাম্মদ পরস্পর কাজিন) পদবি কেড়ে নেয়া মেনে নিতে নায়েফকে বাধ্য করা হয়, কেন তিনি চাপের মুখে রাজি হয়েছিলেন, সে রাতের দীর্ঘ বর্ণনাও সেখানে দেয়া হয়।

কিন্তু এর চেয়েও বড় কথা নিউ ইয়র্ক টাইমসের ওই রিপোর্টে প্রথম সিআইএর প্রসঙ্গ আসে; পাঠককে জানানো হয় যে, এই পরিবর্তনে সিআইএ ‘খুবই অখুশি’। কেন? এর অনেক কারণ। মূল বিষয় হলো ‘সন্ত্রাসবাদ’; অর্থাৎ আমেরিকা এটা বলতে যা বুঝে তাই। আমেরিকা ও সৌদি আরবের মধ্যে সম্পর্কের ক্ষেত্রে তেল (মানে আমেরিকা তেলের ভোক্তা আর সৌদিরা এর সরবরাহকারী) এখন আর তেমন ইস্যু নয়। কারণ মূলত আমেরিকার নিজেরই তেলের উৎস পাওয়া গেছে প্রচুর। এ ছাড়া, গ্লোবাল ইকোনমিতে তেলের চাহিদা মারাত্মকভাবে পড়ে গেছে এবং দাম কমে গেছে। কিন্তু এর প্রায় সমান গুরুত্বের জায়গা নিয়েছে টেররিজম বা সন্ত্রাসবাদ। এই ইস্যুতে নাইন-ইলেভেনের পর থেকে বিশেষ করে, এ কাজে খুব গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার করার দরকার হয়ে উঠেছে সৌদি আরবকে। অপসারিত প্রিন্স নায়েফ ছিলেন সৌদি আরবের বাদশাহ সালমান সরকারের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। কিন্তু আমেরিকার কাছে তিনি ছিলেন খুব গুরুত্বপূর্ণ। আমেরিকার কাউন্টার টেররিজম মধ্যপ্রাচ্য পরিকল্পনায় বাস্তবায়নের মূল ব্যক্তিত্ব, আমেরিকার ভাষায় মূল ‘কনট্রাক্ট’ ছিলেন তিনি। কাউন্টার টেররিজম মানে যাকে টেররিজম বলা হচ্ছে, ঠিক তার কায়দায় পাল্টা টেররাইজ বা সন্ত্রাস সৃষ্টি করে সব ভণ্ডুল করে দেয়া। আমেরিকা নায়েফকে বহুবার কাউন্টার টেররিজম তৎপরতায় নিজ দেশে নিয়ে ট্রেনিং দিয়ে এনেছে। শুধু তাই নয়, শুধু সৌদি আরবে নয়, সারা মধ্যপ্রাচ্যে আমেরিকার নানাবিধ কর্ম-পরিকল্পনায় তাকে অংশীদার করেছিল, একসাথে কাজ করেছিল। মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন কাউন্টার টেররিজম প্রোগ্রামের মূল ‘কনট্রাক্ট’ ছিলেন তিনি। নায়েফকে আমেরিকা এভাবেই গড়ে তুলেছিল। ফলে সেই নায়েফকে এখন সরিয়ে দেয়াতে সিআইএ মারাত্মক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে সে কথা তারা হোয়াইট হাউজে রিপোর্ট করে বলেছে বলে নিউ ইয়র্ক টাইমসের রিপোর্ট আমাদের জানিয়েছে। আরো আছে।

টাইমসের বর্ণনা অনুযায়ী নিউ ইয়র্ক একজন আমেরিকান অফিসিয়াল ও সৌদিরাজের একজন পরামর্শকের মতে, নায়েফ আসলে কাতারের বিরুদ্ধেসৌদি নেতৃত্বে আরোপিত অবরোধের বিরোধী ছিলেন। এটাও তাকে অপসারণের একটা কারণ। এ ছাড়া সিআইএ’র সংক্ষুব্ধ হওয়ার আর একটা বড় কারণ হলো, নায়েফের সাথে তার অনুগত বহু সৌদি সিভিল এবং সামরিক অফিসার যাদের কাউন্টার টেররিজমের ট্রেনিং দিয়ে আমেরিকা একটা ওয়ার্কিং গ্রুপ বানিয়েছিল, নায়েফের সাথে সাথে তাদেরও চাকরিচ্যুত বা বন্দী করা হয়েছে। নায়েফের খুবই ঘনিষ্ঠ জেনারেল আবদুজ আজিজ আলহুয়াইরিনিও বন্দী হয়ে আছেন।

এ তো গেল আমেরিকার তরফে খবর। কোল্ড ওয়ারের আমল থেকে সোভিয়েত ইনটেলিজেন্স সব জায়গাতেই বিস্তৃত হয়ে ছড়িয়ে ছিল। সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙে যাওয়ার সাথে সাথে সেই অবকাঠামো অনেকটাই ভেঙে গিয়েছিল, উত্তরসূরি রাশিয়া এর খরচ জোগাতে না পারার কারণে। কিন্তু পুতিনের আমলে সেগুলো আবার খাড়া করা হয়েছে, আর পুতিন সেগুলোকে নিজের পক্ষে ব্যবহার করেছেন অথবা অন্যের কাছে নানা আন্তর্জাতিক ইস্যুতে ইনটেলিজেন্স বিক্রি অথবা অন্য রাষ্ট্রের সাথে শেয়ার করে, অনেক সময় বহু স্বার্থ উদ্ধার করেছেন। যেমন গত বছর তুরস্কে, ‘গুলেন পার্টি’ আমেরিকায় ও তুরস্কে বসে এরদোগানের বিরুদ্ধে কী কী ষড়যন্ত্র করেছিল, আর আমেরিকারইবা তাতে কী ভূমিকা ছিল সেই ইনটেলিজেন্স পুতিন এরদোগানকে জানিয়েছিলেন। এতে করে এরদোগানের আস্থা অর্জন করে তুরস্কের সাথে রাশিয়ার ভেঙে যাওয়া বাণিজ্যিক সম্পর্ক পুনরায় চালু করেছিলেন। পুতিনের রাশিয়ার সংগৃহীত ইনটেলিজেন্স বিক্রি বা শেয়ার অনেকভাবেই করা হয়, অনেক সময় তা প্রপাগান্ডায় ব্যবহারও করা হচ্ছে। অনেক সময় এক পাল্টা মিডিয়া রিপোর্ট করে দেয়া হয়, ফ্যাক্টস জানিয়ে দেয়ার জন্য। এমন এক সাংবাদিক, আমেরিকাবিরোধী এবং আন্তর্জাতিকভাবে খ্যাত কলাম লেখক হলেন পেপ এস্কোবার। তিনি রাশিয়ার দিকে তাকিয়ে অনেক সময় ভাষ্য তৈরি করেন। তবে আমাদের মতো পাঠকের সুবিধা হলো, যেহেতু রাশিয়ান ইনটেলিজেন্সে ঘনিষ্ঠতা থাকায় তিনি নিজে তা দেখতে জানতে পারেন আর তা তিনি লেখায় শেয়ার করেন, ফলে তার লেখা পাঠ করায় আমরা মেন-স্ট্রিমের বিপরীত তথ্য ও ভাষ্য পাই।

সৌদি আরবের এ ঘটনায় এস্কোবার দুটো রিপোর্ট লিখেছেন। একটি রাশিয়ান স্পুটনিক পত্রিকা, অন্যটি সিঙ্গাপুর থেকে প্রকাশিত সিরিয়াস পত্রিকা ‘এশিয়া টাইমস’-এ। প্রায় একই ধরনের রিপোর্ট তিনি লিখেছেন দুজায়গাতেই; কথিত ‘প্রাসাদ ক্যু’র রদবদলের চার দিনের মাথায় ২৪ জুন স্পুটনিকে। আর ‘এশিয়ান টাইমসে’ ২০ জুলাই।
প্রায় সব মিডিয়ার ভাষ্যে নতুন ক্রাউন প্রিন্স মোহাম্মদ বিন সালমান চিত্রিত হয়েছেন একজন কম বয়সী, বেপরোয়া, দায়িত্বজ্ঞানহীন, উচ্চাভিলাষী, হামবড়াভাবের মানুষ ইত্যাদি হিসেবে। এসবের মধ্যে মূল অভিযোগ হলো, তিনি কাজের গুরুত্ব ও দায়দায়িত্ব না বুঝেই সব কাজে মধ্যমণি থাকতে চান। গ্লোবাল বিনিয়োগ জগতের গুরুত্বপূর্ণ টিভি ও অনলাইন মিডিয়া ‘ব্লুমবার্গ’ তার নাম দিয়েছে ‘মি. এভরিথিং’।

এস্কোবার কিছু গুরুত্বপূর্ণ তথ্য প্রকাশ ও দাবি করেছেন যে, সিআইএ নায়েফের অপসারণে প্রচণ্ড অসন্তুষ্ট। কারণ তারা মনে করে প্রিন্স মোহাম্মদ নিজেই ‘টেররিজম স্পন্সর’ করেন। দাবি করা হচ্ছে আল-নুসরা সংগঠনের সাথে তিনি সম্পর্ক রেখেছেন। এ কারণে, এপ্রিল ২০১৪ সালে টেররিজম ইস্যুতে আমেরিকার সিআইএ সৌদি আরব ও আমিরাতের (বিশেষ করে আবুধাবির প্রিন্স জায়েদ, তিনি মোহাম্মদের মেন্টর/বড়ভাই বলে কথিত আছে) ক্ষমতাসীনদের ওপর প্রচণ্ড নাখোস হয়ে পড়েছিল। এমনকি তাদের অপসারণের কথা পর্যন্ত ভেবেছিল। পরে এক আপস ফর্মুলায় সাব্যস্ত হয় যে, বাদশাহ বদল করে নায়েফকে ক্ষমতায় এনে এর সমাপ্তি টানা হবে। এস্কোবার তার ইনটেলিজেন্স সোর্সকে উদ্ধৃত করে দাবি করেছেন, ওই ফর্মুলা সাব্যস্ত হওয়ার আগে আমেরিকা বা সিআইএ একপর্যায়ে সৌদি বাদশাহ’র বিরুদ্ধে নাকি আমেরিকান সৈন্য পাঠানোর কথা ভেবেছিল। এটা ভাবার কারণ আছে যে, ওই ফর্মুলাটাই প্রিন্স মোহাম্মদ ও তার বাবা বাদশাহ সালমানকে আরো কঠোর হতে উৎসাহিত করেছিল। ইতোমধ্যে খবর বেরিয়েছে, প্রিন্স মোহাম্মদ ও আবুধাবির প্রিন্স জায়েদ মিলে ভাড়াটে আমেরিকান সৈন্য (ব্ল্যাকওয়াটার) দিয়ে কাতারের তরুণ আমির শেখ তামিম আল থানিকে ক্ষমতাচ্যুত করার পরিকল্পনা করেছিলেন। কিন্তু এটা সিআইএ নাকি টের পেয়ে ভণ্ডুল করে দিতে সমর্থ হয়। কিন্তু তাতে ক্ষুব্ধ হয়ে প্রিন্স মোহাম্মদ ও বাদশাহ সালমান সিআইএ ’র পছন্দের হবু বাদশা নায়েফকেই সরিয়ে ফেলে দিতে সক্ষম হলেন। এটাই হলো এস্কোবারের ব্যাখ্যা। এটা হয়তো সবটা সত্যি নয়, কিন্তু ফেলনাও নয়। ২০১৫ সালের ২ ডিসেম্বর জার্মান ইনটেলিজেন্সের বরাতে লন্ডন টেলিগ্রাফ একটা রিপোর্ট ছেপেছিল। শিরোনাম ছিল ‘সৌদি আরব মধ্যপ্রাচ্যকে অস্থিতিশীল করে তুলছে’।

সেখানে সৌদি ক্রাউন প্রিন্স মোহাম্মদকে নাম ও ছবিসহ উল্লেখ করে, তাকে এক মহা ‘গ্যাম্বলার’, বিপজ্জনক ব্যক্তি ও ব্যক্তিত্ব হিসেবে উল্লেখ করে বলা হয়েছিল যে, সিরিয়াতে আলকায়েদার সাথে সম্পর্ক রয়েছে তার। সৌদি আরবকে মধ্যপ্রাচ্যে অস্থিতিশীলতা আনার জন্য দোষারোপ করা হয়েছিল। এস্কোবার বলছেন, এই অভিযোগটাই পরে কাতার অবরোধের সময় সৌদি আরব ও অন্যরা কাতারের বিরুদ্ধে তুলেছিল, যে অভিযোগের সবটাই আসলে সৌদি বাদশাহ ও বর্তমান ক্রাউন প্রিন্সের বিরুদ্ধে এনেছিল সিআইএ এবং জার্মান ইনটেলিজেন্স।
লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক

    Print       Email

You might also like...

রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ ধেয়ে আসছে

Read More →