Loading...
You are here:  Home  >  কলাম  >  Current Article

ফিকে হয়ে যাচ্ছে বিশ্ব শান্তির রংধনু

1527867265

মুহা. রুহুল আমীন : দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পূর্ব পর্যন্ত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ‘মনরো মতবাদ’ অনুসরণ করে বিশ্ব রাজনীতি থেকে বিচ্ছিন্ন থাকলেও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর নতুন বিশ্ব ব্যবস্থার নিয়ন্ত্রকের ভূমিকা গ্রহণ করে। স্বীয় জাতীয় স্বার্থ রক্ষায় তথাকথিত ‘বাস্তববাদ’ নীতির আলোকে বৈশ্বিক স্বার্থ রক্ষায় দেশটি কায়েমি স্বার্থতত্ত্ব, দখল তত্ত্ব, যুদ্ধতত্ত্ব অনুসরণ করে, ইতোমধ্যে স্নায়ু যুদ্ধের বাস্তবতায় বিশ্বব্যাপী ‘প্রভাব বলয়’ সৃষ্টির লক্ষ্যে রাষ্ট্রিক মূল্যবোধ ও আন্তর্জাতিক নৈতিকতা বিসর্জন দিয়েও রাষ্ট্রটি অনেক সময় নীতি চ্যুতির অপবাদ মাথায় তুলে নিয়েছে। এতদসত্ত্বেও গণতন্ত্র, মানবাধিকার, সাম্য, সুশাসন প্রতিষ্ঠায় স্বীয় পররাষ্ট্রনীতির মূল্যবোধকে যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃবৃন্দ সবসময় অগ্রাধিকার দিয়েছেন। কিন্তু দেশটির ইতিহাসে প্রথমবারের মতো প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প পররাষ্ট্রনীতি, কূটনীতি ও বহিঃরাষ্ট্রিক মূল্যবোধ থেকে সরে গিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের বহিঃইমেজ ও কূটনৈতিক চিরায়ত সংস্কৃতির ব্যাপক ক্ষতিসাধন করে চলেছেন। তার নিজস্ব রাজনৈতিক দল, বিরোধীদল ও যুক্তরাষ্ট্রের সুশীল সমাজের নাড়ির স্পন্দনও তিনি অনুভব করছেন কি না সন্দেহ।

ক্ষতায় আরোহণ করার আগে থেকে তিনি অভিবাসন ও কতিপয় আভ্যন্তরীণ ও পররাষ্ট্রিক বিষয়ে হঠকারী সিদ্ধান্তের কথা জানাচ্ছিলেন। তখন বিশ্ববাসী তার এ বক্তব্যকে প্রাক নির্বাচনী প্রচারণামূলক রাজনৈতিক বক্তব্য হিসেবেই মনে করেছিলেন। কিন্তু শপথ নেওয়ার পরপরই এক এক করে তার প্রাক নির্বাচনী আপত্তিকর নীতিসমূহের বাস্তবায়নের পথে পা রাখেন। বিশ্বশান্তি ও নিরাপত্তা রক্ষায় যুক্তরাষ্ট্র ঐতিহাসিকভাবে নেতৃত্বের ভূমিকা পালন করে আসছে। ফিলিস্তিন, ইরাক, সিরিয়াকে ঘিরে মধ্যপ্রাচ্যে অশান্তির দাবানল জ্বলতে থাকে। কিন্তু সেই প্রজ্বলিত বহ্নিশিখা যাতে আর কোনো লোকালয় জ্বালাতে না পারে সেজন্য যুক্তরাষ্ট্র শান্তি প্রতিষ্ঠায় মূল নায়কের জায়গায় অধিষ্ঠিত হয়। অসলো চুক্তি এবং এর পরবর্তী পদক্ষেপসমূহ দ্বিরাষ্ট্রিক সমাধানের পথে ফিলিস্তিন ইস্যুর শান্তিপূর্ণ নিষ্পত্তি খুঁজে পেলেও জেরুজালেমে ইসরাইলের রাজধানী স্থানান্তরের স্বীকৃতি ও জেরুজালেমে যুক্তরাষ্ট্রের দূতাবাস প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে ফিলিস্তিনের শান্তি প্রক্রিয়া নস্যাত্ করা হয়েছে। ফিলিস্তিনিরা এখন আর যুক্তরাষ্ট্রকে তাদের সমস্যায় কান্ডারীয় ভূমিকা দেখে না এবং এমনকি যুক্তরাষ্ট্রের কোনো মধ্যস্থতা ও তারা মেনে নেবে না বলে জানিয়ে দিয়েছে।

ইরাকের প্রেসিডেন্ট সাদ্দামকে দীর্ঘদিন মিত্রতার বন্ধনে রেখে হঠাত্ করে ইরাক আক্রমণ করে সাদ্দামকে উত্খাত করে কোনো রকম সেখানে একটি সরকার প্রতিষ্ঠা করে যুক্তরাষ্ট্র। কিন্তু সেই সরকার প্রধান হিসেবে একজন শিয়া প্রেসিডেন্টের প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের আস্থা শাণিত না হওয়ায় এখনো পর্যন্ত দেশটির গণতন্ত্র ও সুশাসন রক্ষায় যুক্তরাষ্ট্র কোনো কার্যকর পদক্ষেপ না নিয়ে কেবল যুদ্ধের মাধ্যমে ঐতিহাসিক স্থাপনার তীর্থভূমি ইরাককে ধ্বংসস্তূপে পরিণত করা হয়েছে।

সিরিয়ায় গৃহযুদ্ধ চলাকালে সরকার বিরোধী সন্ত্রাসীদেরকে ঠাঁই দিয়ে সিরিয়াকে আধুনিক বিশ্বের সবচেয়ে বড় বিপদগ্রস্ত দেশে পরিণত করা হয়েছে। আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক বৃহত্ শক্তিবর্গের মিশ্র ও জটিল ভূমিকায় সিরিয়া প্রলম্বিত যুদ্ধের শিকার হলেও রাশিয়া, ইরান ও তুরস্কের সতর্ক ও কার্যকর কূটনীতির কারণে সিরীয় যুদ্ধের অবসান হয়েছে। কিন্তু যুদ্ধ শেষে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের শত্রুতামূলক ও প্রতারণাপূর্ণ পদক্ষেপের জন্য সিরিয়ার শান্তি প্রক্রিয়া বিলম্বিত হচ্ছে।

সিরিয়াসহ মধ্যপ্রাচ্য ও অন্যান্য যুদ্ধকবলিত দেশ ও জনপদ হতে শরণার্থীর ও অভিবাসীর ঢল নামতে শুরু করলে যুক্তরাষ্ট্রের মিত্র ইউরোপ বিভিন্নভাবে সেই শরণার্থীদের আশ্রয় দেওয়ার ব্যাপারে গড়িমসি করে আন্তর্জাতিক আইন লংঘন করে চলেছে। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পও শরণার্থী ও অভিবাসী নীতির পুনর্মূল্যায়ন করে মেক্সিকো ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে সীমানা দেওয়াল নির্মাণ করে এবং সর্বোপরি চিহ্নিত কতিপয় মুসলিম দেশের নাগরিকদের যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশ ও বসবাসে বাধা দিয়ে অভিবাসীদের তীর্থস্থান যুক্তরাষ্ট্রের চিরায়ত অভিবাসন সংস্কৃতির মূলোত্পাটন করছেন। প্যারিস জলবায়ু চুক্তি থেকে সরে এসে যুক্তরাষ্ট্র এই বার্তা দিয়েছে যে, দেশটি পৃথিবী ও প্রকৃতির শান্তি ও স্বস্তির প্রতি কোনো অনুভূতি ধারণ করে না।

মধ্যপ্রাচ্য ও উপসাগরীয় এলাকার পরমাণু বিস্তার ও পারমাণবিক শক্তির প্রতিযোগিতা রুখতে পঞ্চশক্তি + এক রাষ্ট্রবলয়ের সঙ্গে ইরানের পারমাণবিক চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প সম্প্রতি সেই চুক্তি থেকে যুক্তরাষ্ট্রকে সরিয়ে নিয়ে ইরানের পারমাণবিক অস্ত্রায়নের ঝুঁকি তৈরি করেছেন এবং অত্রাঞ্চলের শান্তির প্রতি হুমকি সৃষ্টি করেছেন। স্পষ্টত মধ্যপ্রাচ্যের চিরায়ত মিত্র ইসরাইল ও সৌদী আরবকে তুষ্ট করতে ট্রাম্প ইরান চুক্তি বাতিল করেছেন। যুক্তরাষ্ট্রের নতুন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মাইক পম্পেও ‘প্লান বি’ নামক যে নতুন ইরান নীতি ঘোষণা করেছেন তা স্পস্টত ইরানের সরকার এবং প্রেসিডেন্ট রুহানির প্রতি হুমকি হিসেবে বিবেচনা করে ইরান তা আস্তাকুঁড়ে ছুড়ে দিয়েছে।

ইউরোপীয় রাষ্ট্রসমূহ এবং চীন ও রাশিয়ার সঙ্গে ইরানের পূর্বোক্ত চুক্তির পরিবর্তিত রূপদানের প্রক্রিয়ায় হয়ত এ নতুন চুক্তি সহজ হবে না। তবুও ‘ডলার ভিত্তিক’ বিশ্ববাণিজ্যের বদলে ইউরো ভিত্তিক বাণিজ্যের নতুন মডেল স্থাপিত হবে অথবা সনাতনকালের বিনিময় প্রথায় ইরান ইউরোপ আন্তঃবাণিজ্যের নতুন দুয়ার উন্মোচিত হবে। তবে যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে উপসাগরীয় এলাকায় অভিজাত রাষ্ট্র ইরানের সঙ্গে চুক্তির মাধ্যমে পারমাণবিক অস্ত্রায়নের আঞ্চলিক প্রতিযোগিতা বন্ধ করে মধ্যপ্রাচ্যে শান্তি প্রতিষ্ঠায় নেতৃত্বদানের যে সুযোগ যুক্তরাষ্ট্রের হাতে ছিল, তা এখন অপসৃত। ইসরাইলের পারমাণবিক অস্ত্রের বিপরীতে ইরান যদি পারমাণবিকায়নের পথে পা রাখে, তবে তাকে শাসানোর কোনো নৈতিক ভিত্তি থাকবে না আন্তর্জাতিক সমাজের হাতে, ইউএই ইতোমধ্যে পারমাণবিক রিএ্যাক্টর প্রোগ্রাম হাতে নিয়েছে। সৌদী আরবের যুবরাজ বিন সালমানও পারমাণবিক রিএ্যাক্টর টেকনোলোজি অর্জন করার কথা বলে যাচ্ছেন। মধ্যপ্রাচ্য বিষয়ক বিশ্লেষকগণ মধ্যপ্রাচ্যে পারমাণবিক প্রতিযোগিতায় ঝুঁকি পর্যবেক্ষণ করছেন এবং মধ্যপ্রাচ্যের আঞ্চলিক শান্তি বিনষ্টের নতুন হুমকি হিসেবে পারমাণবিক অস্ত্রায়নের বিষয়টিকে বিবেচনা করছেন।

কোরীয় উপদ্বীপে শান্তির যে সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে সাম্প্রতিক সময়ে তাও প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের হঠকারি সিদ্ধান্তে নস্যাত্ হওয়ার উপক্রম হয়েছিল। দক্ষিণ কোরিয়াতে প্রেসিডেন্ট মুন জায়ে ইন এবং উত্তর কোরিয়ার নেতা কিম জং উন দু’কোরিয়ার একত্রীকরণ করে ১৯৫০ সাল থেকে চলমান কোরীয় উত্তেজনা দূর করে শান্তি স্থাপনের যে উদ্যোগ নিয়েছেন, তাতে বিশ্ববাসী কোরীয় উপদ্বীপে নতুন আনন্দ যুগের স্বপ্ন দেখছে। হঠাত্ করে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প সিংগাপুরে অনুষ্ঠেয় ট্রাম্প-উন শীর্ষ সম্মেলন বাতিল করেন এবং দক্ষিণ কোরিয়ার সঙ্গে সামরিক ড্রিল করে সম্ভাব্য কোরীয় একত্রীকরণের পথে বড় বাধা সৃষ্টি করেন। এখন ট্রাম্প-উন শীর্ষ বৈঠক শেষ পর্যন্ত হয় কিনা কিংবা তার ফলাফল কী হয় তাই দেখার বিষয়।

উপর্যুক্ত অবস্থায় বিশ্বসমাজের কাছে আজ এ প্রশ্ন খুব বড় হয়ে দেখা দিয়েছে যে, আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নিরাপত্তা ও স্বস্তির যে সম্ভাবনা তৈরিতে যুক্তরাষ্ট্র ভূমিকা রেখেছে তা ট্রাম্পের ভ্রম পররাষ্ট্রনীতির কারণে নস্যাত্ হতে চলেছে। বিশ্ব জনমনে প্রশ্ন: বিশ্ব শান্তির উদীয়মান রংধনু কি ফিকে হয়ে যাচ্ছে?

লেখক : অধ্যাপক, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
ইমেইল :mramin68@yahoo.com

    Print       Email

You might also like...

Mofajjol-Karim

সামাজিক বৈষম্যের ঈদ আর কত দিন

Read More →