Loading...
You are here:  Home  >  আমেরিকা  >  Current Article

বস্টনে ঈদের দিনলিপি

আনিসুল হক
0495c74a3cb92b8c7028346676f1da6b-59aaaacf2e70d

শুক্রবারে ঈদ হচ্ছে এখানে, আমেরিকায়। আগের রাত থেকেই আমরা ঈদের আবহের মধ্যে ঢুকে পড়েছি। রত্না আপা, শরিফ ভাইয়ের বাসায়, ম্যাসাচুসেটস রাজ্যের বস্টন-ঘেঁষা একটা উপশহর শ্যারনে। সন্ধ্যার পর এ বাড়ি-ও বাড়িতে একত্র হওয়া গেল, ঈদের আগের রাত উদ্‌যাপন, প্রধানত মেহেদি উৎসব। ওদের মেয়ে এশা চমৎকার মেহেদি দিতে জানে।
আজ সকাল সকাল গোসল সেরে আমরা বেরিয়ে পড়লাম ঈদের নামাজ পড়তে। ওয়েল্যান্ড মসজিদের দ্বিতীয় জামাত সাড়ে ৯টায়। গাড়ি উপচে পড়ছে, আমাদের গাড়ি রাখতে হলো ওভারফ্লো পার্কিংয়ে, পাশের এক ইহুদি প্রতিষ্ঠানের চত্বরে।
নারী-পুরুষ একই ঘরে নামাজের ব্যবস্থা, পুরুষেরা সামনে, মেয়েরা পেছনে এই রেওয়াজটা ভালো লাগছে। মেরিনা জীবনে প্রথম ঈদের নামাজ পড়লেন। এই জামাতে বিভিন্ন জাতি-গোষ্ঠীর মানুষ এসেছেন, সাদা-কালো, এশীয়, আফ্রিকান, ইউরোপীয়। ইমাম সাহেব তাঁর বয়ানে বলতে লাগলেন, ইসলাম ধর্মে নারীদের কতটা উচ্চ আসন দেওয়া হয়েছে, সে সম্পর্কে।
দেশের কথা মনে পড়ছে। আমার ভ্রাতুষ্পুত্রের ফেসবুক পোস্ট দেখলাম, ঢাকার হাটে গরু কম। শেষ মুহূর্তে গরু কিনতে গিয়ে গত বছর, তার আগের বছর অনেকেই জিতেছিলেন, এবার তাদের চুল ছিঁড়তে হয়েছে। ঈদের আগের দিনে আমার প্রধান কাজ থাকে গরু কেনা, ছাগল কেনা। এরপর আমি ঝাড়া হাত-পা, যা করার বাসার মেয়েরা করেন।
আমরা বলি, ঈদে সবাই স্বজনের কাছে যায়, শৈশবের কাছে যায়, স্মৃতির কাছে যায়, আদিবাড়িতে যায়। যখন বলি, তখন ভুলে যাই দেশের অর্ধেক মানুষের কথা, নারীদের কথা। মেয়েরা নিজের মা-বাবার কাছে যান কমই, তাঁরা যান শ্বশুরবাড়িতে, শ্বশুরবাড়িকেই নিজের বাড়ি বলে গণ্য করেন তাঁরা। আর আমরা কেউই এবার ঈদে রূপার কথা ভুলতে পারব না। রূপা আমাদেরই মেয়ে। রূপা তাঁর মাকে চমকে দিতে চেয়েছিল। রূপা তাড়াশ উপজেলার মেয়ে, বগুড়া আজিজুল হক কলেজে পড়েছে, ল কলেজে পড়েছে, এনজিওতে চাকরি করত। এমন একটা মেয়ে বাসে চড়ে নিরাপদে গন্তব্যে পৌঁছাতে পারল না! আমরা বলি, মনের পশুকে কোরবানি দেওয়ার কথা। পুরুষদের ভেতরে যে পশু বাস করে, তাকে রুখবে কে?
আমি রূপার জায়গায় নিজেকে ভাবি। আচ্ছা, ধরা যাক, আমার মানিব্যাগটা কিংবা মোবাইল ফোনের লোভেই কেউ বাসের মধ্যে আমাকে মারতে লাগল, আমার ঘাড় মটকে দেবার চেষ্টা করছে…না, আমি আর ভাবতে পারছি না। রূপা নাকি তাঁর সঙ্গে থাকা টাকা আর মোবাইল ফোন দিয়ে বলেছিলেন, ‘এসব নিন, আমার কোনো ক্ষতি করবেন না। আহা, আমার মেয়ে। আহা, আমার মা। আহা, আমার বোন। আমরা আমাদের আত্মজাদের নিরাপত্তা দিতে পারলাম না। রূপাকে না, তনুকে না। তনু হত্যার বিচার যদি এগোতো, রূপা হয়তো বেঁচে যেত। এখন রূপার ওপর হামলাকারী নরপশুদের দৃষ্টান্তমূলক সাজা চাই।
জানি না, মানুষ কেন মানুষকে আঘাত করে। মানুষ কেন মানুষকে ভায়োলেট করে।
আমার তো ওই শিশুদের কথা ভেবেও বুকের ভেতরটা হাহাকার করে ওঠে। মিয়ানমার থেকে পালাতে গিয়ে নৌকাডুবিতে যে শিশুরা মারা গেল, যাদের লাশ উদ্ধার করে আনা হচ্ছে, কাগজে ছবি বেরোল, সেই শিশুদের কী অপরাধ? সে কোন ধর্মের, কোন ভাষার, কোন নৃগোষ্ঠীর, সেটা কি বড়, নাকি সে আমার আপনার শিশুর মতো একটা শিশু, সেটাই বড়। ওই শিশু তো রাজনীতি করে না, রাজনীতি বোঝে না, ওই শিশু তো রাষ্ট্র বোঝে না, সীমানা জানে না, ওকে কেন মরতে হলো? ওদের কেন মরতে হয়।
বাংলাদেশের ১২ ঘণ্টা আগে আমেরিকার ঈদ পালিত হলো। আমাদের এবার ঈদটা বেশ ভালোই হলো বলতে হবে। আমরা এক বাড়ি থেকে আরেক বাড়িতে গেলাম, বাঙালিদের বাড়ি, ছোটবেলায় এই রকম করে বাড়ি বাড়ি গিয়ে নানা কিছু খেয়ে পেট ফুলিয়ে ফিরতাম। পা টনটন করত।
রাতের বেলা ফিরছি ছায়ানটের রুমি ভাই আর জলি আপার বাসা থেকে। মুশতাক তালুকদার শোনালেন বঙ্গবন্ধুর ভাষণ, আবদুল আলীমের গান। রুমি শোনালেন রবীন্দ্রসংগীত।
আমার প্রাণের পরে চলে গেল কে…শুনে ফিরছি। বস্টনের উপশহরগুলোর পথ ধরে, আকাশে একাদশীর চাঁদ। লেখন ভাই গাড়ি চালাচ্ছেন। কেয়া ভাবি অদিতি মহসিনের সিডি চালিয়ে দিলেন…চাঁদটা আমাদের সঙ্গে সঙ্গে চলেছে, অদিতি গেয়েই চলেছেন, দিবসরজনী আমি যেন কার আশায় আশায় থাকি…।

    Print       Email

You might also like...

b01c8e0fdd54d48c68ebf1085003cbb9-5a119ec59360d

নিউইয়র্কে বিতাড়নের খড়গে আরও এক বাংলাদেশি

Read More →