Loading...
You are here:  Home  >  কলাম  >  Current Article

বাংলাদেশকে বিশ্ববাণিজ্যের সুবিধা নিতে হবে

আবু আহমেদ

9ABE281A-E107-4667-A384-86689D858E82

আগের মতো সব দেশকে নিয়ে বাণিজ্য, সে পথ থেকে বিশ্ব এখন সরে যাচ্ছে। বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার (WTO) অধীনে একক নিয়মের মাধ্যমে বিশ্বব্যাপী বাণিজ্য ও বিনিয়োগ উদারীকরণের প্রচেষ্টা এখন থেমে গেছে।

বরং বলা চলে, সেই প্রচেষ্টা এখন পরিত্যাজ্য। বাণিজ্য ও বিনিয়োগ উদারীকরণের ক্ষেত্রে সর্বশেষ গ্লোবাল উদ্যোগ ছিল দোহা রাউন্ড (Doha round) সাফল্যের দ্বারপ্রান্তে এসে বড় অর্থনীতিগুলোর, বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের বিরোধিতার কারণে সেই রাউন্ড এখন পরিত্যক্ত। এখনো শোনা যাচ্ছে, বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার উদ্যোগে এ পর্যন্ত অর্জিত ট্রেড ও বিনিয়োগ উদারীকরণের অনেক ইস্যুকে আর কার্যকর করতে দেওয়া হবে না। এর অর্থ কী? তাহলে কি বিশ্ব এক ধরনের সংরক্ষণবাদের দিকে ফিরে যাচ্ছে? উত্তর—হ্যাঁ, না, উভয়ই। বিশ্ব অর্থনীতি বৃদ্ধি পেলে সংরক্ষণবাদের মধ্যেও গ্লোবাল ট্রেড ও বিনিয়োগ বাড়বে, এটিই স্বাভাবিক। তবে সেই বৃদ্ধির গতি হবে অনেক শ্লথ। আগের মতো বিশ্বব্যাপী প্রায় এক অর্থনীতির স্বপ্ন আপাতত আর বাস্তবায়িত হচ্ছে না। যুক্তরাষ্ট্র কি দোহা রাউন্ড থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়ে বেশি উপকৃত হবে? হবে না। তবে তারা মনে করে, এক ধরনের অন্তর্মুখী বা সংরক্ষণবাদের মাধ্যমে তারা তাদের প্রতিযোগী অর্থনীতিগুলো থেকে ভালো করবে। হ্যাঁ, সেটা সত্য। তবে এই নীতির কারণে তাদেরও ব্যয় বাড়বে। তাদের ভোক্তাদের উচ্চমূল্য দিয়ে পণ্য কিনতে হবে। কিন্তু বর্তমান মার্কিন প্রশাসন স্বল্প মেয়াদের অর্জনে বিশ্বাসী। তার এবং তার সঙ্গে যেসব রিপাবলিকান আছে তারা মনে করে, অন্য দেশ থেকে সস্তায় পণ্য ও সেবা প্রবেশ করতে না দিলে তাদের দেশে অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে বিনিয়োগ বাড়বে এবং তাদের বেশি লোক কর্মসংস্থান পাবে। এই বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানের পক্ষে এই যুক্তি অতি পুরনো। কিন্তু সেই যুক্তি যদি পণ্য হতো, তাহলে মার্কিন অর্থনীতিবিদ ও বাণিজ্য বিশেষজ্ঞরা এ ধরনের আধাসংরক্ষণবাদের বিরুদ্ধে অবস্থান নিতেন না। এটিও ঠিক, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরের সময়গুলোতে বিশ্বব্যাপী বাণিজ্য ও বিনিয়োগের উদারীকরণের ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের বড় ভূমিকা ছিল। এই মার্কিনরা পক্ষে থাকলে এই দুই ক্ষেত্রে কোনো গ্লোবাল পলিসি সহজেই পাস হয়ে যেত। আর মার্কিনরা না চাইলে এই দুই ক্ষেত্রে কোনো এজেন্ডাই এগোত না। যুক্তরাষ্ট্র তাদের অর্থনৈতিক ইতিহাসে যে কখনো কখনো সংরক্ষণবাদের (Protectionism) দিকে যায়নি তা নয়। তারা গিয়েছে আবার সরেও এসেছে।

গত শতাব্দীর নব্বইয়ের দশক থেকে বিশ্বব্যাপী ট্রেড ও বিনিয়োগ উদারীকরণের বিষয়গুলো নতুন গতি পায়। আগে বাণিজ্য নিয়ে দর-কষাকষি হতো দুই বা কয়েকটি অর্থনীতির মধ্যে। এই সময়ের পরে এই দুই বিষয়ে সামগ্রিকভাবে বিশ্বের সব দেশকেই সম্পৃক্ত করা হয়। এর সুফলও ছোট ও মাঝারি অর্থনীতিগুলো পেয়েছে। বিগত তিন দশক বিশ্ববাণিজ্য যে হারে বেড়েছে তার থেকে বেশি হারে বেড়েছে বাংলাদেশসহ বেশ কয়েকটি অনুন্নত অর্থনীতির। বাণিজ্য ও বিনিয়োগের ক্ষেত্রে শুল্ক বাধা দূর এবং অন্য বাধাগুলো দূর করার ওই প্রচেষ্টার নাম দেওয়া হয়েছে গ্লোবালাইজেশন তথা বিশ্বায়ন। একপর্যায়ে মনে হচ্ছিল ভৌগোলিক সীমাগুলো থাকবে শুধু নামে। বাণিজ্য ও বিনিয়োগ প্রচারে ওইগুলো কোনো বাধা হবে না। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রের ইউ টার্নের মাধ্যমে সেই আশা এখন বহুদূরে সরে গেছে। ছোট অর্থনীতিগুলোর পক্ষে গ্লোবালাইজেশনের পক্ষে নেতৃত্ব দেওয়া সম্ভব নয়। এবং সেটি ফলপ্রসূও হবে না। ছোট অর্থনীতিগুলো উপকৃত হয়েছিল বড় অর্থনীতিগুলোর বাজারে পণ্য বেচে। যেমন বাংলাদেশের তৈরি পোশাক রপ্তানির ক্ষেত্রে যে উত্তরণ সেটি সম্ভব হয়েছে গ্লোবাল ট্রেড উদারীকরণের কারণে এবং ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে রপ্তানির মাধ্যমে। বাংলাদেশ কোনো ছোট অর্থনীতিতে বা তার সম কোনো অর্থনীতিতে পণ্য বেচে লাভবান হতে পারেনি। এই একই কথা সত্য অন্য ৪৭টি অনুন্নত দেশের ক্ষেত্রেও। এখন যখন দোহা রাউন্ড থেমে গেছে তখন যদি বাংলাদেশ বিকল্প পথের সন্ধান না করে, তাহলে হেরে যাবে বাংলাদেশই। ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে আমাদের রপ্তানি বাণিজ্য আরো অনেক বাড়বে—এমন আশা করাটা মোটেই ঠিক হবে না। যুক্তরাষ্ট তো আগেই আমাদের রপ্তানি পণ্যের ওপর বেশি কর (Duty) বসাত। আসলে তারা সেই কর বাড়াতে পারে, কমানোর প্রশ্নই আসে না। একই অবস্থা ইউরোপীয় ইউনিয়নের ক্ষেত্রেও। তাদের থেকে আর অতিরিক্ত কোনো সুবিধা পাওয়া যাবে না। আর বাংলাদেশ অর্থনীতির চালিকাশক্তি হলো তার রপ্তানি বাণিজ্যে প্রবৃদ্ধি। এই প্রবৃদ্ধি বন্ধ হয়ে গেলে বাংলাদেশের উচ্চ প্রবৃদ্ধিতে পৌঁছানোর বিষয়টি অধরাই থেকে যাবে। তাহলে বিকল্প কী? বিকল্প আছে। তবে বাংলাদেশ বোধ হয় ঠিকমতো দেয়ালের লেখাগুলো পড়তে পারেনি। বাংলাদেশ পড়ে আছে অতীতের অর্জন নিয়ে। ভবিষ্যতে কী হবে, তা নিয়ে বাংলাদেশ কম ভাবছে।

যুক্তরাষ্ট্র সংরক্ষণবাদের দিকে গিয়ে এরই মধ্যে বাড়তি শুল্ক আরোপ করেছে। তবে অনেক ভেবেচিন্তে তার বন্ধুদের এই শুল্ক থেকে ছাড় দিয়েছে। বন্ধুরা হলো—ইউরোপীয় ইউনিয়ন, ব্রাজিল, কানাডা ও মেক্সিকো। তাহলে অন্য কোনো দেশের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের শুল্ক খড়্গ পড়তে পারে? বাকি আছে চীন-ভারত। যারা ওদের বাজারে এই দুটি পণ্যের বড় বিক্রেতা। কিন্তু এই দুটি দেশের সুবিধা হলো, এরা দর-কষাকষি করতে পারবে। যেমন চীন এরই মধ্যে কিছু মার্কিন পণ্যের ওপর পাল্টা শুল্ক আরোপ করেছে। চীন হলো বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থনীতি। বিশ্ব অর্থনীতিতে এখন যে প্রবৃদ্ধি বইছে তার ৩ শতাংশ জোগান দিচ্ছে চীন। বলা যায়, একসময়ে যুক্তরাষ্ট্রকে বলা হতো বিশ্ব অর্থনীতির চালিকাশক্তি। এখন সেই অবস্থানটা চলে গেছে চীনের অধীনে। সুতরাং চীনকে হটিয়ে যুক্তরাষ্ট্র সুবিধা করতে পারবে সেটি ভাবার কোনো কারণ নেই। একপর্যায়ে চীনের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রকে অবশেষে একটি সমঝোতায় আসতে হবে। ভারতের দর-কষাকষির অনেক ক্ষেত্র আছে। ভারত এখন পঞ্চম বৃহত্তম অর্থনীতি। ভারতের কেনাকাটা বিশাল অঙ্কের। এর মধ্যে আছে দেশরক্ষার জন্য উচ্চ প্রযুক্তির সরঞ্জাম। ভারত যুদ্ধবিমান, ট্যাংকসহ অন্য অনেক ডিফেন্স সামগ্রী অন্য সূত্র থেকেও সংগ্রহ করতে পারে। সুতরাং যুক্তরাষ্ট্র যদি মনে করে, একতরফা সংরক্ষণবাদের নীতি গ্রহণ করে তারা জয়ী হবে, সেই ধারণা ভুল। যুক্তরাষ্ট্রের সুবিধা হলো, তারা অন্য ছোট দেশগুলোকে কৌশলে অস্থিতিশীল করতে পারে। অস্থিতিশীল করলে তারা অস্ত্র বিক্রয় করতে পারে। এবং ওই সব দেশ এ অঞ্চল থেকে বড় রকমের ক্যাপিটাল ফ্লাইট (Capital Flight) ঘটে। এই কৌশল অবলম্বন করে অনেকে অর্থের পরিমাণে অনেক উপকার পাচ্ছে। হেরে যাচ্ছে ছোট ছোট অর্থনীতি, যারা স্বাধীন থাকতে চেয়েছে। বাংলাদেশকে চারদিকে খেয়াল রাখতে হবে।

বাংলাদেশের জন্য সর্বোত্তম নীতি হবে, যারা সুবিধা দিতে চায় সেটি গ্রহণ করা। বাংলাদেশ এক অর্থে ভাগ্যবান যে এক দরজা বন্ধ হলে বাংলাদেশের জন্য অন্য দরজা খুলে যায়। বাংলাদেশের ভৌগোলিক অবস্থান একটা সম্পদ। এ জন্য অনেকে এসে বাংলাদেশের দরজায় কড়া নাড়বে। আমাদের দেখতে হবে যারা বিনিময়ে কিছু দেবে, আমরা তাদের জন্যই শুধু দরজা খুলব। এখনো বন্ধুদের মধ্যে মুক্তবাণিজ্য চুক্তি এবং বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল গঠনের প্রক্রিয়া চলছে। তবে সবাইকে নিয়ে সেই প্রক্রিয়া আপাতত আর হবে না। বাংলাদেশের সামনে চীনের একটি বড় সুযোগ। অনেক দেশ চীনের অর্থ নিজেদের উপকারে ব্যবহার করছে। বাংলাদেশ কি বিষয়টি ঠিকমতো অনুধাবন করছে? মনে রাখতে হবে, চীন যা বাংলাদেশকে দিতে পারবে, অন্য কোনো দেশ বাংলাদেশকে দিতে পারবে না। চীনের ইচ্ছা ও শক্তি উভয়ই আছে। আমরা কেন ইতস্তত করছি চীনের সঙ্গে একটি এফটিএ (FTA) বা মুক্তবাণিজ্য চুক্তি সই করতে? আমরা যদি পুরনো দিনের মতো হিসাব করতে থাকি চীনের সঙ্গে এফটিএ সই হলে আমরা কোটি কোটি টাকার রাজস্ব আয় হারাব, তাহলে তো একই যুক্তিতে বিশ্বে একটিও এফটিএ সই হতো না। চীনের সঙ্গে সম্পর্কটা সামগ্রিকভাবে দেখতে হবে। একটি এফটিএর মাধ্যমে বাণিজ্য বাড়লে সঙ্গে সঙ্গে আমাদের অর্থনীতিতে ভেতর ও বাইরে থেকে বিনিয়োগও বেড়ে যাবে। এটি প্রবৃদ্ধিতে প্রবেশ করেছে এমন একটিও অর্থনীতি বিশ্বে নেই, যে অর্থনীতি অন্য বড় অর্থনীতির সঙ্গে অংশীদারি লাভ করেনি। যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে বাণিজ্য সুবিধা ছাড়া তাইওয়ান-সিঙ্গাপুর-কোরিয়া কি আজকের অবস্থানে যেতে পারত? বাংলাদেশ যেন বিচ্ছিন্ন থাকার মানসিকতা থেকে বের হয়ে আসে, এটিই আমাদের প্রত্যাশা। চীন বাংলাদেশের বড় রকমের বাণিজ্য সহযোগী হলে অন্য বড় অর্থনীতিগুলো আমাদের তাদের অংশীদার হিসেবে পেতে চাইবে। একটি এফটিএ অন্য এফটিএগুলোর পথকে সুগম করবে। ওই অবস্থায় বাংলাদেশের ব্যক্তি খাতের বিনিয়োগকারীদের মধ্যে আশাবাদের একটি জোয়ার বয়ে যাবে। আর তখনই শুধু বাংলাদেশের অর্থনীতি ৮ শতাংশ হারে বাড়তে থাকবে। এসব কথা বাংলাদেশকে কোনো ঋণদানকারী সংস্থা বলে দেবে না। এই চিন্তা ও সিদ্ধান্ত বাংলাদেশকেই করতে হবে।

লেখক : অর্থনীতিবিদ, অধ্যাপক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

    Print       Email

You might also like...

Saadat-hossain

বৈষয়িক তরক্কির পদ্ধতি প্রক্রিয়া বিকৃতি ভেজালে আক্রান্ত হওয়ার সমূহ আশঙ্কা থাকে

Read More →