Loading...
You are here:  Home  >  এক্সক্লুসিভ  >  Current Article

বাংলাদেশে পানি সংকট প্রাসঙ্গিক আলোচনা

Riverমো. আমান উল্লাহ: ছোটবেলা থেকেই আমরা জেনে আসছি পানির অপর নাম জীবন। তবে বর্তমান সময়ে এসে প্রশ্ন জাগে যে, পানি মাত্রই কি জীবন? বিশিষ্ট মিডিয়া ব্যক্তিত্ব হানিফ সংকেত পরিচালিত জনপ্রিয় টিভি অনুষ্ঠান ইত্যাদির এক পর্বে নানা-নাতির অভিনয়ে নাতি তার নানার ভুল ধরিয়ে বলেছিল, বিশুদ্ধ পানির অপর নাম জীবন, দূষিত পানির অপর নাম মরণ। অনুষ্ঠানটি বিনোদনমূলক হলেও কথাটি সর্বাংশে সত্য।
মানুষের প্রথম ও প্রধান মৌলিক চাহিদা হচ্ছে খাদ্য। পানি হচ্ছে সেই খাদ্যের প্রধান অংশ। এমনকি স্বাভাবিক খাদ্য না খেয়ে একজন মানুষ অনেক দিন পর্যন্ত বেঁচে থাকতে পারে। কিন্তু পানি না খেয়ে বেশি দিন বেঁচে থাকার আশা করা যায় না। সমগ্র বিশ্ব জুড়েই তাই পানির এত গুরুত্ব। মহান আল্লাহ সেই প্রেক্ষিতে পৃথিবীর প্রায় তিন চতুর্থাংশই পানি দিয়ে ভর্তি করে রেখেছেন। পানি শুধু মানুষের জন্য নয়, গোটা প্রাণীকুলের জন্য আল্লাহ প্রদত্ত এক অসাধারণ নিয়ামত। তাই কোন মানুষ যদি অপর মানুষকে পানিতে মারার কথা বলে তাহলে তা হবে আল্লাহর নিয়ামতে সরাসরি বিরোধিতা তথা গর্হিত অপরাধ।
বর্তমানে আমাদের দেশে পানি সংকটের যে আশংকা পরিদৃষ্ট হচ্ছে তাকে ছোট করে দেখার কোন যুক্তি নেই। আমাদের দেশে পানি সংকটের ব্যাপকতা সত্যিই ভাবনার বিষয়। কারণ, আমাদের দেশে খাবার পানির যেমন সংকট তেমনি ভূমির অভ্যন্তর থেকে টেনে তোলা সেচের পানিরও সংকট। উপরন্তু বিল-ঝিল, হাওর-বাঁওড়, নদী-নালা ইত্যাদির পানি ক্রমেই হ্রাস পাচ্ছে। এক সময় এদেশে ছিল ৫০০০ মাইল দীর্ঘ নদী-নালা। এখন তা হ্রাস পেয়ে ১০০০ মাইলে এসে দাঁড়িয়েছে। বিষয়টি আশংকাজনক বৈকি।
আমরা পত্র-পত্রিকায় দেখি রাজধানী ঢাকা ও বন্দরনগরী চট্টগ্রামসহ বিভিন্ন শহরে খাবার পানির তীব্র সংকট। ভুক্তভোগী  মানুষ কর্তৃক কলসী নিয়ে মিছিল করে সরকারের দৃষ্টি আকর্ষণ করার চিত্রও আমরা দেখি। আবার ঢাকাসহ বিভিন্ন স্থানে যে পানি সরবরাহ করা হয় তা কতটুকু খাবার উপযোগী বা বিশুদ্ধ তা আল্লাহই মালুম। রাজধানীতে বহু স্থানে পানির জন্য হাহাকার চলে আবার বহু স্থানে দুর্গন্ধযুক্ত পানি পাওয়া যায়। যদিও কিছুদিন পূর্বে প্রথম আলো পত্রিকার রিপোর্টে ওয়াসা’র এক কর্মকর্তার বক্তব্য উদ্ধৃত করা হয়। তিনি বলেন, রাজধানী ঢাকায় যে পরিমাণ পানি প্রয়োজন তার চেয়ে উৎপাদন বেশি হয়। কিন্তু এরূপ কথার সাথে বাস্তবতার মিল খুঁজে পাওয়া দুষ্কর।
বাংলাদেশে কৃষিকার্যে ব্যবহার করার জন্য এক সময় প্রাকৃতিকভাবে সেচের পানি পাওয়া যেত। এখন সে অবস্থা যেন কল্পনার জগতে চলে গিয়েছে। সেচের পানির জন্য যেসব গভীর ও অগভীর নলকূপ ব্যবহার করা হয় তাতে প্রচুর ডিজেল দরকার হয়। সেই ডিজেলের মূল্য পরিশোধ করতে গিয়ে কৃষকদের আজ নাভিশ্বাস উঠার উপক্রম। এত টাকা-কড়ি খরচ করে কৃষক যদি তার উৎপাদিত পণ্যের যথাযথ মূল্য না পায় তাহলে মাথায় হাত দেয়া ছাড়া তার আর কোন গত্যন্তর থাকে না।
তবে প্রাকৃতিকভাবে পানি পাওয়ার চেষ্টা অব্যাহত রাখতে হবে। এজন্য পানির প্রাকৃতিক আধার যেমন, পুকুর, ডোবা, বিল-ঝিল, হাওর-বাঁওড় ইত্যাদি সংরক্ষণে সবিশেষ উদ্যোগী হতে হবে। অনেক গ্রামে-গঞ্জে লোকেরা জলাশয় শুকিয়ে কৃষিজমি হিসেবে ব্যবহার করার প্রতিযোগিতায় লিপ্ত হয়। এটি একটি চরম বোকামী।
এ ব্যাপারে গুরুত্বপূর্ণ কাজ হলো নদীগুলোর নাব্যতা বহাল রাখা। এ প্রেক্ষিতে নদী খনন কার্যে সরকারের উদ্যোগ নদীর জোয়ার ভাটার মতোই কখনো দেখা যায় আবার কখনো বা পাত্তাই থাকে না।
আমরা লক্ষ্য করছি, পদ্মায় ফারাক্কা বাঁধের কারণে রাজশাহী তথা উত্তর বঙ্গ মরুময় হয়ে উঠছে। ফলশ্রুতিতে পদ্মা পাড়ের অসংখ্য মানুষ আজ জীবিকা হারা। এখন আবার তিস্তার মুখে টিপাইমুখ বাঁধ দিয়ে সিলেট ও ময়মনসিংহ অঞ্চলের বিস্তীর্ণ হাওর এলাকা পানিশূন্য করার চক্রান্তের থাবা আমাদের দিকে এগিয়ে আসছে।
এদেশের যে সকল স্পষ্টভাষী ও দেশপ্রেমিক নেতৃবৃন্দ টিপাইমুখ বাঁধের বিরোধিতা করে তার প্রতিবাদে জনগণকে সংগঠিত করার প্রয়াস নিয়েছিলেন সে সব সম্মানিত নেতৃবৃন্দকে একেবারে নিঃশেষ করার অপপ্রয়াস শুধু এদেশের জনগণ নয় গোটা বিশ্ববাসী প্রত্যক্ষ করছে।
প্রতিবেশী দেশ ভারতের সাথে আমাদের ৫৪টি নদীর সংযোগ। কিন্তু দেশটি কর্তৃক নদী শাসনের মাত্রা ক্রমেই আশংকাজনক পর্যায়ে উপনীত হচ্ছে। তারা আমাদেরকে ভাতে ও পানিতে মারার কোশেশ করছে। গঙ্গার শত শত পয়েন্ট থেকে বিভিন্ন উপায়ে ভারত পানি সরিয়ে নিচ্ছে। সর্বশেষ তথ্যানুসারে আমরা জানতে পারি যে, ভারতের পানি সম্পদমন্ত্রী প্রকাশ্যেই বলেছেন তাদের দেশের খরা পরিস্থিতি মোকাবিলায় গঙ্গা ও ব্রহ্মপুত্রের পানির প্রবাহ ভিন্ন দিকে সরিয়ে নেয়ার প্রকল্প হাতে নিয়েছে। যদিও ভারতের অনেক পরিবেশবাদীরা তার বিরোধিতা করছেন। (প্রথম আলো-১৭/০৫/১৬) সংবাদ পত্রের কল্যাণে আমরা আরো জানতে পারি যে, ভারতের প্রায় এক-চতুর্থাংশ জনগণ পানি সংকটের আবর্তে দিন কাটাচ্ছে।
বর্তমানে পদ্মায় স্মরণকালের সর্বনিম্ন পরিমাণ পানির সরবরাহ হচ্ছে। তার পরিমাণ মাত্র ১০ হাজার কিউসেক। অথচ সর্বনিম্ন ৪৫ হাজার কিউসেক পানির সরবরাহ থাকার কথা। দুই দেশের চুক্তি অনুসারে দিনওয়ারী হিসেবে যেভাবে পানি দেয়ার কথা তার কিছুই অনুসরণ করছে না ভারত। মূলত এ সংক্রান্ত সকল আন্তর্জাতিক আইন-কনভেনশন উপেক্ষা করছে প্রতিবেশী দেশটি।
গত ১৬ মে ছিল ঐতিহাসিক ফারাক্কা দিবস। এবার ফারাক্কা লং মাচের ৪০ বছর পূর্তি হয়ে গেল। মজলুম জননেতা মওলানা ভাসানীর নেতৃত্বে সে দিন ফারাক্কা অভিমুখে যে লংমার্চ অনুষ্ঠিত হয়েছিল তা শুধু এ দেশের জনগণকেই আন্দোলিত করেনি বরং প্রতিবেশী দেশটির শাসকদের অন্তরাত্মায় কাঁপন ধরিয়ে দিয়েছিল। আজকের স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে বিশেষত আধিপত্যবাদ বিরোধী আন্দোলনে মওলানা ভাসানীর ফারাক্কা লংমার্চ আমাদের জন্য যুগ যুগের প্রেরণার উৎস হয়ে থাকবে।
যা হোক, এবার একটু বিশুদ্ধ পানির কথায় আসি। এব্যাপারে দেশীয় বিজ্ঞানী ও প্রযুক্তিবিদদের প্রতি আমাদের দাবি থাকবে তারা যেন বিশুদ্ধ পানি প্রাপ্তির কোন সহজ উপায় জনগণের নিকট তুলে ধরেন। এজন্যে শহরাঞ্চলে পানি শোধন মেশিনের সুলভমূল্য ও সহজপ্রাপ্যতা নিয়ে ভাবা যেতে পারে।
এ প্রসঙ্গে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো আর্সেনিক মুক্ত পানি। এ ব্যাপারে এক সময় সরকারের পক্ষ থেকে যথেষ্ট উদ্যোগ ছিল এবং সেই উদ্যোগ অনেক উপকারে লেগেছে। বর্তমান সরকারের এ ব্যাপারে কোনরূপ কার্যকরী তৎপরতা পরিলক্ষিত হচ্ছে না। বিষয়টি মোটেই কাক্সিক্ষত নয়।
আরেকটি বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করা জরুরি মনে করছি। রাজধানী ঢাকার পরিবেশ ভাল রাখতে হলে বুড়িগঙ্গাকে অবৈধ ও অনাকাক্সিক্ষত পরিবেশ বিনষ্টকারী ব্যবহার থেকে হেফাজত করা তথা বুড়িগঙ্গার পানি দূষণ বন্ধ করার জন্য এ মুহূর্তেই পদক্ষেপ গ্রহণ করা উচিত। এ সরকারের আমলে গাবতলী থেকে সদরঘাট পর্যন্ত নৌ রুট চালু করা হয়েছিল এবং পরবর্তীতে অন্য রুটে তা সম্প্রসারণের কথাও বলা হয়েছিল। কিন্তু যত গর্জে তত বর্ষে না। সরকারের এ উদ্যোগ যেন অন্ধকারে হারিয়ে গিয়েছে।
ইতিহাস বলে, প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান এতটাই দুরদর্শী ছিলেন যে, এদেশের পানি সমস্যার কথা চিন্তা করে তিনি নিজ হাতে দেশব্যাপী খাল খনন কর্মসূচি চালু করেছিলেন। এর শুভ ও সুদূরপ্রসারী ফলাফল দেশবাসী ভোগ করেছে। বর্তমান সরকার যদি তেমন উদ্যোগ হাতে নেয় তাহলে সরকারের ভাব-মর্যাদা বাড়বে বৈ কমবে না।
আমাদের দেশে পানি সম্পদ মন্ত্রণালয় রয়েছে। মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে নিয়োজিত ব্যক্তিবর্গের উচিত  বিষয়গুলো গভীরভাবে ভেবে দেখা। প্রয়োজনে প্রতিবেশী দেশের কর্তাব্যক্তিদের সাথে কোনরূপ তোষণ নীতি অবলম্বন না করে সরাসরি আলোচনার টেবিলে বসতে হবে। মনে রাখতে হবে ভারত আমাদের বন্ধু হতে পারে, কিন্তু প্রভু নয়।
সবচেয়ে বড় কথা, আমাদের সমস্যার বিষয়ে আমাদেরকেই ভাবতে হবে। জনগণের জন্য সুপেয় পানির ব্যবস্থা করতে হবে, কৃষকের জন্য সেচের পানির ব্যবস্থা করতে হবে। পানি সংকট দূরীভূত করে পানির সহজ প্রাপ্তির নিশ্চয়তা বিধান করা সরকারের মৌলিক দায়িত্বের মধ্যে পড়ে। এ ব্যাপারে সরকারের আরো গতিশীল ও কার্যকরী ভূমিকা আমাদের একান্ত কাম্য।

    Print       Email

You might also like...

Mufti-news-bg20171122232853

Read More →