Loading...
You are here:  Home  >  প্রবন্ধ-নিবন্ধ  >  Current Article

বাংলা ভাষার অহঙ্কার ও সমাদর

ফরীদ আহমদ রেজা :

farid a reza

ভাষা আন্দোলনে যারা জীবন দিয়েছেন এবং ভাষার লড়াইয়ে যারা ভূমিকা রেখেছেন তাদের সকলকে শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করছি। বলা ‎‎হয় বাঙালি আবেগ-প্রবণ জাতি। আনন্দ এবং ক্রন্দনে বাঙালির জুড়ি মেলা কঠিন। আমরা বাংলাদেশ নামক ভূখন্ডে বসবাসকারী ‎‎বাঙালি জনগোষ্ঠী। দুটো বিষয় আমাদের আবেগের সাথে জড়িয়ে আছে। একটা ২১ ফেব্রুয়ারী এবং অন্যটা মুক্তিযুদ্ধ। বছরের পর ‎‎২১ ‎ফেব্রুয়ারী আবার ফিরে এসেছে। আমাদের ছোটবেলা গ্রামে কেটেছে। গ্রামে থেকেও আমরা ২১ ফেব্রুয়ারীতে খালি পায়ে ‎প্রভাতফেরি ‎করেছি। সর্বস্তরে বাংলা চালুর অঙ্গীকার করেছি। সরকারের কাছে দাবি জানিয়েছি। ৫২ থেকে ২০১৪ অনেক দীর্ঘ ‎সময়। আমাদের ‎ভাষার লড়াই ৭১ সালে এসে ভাষাভিত্তিক রাষ্ট্র গঠনের লড়াইয়ে পরিণত হয়েছে। বাংলাদেশ বিশ্বের মানচিত্রে ‎একমাত্র রাষ্ট্র যেখানে ‎অধিকাংশ মানুষের মুখের ভাষা বাংলা। একমাত্র রাষ্ট্র যার সরকারী ভাষা বাংলা। বাংলাভাষা দেশের অন্যতম ‎রাষ্ট্রভাষার মর্যাদা ‎পেয়েছে পাকিস্তান আমলে। সর্বস্তরে বাংলা চালুর পথে তখন অনেক সরকারী প্রতিবন্ধকতা ছিল। স্বাধীন ‎বাংলাদেশে সে প্রতিবন্ধকতা ‎নেই। কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে, আমরা এখনো সর্বস্তরে বাংলা চালু করতে পারিনি। এ দায় শুধু সরকারের ‎বললে ভুল হবে। প্রজাতন্ত্রের ‎কর্মচারী এবং শিক্ষিত জনগোষ্ঠীর মানসিকতাও এ জন্যে কম দায়ী নয়। ‎

ভাষার আন্দোলনের মাস ফেব্রুয়ারী এলে ভাষা নিয়ে আমাদের আবেগ জেগে উঠে। বাংলাদেশে শুরু হয় ভাষার উৎসব। সে ‎‎উৎসবের সাথে প্রবাসে বসবাসকারী বাংলাভাষী মানুষও একাত্মতা প্রকাশ করেন। বাংলাদেশসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ২৫ থেকে ‎‎৩০ ‎কোটি বাংলাভাষী মানুষ রয়েছেন। বাংলাদেশে ১৬ কোটি, ভারতের পশ্চিমবঙ্গ, আসাম ও ত্রিপুরা মিলিয়ে ১০ থেকে ১২ ‎‎কোটি এবং ‎পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে আরো এক থেকে দেড় কোটি বাংলাভাষী মানুষ রয়েছেন। এ বিপুল সংখ্যক মানুষের ‎ভাবপ্রকাশের প্রধান ‎মাধ্যম বাংলাভাষা। সে তুলনায় বাংলাভাষার সমৃদ্ধি, আধুনিকায়ন এবং বিশ্ব-বাজারে গ্রহণযোগ্যতা অনেক ‎কম। এর কারণ ‎অন্বেষণের প্রয়োজন। কিন্তু তা কে করবে? মানুষের আবেগের সাথে যে বিষয়ের সম্পর্ক থাকে সেটা নিয়ে ‎বানিজ্য এবং রাজনীতি ‎করার অনেক সুবিধা রয়েছে। তাই ভাষা দিবস, শহীদ দিবস এবং আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস পরিচিত ‎‎২১ ফ্রেব্রুয়ারী নিয়ে বানিজ্য ‎করা যায়। কেউ কেউ রাজনীতি-বানিজ্যও করেন। চৌকস লোক ভাষা নিয়ে বানিজ্য এবং রাজনীতি-‎বানিজ্য করলে তা ভাষার ‎উন্নয়নে সহায়ক ভূমিকা পালন করে। গত কয়েক দশক ধরে যারা ২১ ফেব্রুয়ারী নিয়ে বানিজ্য করছেন ‎তারা চৌকস হলে আজ ‎বাংলাভাষা শিক্ষার জন্যে বিদেশে বহু শিক্ষাকেন্দ্র গড়ে উঠতো। আমরা বাংলা ভাষায় বিশ্বমানের অসংখ্য ‎কালজয়ী কবি-সাহিত্যিক ‎দেখতে পেতাম। ‎

আমরা বাংলা ভাষাকে জাতিসংঘের দাপ্তরিক ভাষা করার দাবি করছি। কিন্তু নিজ বাসভূমে বাংলা ভাষার নানা ভাবে অবহেলিত। ‎‎পাঠ্যপুস্তকে বানান ভুল বানান আর ভুল বাক্যের ছড়াছড়ি। যারা বাংলা শিক্ষা দেন তারা কতটুকু বাংলা জানেন এবং বাংলা শিক্ষা ‎‎‎দেয়ার ব্যাপারে কতটুকু আন্তরিক সেটাও প্রশ্নের বিষয়। আমাদের নতুন ছেলেমেয়ে ভুল উচ্চারণ ও ভুল বানানে মাতৃভাষা ‎শিখছে। ‎এর সাথে যোগ হয়েছে হিন্দি ভাষার সিনেমা এবং হিন্দিতে ডাবিং করা অনুষ্ঠানমালা। বাংলাভাষী অনেক শিক্ষিত মা-বাবা ‎‎ছেলেময়ের ‎ইংরেজি ভাষার দক্ষতা বাড়াতে ইংরেজি বলেন বলে শোনা যায়। মনে হচ্ছে হিন্দিভাষা পশ্চিম বঙ্গ থেকে বাংলাকে ‎উচ্ছেদ করে ‎বাংলাদেশের দিকে ধেয়ে আসছে। বাঙালির ইংরেজি ও হিন্দি প্রীতি চোখে পড়ার মতো। বাংলাদেশী টিভি নাটক, ‎চলচ্চিত্রেও ‎ইংরেজির আধিপত্য চলছে। বাংলা ভাষা, বাংলা বানান, বাক্যগঠন ইত্যাদি নিয়ে স্বেচ্ছাচারিতা চলছে। ভাষা দিবস ‎নিয়ে বানিজ্য ‎ঠিকই চলছে। কিন্তু ভাষার উন্নয়ন এবং সংরক্ষণের কাজ করার কথা কেউ ভাবছে বলে মনে হচ্ছে না। আমাদের ‎বিদেশী ভাষা ‎অবশ্যই শিক্ষা করতে হবে। কিন্তু আমাদের বুঝতে হবে, মাতৃভাষাকে উপেক্ষা করে অথবা অবমূল্যায়ন করে ‎বিদেশী ভাষা শিক্ষার ‎মধ্যে কোন কল্যাণ নেই।
‎ ‎
আসলে আমাদের ভাষার লড়াই শেষ হয়নি। আমাদের উচ্চশিক্ষার মাধ্যম এখনো বাংলা করতে পারিনি। দর্শন, বিজ্ঞান, চিকিৎসা, ‎‎কারিগরী প্রভৃতি বিষয় বাংলায় শিক্ষা দেয়ার উদ্যোগ কেউ নিচ্ছে না। আসামী বা বাদীর জন্যে বিচারের রায় বাংলায় পাওয়ার ‎‎সুযোগ নেই। সরকারের বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও অধিদপ্তরের ওয়েবসাইটের মধ্যে সম্পূর্ণ বাংলায় আছে মাত্র ৩৩টি। বাকিগুলোর ‎‎বেশির ‎ভাগই ইংরেজিতে। জাতীয় ওয়েব পোর্টালের ৫৯টি ওয়েবসাইটের আটটি বাংলায় এবং বিভিন্ন দপ্তর-অধিদপ্তরের ১৯০টি ‎‎ওয়েবসাইটের মধ্যে সম্পূর্ণ বাংলায় আছে ২৫টি। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের ওয়েব সাইটে বাংলা খুঁজে পাওয়া কষ্টসাধ্য ব্যাপার। বাংলা ‎‎একাডেমির ওয়েবসাইট অসম্পূর্ণ এবং বানান বিভ্রাটে পরিপূর্ণ। ‎

সর্বস্তরে বাংলা চালু না হওয়ার প্রধান কারণ হিসেবে দোষ দেয়া হয় পরিভাষার। বলা হয় বাংলাভাষায় সঠিক পরিভাষার অভাবে ‎‎সকল কথা বাংলায় লেখা যায় না এবং সকল বিষয় বাংলায় বোঝানো যায় না। এটা একটি খোঁড়া যুক্তি বই কিছু নয়। বাংলা এমন ‎‎‎কোন ভাষা নয় যে প্রয়োজনে কোন বিদেশী শব্দ গ্রহণ করলে তাকে জাতচ্যুত হতে হবে। বাংলা অভিধান উল্টালে দেখা যাবে ‎‎‎সেখানে এশিয়া এবং ইউরোপের বিভিন্ন দেশ থেকে বহু শব্দ স্থান পেয়েছে। যুগের প্রয়োজনে এবং গ্রহণযোগ্যতার কারণে ‎পৃথিবীর ‎সকল ভাষা-ই বিদেশী শব্দ গ্রহণ করে। বিদেশী শব্দ আগমনে ভাষা সমৃদ্ধ হয় এবং ভাষার সৌন্দর্য বৃদ্ধি পায়। ‎রাজনৈতিক ‎সিদ্ধান্তের মাধ্যমে আমরা সহজেই অফিস-আদালতে বাংলা ব্যবহারে বাধ্য করতে পারি। দাপ্তরিক সিদ্ধান্ত এবং নোট ‎বাংলায় লেখা ‎শুরু হলে এর মাধ্যমেই দাপ্তরিক পরিভাষা বেরিয়ে আসবে। উকিলরা আর্জি এবং বিচারকরা রায় বাংলায় লেখা শুরু ‎করলে একদিন ‎দেখা যাবে আদালতে ব্যবহারের জন্যে উপযুক্ত পরিভাষা তৈরি হয়ে গেছে। ভাষা সৈনিক অধ্যাপক আবুল কাসেম ‎‎সেই ৫০ বছর ‎আগে রসায়ন শাস্ত্রের উপর বাংলায় বই লিখেছেন। এর পর উদ্যোগের অভাবে বাংলায় উচ্চশিক্ষার জন্যে ‎পাঠ্যপুস্তক রচনার কাজে ‎কোন অগ্রগতি সাধিত হয়নি। রাষ্ট্র এ ব্যাপারে উদ্যোগী হলে বই লেখার জন্যে পন্ডিত লেখকের অভাব ‎হবে না। ইংরেজী ছাড়া চলা ‎যাবেনা, ইংরেজী ছাড়া উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করা যাবেনা, এ ধরণের হীনমন্যতা থেকে আমাদের মুক্ত হতে ‎হবে। রাজনৈতিক নেতৃত্বকে ‎সাহসিকতার সাথে এগিয়ে এলেই বুদ্ধিজীবীরা এগিয়ে আসবেন, শিক্ষাবিদরা রাতারাতি পাঠ্যপুস্তক ‎‎তৈরি করে দেবেন। ‎

বাংলাদেশের অধিকাংশ মানুষ বাংলায় কথা বললেও বাংলাদেশে বহুসংখ্যক লোক এমন আছেন যাদের মাতৃভাষা বাংলা নয়। ‎‎বাংলাদেশে কি পরিমান উপজাতি আছেন এর সঠিক হিসাব আমাদের কাছে নেই। খাসিয়া, মনিপুরী, গারো, চাকমা প্রভৃতি ‎‎জনগোষ্ঠীর সংখ্যা কোটি কোটি না হলেও লক্ষ লক্ষ তো হবেই। তারা কেউ বাঙালি নয়, বাংলা তাদের মাতৃভাষা নয়। তাদের ‎নিজস্ব ‎ভাষা, সংস্কৃতি এবং ধর্ম রয়েছে। ২১ ফেব্রুয়ারীকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস ঘোষণার মাধ্যমে জাতিসংঘ পৃথিবীর ‎সকল ‎জনগোষ্ঠীর মাতৃভাষাকে সম্মানিত করেছে। এর দাবি হচ্ছে, বাংলাদেশে বসবাসরত সকল আদিবাসীর ভাষাকে বাংলাদেশ ‎মর্যাদার ‎সাথে দেখবে এবং তাদের মাতৃভাষা চর্চার পথে সহযোগিতা প্রদান করবে।‎

বাঙালি বা বাংলাভাষী মানুষ আজ গোটা পৃথিবীতে ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছেন। বৃটেন, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা, অস্ট্রেলিয়া প্রভৃতি ‎‎‎দেশে বাংলাভাষী অভিবাসীর সংখ্যা দিনে দিনে বাড়ছে। বহির্বিশ্বের বাঙালি জনগোষ্ঠী দিনটিকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস ‎হিসেবে ‎পালন করছেন। বিলাতের বাঙালি সমাজ এ থেকে ব্যতিক্রম নয়। কিন্তু বিলাতে বাঙালির সংখ্যা দিনে দিনে বৃদ্ধি হবার ‎পরও এখানে ‎বাংলা ভাষার ভবিষ্যত নিয়ে শঙ্কা রয়েছে। যারা বাংলা টিভি দেখেন, বাংলা পত্রিকা পড়েন তারা সবাই বাংলাদেশ ‎‎থেকে বড় হয়ে ‎এসেছেন। এ দেশে বেড়ে উঠা ছেলেমেয়েদের আমরা বাংলা ভাষার সাথে সম্পৃক্ত করতে পারিনি।‎

সরকারের সহযোগিতায় এক সময় বৃটেনে বাংলা শিক্ষার নানা সুযোগ-সুবিধা চালু হয়। বিভিন্ন এলাকায় বাংলা স্কুল স্থাপিত হয়। ‎‎মাতৃভাষা শিক্ষার জন্যে প্রদত্ত সরকারী অনুদান থেকে এ সকল স্কুলের শিক্ষকরা বেতন পেতেন। বর্তমানে সে অনুদান অত্যন্ত ‎সীমিত ‎বা বন্ধ হয়ে আসছে। এক সময় লন্ডনের টাওয়ার হ্যামলেটস, নিউহাম, হ্যাকনি প্রভৃতি এলাকার বিভিন্ন সেকেন্ডারি স্কুল ‎‎‎ছেলেমেয়েদের জিসিএসই পরীক্ষায় ঐচ্ছিক বিষয় হিসেবে বাংলা গ্রহণ করার সুবিধা প্রদান করে। কোন কোন স্কুলে এ ব্যবস্থা ‎‎এখনো চালু আছে। আবার বেশ কিছু স্কুল তা বন্ধ করে দিয়েছে। আমার জানা মতে এ রকম ৪টি স্কুল আছে যারা এখন ‎জিসিএসই ‎বিষয় হিসেবে বাংলা পড়ানো বন্ধ করে দিয়েছে। অতীতে এ সকল স্কুলের প্রত্যেকটি থেকে বছরে ৪০/৫০ জন ‎‎ছেলেমেয়ে বাংলায় ‎জিসিএসই পরীক্ষায় অংশ নিয়েছে। কি কারণে এ সকল স্কুল বাংলা বন্ধ করে দিয়েছে এর জবাবে অনেক কথা ‎আমাদের কানে ‎আসছে। এর মধ্যে রয়েছে ছাত্ররা বাংলা পড়তে আগ্রহী নয়, প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত শিক্ষকের অভাব, আর্থিক অবস্থা ভালো ‎না থাকার কারণে ‎স্কুলকে ব্যয়-সংকোচন করতে হচ্ছে ইত্যাদি। এ সকল কারণের কোনটা সত্য এবং কোনটা খোঁড়া অজুহাত তা ‎অন্বেষণ করার গরজ ‎বাঙালি কমিউনিটির কারো আছে বলে মনে হয় না।‎

টাওয়ার হ্যামলেটস বারার এক স্কুলশিক্ষিকা আমাকে বলেছেন, ছাত্রদের আগ্রহ নেই কথাটার মধ্যে কিছুটা সত্যতা রয়েছে। ‎তাদের ‎স্কুলে এক সময় বছরে ৫০/৬০ জন ছেলেমেয়ে বাংলায় জিসিএসই পরীক্ষায় অংশ গ্রহণ করতো। সেখানে বাংলা ভাষা ‎শিক্ষা দেয়ার ‎জন্যে ৫জন শিক্ষক ছিলেন। এখন সেখানে পরীক্ষার্থীর সংখ্যা কমতে কমতে ১৫ থেকে ২০ জনে এসে দাঁড়িয়েছে। ‎তবে সব স্কুলের ‎অবস্থা এ রকম নয়। অনেক স্কুল ছাত্রদের আগ্রহ থাকা সত্তেও বাংলায় জিসিএসই পরীক্ষা দেয়ার সুযোগ বন্ধ ‎করে দিয়েছে। কিন্তু ‎অভিভাবকরা তা নিয়ে মোটেই মাথা ঘামান না।‎

বাংলাদেশে যারা বাংলাভাষা শিক্ষা করেন এবং শিক্ষা দেন তাদের মাতৃভাষা বাংলা। বিলেতে যে সব ছেলেমেয়ে বাংলাভাষা শিক্ষা ‎‎করে তাদের অনেকের মা-বাবার মাতৃভাষা বাংলা হলেও তারা বাংলায় কথা বলে না। বাংলাভাষাকে নিজেদের প্রথম ভাষা বা ফার্স্ট ‎‎ল্যাঙুয়েজ হিসেবে তারা বিবেচনা করে না। তারা নিজেদের মধ্যে ইংরেজিতে কথা বলে। আমরা জানি, নিতান্ত বাধ্য না হলে তারা ‎‎বাংলায় কথা বলতে অগ্রহী নয়। বিলেতে বহু ভিন্নভাষী লোকও বাংলাভাষা শেখেন। এ ধরণের ভাষাশিক্ষাকে আমরা দ্বিতীয় ভাষা ‎‎শিক্ষা হিসেবে বিবেচনা করি। তাছাড়া বিলেতের অধিকাংশ বাঙালি বৃহত্তর সিলেট থেকে এসেছেন। সিলেট অঞ্চলের পরিবারে ‎‎বাংলায় কথা বলার প্রচলন নেই। তাই বাংলাভাষাকে সিলেট থেকে আগত পরিবারে জন্মগ্রহণকারী শিশুর মাতৃভাষা বা প্রথম ‎ভাষা ‎হিসেবে বিবেচনা করা যায় না।‎

বাংলাভাষা শিখতে গিয়ে বিদেশী বা এ দেশে বেড়ে উঠা প্রজন্ম কি অসুবিধায় পড়ে তা আমাদের বিবেচনায় নেয়া দরকার। বাংলা ‎‎বর্ণমালায় দুটি ন, তিনটি স ধ্বনি এবং প্রত্যেকটি স্বরবর্ণের জন্যে একটি করে স্বরচিহ্ন রয়েছে। ছেলেমেয়েদের এ সব উচ্চারণ ‎‎শেখা ‎এবং স্বরবর্ণের চিহ্নগুলো মনে রাখা সহজ নয়। হ্রস্ব-ইকার, দীর্ঘ-ঈকার, হ্রস্ব-উকার, দীর্ঘ-উকার ইত্যাদি মনে রাখা নতুন ‎শিক্ষার্থীর ‎জন্যে অত্যন্ত কষ্টসাধ্য। এসব উচ্চারণ ও জটিল বর্ণমালা, যুক্তাক্ষর এবং সেগুলো দিয়ে গঠিত শব্দ তোতা পাখির মত ‎তাদের মুখস্থ ‎করতে হয়। যারা বাংলা পড়ান তাদের ক’জন এসব বর্ণ, শব্দ, ধ্বনি ইত্যাদির ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ জানেন তাও প্রশ্ন ‎সাপেক্ষ। বাংলা ‎ব্যাকরণের ণত্ব বিধান, ষত্ব বিধানের ব্যাখ্যা-বিশেষণ আমাদের অনেকের মনে নেই। এ সকল জটিল বিষয় সহজ ‎না করার কারণে ‎বিদেশে শুধু নয়, বাংলাদেশেও ছেলেমেয়েরা বেকায়দায় পড়ে। বিলেতে যারা দ্বিতীয় ভাষা হিসেবে বাংলা শিক্ষা ‎‎দেন, বাংলাভাষার ‎বর্ণ, বানান এবং ব্যাকরণ নিয়ে তাই অনেক সমস্যার মুখোমুখি হন। বাংলাকে আন্তর্জাতিক মানের ভাষা ‎হিসেবে দাঁড় করাবার জন্যে ‎বাংলা বর্ণমালার সরলীকরণ এবং ব্যাকরণকে আরো সহজ করা প্রয়োজন। অবশ্য ভাষার আন্তর্জাতিক ‎মানের জন্যে বানান, বর্ণ ‎এবং ব্যাকরণের মানের চেয়ে সে ভাষায় উন্নত সাহিত্য রচনার প্রয়োজন অনেক বেশি। তবে ভাষাকে ‎বিদেশীদের জন্যে সহজবোধ্য ‎করতে হলে বানান, বর্ণ এবং ব্যাকরণ সহজ করার দাবি উপেক্ষা করার উপায় নেই। ‎

আমরা ২১ ফেব্রুয়ারী উদযাপন করে শহীদদের স্মরণ করি। এর সাথে সাথে বাংলাভাষাকে এগিয়ে নেয়ার জন্যেও আমাদের কাজ ‎‎করতে হবে। বৃটিশ সমাজ আমাদের বাংলা চর্চার কিছুটা সুযোগ দিলেও আমরা বাংলার ব্যাপারে তেমন আগ্রহী নই। যে সকল ‎‎স্কুলে ‎বাংলা শেখার সুযোগ রয়েছে সেখানেও দেখা যায় অনেক মাবাবা ছেলেমেয়েদের বাংলা শিক্ষার প্রতি সম্পূর্ণ উদাসীন। ‎আনেক ‎মাবাবা জানেন-ই না তাদের সন্তান বিদেশী ভাষা হিসেবে কোন্ ভাষা শিখছে। অবস্থা এ ভাবে চললে আমাদের আশঙ্কা, ‎কিছুদিন পর ‎এ দেশের স্কুলে বাংলা শিক্ষার সুযোগ বন্ধ হয়ে যাবে। বাংলাক্লাস চালু রাখার জন্যে প্রয়োজনীয় সংখ্যক ছাত্র না ‎‎পেলে যে কোন ‎স্কুল বাংলা শিক্ষার সুযোগ বন্ধ করে দেয়ার অধিকার রাখে। তখন পত্রিকায় বিবৃতি দিয়ে বা আন্দোলন করে কোন ‎ফল হবে না। ‎

বাংলাদেশ এবং বৃটেনে বাংলা ভাষা শিক্ষার অবস্থা বিবেচনায় নিলে আমরা বুঝতে পারি, বাঙালির কাছে বাংলা ভাষা বাস্তবে ‎কতটুকু ‎সমাদৃত। আমাদের শুধু ভাষা নিয়ে রাজনীতি অথবা প্রবাসে বাঙালি এমপি, মেয়র বা কাউন্সিলার নির্বাচিত করার ধ্যানে ‎‎থাকলে ‎চলবে না। প্রবাসে বাংলা ভাষা রক্ষার জন্যেও কাজ করতে হবে। সময় থাকতে কমিউনিটির সবাইকে এ ব্যাপারে সচেতন ‎হওয়া ‎দরকার। ‎

    Print       Email

You might also like...

326957_112

পলাশি : ইতিহাসের কালো অধ্যায়

Read More →