Loading...
You are here:  Home  >  প্রবন্ধ-নিবন্ধ  >  Current Article

বিএনপির ভারতচিন্তা ও আত্মশুদ্ধির প্রচেষ্টা

045947Pic-34

গাজীউল হাসান খান : রাজনীতিতে কখনো স্থায়ী শত্রু বা মিত্র বলে কিছু থাকতে পারে না। বিভিন্ন দল-মত-সময়-পরিস্থিতি কিংবা নেতৃত্ব নির্বিশেষে অবস্থার পরিবর্তন ঘটতেই পারে, এটা রাজনৈতিক ইতিহাসের একটি নির্ভরযোগ্য শিক্ষা বলে ধরে নেওয়া যেতে পারে, কোনো জনগোষ্ঠীকে মিথ্যা ধারণা কিংবা বিপথগামী করে বেশি দিন রাজনৈতিক স্বার্থ হাসিল করা সম্ভব হয় না। কারো প্রতি হিংসা-বিদ্বেষ কিংবা বিরূপ মনোভাব পোষণের রাজনীতি কোনো অর্থেই সুস্থ কিংবা সুদূরপ্রসারী ফলপ্রসূ রাজনীতি হতে পারে না। অপেক্ষাকৃত বৃহৎ শক্তি কিংবা বড় বড় দেশের আঞ্চলিকভাবে হলেও কিছুটা আধিপত্যবাদী দৃষ্টিভঙ্গি থাকা অস্বাভাবিক নয়। সে অবস্থাকে একটি স্থায়ী শত্রুতামূলক ইস্যুতে পরিণত না করে বন্ধুত্ব, বৃহত্তর সমঝোতা ও দ্বিপক্ষীয় আলোচনার ভিত্তিতে সহনীয় পর‌্যায়ে নামিয়ে আনা কোনো অসম্ভব বিষয় নয়। ভারতবর্ষে ঔপনিবেশিক আমলে ব্রিটিশ শাসকরা বিভিন্ন জাতির মধ্যে বিভেদ সৃষ্টি করে তাদের ক্ষমতা ও শাসন বহাল রাখার চেষ্টা করেছে। তাদের সে নীতির মধ্য থেকে তৎকালীন হিন্দু, মুসলমান এবং অন্যান্য সম্প্রদায়ের মধ্যে সৃষ্টি হয়েছিল পারস্পরিক হিংসা, বিদ্বেষ, ঘৃণা ও সর্বোপরি হানাহানির রাজনীতি। ব্রিটিশ শাসকদের তৎকালীন বিভেদ সৃষ্টিমূলক অপকর্ম কিংবা শাসনপ্রক্রিয়া থেকে ভারতবর্ষে দ্বিজাতিতত্ত্বের উদ্ভব হয়েছে বলে অনেকের ধারণা। আর তা থেকেই হিন্দু-মুসলিম জনসংখ্যার ভিত্তিতে শেষ পর্যন্ত ভারতবর্ষে দুটি পৃথক স্বাধীন রাষ্ট্রের জন্ম হয়েছিল বলে ধারণা করা হয়। ১৯৪৭ সালে এ উপমহাদেশে ঔপনিবেশিক শাসনের অবসান ঘটলে ব্রিটিশ শাসকরা স্বদেশে ফিরে যায়। কিন্তু পেছনে রেখে যায় হিন্দু, মুসলমান ও অন্যদের মধ্যে একটি সাম্প্রদায়িক মনোভাব বা দৃষ্টিভঙ্গি। কিন্তু সে হিংসা-বিদ্বেষ, বিভেদ কিংবা সে সাম্প্রদায়িকতার সৃষ্টি এক দিনে হয়নি। অত্যন্ত পরিকল্পিতভাবে এ উপমহাদেশে সাম্প্রদায়িকতার বীজ বপন করা হয়েছিল বলে তথ্যাভিজ্ঞ মহলের অভিমত। মূলত সে কারণেই ’৪৭-পূর্ববর্তী সময়ে এ উপমহাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা ছড়িয়ে পড়েছিল এবং হিন্দু ও মুসলিম সম্প্রদায়ের মধ্যে সৃষ্টি হয়েছিল এক চরম তিক্ত সম্পর্ক ও বিভেদ। সে অবস্থা বা পরিস্থিতি এ উপমহাদেশে সুদীর্ঘ সুলতানি কিংবা মোগল সম্রাটদের শাসনামলে অতীতে কখনোই সেভাবে দেখা যায়নি।

সম্পূর্ণ এক ভিন্ন পরিস্থিতিতে পরবর্তী পর‌্যায়ে বাংলাদেশের জন্ম হলেও এ দেশ সাম্প্রদায়িকতার অভিশাপ থেকে সম্পূর্ণভাবে মুক্ত ছিল, এ কথা বলা যাবে না। একাত্তর-পরবর্তী কিংবা বাংলাদেশের স্বাধীনতা-পরবর্তী সময়ে গঠিত দু-একটি রাজনৈতিক দলের মধ্যে যে তার কিছুটা প্রভাব পড়েনি, তা নয়। ভারত বিরোধিতার নামে কোনো কোনো ক্ষেত্রে তারা কিছুটা সাম্প্রদায়িক রাজনীতির বহিঃপ্রকাশ ঘটিয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। তা ছাড়া ধর্মভিত্তিক রাজনীতির সঙ্গে নীতিগতভাবে সাম্প্রদায়িকতার কোনো সম্পর্ক থাকা উচিত নয়। তবুও ভারতবিরোধী রাজনীতি চর্চা করতে গিয়ে কেউ কেউ পক্ষান্তরে সাম্প্রদায়িকতায় অংশ নিয়েছে বলে প্রচার করা হয়ে থাকে। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সময় এ বিষয়টি বেশ স্পষ্ট হয়ে উঠেছিল বলে উল্লেখ করা হয়। তা ছাড়া বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর বেরুবাড়ী (ছিটমহল) ভারতের কাছে হস্তান্তর করা সত্ত্বেও বহুদিন ধরে বাংলাদেশের সঙ্গে অন্যান্য ছিটমহলসহ সীমান্ত সমস্যার সমাধান না করা, সীমান্তে তারকাঁটার বেড়া দেওয়া, একতরফাভাবে পদ্মার পানি সরিয়ে নিয়ে গিয়ে ফারাক্কা বাঁধ চালু করা কিংবা ভারতের সঙ্গে ব্যাপক বাণিজ্য ঘাটতি নিয়ে ক্রমে ক্রমে এ দেশের (বাংলাদেশ) মানুষের মধ্যে বেশ কিছু বিরূপ প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছিল। তাতে একটি ধর্মান্ধ গোষ্ঠী দেশের হিন্দু ও বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের ওপর খড়্গহস্ত হয়ে ওঠে। অথচ ভারতের সঙ্গে বিরাজিত বিভিন্ন সমস্যার কারণে নীতিগতভাবে সাম্প্রদায়িক মনোভাব সৃষ্টি হওয়ার কোনো অবকাশ না থাকলেও ঔপনিবেশিক শাসকদের সৃষ্ট বিভেদ ও ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গির কারণে তা পারস্পরিক ঘৃণা ও বিদ্বেষে পরিণত হয়েছিল। তা ছাড়া কাশ্মীর প্রশ্নে দীর্ঘ প্রায় ২৫ বছরে পাকিস্তানি শাসকরা তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের সাধারণ মানুষের মধ্যেও একটি সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষ ছড়ানোর প্রয়াস পেয়েছিল। তারা ভেবেছিল, তা পাকিস্তানের দুই অংশের মধ্যে অবিচ্ছেদ্য সংহতি ও তথাকথিত জাতীয় ঐক্য সুদৃঢ় করবে। কিন্তু সে কৌশলের আড়ালে পূর্ব পাকিস্তানের জনগণের ওপর অন্যায় শাসন ও শোষণ অব্যাহত রাখার প্রয়াস শেষ পর্যন্ত হিতে বিপরীত হয়ে দাঁড়িয়েছিল। তাদের আধিপত্যবাদী কিংবা আধা ঔপনিবেশিক শাসনের বিরুদ্ধে ক্রমে ক্রমে ঐক্যবদ্ধ হয়ে রুখে দাঁড়ায় বাঙালিরা। তার পরের সবই ইতিহাস। এবং সে ইতিহাস সবারই জানা।

আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে এবং অন্যান্য দেশপ্রেমিক দল ও সংগঠনের অংশগ্রহণে মুক্তিযুদ্ধে অর্জিত বিজয় এ দেশের মানুষের আশা-আকাঙ্ক্ষাকে একটি বিশেষ উচ্চতায় পৌঁছে দিয়েছিল। একটি যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশ ও তার সম্পূর্ণ ভেঙে পড়া অর্থনীতিতে সেসব আশা-আকাঙ্ক্ষার বাস্তবায়ন ছিল অনেকটা সময়সাপেক্ষ ব্যাপার। সে অবস্থায় দেশে চরম খাদ্য ঘাটতি, সীমান্তে চোরাচালানি, আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি এবং সর্বোপরি দেশের স্বাধীনতাবিরোধীদের বিভিন্ন চক্রান্ত সার্বিক পরিস্থিতিকে অনেকটা বেসামাল করে তুলেছিল। সে অবস্থায় বিভিন্ন সমস্যা সমাধানে বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে গঠিত সরকারের আপ্রাণ প্রচেষ্টা ও বিভিন্ন ক্ষেত্রে গৃহীত দীর্ঘস্থায়ী পরিকল্পনা বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে একদিকে একটি অত্যন্ত দুর্নীতিগ্রস্ত গোষ্ঠী এবং অন্যদিকে আমাদের স্বাধীনতাকে অকার্যকর করার লক্ষ্যে নিয়োজিত চক্রের অপতৎপরতার মুখে। এরই মধ্যে আওয়ামী লীগ ও ছাত্রলীগ ভেঙে জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দলের জন্ম হলে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শক্তির মধ্যে নানা দ্বিধাদ্বন্দ্বের সৃষ্টি হয়েছিল। তা ছাড়া সীমান্তে চোরাচালান ও দেশের অভ্যন্তরে ভারতীয় নিম্নমানের সস্তা পণ্যের বাজার দখল নিয়েও বিরূপ প্রতিক্রিয়া দেখা দিতে শুরু করেছিল জনমনে। সে অবস্থায় মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও ত্যাগের আদর্শও যেন এক অংশের মানুষের মধ্যে শিথিল হয়ে পড়েছিল। ক্রমে ক্রমে এক নৈরাজ্য যেন জাতীয় জীবনের সর্বত্র ছায়া ফেলা শুরু করেছিল। তখন দেশের সার্বিক অবস্থা সামাল দেওয়ার জন্য বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান একদলীয় বাকশাল সরকার কায়েম করেছিলেন। মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শক্তিকে আবার ঐক্যবদ্ধ ও সুসংহত করার প্রচেষ্টা যখন এগিয়ে যাচ্ছিল, ঠিক তখনই বঙ্গবন্ধু ও তাঁর পরিবারের ওপর নেমে আসে এক তীব্র আঘাত। সামরিক বাহিনীর কিছু বিপথগামী সৈনিক এক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে হত্যা করে তাঁকে ও তাঁর পরিবারের সদস্যদের। অথচ আশ্চর্য বিষয় এই যে সে অভ্যুত্থানের পেছনে যাঁরা ইন্ধন ও সমর্থন জুগিয়েছিলেন, খন্দকার মোশতাক আহমদসহ তাঁদের অনেকেই ছিলেন আওয়ামী লীগের নেতা ও বঙ্গবন্ধুর ঘনিষ্ঠ সহচর।

২.
১৯৭৫ সালের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর বাংলাদেশের প্রগতিশীল কিংবা বাম ধারার একটি বিশেষ অংশ রাতারাতি জাতীয়তাবাদী মনোভাবাপন্ন হয়ে পড়েছিল। তাঁদের মধ্যে বেশ কিছু ছিলেন গণমাধ্যমে উল্লেখযোগ্য বুদ্ধিজীবী ও জনপ্রিয় ব্যক্তিত্ব। তাঁদের ধারণা জন্মেছিল যে জাতীয় মুক্তি আন্দোলনকে অসমাপ্ত রেখে সমাজতান্ত্রিক বিপ্লব সংগঠিত করা সম্ভব হবে না। তাঁদের কেউই সাম্প্রদায়িক দৃষ্টিভঙ্গি পোষণ করতেন না। তাঁরা চেয়েছিলেন ভারতীয় আধিপত্য ও তাঁবেদারি থেকে নতুন স্বাধীনতাপ্রাপ্ত বাংলাদেশকে মুক্ত করতে। তাঁদের ধারণা জন্মেছিল, বাংলাদেশের জনগণের মধ্যে তাঁদের সমর্থনের অভাব হবে না। তাঁরা বিভিন্ন আর্থ-সামাজিক ও বিশেষ করে রাজনৈতিকভাবে পাহাড় থেকে সমতলের সব মানুষকে ঐক্যবদ্ধ করতে চেয়েছিলেন বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদের স্লোগানের অন্তরালে। তারই পথ ধরে বিশিষ্ট মুক্তিযোদ্ধা ও বঙ্গবন্ধুর পক্ষে স্বাধীনতার ঘোষণা প্রদানকারী বিদ্রোহী সৈনিক জিয়াউর রহমানের নেতৃত্বে ১৯৭৮ সালের ১ সেপ্টেম্বর গঠিত হয়েছিল বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)। সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান কিংবা তাঁর দল বিএনপি প্রকাশ্যে ভারতবিরোধী কোনো স্লোগান না দিলেও জিয়া ফারাক্কা ইস্যু অর্থাৎ ভারতের কাছ থেকে পদ্মার পানির ন্যায্য হিস্যা আদায় করার জন্য জাতিসংঘের শরণাপন্ন হয়েছিলেন। তা ছাড়া তাঁদের মতে, বাংলাদেশে জলসীমায় জেগে ওঠা তালপট্টি দ্বীপ ও সীমান্তে ছিটমহল সমস্যা নিয়ে ভারতের ওপর চাপ সৃষ্টি করার জন্য রাজনৈতিক আন্দোলনের প্রয়াস পেয়েছিলেন। অন্যদিকে জিয়াউর রহমান আঞ্চলিক সহযোগিতা সংস্থা ‘সার্ক’ গঠনসহ বিভিন্ন আলোচনার মাধ্যমে বাংলাদেশের ওপর ভারতের প্রভাব কিংবা আধিপত্য কাটিয়ে ওঠার বিভিন্ন কূটনৈতিক উদ্যোগ গ্রহণ করেছিলেন। একদিকে ইসলামী সহযোগিতা সংস্থা ‘ওআইসি’ এবং বিশেষ করে সৌদি আরব ও অন্যদিকে চীনের সঙ্গে সম্পর্ক অত্যন্ত শক্তিশালী করেছিলেন শহীদ জিয়া। তিনি আঞ্চলিক সহযোগিতা সংস্থা সার্ক নিয়ে ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর সঙ্গে ঘনিষ্ঠ হওয়ার প্রয়াস চালিয়ে গেলেও মিসেস গান্ধী বাংলাদেশের স্বাধীনতাসংগ্রামে নেতৃত্বদানকারী তাঁর নেতৃত্বাধীন কংগ্রেসের বন্ধুপ্রতিম রাজনৈতিক সংগঠন আওয়ামী লীগের জায়গায় কখনো নবগঠিত বিএনপিকে কোনো অবস্থাতেই স্থান দিতে পারেননি। অন্যদিকে বিএনপির নেতাকর্মী ও সমর্থকরা জিয়াউর রহমানের জীবদ্দশায়ই ভারতবিদ্বেষী কিংবা সাম্প্রদায়িক না হলেও ভারতের আধিপত্যবিরোধী রাজনৈতিক সংগঠনে পরিণত হয়েছিল। এ সংগঠনের ওপর ইসলামী মূল্যবোধের প্রভাবও ছিল অপরিসীম। তবে স্বাধীনতাবিরোধী ধর্মীয় কোনো রাজনৈতিক সংগঠনের মতো ভারত বিদ্বেষ কিংবা সাম্প্রদায়িক দৃষ্টিভঙ্গি শহীদ জিয়াসহ বিএনপির কোনো কেন্দ্রীয় নেতার মধ্যে পরিলক্ষিত হয়নি তখন।

খালেদা জিয়ার নেতৃত্বাধীন বিএনপির সঙ্গে ১৯৯৫-পরবর্তী সময়ে ক্রমে ক্রমে ঘনিষ্ঠ হতে থাকে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী দল। এবং পরবর্তী পর‌্যায়ে একরকম স্থায়ী নির্বাচনী জোট গঠন করে তারা বিএনপির সঙ্গে। জামায়াতের নেতাদের যুদ্ধাপরাধের অভিযোগে বিচার যত গতি লাভ করতে থাকে, জামায়াত ততই খালেদা জিয়ার আশ্রয়প্রার্থী হয়ে বিএনপির কাঁধে চেপে বসার চেষ্টা করে। ক্ষমতার রাজনীতির স্বার্থে বিএনপি নেত্রী খালেদা জিয়া আমাদের স্বাধীনতাযুদ্ধের বিরোধী শক্তি জামায়াতকে ত্যাগ করেননি কখনো। তা ছাড়া বাংলাদেশের গণমাধ্যমের একটি বিশেষ অংশ মনে করে, পাকিস্তানের প্রতি অনুরাগী জামায়াত চায় না বিএনপি কোনোভাবে ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক বন্ধুত্বপূর্ণ করুক। সে কারণে ভারতের সাবেক বাঙালি রাষ্ট্রপতি প্রণব মুখার্জির বাংলাদেশ সফরকালে বিএনপি নেত্রী খালেদা জিয়া সাক্ষাৎকারের জন্য সুনির্দিষ্ট সময় নিয়েও শেষ পর্যন্ত তা বাতিল করেছিলেন। কারণ সেদিন জামায়াতে ইসলামী তাদের দলের যুদ্ধাপরাধীদের মুক্তির দাবিতে হরতাল ডেকেছিল। এবং খালেদা জিয়া সে হরতালে জামায়াতে ইসলামীকে সমর্থন দিয়েছিলেন। সে কারণে বিএনপি নেত্রী ও তাঁর দল ভারতের আস্থা হারিয়েছে বলে গণমাধ্যমের একটি অংশ মনে করে। খালেদা জিয়া ক্ষমতায় এবং এমনকি বিরোধী দলে থাকা অবস্থায়ও ভারত সফর করেছেন। তিনি ক্ষমতার রাজনীতি করেন বলেই প্রভাবশালী প্রতিবেশী ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করে তাঁদের আস্থাভাজন হতে চেয়েছিলেন। কিন্তু জামায়াত নেতাদের ভালো করেই জানা আছে যে ভারতের সঙ্গে বিএনপির সম্পর্ক স্বাভাবিক হলে সে সংগঠনের নেতাকর্মীরা জামায়াতকে ছুড়ে ফেলে দেবে। কারণ আর যা-ই হোক, বিএনপি মুক্তিযোদ্ধাদের একটি দল। তারা নির্বাচনে জেতার জন্য সব সময় মুক্তিযুদ্ধের বিরোধী শক্তির হাতে জিম্মি হয়ে থাকতে চাইবে না। তা ছাড়া ২০০১ সালে অনুষ্ঠিত নির্বাচনে বিএনপি একাই দুই-তৃতীয়াংশের সংখ্যাগরিষ্ঠ আসন পেয়েছিল জোটের অন্যদের ছাড়াই। তাহলে কী প্রয়োজন ছিল ডেকে এনে দুই যুদ্ধাপরাধী রাজাকারকে মন্ত্রী বানানোর। সেসব কারণে বিএনপির অনেক নিবেদিতপ্রাণ ও রাজনীতিসচেতন কর্মীরা এখন সম্পূর্ণ নিষ্ক্রিয় হয়ে বসে আছে। অনেকে বিএনপির সঙ্গে ন্যূনতমভাবে কোনো যোগাযোগ রাখাও বন্ধ করে দিয়েছে। ধর্মীয় মূল্যবোধে যতই বিশ্বাসী হোক না কেন, বিএনপি ও জামায়াত কখনোই এক হতে পারে না। তা ছাড়া বাংলাদেশের সার্বিক উন্নয়নে প্রতিবেশী ভারতের সাহায্য-সহযোগিতা ও সমর্থন সব সময়ই প্রয়োজন হবে। ভুলে গেলে চলবে না যে আমাদের দেশের তিন দিকজুড়ে রয়েছে ভারতের অবস্থান। এবং ভারত এখন আমাদের উন্নয়নের অংশীদার। ভারত শুধু প্রতিবেশীই নয়, নির্ভরযোগ্য বন্ধুও বটে।

ভারতের সঙ্গে বিভিন্ন ছিটমহলসহ আমাদের স্থলসীমা ও সমুদ্রসীমা নির্ধারণ করা সম্ভব হয়েছে স্বাধীনতাযুদ্ধে নেতৃত্বদানকারী দল আওয়ামী লীগ নেত্রী প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কারণে। তিনি ভারতের ক্ষমতাসীনসহ প্রধান বিরোধী দল কংগ্রেসেরও বিশেষ আস্থাভাজন রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব। বর্তমানে ভারত বাংলাদেশের উন্নয়ন খাতে যেসব ঋণ, অনুদান ও সরাসরি বিনিয়োগের ব্যবস্থা করে দিয়েছে, তা একমাত্র সম্ভব হয়েছে আওয়ামী লীগ নেত্রী শেখ হাসিনার বলিষ্ঠ পদক্ষেপের জন্য। বাংলাদেশের স্থলসীমা ও সমুদ্রসীমা নির্ধারণের পর শেষ পর্যন্ত তিস্তার পানিবণ্টন সমস্যাও সমাধান হতে যাচ্ছে খুব শিগগিরই। কিন্তু খালেদা জিয়া প্রধানমন্ত্রী হিসেবে ক্ষমতায় থাকা অবস্থায়ও ফারাক্কা পয়েন্টে পদ্মার পানিবণ্টন এবং আমাদের ন্যায্য পাওনা নিশ্চিত করতে পারেননি। ভারত সফর শেষে ঢাকায় ফিরে এসে সাংবাদিকদের পদ্মাসহ অভিন্ন নদীর পানিবণ্টনসংক্রান্ত এক প্রশ্নের জবাবে খালেদা জিয়া বলেছেন, তিনি নাকি সে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করতেই ভুলে গিয়েছিলেন। যাক, তবুও বিএনপি নেতাদের একটি অংশের এখন বোধোদয় হয়েছে যে ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের সম্পর্ক স্বাভাবিক করা প্রয়োজন। সব বৈরী মনোভাব ও বিরোধিতার ঊর্ধ্বে ওঠে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে তোলা আবশ্যক। সে কারণে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী ও ভাইস চেয়ারম্যান আবদুল আউয়াল মিন্টুসহ তিন নেতা সম্প্রতি ভারত সফর করেছেন। তাঁরা বাংলাদেশের নির্বাচন সামনে রেখে ভারতের বিভিন্ন পর‌্যায়ের কয়েকজন নেতৃস্থানীয়ের সঙ্গে কথা বলেছেন। এ উদ্যোগকে অবশ্যই সাধুবাদ জানাতে হবে। এ উদ্যোগে বিএনপির কয়েকজন প্রবীণ নেতা, যাঁরা বিভিন্ন দুর্নীতির মামলায় অভিযুক্ত—খুব একটা খুশি হতে পারেননি। ভারতের সঙ্গে বিএনপির সম্পর্ক দু-একটি সফরেই স্বাভাবিক হয়ে যাবে, তেমনটা আশা করা যায় না। এ ক্ষেত্রে বিভিন্ন পর‌্যায়ের ভারতীয় নেতাদের সঙ্গে নিয়মিতভাবে আলোচনা চালিয়ে যেতে হবে। তথ্যের আদান-প্রদান ও মতবিনিময় করে প্রথমে তাঁদের আস্থা অর্জন করতে হবে। বাংলাদেশে একটি সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ ও অবাধ নির্বাচনের ক্ষেত্রে প্রধান বাধাগুলো কী, তা তাদের বোঝাতে হবে। প্রয়োজন হলে রাজনৈতিক ও অরাজনৈতিক বিভিন্ন সংগঠনের কয়েকজন করে নেতাকে দাওয়াত করে বাংলাদেশে এনে আলোচনা করতে হবে। সে পথ ধরে তাদের কাছে বিএনপিকে নতুন করে দায়িত্বশীল ও সম্পূর্ণ সংগঠিত দল হিসেবে প্রমাণ করতে হবে। এ ক্ষেত্রে দায়িত্ব বিএনপির, তাদের নয়।

বিএনপির বিভিন্ন বিপর্যয়, সাংগঠনিকভাবে অগোছালো অবস্থা এবং বাধা-বিপত্তির মুখেও যে তিনজন নেতা আগামী নির্বাচন সামনে রেখে বিভিন্ন আলোচ্য বিষয় নিয়ে ভারত সফর করেছেন, তাঁদের এখানেই থেমে গেলে চলবে না। এর মধ্য দিয়েই ক্রমে ক্রমে বিএনপি সংগঠিত হবে। আত্মশুদ্ধি হবে নেতাদের। বিভিন্ন রাজনৈতিক শক্তির সঙ্গে বন্ধুত্বের সম্পর্ক গড়ে উঠবে। তাতে উভয় দেশেই উগ্রবাদ, জঙ্গিবাদ, সাম্প্রদায়িকতা ও ধর্মান্ধতা কেটে গিয়ে গণতন্ত্রের একটি প্রকৃত আবহ সৃষ্টি হবে। উভয়ের মনোজগৎ থেকে বিদ্বেষ ও বৈরিতা অপসারিত এবং তৈরি হবে একটি অবস্থার ভিত্তি।

লেখক : স্বাধীনতাপূর্ব ছাত্র ইউনিয়নের একাংশের সভাপতি। বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থার (বাসস) সাবেক প্রধান সম্পাদক ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক
gaziulhkhan@gmail.com

    Print       Email

You might also like...

dav

থাইল্যান্ডে বাংলাদেশিদের ব্যবসা ও বিয়ে

Read More →