Loading...
You are here:  Home  >  ফিচার  >  Current Article

বিলুপ্তির পথে ঐতিহ্যবাহী ঢেঁকি শিল্প

03-151

“ও ধান ভানেরে ঢেঁকিতে পাড় দিয়া, ঢেঁকি নাচে আমি নাচি হেলিয়া দুলিয়া ও ধান ভানেরে………..।
গ্রাম বাংলার মহিলাদের কন্ঠে আগে প্রায়ই শোনা যেত এ ধরনের সুর আর ঢেঁকির ঢিপ ঢিপ শব্দ। বর্তমান যান্ত্রিকতার যুগে এই চির চেনা সুর যেন প্রায়ই হারিয়ে গেছে। কালের বিবর্তনে প্রায় বিলুপ্ত হতে চলেছে কুষ্টিয়া থেকে ঐতিহ্যবাহী ঢেঁকি শিল্প। এক সময় জেলার প্রত্যন্ত গ্রামাঞ্চলে প্রায় সকল বাড়ীতে ছিল ঢেঁকি। কিন্তু এখন আর তেমন চোখে পড়ে না। গ্রামের অভাবগ্রস্থ গরিব অসহায় মহিলাদের উপার্জনের প্রধান উপকরণ ছিল ঢেঁকি। গ্রামের বিত্তশালীদের বাড়ীতে যখন নতুন ধান উঠতো তখন অসহায় অভাবগ্রস্থ মহিলারা ঢেঁকিতে ধান ছেঁটে চাউল বানিয়ে দিতো। তা থেকে তারা যা পেতো তা দিয়েই ছেলে মেয়ে নিয়ে সংসার চলে যেতো।

ঢেঁকিতে ধান ভানতে গিয়ে তারা বিভিন্ন ধরনের হাসি-তামাশার কথা বলতো ও গান গাইতো। অতিতে বিত্তশালীদের বাড়ীতে ঢেঁকি ঐতিহ্য বহন করতো। তাল ও অন্য গাছের গুড়ার (শিকড়ের অংশ) উপর লম্বা কাঠের গুড়ি দিয়ে তৈরী হত ঢেঁকী। শক্ত ধরনের প্রশস্ত গাছ কেটে সটান আকৃতি করে ঢেঁকি তৈরি করা হয়। এর মাথার দিকটা মোটা। আর পিছনের দিকটা চেপ্টা। মাথার দিকে থাকে একটি শুড়। একে বলে মুষল। মুষলের শেষ প্রান্তে লাগানো থাকে লোহার আংতা। কেউবা কাঠ দিয়ে, কেউবা সিমেন্ট দিয়ে আংতা ও মুষল পড়ার জায়গা তৈরি করে। একে বলে নোট। এই নোটের মধ্যেই ফেলানো হয় ধান বা গ্রহস্থদের ফসল।

ঠেকির পেছনের দিকে লাখি দিইে ঠেকির মাথা উঁচু হয়ে ওই ছসলের উপর পড়তে থাকে। এর পরেই ক্রমাগত পাড় দিতে দিতে ধান ভানা হয়ে যায়। গ্রামের ফাঁকা স্থানে বা কোন রকম ছাউনি দিয়ে বাড়ীর এক পাশে তৈরী করা হতো ঢেঁকি ঘর। শীত মৌসুমে ধান ভাঙার পাশাপাশি ঠিকরে কলাই বড়ি বানাতে ঢেঁকি ব্যবহার হতো। সন্ধ্যা হতে গভির রাত পর্যন্ত অথবা খুব ভোরে উঠে মহিলারা ঢেঁকিতে পাড় দিত। সকালের ঘুম ভাঙতো তখন ঢেঁকির ক্যাচ-কুচ, ডুক-ঢাক শব্দে।

ঢেঁকি দিয়ে ধান ভাঙনতে সর্বনিম্ন দুই জন তবে চার জন মহিলা হলে চলতো। কেউ পাড় দেয়, কেউ এলে দেয়। এভাবেই চলে ধান ভানার কাজ। বাড়িতে অতিথি এলে ঢেঁকিতে ধান কুটার তোড়জোড় শুরু হতো। এই নিয়মে চিড়ে, ছাতু তৈরি করা হতো। তারপর গভীর রাত অবধি চলতো রকমারী পিঠা-পায়েস বানানো আর সকাল বেলা ঘুম থেকে উঠে খাওয়ার আমেজটা ছিল খুবই উপভোগ্য।

ঢেঁকি ছাটা চালের ভাত, পেলাও, জাউ আর ফিরনী ছিল অত্যান্ত সুস্বাদু। ঢেঁকিতে কোটা চিড়া আর চালের গুড়ির পিঠার কোন জুড়ি ছিলনা। এসব খাদ্যের সুবাতাস কয়েক বাড়ী পর্যন্ত পৌছে যেত। সে কথা মনে হলে এখন খাওয়ার জন্য মনটা পাগল হয়ে ওঠে। অন্যদিকে ঢেঁকিছাটা চালে প্রচুর ভিটামিন রয়েছে বলে চিকিৎসাবিদরা রুগীকে ঢেঁকি ছাটা চাউলের ভাত খেতে বলতো।

কিন্তু কালের বিবর্তনে আমরা সবই হারাতে বসেছি। আর এখন পিঠা বানানোর অন্যতম উপকরণ চালের গুড়ো বানাতে দু’এক গ্রাম খুঁজলেও ঢেঁকি দেখা মেলা ভার। প্রত্যান্ত গ্রামাঞ্চল থেকে এখন ঢেঁকি প্রায় হারিয়ে যেতে বসেছে। কয়েক বছর আগেও গ্রাম-গঞ্জের বিত্তবানদের বাড়ীতে দেখা যেত ঢেঁকি। এখন ঢেঁকির পরিবর্তে আধুনিক ধান ভাঙ্গার রাইচ মিলে চাল কুটার কাজ চলছে। জেলার যে সব গ্রামে বিদ্যুত পৌছায়নি সেখানে ডিজেলের মেশিন ছাড়াও ভ্যান গাড়িতে শ্যালো ইঞ্জিন নিয়ে বাড়ীতে বাড়ীতে যেয়ে ধান মাড়াই করেন।

যার কারনে গ্রামের অসহায় ও অভাবগ্রস্ত মহিলারা যারা ধান ভেঙে জীবিকা নির্বাহ করতো তারা বিকল্প পথ বেছে নেওয়া ছাড়া অনেকে ভিক্ষা করে দিন অতিবাহিত করছে। জেলার পোড়াদহ গ্রামের সন্ধ্যা রানী অধিকারী (৫৫), মেনকা (৪০), রাবেয়া বেগম (২৮), লিপি আক্তার (৩২), মণিষা (৪২) এ রকম অনেকে জানান, ঢেঁকিতে ভাঙা চাউলের গুড়ার পিটা-পায়েস স্বাধ ছিল অতুলনিয় তাছাড়া পিঠা তৈরী করলে ভাল হতো। ঢেঁকির অভাবে অনেক সময় ইচ্ছা থাকলেও পিঠা তৈরী করে খাওয়া হয় না। তাছাড়া এখন আর কারোর বাড়ীতে ঢেঁকি পাওয়া যায় না।”ঢেঁকির ঢেঁক ঢেকানি আর শোনা যায়না। শুধু নয় জেলার প্রায় সকল অঞ্চল থেকে বিলুপ্তির পথে ঐতিহ্যবাহী ঢেঁকি শিল্প। তাইতো কবির ভাষায় বলি-
“তব রাজপথে চলিছে মোটর সাগরে জাহাজ চলে / রেলপথে চলে রেল ইঞ্জিন দেশ ছেয়ে গেছে কলে।”

    Print       Email

You might also like...

crmuslim

বছরে বাজার হাজার কোটি টাকা

Read More →