Loading...
You are here:  Home  >  এক্সক্লুসিভ  >  Current Article

‘বিশ্বনবী’ গ্রন্থের রচয়িতা কাজী নজরুল ইসলাম

Nozrulশফি চাকলাদার: দৈনিক পত্রিকার ২০১৭-এর প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী সংখ্যায় একটি অতীব গুরুত্বপূর্ণ নিবন্ধ পেলাম। নজরুল গবেষক শেখ দরবার আলম লিখিত নিবন্ধটির শিরোনাম ছিল ‘কবি কাজী নজরুল ইসলামের লেখা ‘বিশ্বনবী’। শেখ দরবার আলম সাহেবকে ধন্যবাদ জানাই যে, তিনি এ বিষয়ে প্রায় দেড় দশক আগেও লিখেছেন। দৈনিক ইনকিলাব পত্রিকায় ২০০৪ সালের ১লা মার্চ ১৪১০ বঙ্গাব্দের ১৮ই ফাল্গুন’ কেবল নজরুলের গান এবং সুর নয়/নজরুলের গ্রন্থও অন্যের নামে’ এই শিরোনাম ছিল সেই লেখাটির। এই গুরুত্বপূর্ণ তথ্যটি আলোড়ন সৃষ্টিকারী তথ্য। তবে আমরা যারা ‘নজরুল’ নিয়ে গবেষণা করে চলেছি তাদের খুব হতবাক করেনি তথ্যটি। কারণ নজরুলের গান, সুর চুরি হয়েছে এতো সবারই জানা, তাই। সেই চুরির সাথে যুক্ত হলো গ্রন্থ চুরি। নজরুলের নাটকও চুরি হয়েছে। এতে এইটুকু বুঝতে বাকি থাকে না যে, ‘নজরুল’ থেকে চুরি করা সহজ এবং যারা এই চুরি করার মানসিকতায় ছিলেন তারা এই ‘সহজ’ বিষয়টি মাথায় রেখে নজরুল-এর আশপাশে যখনই থাকতেন তখনই সুযোগটা নেবার চেষ্টা করতেন এবং সফল্য হয়েছেন প্রায়শই। এতে করে নজরুলের অনেক মূল্যবান গানের সুর এবং বাণী অন্যের নামে চলে গেছে। উদ্ধারও হচ্ছে। একটি উদাহরণ দিয়ে ‘বিশ্বনবী’ বিষয়ে আলোচনা করছি। নজরুলের একটি ভক্তিগীতি ‘সখি সেদিন শ্রাবণে দুলেছিনু ফুলদোলা/হৃদয় যমুনা হয়েছিল উতরোলা’। যারা নজরুলের গান-সুর-বাণী বা সমগ্র ‘নজরুল’ নিয়ে গবেষণা করছেন তারা গানটির ভাষা সুর-গানটিতে যেভাবে করা হয়েছে শুনেই বলতেন শ্রুতি ধরে রেখে যে এ গান নজরুলের অবশ্যই নজরুলের। আমার তো বিশ্বাস, প্রায়ই তিন চারশত গান এভাবে অন্যের নামে সুরে কথায় চলে আসছে। যাক এখানে এ লেখার প্রসঙ্গ আলাদা। নজরুলের ‘বিশ্বনবী’। অবাক-বিস্ময় সৃষ্টি করল শেখ দরবার আলমের এই অতীব গুরুত্বপূর্ণ লেখাটি।
জনাব দরবার আলম সাহেব তার লেখায় যেসব তথ্য দিয়েছেন সেখান থেকেই ধারণা করা সম্ভব যে, গোলাম মোস্তফা সাহেবের যে তথ্যটি তিনি তুলে ধরেছেন, তা নির্ভরযোগ্য। তবে আরো তথ্যাদির প্রয়োজন। দৈনিক ইনকিলাবের সাংবাদিক মেহেদী হাসান পলাশের পিতা শমসের উদ্দিন বিশ্বাসকে নিয়ে শমসের উদ্দিন সাহেবের পিতা আবদুর রহিম বিশ্বাস কলিকাতায় অসুস্থ নজরুলকে দেখতে যান। কবিপুত্র কাজী সব্যসাচী ইসলাম সেই সময় আবদুর রহিম সাহেবকে জিজ্ঞেস করেছিলেন, কোত্থেকে এসেছেন কেন এসেছেন ইত্যাদি ইত্যাদি। সেই সাথে এটাও জিজ্ঞেস করেছিলেন কবি গোলাম মোস্তফাকে চেনেন কিনা। এটা জিজ্ঞেস করার কারণ কবি গোলাম মোস্তফা এবং আবদুর রহিম সাহেবদের বাড়ি ঘটনাক্রমে প্রায় কাছাকাছি। সব্যসাচী ইসলাম ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেছিলেন ‘কবি গোলাম মোস্তফা’ তার বাবাকে দেখতে এসে ‘বিশ্বনবী’ ছাপিয়ে দিতে নিয়ে গিয়ে নিজের নামে ছাপিয়ে নিয়েছেন।’ এই জঘন্যতম ঘটনাটি বুকে চেপে রেখেছিলেন কবিপুত্র কাজী সব্যসাচী ইসলাম। এখানে তাই আগে-ভাগে বলা যায়, যখন গবেষণা করে এটা প্রমাণিত হবে যে, কাজী সব্যসাচী ইসলামের ক্ষোভটা সত্য তখন সাহিত্যাঙ্গনে এদের মুখঢাকা কি সম্ভব হবে? চৌর্যবৃত্তির শ্রেষ্ঠতম (নিকৃষ্টতম) উপহার হয়ে দাঁড়াবে, নয়কি? এ বিষয়ে এখানে একটি তথ্য তুলে ধরতে ইচ্ছে হয়। কিছুটা ক্লু এর থেকে পাওয়া যেতে পারে। ১৩৪০ বঙ্গাব্দ, ১৯৩৩ খৃ.-এর ২৭ নভেম্বর কাব্য আমপারা’ কুরআন শরীফের ৩০ অধ্যায়ের পদ্যানুবাদ প্রকাশ পায়। এই গ্রন্থের ভূমিকা (আরজ)-এ নজরুল কি বলেন সেটা লক্ষ্য করা দরকার। নজরুল বলেন, ‘আমার জীবনের সবচেয়ে বড় সাধ ছিল পবিত্র কুরআন শরীফের বাংলা পদ্যানুবাদ করা। সময় ও সাধ্যের অভাবে এতদিন তা করে উঠতে পারিনি। বহু বছরের সাধনার পর খোদার অনুগ্রহে অন্তত পড়ে বুঝবার মত আরবি-ফারসি ভাষা আয়ত্ত করতে পেরেছি বলে নিজেকে ধন্য মনে করছি।
‘কুরআন’ শরীফের মত মহাগ্রন্থের অনুবাদ করতে আমি কখনো সাহস করতাম না বা তা করবারও দরকার হতো না- যদি আরবি ও বাংলা ভাষায় সমান অভিজ্ঞ কোনো যোগ্য ব্যক্তি এদিকে অবহিত হতেন।’
‘কাব্য আমপারা’ গ্রন্থের আরজটুকুর অংশ উল্লেখ করলাম এই কারণে যে, তার অর্থাৎ কাজী নজরুল ইসলামের কুরআন সম্পর্কে অতি উচ্চ এবং প্রবল জ্ঞান এবং তার প্রকাশের পবিত্রতম মানসিকতা, এর থেকে এটাও ধারণা জন্মে যে, নজরুল তার প্রিয় নবী (সা.) নিয়ে কিছু লেখার যে চেষ্টা করেছিলেন তার একটি একত্রিত জীবনী-সমাহার করার উদগ্র বাসনা। সেই বাসনার একটি প্রতিফলন তৈরি করার আগে বলতে চাই, বাংলা একাডেমী প্রকাশিত নজরুল জন্ম শতবার্ষিকী রচনাবলীর পঞ্চম খ- ১২ ভাদ্র ১৪১৪, ২৭ আগস্ট ২০০৭-এর গ্রন্থ পরিচয়ের ৩৯১ পৃষ্ঠায় ‘কাব্য আমপরা’ (কুরআন শরীফের ৩০ অধ্যায়ের পদ্যানুবাদ) প্রকাশিত হয়- নজরুল ৩০ অধ্যায় (৩০ পারা) পদ্মানুবাদ করেননি নজরুল কুরআন শরীফের ১১৪টি সূরার মধ্যে ৩৮টির অনুবাদ করেছেন। বাংলা একাডেমী উল্লেখিত ৩০ অধ্যায় ঠিক নয়।
‘নজরুল’ প্রসঙ্গে কথা বলতে গেলে অনেক প্রসঙ্গই এসে যায়। তার গান চুরি হওয়া, তার বাণী চুরি হওয়া, তার নাটক, গীতিনাট্য চুরি হওয়া ইত্যাদি ইত্যাদি প্রসঙ্গ তো রয়েছেই। একদম শেষে এসে যুক্ত হয়েছে গ্রন্থ চুরি হওয়ায়। গ্রন্থটি প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়াসাল্লামের জীবনী ‘বিশ্বনবী’। তথ্য এসেছে এটি নজরুলের রচিত। সত্যি কি? যে তথ্য পাওয়ায় গেল তাতে অসত্যেরই বা কি আছে? কারণ নজরুলের নানা ধরনের বিষয়বস্তু চুরি হওয়ার ঘটনা সর্বজন স্বীকৃত। আগেরগুলোর বিষয়ে বলা যাবে, ওগুলো চুরিই। কারণ হিজ মাস্টার্স ভয়েসের রিহার্সাল রুম থেকেই নজরুলের আশপাশে সুহৃদ (?) পরিচয়ের ব্যক্তিরাই খুব সূক্ষভাবে এই ‘চুরি’গুলো করেছে। কিন্তু‘বিশ্বনবী’ গ্রন্থটির বিষয় চুরি নয়। কারণ গ্রন্থটি স্বয়ং নজরুল থেকে নেয়া হয়েছিল প্রকাশ করার নামে এবং নিয়ে এসে ঢাকায় নিজ নামে প্রকাশ করেন গোলাম মোস্তফা সাহেব। এটা তো চুরি নয়- একে ‘রাহাজানি’ বলব না তো কি? নজরুলের সম্পদগুলো এভাবে সুযোগের অপব্যবহার করে যে কনফিউশন সৃষ্টি করার ব্রতীরা সাহিত্যাঙ্গনের কীট সমতুল্য। আমরা জানি, নজরুল প্রিয় নবী (সা.)-এর জীবন পদ্যতে রচা শুরু করেছিলেন, সমাপ্ত যদিও করতে পারেননি তবে ‘বিবাহ’ অবদি যতটুকু করেছেন তা বাংলা সাহিত্যের জন্য অতি মূল্যবান তো বটেই। বাণী, শব্দময়ন, চলন-গতি-ছন্দ মিলিয়ে একাকার হয়ে সাহিত্য-রতœ হিসেবে বিবেচিত হয়ে রয়েছে। যারাই এই গ্রন্থে প্রবেশ করবেন তারাই যথেষ্ট উপকৃত হবেন এবং নজরুলের নবীপ্রীত এবং তার মূল্যায়ন যে কত ঊর্ধ্বে তা অনস্বীকার্য। ‘বিশ্বনবী’ গদ্যে। এখন ‘বিশ্বনবী’ গ্রন্থটির সাথে ‘মরু-ভাস্কর’ কাব্য গ্রন্থটির ভাষাগত, বর্ণনারীতি শব্দ- প্রয়োগের অসাধারণ ব্যুৎপত্তিগুলো গবেষকগণ মিলিয়ে দেখতে পারেন। ‘মরু-ভাস্কর’ এবং বিশ্বনবী’র চলমান বর্ণনাগুলোতে একই হাতের লেখা কিনা খতিয়ে দেকা দরকার। ‘মরু-ভাস্কর’ এর সূচি এবং ‘বিশ্ব-নবী’-এর সূচির চলমানতায় মিল-অমিল রয়েছে কিনা? ‘মরু-ভাস্কর’ কাব্যে চারটি সর্গতে ১৮টি শিরোনাম পাওয়া যায়। কিন্তু ‘মরু-ভাস্কর’ অসম্পূর্ণ। তবে ‘বিশ্বনবী’ পূর্ণ নবী জীবনÑ এখানে শিরোনাম রয়েছে প্রথম খ-ে ৫৮টি এবং দ্বিতীয় খ-ে ১৪টি। ‘বিশ্বনবী’তে ‘শাদী মুবারক’ এবং ‘মরু-ভাস্কর’ কাব্যের শিরোনাম ‘শাদীমুবারক’। ‘খদিজা’ যেখানে মূল এমন বর্ণনায় নজরুল-তুলনা মেলা ভারÑ সামান্য থুলে ধরছি ‘বিশ্বনবী’ থেকেÑ
“একদিন অপরাহ্নে খাদিজা আপন গৃহের চত্বরে দাঁড়াইয়া দিগন্তের পানে চাহিয়া আছেন, এমন সময় দেখিতে পাইলেন মরুভূমির ওপার হইতে উটের পিঠে চড়িয়া মুহম্মদ ফিরিয়া আসিতেছেন। একদৃষ্টে তিনি সেই দিকে চাহিয়া রহিলেন। মনে হইতে লাগিল একটি বেহেশতী রঙিন স্বপ্ন যেন ধীরে ধীরে তাহার নয়ন-পথে রূপায়িত হইয়া উঠিতেছে।”

‘মরু-ভাস্কর’ কাব্যে ‘খদিজা’ পর্বেও এমন সুন্দর সাবলীল কাব্য বর্ণনা পাই-

তরুণ তাপস চলিয়া গেল গো যে পথ বাহি

সকল ভুলিয়া খদিজা রহে গো সে পথ চাহি।

বেলা-শেষে কেন অস্ত-আকাশ বধূর প্রায়

বিবাহের রঙে রাঙা হয়ে ওঠে, কোন মায়ায়!

‘জুলেখার’ মতো অনুরাগ জাগে হৃদয়ে কেন,

মনে মনে ভাবে, এই সে তরুণ ‘য়ুসোফ’ যেন!

দেখেনি য়ুসোফে, তবু মনে হয় ইহার চেয়ে

সুন্দরতর ছিল না সে কভু। বেহেশ্ত বেয়ে

সুন্দরতম ফেরেশতা আজ এসেছে নামি

এল জীবনের গোধূলি-লগনে জীবন-স্বামী!

‘বিশ্বনবী’ গ্রন্থের ত্রয়োদশ পরিচ্ছেদে ‘শাদী মুবারক’ এবং ‘মরু-ভাস্কর’ কাব্যের চতুর্থ সর্গে পাই ‘শাদি মোবারক’। ‘শিরোনাম’ হিসেবে শুধু বিয়ে-প্রসঙ্গ থাকছে তাই নয়। ইতিহাস-তথ্যাদির বর্ণনা শুধু শিরোনামেই সীমাবদ্ধ থাকেনি একাধিক শিরোনামে মিশ্রভাবে জীবনীতে এসেছে। ‘বিশ্বনবী’তে পাইÑ “অন্তরের শুচিতায় এবং শুভ্রতায় এতই তিনি যশস্বিনী হইয়াছিলেন যে, লোকে তাহাকে খাদিজা না বলিয়া ‘তাহিরা’ (পবিত্র) বলিয়া ডাকিত।”

‘মরু-ভাস্কর’-এ পাই-

‘আমিন’ ‘তাহেরা’ সাধু ও সাধ্বী, ইঙ্গিতে ওগো খোদারই যেন

আরববাসীরা না জানিয়া এই নাম দিয়েছিল তাদেরে হেন!

মহান খোদারই ইঙ্গিতে যেন ‘সাধু’ ও সাধ্বী’ মিলিল আসি,

শক্তি আসিয়া সিদ্ধির রূপে সাধনার হাত ধরিল হাসি।

নাফিসা নামের এক মহিলা খাদিজা (রা:)-এর পরম বান্ধবী ছিলেন। এবং বন্ধুত্বের এই ঘনিষ্ঠ কথা একে অন্যেকে বলতেনÑ ‘মরু-ভাস্কর’- এ ‘খদিজা’ পর্বে পাইÑ

ছিল খদিজার আত্মার আত্মীয় সহচরী ‘নাফিসা’ নাম,

কহিল তাহারে অন্তর-ব্যথা, হরেছে কে তার সুখ আরাম!

অনুরাগ-ভরে বেপথু মন

হুহু করে কেন সকল খন,

‘সখী লো, জহর পিইয়া মরিব, না পুরিলে মোর মনস্কাম।

সে বিনে আমার এই দুনিয়ার সব আনন্দ সুখ হারাম।

‘বিশ্বনবী’তেও যেন অনুরণন একই ধরনেরÑ

“নফিসা মুহম্মদের নিকট পৌঁছিয়া প্রসঙ্গটি অতি সুন্দরভাবে উত্থাপন করিলেন।

বলিলেন : আপনি বিবাহ করিতেছেন না কেন?

¯িœগ্ধ হাসি হাসিয়া মুহম্মদ বলিলেন: ‘কে আমাকে বিবাহ করিবে? বিবাহ করিবার মত সামর্থ্য আমার কোথায়?”

নফিসা: “যদি তাহার সুব্যবস্থা হয়?”

মুহম্মদ : “তার মানে?”

নফিসা: মনে করুন যদি কোন সম্ভ্রান্ত ঘরের মহিলা যিনি রূপে-গুণে, ধনে-মানে অতুলনীয়া আপনাকে বিবাহ করিতে চাহেন?”

মুহম্মদ : “কে তিনি? শুণিতে পারি কি?”

নফিসা : “তিনি বিবি খাদিজা।”

নজরুলের অসম্পূর্ণ নবী (সা.) জীবন ‘মরু-ভাস্কর’ কাব্য এবং ‘বিশ্বনবী’ গ্রন্থ যখন একজন মনযোগ দিয়ে পাঠ করবে তারা সেখানে খুঁজে পাবে ‘বিশ্বনবী’র লিখন ‘নজরুলই’। শাদি মুবারক’, খদিজা, এবং সম্প্রদান তিনটি কবিতা মিলে শাদির বর্ণনা ‘মরু ভাস্কর’-এ। সিরিয়া গমন, ব্যবসা বাণিজ্য এবং শাদি পর্যন্ত ঘটনাবলী যে শব্দ চয়নে বর্ণনা হয়েছে তাতে সহজভাবে পাঠকদের সামনে উত্থাপিত হয়েছে তা নজরুলেরই বলতে হবে। এখানে আরো একটু বলতে চাই যে নজরুলের বন্ধু, সুহৃদ বলে পরিচিত যারা ভারত বিভাগের পর পূর্ব পাকিস্তানে চলে এসেছিলেন তারা বিষয়টি জানতেন। শুধু যে নজরুল এবং গোলাম মোস্তফার মধ্যে বিষয়টি ছিল তা নয়। তারা ভেবেছিলেন নজরুল-প্রিয়ড শেষ। স্বার্থপর এই বন্ধু সৃহদেরা ‘নজরুল’ থেকে অনেক নিয়েছে কিন্তু বিনিময় শূন্যতে রেখেছিলেন। তবুও ধন্যবাদ শেখ দরবার আলম সাহেবকে যে বিষয়টি সম্মুখে এনেছেন। তবে ২০০৩ এর পর ফলো-আপ তিনি যদি আরো করতেন সেটা আরো ভালো হত। আশা বরক অচিরেই আরো ফলো আপ পাব।

গদ্য ও পদ্যের বর্ণনা রীতির চলন প্রায় একই ধরনের। ‘প্রতিশ্রুত পয়গম্বর’ ‘বিশ্বনবী’ গ্রন্থের এই পর্বে উপনিষদ তেকে বৌদ্ধ শা¯্র থেকে পার্শী ধর্ম শাস্ত্র থেকে তওরাত থেকে বাইবেল থেকে বেদ পুরান থেকে যে সমুদয় উপমা-উদ্ধৃতি আলোচনা রয়েছে তা প্রমাণ করে এসব নজরুল-আহরিত জ্ঞান ছাড়া অন্য কারো কথা মনেই আসে না। ‘বিশ্বনবী’ গ্রন্থের ‘বিদায় হজ্জ’, পরপারের আহ্বান, মেষ কথা পরিচ্ছদ সমূহের বর্ণনাগুলোর সাথে নজরুলের ফাতেহা দোয়াজ দহম- আবির্ভাব ও তিরোভাব কবিতা দ্বয়ের কাব্যিক বর্ণনায় সামসুস্যতা রয়েছে। তবে নজরুলের ইসলামি গানগুলোতে ছড়িয়ে ছিটিয়ে মুহম্মদ (সা.) নিয়ে সম্ভার রয়েছে সেগুলোকে মনে করে ‘বিশ্বনবীর’ পাতা ওলটালে চলন রীতির মিল পাওয়া যায়। গোলাম মোস্তফা সাহেবের ইসলামী গান তথা ইসলাম-তত্ত্ব নিয়ে তেমন মূল্যবান অবদান তো নেই-ই। ‘বিশ্বনবী’ তাই অত্যন্ত গভীরে গিয়ে মনে করিয়ে দেবে এমন মূল্যবান চলমান বর্ণন রীতি নজরুলেই সম্ভব। পুঙ্খনুপুঙ্খ গভীরে প্রবেশ করলে এর সত্যতা আরো গভীরভাবে ফুটে উঠবে। সবশেষে পুনরায় বলবোÑ কাজী নজরুল ইসলাম থেকে এ গ্রন্থটি প্রকাশ করার ছলে সংগ্রহ করে গোলাম মোস্তফা নিয়ে গেছেÑ এ কথাটি নজরুল তার জ্যেষ্ঠ পুত্র কাজী সব্যসাচী ইসলামকে কেন বলতেন আর কাজী সব্যসাচী ইসলাম কেনইবা গোলাম মোস্তফাকে নিয়ে এমন ক্ষোভ প্রকাশ করবেন এবং গোলাম মোস্তফার একই জেলার বাসিন্দা জনাব আবদুর রহিম বিশ্বাস-এর কাছে? এতবড় সত্য যখন বেরিয়ে এসেছে তখন এটাই বলা দরকার এ গ্রন্থের (‘বিশ্বনবী’) রচয়িতা খোদ কাজী নজরুল ইসলাম।
‘বিশ্বনবী’ গ্রন্থের ‘নামকরণ’ পরিচ্ছেদ এবং ‘মরু-ভাস্কর’ এর ‘দাদা’ কবিতাটি পাশাপাশি রেখে লক্ষ্য করলে এর বর্ণনা-রীতি যে একই কলমের তা ফুটে ওঠে। কবিতার এবং গদ্যের মধ্যে পার্থক্য থাকা স্বাভাবিক কিন্তু এর ঘটনা প্রবাহতে মিল মাঝে মধ্যেই রয়েছে। সামান্য উদ্ধৃতি নি¤েœ দেয়া হলÑ

‘বিশ্বনবী’ নামকরণ’ পরিচ্ছেদ থেকে-

‘সাতদিন পরে আরবের চিরাচরিত প্রথানুযায়ী আবদুল মুত্তালিব শিশুর ‘আকিকা’ উৎসব করিলেন। মক্কার বিশিষ্ট কোরেশ নেতৃবৃন্দ ও আত্মীয়-স্বজনকে দাওয়াত দেওয়া হইল। উৎসব শেষে কোরেশ দলপতিগণ শিশুকে দেখিয়া খুশি হইলেন এবং কৌতূহলী হইয়া জিজ্ঞাসা করিলেন : “শিশুর নাম কি রাখিলেন?”

‘মুহম্মদ’।

কোন এক অদৃশ্য ইঙ্গিতে আবদুল মুত্তালিব এই কথা বলিয়া ফেলিলেন।

“মুহম্মদ! এমন অদ্ভুত নাম ও আমরা কখনও শুনি নাই। দেবতার নামের সঙ্গে নাম মিলাইয়া রাখিলেন না কেন?”

তৎকালে কোরেশ দিগের মধ্যে ইহাই ছিল প্রথা। দেব দেবীদের নামের সঙ্গে মিলাইয়া শিশুর নামকরণ করা হইত।

বৃদ্ধ বলিলেন: “আমার এই ¯েœহের নাতিটি বিশ্ববরেণ্য হইবেÑ সমগ্র জগতে ইহার মহিমা ও প্রশংসা পরিকীর্তিত হইবেÑ এই জন্যই ইহার নাম রাখা হইয়াছে মুহম্মদ।”

‘মরু-ভাস্কর’-এর প্রথম সর্গের ‘দাদা’ থেকেÑ

পৌত্রে ধরিয়া বক্ষে তখনই আসিলেন কা’বা-ঘরে,

বেদি পরে রাখি শিশুরে করেন প্রার্থনা শিশু তরে।

‘আরশে’ থাকিয়া হাসিলেন খোদাÑ নিখিলের শুভ মাগি

আসিল যে মহামানবÑ যাচিছে কল্যাণ তারই লাগি!

ছিল কোরেশের সর্দার যত সে প্রাতে কাবায় বসি

যোগ দিল সেই ‘মুনাজাতে’ সবে আনন্দে উচ্ছ্বসি।

সাতদিন যবে বয়স শিশুর – আরবের প্রথামতো

আসিল ‘আকিকা’ উৎসবে প্রিয় বন্ধু স্বজন যত!

উৎসব শেষে শুধাল সকলে শিশুর কী নাম হবে,

কোন সে নামের কাঁকন পরায়ে পলাতকে বাঁচি লবে।

কহিল মুত্তালিব বুকে চাপি নিখিলের সম্পদ,

“নয়নাভিরাম! এ শিশুর নাম রাখিনু ‘মোহাম্মদ’!”

চমকে উঠিল কোরেশির দল শুনি অভিনব নাম,

কহিল, ‘এ নাম আরবে আমরা প্রথম এ শুনিলাম।

বনি-হাশেমের গোষ্ঠীতে হেন নাম কভু শুনি নাই,

গোষ্ঠী-ছাড়া এ নাম কেন তুমি রাখিলে, শুনিতে চাই!’

আঁখিজল মুছি চুমিয়া শিশুরে কহিলেন পিতামহ –

“এর প্রশংসা রণিয়া উঠুক এ বিশ্বে অহরহ,

তাই এরে কহি ‘মোহাম্মদ’ যে চির-প্রশংসমান,

জানি না এ নাম কেন এল মুখে সহসা মথিয়া প্রাণ।”

    Print       Email

You might also like...

6afed405318d4219e5ce1f58be1a4401-5a1580a4a4885

২৭ নভেম্বর লন্ডনে কারি শিল্পের ‘অস্কার’

Read More →