Loading...
You are here:  Home  >  প্রবন্ধ-নিবন্ধ  >  Current Article

বিশ্ব হেভিওয়েট মোহাম্মদ আলী

Aliশরীফ আবদুল গোফরান: ‘আই অ্যাম দ্য কিং! আই অ্যাম দ্য গ্রেটেস্ট!’ এই কথাগুলো কার, বলতে পারবে? নামটি বললে অবশ্যই তোমরা চিনবে। হ্যাঁ চেনারই তো কথা। বিশ্বের এমন কোন লোক কি আছে, তাকে চেনে না।
১৯৪২ সাল। জানুয়ারি মাস। তখন আমেরিকার লুইসভিল শহরে প্রচণ্ড শীত। সেদিন ছিল ১৭ জানুয়ারি। লুইসভিল শহরের জেনারেল হাসপাতালে জন্ম হয় একটি নিগ্রো শিশুর। শিশুটির জন্মের শুরু থেকেই নানা ঘটনা ঘটতে লাগল হাসপাতালেই নাকি শিশুটি অন্য শিশুর সাথে বদল হয়ে যায়। সেই শীতের রাতে শিশুটিকে খুঁজতে গিয়ে সমস্ত হাসপাতালে হই চই পড়ে যায়। আর এই শিশুটিই তো সর্বকালের বিস্ময়।
নাম ক্যাসিয়াস মার্সেলাস ক্লে। সবাই তাকে ক্লে বলেই ডাকতো। তার বাবা কে ছিলেন জানো? হ্যাঁ, তার বাবা ছিলেন একজন সাধারণ সাইন পেইন্টার। তিনি নামকরা শিল্পী হতে চেয়েছিলেন, কিন্তু শ্বেতাঙ্গদের ষড়যন্ত্রে তার সে আশা আর পূরণ হয়নি। তাই শ্বেতাঙ্গদের ওপর তার খুব রাগ ছিল। বাবার এই মনোভাবটা পরবর্তীতে ক্লের মনেও জেগেছিল।
ছোট বেলা থেকে ক্লে খুব দুরন্ত। তার দুরন্তপনা যেন বয়স বাড়ার সাথে তাল মিলিয়ে বেড়ে চলছিল। তার চেহারাটা ছিল বেশ বড়সড়। তিন-চার বছরের ক্লেকে দেখলে মনে হতো যেন সাত-আট বছরের বালক। ক্লের বয়স যখন তিন বছর, তখন তার আরো একটি ভাইয়ের জন্ম হয়। তার নাম কি জানো? তার নাম রুডলফ। কিন্তু ক্লে তাকে ডাকতো বেবি বলে। যখন বেবি হাঁটতে বা খেলতে শেখে তখন থেকে তারা দু’ভাই বাড়িটাকে মাথায় তুলে রাখতো। তাদের এসব জালাতন সহ্য করতে হতো মা ওডেসাকে। এক সময় দু’জনেই স্কুলে পড়তো। যেতো এক সঙ্গে। অনেক সময় দুষ্টমি করতেই করতেই স্কুলের সময় পার কতো।
একদিনের ঘটনা। ক্লের বয়স তখন ১২। ওর জন্মদিনে বাবা একটা সাইকেল কিনে দিয়েছিলেন। সেদিন দু’ভাই মিলে সাইকেলে চড়ে গিয়েছিল স্কুলে। কিন্তু দুর্ভাগ্য প্রথমদিনেই সাইকেলটি হারিয়ে ফেলে। সাইকেল না পেয়ে দু’ভাইয়ের সেকি কান্না। সাইকেলও খুঁজে পাচ্ছে না, বাড়িও যাচ্ছে না।
সন্ধ্যা হয়ে আসছে। ওদের মা তো চিন্তায় অস্থির। অবশেষে ওরা কাঁদতে কাঁদতে গিয়ে উপস্থিত হলো লুইসভিল শহরের এক পেট্রোল পুলিশ জো-মার্টিনের কাছে। জো-মার্টিন ওদের জড়িয়ে ধরে বলল, এই যে, বাবুরা কাঁদছো কেন? তিনি তাদের আদরে আদরে নিয়ে গেলেন তার বক্সিং শেখার আখড়ায়। সেখানে গিয়ে তাদের মুখে সব কথা শুনলেন। তিনি সব কথা নোটবুকে লিখে নিয়ে সাইকেলটা খুঁজে দেবার আশ্বাস দিলেন। যখন জো-মার্টিন নোটবুকে তাদের অভিযোগগুলো লিখছিলেন তখন ক্লে রাগে শূন্যে ঘুষি ছুঁড়ছিলো। মার্টিন লেখার ফাঁকে ফাঁকে ক্লের ঘুষি ছোঁড়া লক্ষ্য করছিলেন। ক্লের ভাবভঙ্গি দেখে তিনি জিজ্ঞেস করলেন, তোমরা বক্সিং জানো? উত্তরে দু’ভাই বলল, না। মার্টিন আবার বললেন, ‘শিখবে আমার কাছে?’ এবার দু’ভাই চিন্তায় পড়ে গেল।
অনেকক্ষণ চিন্তা করে দু’জন এক সঙ্গে মাথা নাড়ে হ্যাঁ। ক্লে এরি মধ্যে চিন্তা করে ফেলে যে, তাকে বক্সিং শিখে অনেক শক্তিশালী হতে হবে। যাতে সবাই তাকে ভয় পায় তাকে যেমন টিফিনের ভাগ দেয়। ক্লে ছিল ভীষণ পেটুক। সে একাই ৪-৫ জনের খাবার খেয়ে ফেলতে পারতো। মা স্কুলে যাওয়ার সময় তাকে কিছু টিফিন দিয়ে দিতো, ক্লে মাঝ পথেই সব খেয়ে সাবাড় করে ফেলতো। তারপর ঘুষি দেখিয়ে টাকা দিয়ে অন্য ছেলেদের কাছ থেকে টিফিন কিনে নিত। স্কুলে পৌঁছেও আবার সেই হই চই।
এখন ক্লে মার্টিনের আখড়ায় নিয়মিত বক্সিং শিখে। মার্টিন ক্লের মধ্যে উজ্জ্বল প্রতিভার আভাস পেয়েছিলেন। তিনি ক্লেকে নিয়ে নানা স্বপ্ন দেখতে লাগলেন। সেজন্যই তিনি অনুশীলনের ফাঁকে ফাঁকে ক্লেকে ছোটখাটো প্রতিযোগিতায় নামিয়ে তার সাহসের পরখ করছিলেন। প্রথমেই ক্লেকে নামানো হলো গোল্ডেন গ্লাভস প্রতিযোগিতায়। সহজেই ক্লে সে খেতাব ছিনিয়ে আনে। তারপরই ক্লে পেয়েছিল ঙঅট খেতাব। এমনি আরো কয়েকটি প্রতিযোগিতায় ক্লে অংশ নিয়ে বেশ সাফল্য দেখিয়েছিলেন।
এরপরই ক্লের ডাক এলো বিশ্ব অলিম্পিকের জন্য। বিশ্ব অলিম্পিকে চ্যাম্পিয়ন হতে পারলে তার জীবনের মোড় ঘুরে যাবে, এই ভেবে তাকে অনেক সাধনা করতে হয়। অবশেষে সুযোগ করে নিলো বিশ্ব অলিম্পিকে।
সুযোগ হলো, কিন্তু যাওয়া নিয়ে হলো সমস্যা। তখন বিশ্ব অলিম্পিক হচ্ছিলো সানফ্রান্সিসকোতে। প্লেনে যেতে হয় সেখানে। কিন্তু ক্লে যে প্লেনে উঠতে ভয় পায়। অবশেষে সব ভয় দূর করে গিয়ে পৌঁছলেন সানফ্রান্সিসকোতে। প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ করে ক্লে হয়ে গেলো বিশ্ব অলিম্পিক চ্যাম্পিয়ন।
বিশ্ব অলিম্পিকের সোনার মেডেল এখন ক্লের গলায়। বিশ্বের কোটি কোটি মানুষ জেনে গিয়েছে তার সাফল্যের কথা। কিন্তু বাবার আদেশে এ সময় ক্লে তার প্রশিক্ষক জো মার্টিনের সাথে সম্পর্কচ্যুতি ঘটালো। ক্লের সাফল্যের পরই কয়েকজন কোটিপতি মিলে গড়েছিলো ‘দি লুইসভিল স্পনসরনিং গ্রুপ’। ঠিক হলো যে, ক্লের সব আয় ঐ গ্রুপের সদস্যদের মধ্যে ভাগ হবে। বিনিময়ে চুক্তিতে সই করার জন্য দেয়া হবে দশ হাজার স্টার্লিং। সেই সাথে ক্লের রোজগারের ১৫ শতাংশ ভবিষ্যতের জন্য সঞ্চয় করা হবে। ৩৫ বছর পর সেই টাকায় হাত দেয়া যাবে। তারাই বলে দেবে ক্লে কখন কোথায় কার সাথে লড়বে।
১৯৬০ সালের ২৯ অক্টোবর। পেশাদারী লড়িয়ে হিসেবে ক্লে তার জীবনের প্রথম লড়াই করেছিলো টুথি হাস্কারের সাথে। জিতে গেলো ক্লে। এরপর ক্লে হারালো পর্যায়ক্রমে ব্যাংকস, আচিমুর, কুপার, বেসম্যানফ প্রভৃতি নাম করা মুষ্টিযোদ্ধাকে। এরপরই এলো ক্লের স্মরণীয় দিন। তখন বিশ্ব হেভিওয়েট চ্যাম্পিয়ন সনি লিস্টন। আর সেই নিগ্রো বক্সার ক্যাসিয়াস ক্লে হারিয়ে দিলো লিস্টনকে। ছিনিয়ে নিলো বিশ্ব হেভিওয়েট চ্যাম্পিয়নের খেতাব। ঘটনাটি ঘটেছিল ১৯৬৪ সালের ২৪ ফেব্রুয়ারি।
এর তিন দিন পরই ২৭ ফেব্রুয়ারি ক্লে ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেন। সেদিন ক্লে কী বলেছিলেন জানো? ‘আমি নতুন আলোর সন্ধান পেয়েছি।’ মুহাম্মদ (সা.)-এর শিষ্যত্ব গ্রহণ করে। তিনি শুরু করেন নতুন জীবন। সাথে সাথে নাম পাল্টিয়ে রাখা হলো ‘মোহাম্মদ আলী’। সবাই আমাকে বলবেন, ‘বিশ্ব হেভিওয়েট মোহাম্মদ আলী। ক্যাসিয়াস মার্সেলাস ক্লে নয়’।
বন্ধুরা সর্বকালের সেরা বক্সিং হিরো বিশ্ব হেভিওয়েট মোহাম্মদ আলী আজ আর আমাদের মাঝে নেই। তিনি অ্যারিজোনার ফিনিক্সের একটি হাসপাতালে গত ৫ জুন শনিবার ইন্তিকাল করেন। (ইন্না লিল্লাহে ওয়া ইন্না ইলাইহে রাজেউন) মৃত্যুকালে তার বয়স কত হয়েছিল জানো? ৭৪ বছর। তার চির প্রস্থানে শোকে স্তম্ভিত যেন সারা বিশ্ব। চলো না আমরা সবাই আল্লাহর কাছে দু’হাত তুলে এই বীর পুরুষের জন্য দোয়া করি, আল্লাহ যেন তাঁকে জান্নাতবাসি করেন।

    Print       Email

You might also like...

cab6cf692901860d98777fd4fcebd2a5-59e095566d79d

চীন ও ভারতের চেয়ে বেশি প্রবৃদ্ধি বাংলাদেশে

Read More →