Loading...
You are here:  Home  >  এক্সক্লুসিভ  >  Current Article

ব্রিটিশ নির্বাচন কি মের জন্য দুঃস্বপ্ন হবে?

british election
গত বছর এই সময়ে যিনি ব্রিটেনের প্রধানমন্ত্রী ছিলেন, সেই ডেভিড ক্যামেরনের এখন অখণ্ড অবসর। ব্রিটেনের দৈনিক দ্য টেলিগ্রাফ ১ জুন তাঁর ও তাঁর স্ত্রীর পায়ের ছবি ছেপেছে। তাঁরা দুজনে অস্ট্রেলিয়ায় ২১তম বিবাহবার্ষিকী পালন করছিলেন, তাঁর স্ত্রী ইনস্টাগ্রামে তাঁদের রোমান্টিক সময়ের ওই ছবি প্রকাশ করেন; টেলিগ্রাফসহ ব্রিটিশ পত্রপত্রিকাগুলোয় তার ওপর প্রতিবেদন ছাপায়। ২০১৫তে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দ্বিতীয় মেয়াদ শুরুর মাত্র এক বছরের মধ্যে বিদায় নিতে হয়েছিল ডেভিড ক্যামেরনকে। ২৩ জুন তিনি যে গণভোট দেন, তাতে তাঁর পরাজয় হয়। কেননা, তিনি ইউরোপের জোটে থাকার পক্ষে থাকলেও গণভোটের রায় আসে বিচ্ছেদের। সেই ব্রেক্সিট নিয়েই কনজারভেটিভ পার্টির দ্বিতীয় আরেকজন প্রধানমন্ত্রী এখন ভাগ্যপরীক্ষার মুখে। এই দ্বিতীয় প্রধানমন্ত্রী—থেরেসা মের আরও অন্তত তিন বছর ক্ষমতায় থাকার কথা থাকলেও তিনি ব্রেক্সিট ইস্যুকে পুঁজি করে আরও ক্ষমতায়িত হওয়ার সুযোগ নিতে চেয়েছিলেন। তাঁর জন্য পরিস্থিতি যতটা অনুকূল ছিল, তেমনটি খুব একটা দেখা যায় না। সুতরাং আজ ব্রিটেনে যে সাধারণ নির্বাচন হচ্ছে তাতে বিরোধী দল লেবার পার্টি জিতবে কি না, সেই প্রশ্ন কেউ করছে না। সবার প্রশ্ন, থেরেসা মে থাকবেন নাকি তাঁকেও ক্যামেরনের মতো বিদায় নিতে হবে।
গণতান্ত্রিক রাজনীতির গতিবিধি নিয়ে ভবিষ্যদ্বাণী করা যায় না। থেরেসা মে যখন নির্বাচনের ঘোষণা দেন, তখন তাঁর দল টোরি পার্টি জাতীয় পর্যায়ে প্রতিদ্বন্দ্বী লেবার পার্টির থেকে অন্তত কুড়ি পয়েন্টের ব্যবধানে এগিয়ে ছিল। আর থেরেসা মে জেরেমি করবিনের চেয়ে অন্তত দ্বিগুণ জনসমর্থন পেয়ে আসছিলেন। টোরি পার্টির নেতৃত্বে থেরেসা মে যখন দ্বিতীয় লৌহমানবীর আসনে তাঁর অবস্থান সংহত করায় নজর দিয়েছেন, তখন সন্ত্রাসীদের (আইআরএ এবং হামাস) সঙ্গে সখ্য এবং পরমাণু অস্ত্র বিরোধিতার ব্যাখ্যা দেওয়ায় নাজেহাল করবিন। অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনা, বৈদেশিক সম্পর্ক, নাগরিক ও রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা—এগুলোর প্রতিটিতে টোরিদের প্রতি ভোটারদের আস্থার হার ছিল অনেক বেশি। লেবার পার্টির অন্তর্দ্বন্দ্ব, বিশেষ করে জেরেমি করবিনের প্রতি দলের সংখ্যাগরিষ্ঠ এমপির অনাস্থা দলটিকে প্রায় খাদের কিনারায় নিয়ে গিয়েছিল। তাই ধরে নেওয়া হয়েছিল যে থেরেসা মে লেবার পার্টিকে আরও কাবু করার উদ্দেশ্যেই আগাম নির্বাচন দিয়েছেন। প্রতিপক্ষের দুর্দিনে তার ওপর চাপ বাড়ানোর সুবিধাবাদী কৌশল অনুসরণের কারণে অনেকেই থেরেসা মেকে ধূর্ত রাজনীতিক হিসেবে সমীহ করতে শুরু করেছিলেন।
কিন্তু নির্বাচনী প্রচার শুরুর পর মাত্র তিন সপ্তাহে পালে উল্টো হাওয়ার ধাক্কা লেগেছে। সর্বশেষ জনমত জরিপগুলো বলছে, লেবার পার্টি এখন টোরিদের ধরে ফেলেছে। একটি জরিপে লেবার এগিয়ে আছে শূন্য দশমিক ৫ শতাংশ ব্যবধানে। আবার থেরেসা মের নেতৃত্বের প্রতি আস্থা কমেছে যে পরিমাণে, প্রায় সেই একই পরিমাণে করবিনের প্রতি আস্থা বেড়েছে। টোরিদের ভোটের ঝুড়িতে যেমন প্রবীণদের সংখ্যা বেশি, তেমনি তরুণদের প্রবণতা লেবারমুখী-প্রগতিশীল। তার ওপর জেরেমি করবিনের সততা ও সারল্য তরুণদের দারুণভাবে আকৃষ্ট করেছে। ব্রিটিশ অভিজাত শ্রেণির স্বার্থবাদিতা ও প্রাতিষ্ঠানিকতার বিরুদ্ধে আজীবন প্রতিবাদী করবিনের সরকার পরিচালনার অভিজ্ঞতা না থাকাকেই ভোটারদের অনেকে, বিশেষভাবে তরুণেরা ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন, তাঁরা করবিনকে একবার সুযোগ দেওয়ার পক্ষপাতী। তাঁর নির্বাচনী প্রচারে জনসমাগম নজিরবিহীন। জনমত জরিপে দেখা যাচ্ছে, ত্রিশের নিচে বয়সী ভোটারদের যত শতাংশ করবিনকে ভোট দেবেন, থেরেসা মেকে দেবেন তার অর্ধেক। তবে জনমত জরিপের বিশেষজ্ঞরা এসব তরুণের ওপর খুব একটা আস্থাশীল নন। কেননা, ভোটকেন্দ্রে তাঁদের হাজিরার হার ঐতিহাসিকভাবেই কম। তবে ভোটার রেজিস্ট্রেশনে এবার তরুণেরাই এগিয়ে আছেন।
থেরেসা মে এই নির্বাচন আহ্বানের সময় একটিই কারণ দেখিয়েছেন। সেটি হলো ব্রেক্সিট। তিনি বলেছিলেন, ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে বিচ্ছেদের আলোচনায় ব্রিটেনের পক্ষে শক্ত দর-কষাকষির জন্য যে দৃঢ় নেতৃত্ব প্রয়োজন, সেই ম্যান্ডেটের জন্যই এই নির্বাচন। ভোট শুরুর মাত্র ৩৬ ঘণ্টা আগে মঙ্গলবার রাতে টেলিভিশন বিজ্ঞাপনেও তাঁর সেই একই কথা। বস্তুত ব্রেক্সিট ছাড়া অন্য কোনো ইস্যুই ওই বিজ্ঞাপনে নেই। নির্বাচনের মাত্র দিন দশেকের মধ্যেই ইউরোপীয় ইউনিয়নের প্রতিনিধিদের সঙ্গে ব্রিটেনের আনুষ্ঠানিক আলোচনা শুরু হওয়ার কথা। মের দাবি, ওই আলোচনার জন্য তাঁর দলের কোনো বিকল্প নেই। কিন্তু নির্বাচনী বিতর্ক এবং প্রচারে তিনি আগেই বলে দিয়েছেন যে খারাপ কোনো সমঝোতার চেয়ে কোনো ধরনের রফা ছাড়াই বিচ্ছেদ ঘটা ভালো। বিভিন্ন বণিক সভা, পেশাজীবী গোষ্ঠী, গবেষণা প্রতিষ্ঠান—সবাই হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছে যে কোনো ধরনের সমঝোতা ছাড়া বিচ্ছেদ হলে ব্রিটিশ অর্থনীতি সংকটে পড়বে, শিল্প ও বাণিজ্য ক্ষতিগ্রস্ত হবে। ইউরোপ থেকে আলাদা হওয়ার প্রশ্নে যাঁরা কট্টর অবস্থান নিয়েছেন, তাঁরা ছাড়া অন্যরা ব্রেক্সিট প্রশ্নে থেরেসা মের প্রতি আস্থা রাখতে পারছেন না।
এই নির্বাচনে আর ব্রেক্সিটের ভোট নেই। কৃচ্ছ্র ও ধনী-দরিদ্রের বৈষম্যের প্রশ্নই এখন নির্বাচনের বড় ইস্যু। সরকারি খাতে ব্যয় কমিয়ে স্বাস্থ্য-শিক্ষা-পরিবহন খাতে নাগরিকদের সেবা সংকুচিত করার টোরি নীতির বিপরীতে লেবার পার্টি এসব খাতে অগ্রাধিকারের ভিত্তিতে বিনিয়োগ বাড়ানোর অঙ্গীকার করেছে। রেলওয়ে ও ডাক বিভাগকে আবারও জাতীয়করণের কথা বলেছে। বিশ্ববিদ্যালয়ে টিউশন ফি যেখানে বাড়ার কথা, লেবার সেটি বাতিলের কথা বলেছে। টোরি পার্টি যেখানে বৃহৎ করপোরেশন ও উচ্চ আয়ের লোকজনের জন্য কর ছাড়ের ঘোষণা দিয়েছে, লেবার সেখানে করপোরেট ও সম্পদশালীদের জন্য কর বৃদ্ধির ঘোষণা দিয়েছে। লেবার পার্টি বলছে, তাদের কর নীতিতে ৯৫ শতাংশের কোনো কর বাড়বে না, কিন্তু ৫ শতাংশের ক্ষেত্রে করের হার হবে বেশি।
যে নির্বাচনকে থেরেসা মে তাঁর ক্ষমতা আরও সংহত করার হাতিয়ার বলে ধরে নিয়েছিলেন, সেই নির্বাচন আহ্বানই তাঁর জন্য বড় বিড়ম্বনার কারণ হয়ে দাঁড়ায়। প্রধানমন্ত্রিত্বের শুরু থেকেই বিভিন্ন সময়ে তিনি আগাম নির্বাচনের সম্ভাবনা নাকচ করে এলেও হঠাৎ করে নির্বাচন আহ্বান সমালোচকদের ব্যঙ্গবিদ্রূপের বিষয় হয়। একবার সিদ্ধান্ত পাল্টালে সেটা হয়তো উপেক্ষা করা যেতে পারে। কিন্তু বারবার সিদ্ধান্ত পাল্টালে সেই নেতৃত্বকে তো আর কেউ দৃঢ় ও স্থিতিশীল বলে মানবে না। থেরেসা মে নিজেকে দৃঢ় ও স্থিতিশীল দাবি করলেও নির্বাচন ঘোষণার আগে বাজেটেও একবার সিদ্ধান্ত বদলেছেন। সর্বশেষ ম্যানিফেস্টোতেও প্রবীণদের পরিচর্যার দায়িত্ব-প্রশ্নে তিনি গোলমাল করে ফেলেন।
থেরেসা মের দুর্যোগ যেন কাটছেই না। ২২ মে ম্যানচেস্টারে এবং গত শনিবার লন্ডন ব্রিজে যে দুটি সন্ত্রাসী হামলা হলো তার প্রতিক্রিয়াও তাঁর জন্য ভালো হয়নি। অথচ নিরাপত্তা ও প্রতিরক্ষা ইস্যুতে টোরি পার্টিরই সুবিধা হওয়ার কথা। হামলাকারীদের পরিচয় প্রকাশের পর জানা যাচ্ছে, ম্যানচেস্টারের হামলাকারী ও লন্ডন হামলাকারীদের একজনের উগ্রবাদী তৎপরতার বিষয়ে পুলিশের কাছে আগেই তথ্য ছিল। কিন্তু তাদের ওপর পুলিশের নিবিড় নজরদারি বজায় ছিল না। অভিযোগ উঠেছে, পুলিশের বরাদ্দ কমায় তাদের সদস্যসংখ্যা কমেছে প্রায় সাড়ে ২২ হাজার। তাদের সামর্থ্যও কমেছে। আর তা যখন হয়েছে, তখন থেরেসা মে হয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী, নয়তো প্রধানমন্ত্রী।
নির্বাচনের সম্ভাব্য ফল নিয়ে এখন যেসব জল্পনা চলছে তাতে বলতেই হবে থেরেসা মের নেতৃত্ব এখন গুরুতর চ্যালেঞ্জের মুখে। ভোট বিশেষজ্ঞরা বলছেন, লেবার পার্টির ভোট বাড়লেও পার্লামেন্টারি আসনবিন্যাসের কারণে কনজারভেটিভ পার্টির সংখ্যাগরিষ্ঠতা বজায় থাকার সম্ভাবনাই প্রবল। বিলুপ্ত পার্লামেন্টে সাড়ে ৬০০ আসনের মধ্যে কনজারভেটিভদের ছিল ৩৩০টি, ৫ আসনের ব্যবধানে সাধারণ সংখ্যাগরিষ্ঠতা। লেবার পার্টির ছিল ২২৯ এবং তৃতীয় বৃহত্তম দল স্কটিশ জাতীয়তাবাদী এসএনপির ছিল ৫৪টি। থেরেসা মের আশা ছিল তিনি তাঁর দলীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতার ব্যবধান সম্মিলিত বিরোধীদের সংখ্যার চেয়ে অন্তত ১০০টি বাড়াতে পারবেন। শুরুর জনমত সমীক্ষায় বলা হচ্ছিল তিনি আশাতিরিক্ত সাফল্য পেতে চলেছেন। কিন্তু শেষ মুহূর্তের প্রচারে থেরেসা মে ব্রেক্সিটপন্থীদের প্রতি তাঁর শেষ আবেদনে বলেছেন, মাত্র ৬টি আসন যদি হাতছাড়া হয়ে যায় তাহলে ব্রেক্সিটে জটিলতা দেখা দেবে, জেরেমি করবিন প্রধানমন্ত্রীর আসনে আসীন হবেন।
বোঝাই যাচ্ছে থেরেসা মে ক্ষমতা হারানোর শঙ্কায় আছেন। আসলে বাস্তবতা হচ্ছে, কনজারভেটিভ পার্টির মিত্র হতে পারে মাত্র দুটি দল—ইউকিপ এবং উত্তর আয়ারল্যান্ডের ব্রিটিশ রাজতন্ত্রপন্থী দল আলস্টার ও ডেমোক্রেটিক ইউনিয়নিস্ট পার্টি। বাস্তবে ইউকিপ অনেকটাই বিলীন হয়ে গেছে কনজারভেটিভ পার্টির ধারায় এবং এবারের নির্বাচনে তাদের কোনো আসন পাওয়ার সম্ভাবনা শূন্য। আলস্টার ইউনিয়নিস্টদের আসনসংখ্যা হাতে গোনা, যা সংখ্যাগরিষ্ঠতার জন্য যথেষ্ট নয়। ফলে থেরেসা মের দল একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেলেও সরকার গঠনের মতো যথেষ্ট সমর্থন তাদের না থাকার সম্ভাবনা প্রবল। দীর্ঘ সাত বছরের কৃচ্ছ্রসাধন কর্মসূচিতে অতিষ্ঠ বাম ও উদারপন্থী দলগুলো তাই আনুষ্ঠানিক জোট না হলেও জেরেমি করবিনকে সংখ্যালঘু সরকার গঠনে সহায়তা করতে পারে। এসএনপি এবং গ্রিন পার্টি ইতিমধ্যেই সে রকম কথা বলেছে। লিবারেল ডেমোক্র্যাটরা তেমন কথা না বললেও ধরে নেওয়া যায় তারাও সেই পথে হাঁটবে। কেননা, আরও একবার টোরিদের সঙ্গে মিত্রতা হবে তাদের আত্মহত্যার শামিল।
তবে, আরও মজার বিষয় হচ্ছে, থেরেসা মে সরকার গঠনের মতো সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেলেও তাঁর প্রধানমন্ত্রীর পদটি মোটেও নিশ্চিত নয়। ইতিমধ্যেই কথা উঠেছে যতটা ব্যবধানে তাঁর সংখ্যাগরিষ্ঠতা ছিল তা যদি একটিও কমে, তাহলে তাঁর নেতৃত্ব দলের ভেতরেই চ্যালেঞ্জের মুখে পড়বে। ব্রেক্সিটের দর-কষাকষিতেও তাঁর কবজিতে সেই জোর থাকবে না। ফলে থেরেসা মের দুর্বল বিজয় পরাজয়েরই নামান্তর হয়ে উঠতে পারে।

কামাল আহমেদ: সাংবাদিক।

    Print       Email

You might also like...

_97945049_gettyimages-509148854

মিয়ানমারের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা উচিত: জাতিসংঘের মানবাধিকার বিষয়ক প্রধান

Read More →