Loading...
You are here:  Home  >  প্রবন্ধ-নিবন্ধ  >  Current Article

ব্রেক্সিটের ভবিষ্যৎ

Stজোসেফ ই স্টিগলিজ: বিশ্বব্যাংকের সাবেক মুখ্য অর্থনীতিবিদ জোসেফ ই স্টিগলিজ যুক্তরাষ্ট্রের কলাম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক। তিনি অর্থনীতিতে ২০০১ সালে নোবেল পুরস্কার লাভ করেন। প্রেসিডেন্ট ক্লিন্টনের সময় তিনি অর্থনৈতিক উপদেষ্টা হিসেবে কাজ করেন। জোসেফ স্টিগলিজের এই সাম্প্রতিক রচনায় ব্রেক্সিটোত্তর অর্থনৈতিক পরিস্থিতির ওপর আলোকপাত করা হয়েছে। প্রজেক্ট সিন্ডিকেটে প্রকাশিত এই লেখাটির অনুবাদ করেছেন তানজিলা কাওকাব।
ব্রিটেন, ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) ও পুরো বিশ্বের ব্রেক্সিট হজম করতে বেশ অনেকটা সময় লেগে যাবে। অবধারিতভাবেই এ ব্যাপারে সবচেয়ে তীব্র প্রতিক্রিয়াটি দেখিয়েছে ইইউ। গোড়ার দিকে বেশির ভাগ লোকেরই ধারণা ছিল, ‘এ নিয়ে থুথু ছিটিয়ে নিজের নাক কাটাবে না সংস্থাটি।’ কারণ এই বিচ্ছেদ সবার সম্মতিতেই হতে যাচ্ছে। যদিও বিচ্ছেদের সময় অনেকেই তাল সামলাতে পারে না। আর ঠিক এই ঘটনাটিই ঘটেছে ইইউর ক্ষেত্রে।
বাণিজ্য ও অর্র্থনৈতিকভাবে যে সঙ্কট বা সুবিধা হবে তা যুক্তরাজ্য ও ইইউর পারস্পরিক। যুক্তরাজ্য যদি মনে করে ইইউর সাথে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রক্ষা করলে তারা লাভবান হবে তাহলে তাদের নেতারা বিষয়টি নিশ্চিত করতে পারেন। তবে ইউরোপীয় কমিশনের প্রেসিডেন্ট জ্যাঁ ক্লদ জুঙ্কার এ ক্ষেত্রে কঠিন অবস্থান নিয়েছেন। তিনি স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন, ‘চলে যাওয়া মানেই প্রস্থান।’
তার এই তীব্র প্রতিক্রিয়ার কারণ বোঝা কঠিন নয়। তার যুক্তি, অন্য সদস্য দেশগুলোর সংগঠন ছাড়া ঠেকাতেই ইইউকে শক্ত হতে হবে। আর এ জন্যই যুক্তরাজ্যকে কোনো ছাড় দিতে রাজি নন তিনি। অর্থনৈতিক অগ্রগতি, সংহতি আর ইউরোপীয় হওয়ার গৌরবই যথেষ্ট নয়। জুঙ্কারের মতে, হুমকি বা ভীতির ক্ষেত্রেও ইউরোপকে ঐক্যবদ্ধ থাকতে হবে। তবে এই পরিস্থিতিতে একটি বিষয় অনেকেই এড়িয়ে যাচ্ছেন। প্রথমত ব্রেক্সিট ভোট এবং দ্বিতীয়ত যুক্তরাষ্ট্রের রিপাবলিকান দলের প্রাইমারি। এই দু’টি পরিস্থিতি সৃষ্টির জন্য মূলত দায়ী একেবারে সাধারণ মানুষের জন্য কিছু করতে না পারা। গত চার দশক ধরে যে নব্য উদারবাদী নীতির বাস্তবায়ন চলছে, তাতে শীর্ষে থাকা এক শতাংশ লোক উপকৃত হলেও বাকিদের ভাগ্য ফেরেনি। দীর্ঘ দিন ধরেই আশঙ্কা ছিল, এই পিছিয়ে পড়ার বিষয়টির রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়া একসময় দৃশ্যমান হবে। আর এখন ঠিক সেই বিষয়টিই ঘটছে।
আটলান্টিকের দুই পাড়ের মানুষই নিজেদের দুঃখ-দুর্দশার জন্য বাণিজ্য চুক্তিগুলোকে দায়ী করছে। বোঝার সুবিধার জন্যই বিষয়টিকে অতি সরল করা হলো। আজকাল বাণিজ্য চুক্তিগুলোর আলোচনা হয় আড়ালে। করপোরেট স্বার্থ রক্ষা করে। যেখানে সাধারণ নাগরিক বা শ্রমিকেরা ভাত পায় না। ফলাফলও একতরফা। শ্রমিকদের দরকষাকষির সুযোগ আরো সীমিত হয়ে গেছে।
বাণিজ্য চুক্তিগুলোর কারণেই বৈষম্য সৃষ্টি হয়েছে। আর ক্ষমতার কেন্দ্র হয়েছে রাজধানীগুলো। ফার্মাসিউটিক্যালসের মতো বুদ্ধিবৃত্তিক কোম্পানির সংখ্যা বেড়েছে। বেড়েছে জিনিসের দাম। যদিও শ্রমিকদের মজুরি কমছে। বাড়ছে বৈষম্য। উন্নত দেশগুলোর সব শহরেই এখন নজরে পড়বে এই চিত্র।
শ্রমিকদের জন্য এক ধরনের অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা সৃষ্টি হয়েছে। এর সাথে যোগ হয়েছে অভিবাসন। দুইয়ে মিলে বিষাক্ত পরিস্থিতি সৃষ্টি করেছে। এসব শরণার্থীর অনেকেই যুদ্ধ বা নির্যাতনের শিকার। যার পিছে পশ্চিমাদের ভূমিকাই মুখ্য। এদের সহায়তা করা সবারই নৈতিক দায়িত্ব। তবে এ ক্ষেত্রে সাবেক ঔপনিবেশিক শক্তিগুলোকে বিশেষ ব্যবস্থা নিতে হবে।
পাশাপাশি এও অস্বীকার করা যায় না, কম দক্ষ শ্রমিকদের সংখ্যা বাড়ছে। শ্রমের মূল্য কমে যাওয়ার এটিও একটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ। তবে মজুরি কমানোরও একটা সীমা আছে। সেই সীমায় পৌঁছে গেলে বেকারত্ব বাড়ে। যেসব দেশে অর্থনৈতিক অব্যবস্থাপনা বেশি, সেসব দেশে বেকারত্বের হারও বেশি। সাম্প্রতিক দশকগুলোতে ইউরোজোনে অব্যবস্থাপনা বেড়েছে। গড়পড়তায় এই অঞ্চলে বেকারত্বের হার এরই মধ্যে দুই অঙ্কের সংখ্যায় পৌঁছে গেছে।
ইউরোপে অবাধ চলাচলের সুযোগ শরণার্থীর ঢল নামার পর সঙ্কট সৃষ্টি করেছে। বেকারত্বের সঙ্কটের মধ্যে অভিবাসীরা ইউরোপের দেশগুলোতে গিয়ে সস্তায় কাজ করছে। এতে মালিকরা লাভবান হলেও ওই দেশগুলোর নাগরিকেরা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
ইউরোজোনের ভেতরে অবাধ চলাচলের সুযোগে ক্ষেত্রবিশেষে লাভজনক। বিশেষ করে যেসব দেশের সামাজিক নিরাপত্তা, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবার মান উন্নত নয়, সেসব দেশের নাগরিকেরা সমৃদ্ধ দেশগুলোতে যেতে চাইতেই পারে। তবে উন্নত দেশগুলোর ক্ষেত্রে বিষয়টি একেবারে বিপরীত। এই চাপ সবচেয়ে বিরূপ প্রভাব ফেলে মধ্যবিত্ত শ্রেণীর ওপর। আটলান্টিকের দুই পাড়েই এ দৃশ্য দেখা যায়। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির ছাপ মধ্যবিত্ত বা শ্রমজীবী শ্রেণীর মানুষের বাড়িতে পড়ে না। এই শ্রেণীর লোকেরা ২০০৮ সালে ব্যাংকের সঙ্কট দেখেছে। এও দেখেছে, শত কোটি ডলার খরচ করা হচ্ছে ব্যাংকগুলোকে বাঁচাতে। অন্য দিকে, তাদের জীবন-জীবিকা রক্ষায় আসছে সামান্য কিছু অনুদান। যুক্তরাষ্ট্রে চার দশক আগে একজন পুরুষ শ্রমিক যে মজুরিতে কাজ শুরু করত এখন তার পরিমাণ কমেছে। কাজেই ক্ষুব্ধ মানুষ নির্বাচনের সময় এ নিয়ে প্রতিক্রিয়া দেখাবে- এটাই স্বাভাবিক।
রাজনীতিকেরা বারবারই পরিবর্তনের কথা শুনিয়েছেন। কিন্তু কাজের ক্ষেত্রে সেই কাক্সিক্ষত পরিবর্তনের দেখা মেলেনি। সাধারণ নাগরিকেরা জানেন, প্রচলিত ব্যবস্থায় গলদ আছে। কিন্তু পরিস্থিতির মধ্যে পড়লে তারা বুঝতে পারে, ধারণার চেয়েও বেশি অন্যায় চলছে সেখানে। ফলে প্রতিষ্ঠিত রাজনীতিকদের ওপর থেকে তারা আস্থা হারিয়েছে, ব্যবস্থায় পরিবর্তন আনার কোনো আগ্রহও আর তাদের মধ্যে অবশিষ্ট নেই। আর এ কারণেই নতুনদের দিকে ঝুঁকছে তারা।
তবে তাদের এও বুঝতে হবে যে, ক্ষুব্ধ হয়ে ভোট দিলেই সমস্যার সমাধান হবে না। বরং তা রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক পরিস্থিতিকে আরো সঙ্কটের মুখে ঠেলে দেবে।
ব্রেক্সিটের সবচেয়ে বড় শিক্ষাটি হলো, প্রতিটি ইউরোপীয় দেশের সরকারকেই তাদের সাধারণ নাগরিকদের দিকে তাকাতে হবে। তাদের অবস্থা, ভাগ্যোন্নয়নই হওয়া উচিত সরকারগুলোর প্রাথমিক লক্ষ্য। অতি উদারনীতি এ ক্ষেত্রে কাজ করবে না। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, ভালো ব্যবস্থাপনা হলে মুক্তবাণিজ্য সমৃদ্ধি আনে। কিন্তু ব্যবস্থাপনা ঠিক রাখা না গেলে তা সাধারণ মানুষের জীবনযাপনের মান নিম্নমুখী করে।

    Print       Email

You might also like...

10297_121

ইসরাইলের জন্ম : ইতিহাসের কালো অধ্যায়

Read More →