Loading...
You are here:  Home  >  প্রবন্ধ-নিবন্ধ  >  Current Article

মরিসের গবেষণা ফরাসিদের অন্তর প্রসারিত করতে পারে

ইসমাঈল হোসেন দিনাজী : সম্প্রতি আলজাজিরা টেলিভিশন জানায়, ফ্রান্সের ২৫০ রাজনীতিবিদ পবিত্র কুরআনের কয়েকটি আয়াত মুছে ফেলবার ধৃষ্টতাপূর্ণ দাবি করেছেন। তাঁরা এক পিটিশন ইস্যুর মাধ্যমে এ আহ্বান জানান। অপরিণামদর্শী এই ফরাসি রাজনীতিকদের দাবি এ আয়াতগুলোতে নাকি ইহুদি-খৃস্টানদের হত্যা ও শাস্তির কথা বলা হয়েছে।
দেশটির গ্র্যান্ড মসজিদ বু বকরের প্রধান ইমাম বলেন, এ দাবি অন্যায় এবং হাস্যকর। এটি এদেশে বিভিন্ন জাতি ও সম্প্রদায়ের মানুষের সহাবস্থানের জন্য ক্ষতিকর। ফ্রান্সের মুসলিমরা এমন একটি উদ্ভট পিটিশন প্রত্যাশা করেননি। বরং ফ্রান্সে মুসলিমরাই দশকের পর দশক ধরে বর্ণবাদ ও সহিংসতার শিকার হয়ে আসছেন। ফ্রান্সের মুসলিমরা সবসময় এর নিন্দা জানিয়েছেন।
ইসলাম ফোবিয়া বলে একটি জাতীয় প্রতিষ্ঠানের প্রধান আবদুল্লাহ যুকরা এ পিটিশনকে ভয়াবহ ও বিপজ্জনক বিতর্ক বলে উল্লেখ করেন। মুসলিমদের বিরুদ্ধে এমন বিতর্ক বন্ধের আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, এ পিটিশন করেছেন ওইসব রাজনীতিক যারা আন্তর্জাতিক মিডিয়ায় নিজেদের চেহারা দেখাতে আগ্রহী। এঁরা ইসলাম ও মুসলিমদেরকে নিজেদের অসৎ উদ্দেশ্য হাসিলের মাধ্যম বানিয়েছেন। বুরদু মসজিদের ইমাম তারেক বলেন, কুরআন হত্যাকা- ঘটাতে বলে এটা স্থুল ও হাস্যকর অভিযোগ। তীব্র প্রতিবাদ জানিয়ে তিনি বলেন, ‘কুরআন আরবি ভাষায় নাযিল হয়েছে। আমি নিশ্চিত যারা পিটিশনটি ইস্যু করেছেন, তাঁরা আয়াতগুলোর অনুবাদ বা ব্যাখ্যা পড়েছেন। তাঁদের পাঠ করা অনুবাদ বা ব্যাখ্যা যথাযথ নাও হতে পারে অথবা ধর্মীয় টেক্সটের পাঠের সঙ্গে অপরিচিতিই তাঁদের উত্তেজিত করেছে। তাঁরা যদি কুরআনের আয়াতগুলোকে হিংসাত্মক বলেন তাহলে ইঞ্জিলসহ অন্যসব পবিত্র গ্রন্থকেও হিংসাত্মক বলতে হবে।’ – নয়াদিগন্ত : ২৭ এপ্রিল, ২০১৮।
বুরদু মসজিদের ইমাম যথার্থই বলেছেন বলে আমার মনে হয়। তিনি পিটিশনকারীদের উদ্দেশে বলেন, তাঁরা হয়তো কুরআনের অনুবাদ পড়েছেন। মূল টেক্সট পড়েননি। মূল আরবি টেক্সট পড়লে তাঁদের বিভ্রান্তি নাও থাকতে পারতো। এছাড়া এর তফসির বা ব্যাখ্যা পাঠ করলেও বুঝতে সক্ষম হতেন যে, ইসলাম কোনও সন্ত্রাস সমর্থন কোনওকালেই করেনি। এমনকি কোনও মানুষহত্যাও করতে বলেনি। ইসলাম চায় সব মানুষের মধ্যে শান্তিপ্রতিষ্ঠা। সব মানুষের মধ্যে ভ্রাতৃত্বের সম্পর্ক। তবে কেউ যদি কোনও শান্তিকামী মানুষকে অন্যায়ভাবে হত্যা করে, তবেতো তার ন্যায়বিচার হতেই পারে। এটা কাউকে হত্যার হুমকি দেয়া হতে পারে না। বরং তা সংঘাত নিরসন করে শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের জন্য জরুরি পদক্ষেপ গ্রহণ।
উল্লেখ্য, ফ্রাঁসো মিতেরাঁ ১৯৮১-১৯৯৫ সাল পর্যন্ত ফ্রান্সের প্রেসিডেণ্ট ছিলেন। তিনি আশির দশকের শেষের দিকে ফিরাউনের মমি নিয়ে প্রত্নতাত্ত্বিক গবেষণার জন্য মিসরের কাছে অনুরোধ জানান। মিসরের সরকার এতে রাজি হলে কায়রো থেকে ফিরাউনের লাশ প্লেনে প্যারিসে আনা হয়। ফিরাউনের লাশ ফ্রান্সের প্রতœতাত্ত্বিক গবেষণাকেন্দ্রের একটা বিশেষ ওয়ার্ডে নিয়ে যাওয়া হলো। যেখানে ফ্রান্সের সবচেয়ে বড় সার্জনরা রয়েছেন। তাঁরা ফিরাউনের মমির ময়নাতদন্তের মাধ্যমে এর রহস্য উদঘাটন করেন।
এই মমি গবেষণার প্রধান সার্জন ছিলেন প্রফেসর ডা. মরিস বুকাইলি। থেরাপিস্ট যারা ছিলেন তাঁরা মমি পুনর্গঠন অর্থাৎ ক্ষত অংশগুলো ঠিক করতে চাচ্ছিলেন আর ডা. মরিস গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করছিলেন, কীভাবে ফেরাউন মারা গিয়েছিলেন। আরও ভাবছিলেন, কয়েক হাজার বছর ধরে কীভাবে লাশটা অক্ষত থাকলো? পরিশেষে তিনি ও তাঁর সহযোগীরা সারারাত ধরে লাশ গবেষণা ও পরীক্ষায় আত্মনিয়োগ করলেন। রাতের শেষে পরীক্ষাগারের রিপোর্ট আসলো। বলা হলো: ফেরাউনের শরীরে লবণের অংশ আছে আর এটাই সবচেয়ে বড় প্রমাণ যে, তিনি পানিতে ডুবে মারা গিয়েছিলেন আর মৃত্যুবরণের সঙ্গে সঙ্গে সমুদ্র (লোহিত সাগর) থেকে তাঁকে তুলে আনা হয়েছিল। তারপর লাশ দ্রুত মমি করা হয়। এখানে ফিরাউনের মমিটি প্রফেসর মরিসকে অবাক করে দেয় যে, কীভাবে এই মমি অন্য মমির তুলনায় সুরক্ষিত থাকলো, যা এটা সমুদ্র থেকে তোলা হয়েছে। কারণ ভেজা পরিবেশে ব্যাকটেরিয়া দ্রুত বংশ বৃদ্ধি করে আর প্রতিটি আদ্র বা ভেজা বস্তু দ্রুত ধ্বংস করে ফেলে।
ডা. মরিস ফাইনাল রিপোর্ট তৈরি করলেন। এতে তিনি উল্লেখ করেন: এটা দুনিয়াবাসীর জন্য বিজ্ঞানের একটা মহা আবিষ্কার। এরপর তিনি ফেরাউনের লাশের তথ্য উদঘাটনে নেমে পড়লেন। এক লোক তাঁকে বলেন যে, পবিত্র কুরআনে নাকি ফিরাউনের ডুবে যাওয়া ও তাঁর লাশ সংরক্ষণের ব্যাপারে বিশদ বিবরণ আছে। এ কথা শুনে ডা. মরিস বিস্মিত হয়ে গেলেন এবং প্রশ্ন করতে লাগলেন, এটা কীভাবে সম্ভব? এই মমি পাওয়া গিয়েছে ১৮৮১ সালে। আর কুরআন নাযিল হয়েছে আজ থেকে ১৪০০ বছর আগে! প্রাচীন আরবেরা তো মমি করার পদ্ধতিই জানতেন না, মাত্র কয়েক দশক আগে তা আমাদের হাতে আবিস্কৃত হয়। ডা. মরিস ফিরাউনের লাশের দিকে এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে গভীরভাবে ভাবছিলেন যে, কুরআনে কীভাবে ফিরাউনের লাশ সংরক্ষণের কথা এসেছে?
ডা. মরিস বাইবেলে ফিরাউনের লাশ সম্পর্কে জানতে চাইলেন। তিনি দেখলেন: বাইবেলে ফিরাউন কর্তৃক মুসার পিছু নেবার কথা বলা আছে। কিন্তু ফিরাউনের লাশের পরিণতি সম্পর্কে বিশেষ কিছু বলা নেই। তিনি নিজেকে প্রশ্ন করছিলেন আর ভাবছিলেন: এটা কীভাবে ধারণা করা যায় যে, এই মমির মানুষটি মুসার (আ.)-এর পিছু নিয়েছিলেন? আর এটা কেমন করে সম্ভব যে, মুহাম্মদ (সা.) ১৪০০ বছর আগেই এ সম্পর্কে জেনেছিলেন?
ডা. মরিস সেই রাতে ঘুমাতে পারলেন না। তিনি তোরাহ (তওরাত) আনালেন এবং সেটা পড়লেন। তোরাহতে বলা আছে: পানি আসলো এবং ফিরাউনের সৈন্য এবং তাদের যানবাহনগুলো ডুবিয়ে দিল। যারা সমুদ্রে ডুবলো তাদের কেউই বাঁচতে পারলো না। ডা. বুকাইলি আশ্চর্য হয়ে দেখলেন যে, তওরাতে লাশসংরক্ষণের ব্যাপারে কিছু বলা হয়নি। এরপর ডা. মরিস সিদ্ধান্ত নিলেন তিনি মুসলিম দেশে যাবেন এবং সেখানে প্রখ্যাত মুসলিম বিশেষজ্ঞ ডাক্তারদের সাক্ষাৎকার নেবেন ও আলোচনা করবেন। তিনি সেখানে গিয়ে ফিরাউনের লাশ ডুবে যাওয়া এবং পরবর্তী সংরক্ষণের যে রেজাল্ট পেয়েছেন তা নিয়ে আলোচনা করেন। তখন একজন মুসলিম বিশেষজ্ঞ পবিত্র কুরআন খুললেন এবং আয়াতটা ডা. বুকাইলিকে শোনালেন। যেখানে সর্বশক্তিমান আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা বলেন: “ফাল ইয়াওমা নুনাজ্জিকা বিবাদাইকা লিতাকুনা লিমান খালফাকা আয়াতান; ওয়া ইন্না কাশিরাম মিনান নাসি আন আয়াতিনা লা গাফিলুন।” অর্থাৎ …..
“অতএব, আজকের দিনে বাঁচিয়ে দিচ্ছি আমি তোমার দেহ, যাতে তোমার পশ্চাদবর্তীদের জন্য নিদর্শন হতে পারে। আর নিঃসন্দেহে বহু লোক আমার মহাশক্তির প্রতি লক্ষ্য করে না।” -আল-কুরআন; সুরা:১০,আয়াত-৯২
তিনি এই আয়াতের দ্বারা খুবই প্রভাবিত ও অভিভূত হয়ে যান এবং কয়েক বছর ধরে আরবি ভাষা, আরবি সাহিত্য ও কুরআনের অনুবাদ নিয়ে ব্যাপক গবেষণা ও অনুসন্ধান চালিয়ে যান। তিনি কুরআন গবেষণা করে দেখেন যে, আজ থেকে ১৪০০ বছর পূর্বের কুরআন আধুনিক বিজ্ঞানের সঙ্গে পুরোপুরি সঙ্গতিপূর্ণ। কী আশ্চর্য, কী অবাক করা কথা! কুরআন মহাসত্য। আসমানী কিতাব! তিনি উচ্চকণ্ঠে ঘোষণা করলেন যে, ‘আমি ইসলামে প্রবেশ করেছি এবং আমি এই কুরআনে বিশ্বাসী। সুবহান আল্লাহ!’
ইসলামগ্রহণের পর তিনি ১৯৭৬ সালে একটি মহামূল্যবান বই রচনা করেন। বইটির নাম ‘বাইবেল কুরআন ও বিজ্ঞান’। এটি পৃথিবীর নামকরা ৫০টি ভাষায় অনূদিত এবং বেস্ট সেলার; যা পশ্চিমা বিজ্ঞানীদের অবাক করে দেয়। বাংলা ভাষায়ও বইটি পাওয়া যায়।
ডা. মরিস বুকাইলি ফ্রান্স ফিরে গেলেন এক ভিন্ন অবস্থায়। ফ্রান্সে ১০ বছর তিনি তাঁর ডাক্তারি পেশা আর প্রাকটিস করেননি। বরং এই সময়ে তিনি পবিত্র কুরআন নিয়ে গবেষণা করেছেন। সবশেষে তিনি পবিত্র কুরআনের এই আয়াতটির গুরুত্ব অনুধাবন করতে পারলেন যাতে বলা আছে: “লা ইয়াতিহিল বাতিলু মিন বাইনি ইয়াদিহি ওয়া লা মিন খালফিহি; তানজিলুম মিন হাকিমিন হামিদ।” অর্থাৎ ….
“এতে মিথ্যার কোনও প্রভাব নেই। সামনের দিক থেকেও নেই এবং পেছনের দিক থেকেও নেই। এটা প্রজ্ঞাময়, প্রশংসিত আল্লাহর পক্ষ থেকে অবতীর্ণ।” সুরা-৪১, আয়াত-৪২।
বলতে দ্বিধা নেই বহু বিজ্ঞানী, গবেষক, চিন্তাবিদ ও সমাজসংস্কারক যখন কুরআনকে অভ্রান্ত এবং চির অমৃত বাণী বলে স্বীকার করে নিচ্ছেন তখন ফ্রান্সের অপরিণামদর্শী রাজনীতিকদের ধৃষ্টতাপূর্ণ পিটিশন আমাদের অবাক করেনি। যারা বাইবেল, ইঞ্জিল, তওরাতসহ বিভিন্ন আসমানি কিতাব যুগে যুগে ইচ্ছেমাফিক বদলেছেন, বাড়িয়েছেন, কমিয়েছেন এবং সংযোজন এবং বিয়োজন করেছেন তাঁরা কুরআনের আয়াত মুছে ফেলবার পিটিশন করবেন তাতে বিস্মিত হবার কিছু নেই। কিন্তু তাঁরা কি জানেন যে, পৃথিবীর সমস্ত ছাপা ও বাণীবদ্ধ কুরআন পুড়িয়ে দিলেও এর কিছুই ক্ষতি হবে না। কারণ বর্তমানে সারা পৃথিবীতে ৬ কোটিরও অধিক সংখ্যক কুরআনের হাফেজ বিদ্যমান। প্রতিদিন হাজার হাজার কুরআনের হাফেজ তৈরি হচ্ছেন। তাঁদের হৃদয় থেকে কীভাবে কুরআনের আয়াত মুছে ফেলবেন ফরাসি ওই অঘা রাজনীতিকরা? তাঁরা কি ডা. মরিস বুকাইলির কুরআন গবেষণার রেজাল্ট অনুধাবনের চেষ্টা করবেন সামান্য হলেও? এতে ফরাসিদের চোখের ছানি যেমন কেটে যেতে পারে। তেমনই প্রসারিত হতে পারে ডা. মরিসের ন্যায় ওদের অন্তরও।

    Print       Email

You might also like...

224258Kalerkantho_18-05-20-03

জেরুজালেমে মার্কিন দূতাবাস ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যপ্রাচ্য নীতি

Read More →