Loading...
You are here:  Home  >  প্রবন্ধ-নিবন্ধ  >  Current Article

মাতৃভাষা বাংলা ভাষা খোদার সেরা দান

Banglaসাদেকুর রহমান: জাতীয় ইতিহাসের অবিস্মরণীয় অধ্যায়, ভাষা আন্দোলনের চেতনাদীপ্ত মাস ফেব্রুয়ারির ষষ্ঠ দিন আজ সোমবার। ভাষা আন্দোলনকে সার্বিকভাবে সফল করে তুলতে ঊনিশশ’ বায়ান্ন সালের এই দিনেও রাজনীতিবিদ থেকে ছাত্রসমাজ পর্যন্ত ‘রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই’ দাবিতে অনড় ছিল। পাকিস্তান কেন্দ্রীয় সরকারের বৈরী মনোভাবের বিরুদ্ধে জনরোষ আগ্নেয়গিরির লাভার মতো উদগীরিত হতে থাকে। এই জনপদে মাতৃভাষা বাংলার চিরন্তন অধিকার প্রতিষ্ঠায় যুগপৎ বুদ্ধিবৃত্তিক ও রক্তক্ষয়ী আন্দোলন একটি চূড়ান্ত পরিণতি লাভ করে বায়ান্নতে। সে বছর গোটা ফেব্রুয়ারি মাসই ছিল সংগ্রামে, স্লোগানে রাজপথ, আকাশ-বাতাস উত্তপ্ত ও প্রকম্পিত। লাগাতার কর্মসূচির আওতায় এদিন সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদের সভা অনুষ্ঠিত হয়। ঐ সভায় সভাপতিত্ব করেন মজলুম জননেতা মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী। সভায় অর্থ সংগ্রহের জন্য ১১ ও ১২ ফেব্রুয়ারি পতাকা দিবস পালনের উদ্যোগ নেয়া হয়।
১৯৪৭ সালে পাকিস্তানের জন্ম হয়েছিল মূলত রাজনৈতিক ও ধর্মীয় কারণে। কিন্তু ভাষা আন্দোলনের উত্থান পর্বে ধর্ম-পেশা-বয়স-মতাদর্শ নির্বিশেষে সকল মানুষ সম্পৃক্ত হয়েছিল। বস্তুত মায়ের ভাষা বাংলায় কথা বলার স্বাধিকার প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে সবাই অংশ নিয়েছিল আন্দোলনে। অবশ্য প্রাদেশিক নির্বাচন থেকে সুবিধা আদায়ে তৎপর কতিপয় রাজনীতিক নানা অজুহাতে ভাষা আন্দোলন থেকে নিজেদের দূরত্বে রেখেছিল। এছাড়া তখন রাজনৈতিক দল ব্যস্ত ছিল নবপ্রতিষ্ঠিত পাকিস্তানের ভবিষ্যৎ রাষ্ট্রকাঠামো সম্বন্ধে চিন্তাভাবনা নিয়ে। রাষ্ট্রভাষার মতো ‘সাধারণ’ বিষয়ে মাথা ঘামানোর সময় তাদের ছিল না। তবে একটি পর্যায়ে এসে সকলেরই চৈতন্যোদয় হয়।
এম আর আখতার মুকুল তার ‘ভাষা আন্দোলনের ইতিহাস (কিশোর সংস্করণ)’ গ্রন্থে লিখেন, “তৎকালীন পূর্ব বাংলার প্রতিষ্ঠিত বুদ্ধিজীবীদের (জনাকয়েক ব্যতিক্রম ছাড়া) কেউই এই আন্দোলনে তখনো পর্যন্ত প্রকাশ্যে সমর্থন দিতে এগিয়ে আসেননি। এমনকি আইনজীবী, অধ্যাপক, ডাক্তার, সাংবাদিক, প্রকৌশলী কিংবা ব্যবসায়ীদের কেউ প্রকাশ্যে ছাত্রদের সঙ্গে একাত্মবোধ পর্যন্ত ঘোষণা করেননি। বুদ্ধিজীবীদের যারা ভাষা আন্দোলনের সক্রিয় সহযোগিতা করতে দ্বিধা করেননি তাদের তখন মুখ্য পরিচয় ছিলো ছাত্র হিসেবে। এদের মধ্যে সর্বজনাব শামসুর রাহমান, হাসান হাফিজুর রহমান, আবদুল গাফফার চৌধুরী, সাইয়ীদ আতিকুল্লাহ, কে জি মোস্তফা, মুস্তাফা নূর-উল-ইসলাম, জিল্লুর রহমান সিদ্দিকী, ফজলে লোহানী, আবু জাফর ওবায়দুল্লাহ খান, বোরহানউদ্দিন খান জাহাঙ্গীর, আতাউর রহমান, ড. আব্দুল্লাহ আল-মুতি শরফুদ্দিন, মুর্তাজা বশীর, আমিনুল ইসলাম, কাইউম চৌধুরী প্রমুখ অন্যতম। এরকম এক নাজুক পরিস্থিতিতে যুবলীগ ও ছাত্রলীগের একাংশ ছাড়া অসংখ্য নির্দলীয় ছাত্র এই আন্দোলনের পুরোভাগে এসে দাঁড়িয়েছিল। পরবর্তীকালে অনেক ক’টা রাজনৈতিক দল ও সংগঠন এ মর্মে দাবি করে থাকে যে বাহান্নর ভাষা আন্দোলনের সাথে তারা গোপন স্থান থেকে নির্দেশ দিয়ে এ আন্দোলনকে সফল করে তুলেছেন। দুঃখজনকভাবে তার জবাবে বলবো তারা দলীয় ব্যর্থতা স্বীকারে অক্ষম।”
রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদের প্রথম আহ্বায়ক অধ্যাপক ড. এএসএম নূরুল হক ভূঁইয়া ‘ভাষা আন্দোলনের তিন যুগ পরের কথা’ শীর্ষক এক প্রবন্ধে লিখেন “উপমহাদেশের দুই অঞ্চল বহু শতাব্দী পূর্ব হতেই ভাষার প্রশ্নে অত্যাচারিত হয়ে আসছিল। প্রথমে বৈদিক ও সংস্কৃত প-িতদের দ্বারা বাংলা ভাষাভাষীরা নিপীড়িত হয়। এরপর মোঘল-পাঠানদের ফারসী ভাষা এবং পরে আমাদের সময়ে আগের ইংরেজি ভাষার নিপীড়ন। ইংরেজগণ ভারতবর্ষ বিভক্ত করে বলে বর্তমান ভারতের কর্মকর্তাগণ হিন্দিকে তখনকার রাষ্ট্রভাষা করে নেয়। যেহেতু প্রধানত ধর্মের ভিত্তিতে ঐ দেশ ভাগ হয়েছিল কাজেই পাকিস্তানের প্রায় সকলেই মনে করে নিলেন যে, উর্দুই হবে এ দেশের রাষ্ট্রভাষা। তাছাড়া এর অনেক আগে থেকেই পশ্চিমাঞ্চলের নেতৃবর্গ উর্দুকে রাষ্ট্রভাষা করার কথা প্রচার করতে থাকেন।”
ড. এএসএম নূরুল হক ভূঁইয়া ঢাকাস্থ সোনারগাঁও সমিতির বার্ষিকী ১৯৮৬ উপলক্ষে প্রকাশিত স্মরণিকায় উক্ত প্রবন্ধে আরো বলেন, “দেশ বিভাগের পর পাঞ্জাবী, বিহারী ও অন্যান্য পশ্চিমা লোকজন বর্তমান বাংলাদেশ অর্থ্যাৎ তদানীন্তন পূর্ব পাকিস্তানে এলে তাদের আচার-ব্যবহার ও কথাবার্তায় আমরা রীতিমতো শঙ্কিত হয়ে পড়ি। এ দেশবাসীর প্রতি তাদের অবজ্ঞা, তাচ্ছিল্য ও রূঢ় আচরণ আমাদেরকে এ দেশের পূর্বতন জমিদার-মহাজন ও গোমস্তাদের ব্যবহারের কথা স্মরণ করিয়ে দেয়। বহু আন্দোলনের পর এ দেশবাসী পূর্বেকার অত্যাচারের জগদ্দল পাথর তাদের ঘাড় থেকে সরাতে না সরাতেই এ আবার কোন নতুন উৎপাত শুরু হয়? এমন এক দুঃসহ পরিস্থিতিতে এই ভূখ-বাসীকে মুখের ভাষা রাষ্ট্রভাষার স্বীকৃতির জন্য ঊর্ধ্বমুখী মুঠোবদ্ধ হাতে রাজপথে নামতে হয়।
বশীর আল হেলাল ‘ভাষা আন্দোলনে সেই মোহনায়’ গ্রন্থটিতে ভাষা আন্দোলনের বিভিন্ন ঘটনা ও তার নিজস্ব দর্শন ব্যাখ্যা করেছেন বিভিন্ন শিরোনামে। ‘পূর্ব বাংলার ভাষা আন্দোলন’ শীর্ষক শিরোনামে তিনি পৃথিবীর ইতিহাসকে শোষণের ইতিহাস হিসেবে বর্ণনা করে বাংলাদেশের ভাষা আন্দোলনের পটভূমিকায় এই তত্ত্বের সাজুয্য খুঁজে পাবার চেষ্টা করেছেন। পৃথিবীর সকল মানুষকে তিনি ‘শাসক’ ও ‘শোষক’ এই দুই শ্রেণিতে ভাগ করেছেন। তিনি বলেন, “পাকিস্তান আন্দোলনের নেতৃত্ব ছিল মুসলমান শাসক বা তাদের প্রতিনিধিদের হাতে। তারা পাকিস্তানের রাষ্ট্র ক্ষমতা দখল করে জাঁকিয়ে বসলেন। স্বাধীনতার একটা দাবি অনুযায়ী জমিদার প্রথা তারা তুলে দিয়েছিলেন। কিন্তু সেই সামন্ত মনোবৃত্তি পুরো মাত্রায় রইল, তার সঙ্গে যোগ হলো ধনতান্ত্রিক বা বুর্জোয়া শাসনের আধুনিক কৌশল। মানুষের আশাভঙ্গ, তারপর মোহভঙ্গ হতে দেরী হলো না। আবার সেই লড়াই, আবার সেই সংগ্রাম। সে ছিল পূর্ব পাকিস্তানের মানুষের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সংগ্রাম। সেই সংগ্রামের একটা বিস্ফোরণ ঘটেছিল ভাষা-আন্দোলনের মধ্য দিয়ে।”
অধ্যাপক আবুল কাসেম ফজলুল হক তার ‘একুশে ফেব্রুয়ারি আন্দোলন’ গ্রন্থে এই আন্দোলনের কারণ সম্পর্কে বলেন, “১৯৫২ সালের ফেব্রুয়ারি যে সারা পূর্ব বাংলাব্যাপী এত বড় আন্দোলন হয়েছিল, তার পিছনে বহুবিধ কারণ ছিল। কিংবদন্তী ও জনশ্রুতির অরণ্য ভেদ করে তৎকালীন রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামাজিক-সাংস্কৃতিক ঘটনা প্রবাহের দিকে দৃষ্টিপাত করলেই সে কারণসমূহ স্পষ্ট হয়ে উঠে।” তিনি আরো বলেন, “আন্দোলনের ঘটনাবলী ও পটভূমি পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, শুধু জাতিগত নিপীড়ন নয়, পূর্ব বাংলার অভ্যন্তরীণ বিভিন্ন প্রকার শ্রেণি-শোষণ ও শ্রেণি-নিপীড়নও এই আন্দোলনের পরিস্থিতি সৃষ্টি করেছিল।”

    Print       Email

You might also like...

cab6cf692901860d98777fd4fcebd2a5-59e095566d79d

চীন ও ভারতের চেয়ে বেশি প্রবৃদ্ধি বাংলাদেশে

Read More →