Loading...
You are here:  Home  >  প্রবন্ধ-নিবন্ধ  >  Current Article

মালয় সাগর হতে সিংহল সমুদ্রে …

Onto Genting Highland-malayasia

মোঃ আমিনুল ইসলাম :

শুরুর আগে
হাজার বছর ধরে আমি পথ হাঁটিতেছি পৃথিবীর পথে
সিংহল-সমুদ্র থেকে নিশীথের অন্ধকারে মালয়-সাগরে
অনেক ঘুরেছি আমি; বিম্বিসার অশোকের ধূসর জগতে
সেখানে ছিলাম আমি
রূপসী বাংলার কবি জীবনানন্দ দাসের বিখ্যাত কবিতা ‘বনলতা সেন’ এর উদ্ধৃতাংশ আপনারা অনেকেই পড়েছেন। কবির সাথে আমার এক সফরের কিছু মিল খুঁজে পাই। আমিও ভ্রমণ করি সিংহল সমুদ্র আর মালয় সাগর । তবে পার্থক্য হলো, আমি যাই মালয় সাগর হতে সিংহল সমুদ্রে, কবি যান সিংহল-সমুদ্র থেকে নিশীথের অন্ধকারে-মালয় সাগরে। অবশ্য ফেরার পথে সিংহল সমুদ্র হতে মালয় সাগর হয়ে দেশে ফিরে আসি। আর জীবনানন্দ দাস হেঁটে সমুদ্র অতিক্রম করেন, আমি প্লেনে। কবি হেঁটেছেন হাজার বছর ধরে(যদিও মৃত্যুকালে তাঁর বয়স ছিল মাত্র ৫৪ বছর), আমি মাত্র এক সপ্তাহ। তবে সময়টা তাঁর মতোই রাতে। আমাদের চারটি ফ্লাইটই ছিল রাতের বেলায়, নিশীথের অন্ধকারে। যা হোক কবিদের অনেক কথাই আমাদের বুঝার অসাধ্য।

কীভাবে এ সফর
চৈত্রের শুরু। ফাগুন বিদেয় হলো মাত্র দু’দিন। বসন্তের আবহ এখনো ফুরিয়ে যায়নি। পলাশ, সোনারু এখনো ফুটে আছে। কোকিলের ডাক এখনো ভাসছে বাতাসে। এমনি এক সময়ে পেলাম বিদেশ সফরের বারতা। বাংলাদেশ ব্যাংকের FSSP Department এর Knowledge Development Fund এর আওতায় Central Bank of Sri Lanka, Risk Based Supervision শীর্ষক Knowledge Sharing Programme আয়োজন করে। এটি শ্রীলঙ্কার Centre for Banking Studies এ ১৯-২৩, মার্চ, ২০১৮ মেয়াদে অনুষ্ঠিত হয়। আমার উক্ত কর্মসূচিতে অংশগ্রহণের সুযোগ হয়। এ সুযোগে আমি মালয়েশিয়া ও শ্রীলঙ্কা সফর করি। উক্ত প্রোগামে আমরা ছিলাম ২৫ জন। কিন্তু মালয়েশিয়া যেতে রাজী হন মাত্র ১২ জন। বাকীরা সরাসরি ঢাকা হতে কলম্বো চলে যান।

ময়মনসিংহ থেকে ঢাকার পথে
আমার মূল কর্মস্থল সিলেট অফিস হলেও বদলী নীতিমালার আলোকে বর্তমানে আমার পোস্টিং ময়মনসিংহ অফিসে। ময়মনসিংহ হতে যাত্রা শুরু করি দুপুর ১২-৩০ মিনিটে। মাসকান্দা বাস স্ট্যান্ডের কাছে একটি মসজিদে জুমার সালাত আদায় করে ENA পরিবহনের একটি বাসে করে ঢাকা পৌঁছি বিকেল ৫-২০ মিনিটে। বিদেশ সফরের বিষয় হওয়ায় আগ্রহ, উচ্ছাস, উদ্বেলতার সাথে উদ্বেগও কাজ করেছে, কি জানি কোন অসুবিধায় পড়ি। আমার আরেক সহযাত্রী সিলেট অফিসের যুগ্ম-পরিচালক মোঃ কমর উদ্দিন প্রধান কার্যালয়ের যুগ্ম-পরিচালক মোঃ আব্দুল হাফিজ-১ এর বাসায়(বসুন্ধরা-০৯) অপেক্ষা করছিলেন। অবশেষে ৬-০০ টার দিকে আমি তাঁর সাথে সংযুক্ত হই।

ঢাকা আন্তর্জাতিক বিমান বন্দর
বসুন্ধরার বাসা হতে ঢাকা আন্তর্জাতিক বিমান বন্দরে প্রবেশ করি সন্ধ্যে ৭-৩০ মিনিটে। প্রবেশের পর প্রাথমিক চেকিং, বেল্টে মালামাল বুঝিয়ে দিয়ে বোর্ডিং পাস সংগ্রহ, ফরম পূরণসহ ইমিগ্রেশনের আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করে ডিপার্চার কক্ষে ফ্লাইটের জন্য অপেক্ষা করতে থাকলাম। ১৭ মার্চ, ২০১৮। ফ্লাইট রাত ০১-১০ মিনিটে যথারীতি মালয়েশিয়া এয়ারলাইন্সের একটি বিমানে আমরা উড্ডয়ন করি। বিমানে ভেতর নাস্তা ও খাবারের ব্যবস্থা ছিল। এর মধ্যে কোল্ড ড্রিঙ্কস, অ্যাপল জুস, বিয়ার, চিকেন কারি, মাটন কারি ইত্যাদি ছিল। যার যার পছন্দ অনুযায়ী খাদ্য ও পানীয় সরবরাহ করা হয়। প্লেনের নিয়ম-কানুন ভিডিওসহ ইংরেজি ও মালয় ভাষায় প্রচার করা হয়।

কুয়ালালামপুর বিমান বন্দরে অবতরণ
উদ্বেগ আর আনন্দের দোলাচলে কেটে যায় দু ’ঘন্টা। রাত ০৩-১০ মিনিটে কুয়ালালামপুর আন্তর্জাতিক বিমান বন্দরে বিমান অবতরণ করে। ইমিগ্রেশন কাউন্টারে লাইন। তবে সময়মতো বের হতে পারিনি। ইমিগ্রেশন অফিসারের সাথে সামান্য ভুল বুঝাবুঝির কারণে এখানে কয়েক ঘন্টা বিলম্ব হয়। ফলে দুঃশ্চিন্তার মধ্যে কয়েক ঘন্টা কাটাতে হয়েছে। আমাদেরকে বিমানবন্দরের এ অফিস হতে ও অফিসে যোগাযোগ করতে হয় ; যেতে হয় ইন্টারনাল ট্রেনে করে। কষ্ট আর আনন্দের মেলবন্ধন রচনা হলো।

সকালের নাস্তা
এই সময়ে বিমান বন্দরের সাজসজ্জা- স্থাপনা ইত্যাদি দর্শন করি। কুয়ালালামপুর আন্তর্জাতিক বিমান বন্দরের ভেতরে গ্লাসের আড়ালে পাহাড়ের দৃশ্য-জলপ্রপাত খুবই সুন্দর। আলোঝলমল আধুনিক স্থাপত্য রীতিতে নির্মিত বিমান বন্দরটি মালয়েশিয়ার অন্যতম দৃষ্টিনন্দন স্থাপনা। সকালের নাস্তার জন্য বিমান বন্দরের ভেতরে একটি খাবার দোকানে (ক্যাফেতে) ঢুকলাম। খুলনা অফিসের জনাব মোঃ আক্তারুজ্জামান নাস্তার ব্যয়ভার বহন করেন। সামাজিক মানুষ আক্তার ও নাসের মোহাম্মদ আব্দুল্লাহ বিভিন্ন সময় বিভিন্নভাবে টীমকে সহযোগিতা করেন।

খোলা আকাশের নিচে
অনেক অপেক্ষার পর বিমান বন্দর হতে বের হওয়ার অনুমতি দেয়া হলো। বেল্ট হতে মালামাল নামিয়ে বের হলাম বিমান বন্দরের বাইরে। নির্ধারিত গাড়িতে কুয়ালালামপুরের উদ্যেশ্যে যাত্রা। মহাসড়কের অদূরে সারি সারি পাম গাছ বেশ সুন্দর লাগছিল। পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন শহর, ছিমছাম রাস্তাঘাট, কোন ধূলাবালি নেই। উঁচু উঁচু দালান, চোখ ধাঁধানো। যাত্রাকালে একটি বাস আমাদের গাড়িকে অতিক্রম করলো ; নাম- NadiPutra । জানা যায়, এটি একটি বড় বাস সার্ভিস। ১৯৯৯ সাল থেকে সেবা দিচ্ছে। এখানে আরও কিছু বাস সার্ভিস আছে, যেমন- Rapidbus, Metrobus ইত্যাদি।

বির্জয়া টাইম স্কয়ার হোটেল
কুয়ালালামপুর এসে ওঠলাম পূর্বনির্ধারিত হোটেলে, বির্জয়া টাইম স্কয়ার হোটেল। তবে সকলের জন্য রুম ক্লিয়ার হয়নি ; অগত্যা একটি রুমে সকলের মালামাল রেখে বেরিয়ে পড়লাম ভিজিট ও খাবারের জন্য। বির্জয়া টাইম স্কয়ার হোটেল Time Square Hotel Management Corporation কর্তৃক পরিচালিত। ৫০তলা বিশিষ্ট বিরাট হোটেল। ছাদের ওপরে Rooftop Garden । আমরা ছিলাম ২৭ তলার একটি কক্ষে। দুপুরের খাবারের জন্য প্রবেশ করলাম হোটেল রসনা বিলাসে, একটি বাংলাদেশী হোটেল Bukit bintag এলাকায়। খাবার পরে একটি মালয়েশিয়ান মোবাইল সিম কেনার প্রচেষ্টা চালাই। কিন্তু কেনা সম্ভব হয়নি। ট্যুরিস্ট গাইড সজল ইসলাম চারটি SIM এনেছিলেন। অন্যরা নিয়ে যায়, আমারটাও। পরে আমি ১০০ মার্কিন ডলারের বিনিময়ে মালয়েশিয়ান রিংগিট সংগ্রহ করি এবং বিভিন্ন স্থান পরিদর্শনের জন্য প্রস্তুতি নিই।

সেলেঙ্গর রাজার বাড়িতে
সাইট সিইং শুরু হলো। প্রথমে দেখতে যাই সেলেঙ্গর রাজার বাড়ি স্থানীয় ভাষায় বলা হয় Istina Negara. দেশের গণপূর্ত বিভাগ কর্তৃক মুসলিম, মালয় ও পাশ্চাত্য স্থাপত্যরীতিতে ২০১১ সালে তৈরী এ প্রাসাদটি সরকারী মালিকানাধীন। ৯৭.৬৫ হেক্টর জমি নিয়ে প্রতিষ্ঠিত ২২টি সোনালী গম্বুজ বিশিষ্ট প্রাসাদটির নির্মাণ ব্যয় ৮১২ মিলিয়ন মালয় রিংগিট। দেশী বিদেশী প্রচুর পর্যটক এখানে জড়ো হন। বিরাট ফটক, সাদা পোশাকসহ মূর্তির মতো দাঁড়িয়ে দারোয়ান, সুন্দর রাজপ্রাসাদ দেখলাম। স্বল্প সময়ের মধ্যে আমরা স্বাধীনতা চত্বর, জাতীয় মসজিদ পরিদর্শন করি। বার্ডস মিউজিয়ামের পাশ দিয়ে রাস্তা অতিক্রম করলেও সময়ের অভাবে ভেতরে যাওয়া সম্ভব হয়নি।

পেট্রোনাস টুইন-টাওয়ার
১৯৯৬ সালে প্রতিষ্ঠিত পেট্রোনাস টুইন-টাওয়ার কুয়ালালামপুর সিটি সেন্টারে অবস্থিত। ৮৮টি তলা বিশিষ্ট পাশাপাশি অবস্থিত দুটি উঁচু ভবন পৃথিবীর অন্যতম উঁচু ভবন হিসেবে স্বীকৃত। পৃথিবীর সর্বোচ্চ ভবন হলো বুর্জ খলিফা, দুবাই যার উচ্চতা ২৭১২ ফুট। পেট্রোনাস ভবনদু’টির উচ্চতা ১৪৮৩ ফুট। মুসলিম স্থাপত্য রীতি ও Cube in cube কাঠামোতে নির্মিত এ টুইন-টাওয়ারের মালিকানায় আছে কুয়ালালামপুর সিটি সেন্টার হোর্ল্ডিংস। AVENA, Microsoft, Huwawei ইত্যাদি নামীদামী কোম্পানীর অফিস রয়েছে। টাওয়ারের ভেতর ও বাইরের সৌন্দর্য কিছু সময় অবলোকন করলাম। পাশের লেকে ওয়াটারডেন্স অত্যন্ত মনোমুদ্ধকর। এটি মূলত একটি KLCC Symphony Fountain Show সন্ধ্যার পর আলো-আধাঁরিতে রঙবেরঙ্গের কৃত্রিম পানির প্রবাহ ওঠছে-পড়ছে, এদিক ওদিক দুলছে সঙ্গীতের তালে তালে। নারী-পুরুষ প্রচুর পর্যটকের ভীড়, নয়নাভিরাম দৃশ্য। সকাল ১০.০০ টা হতে রাত ১০.০০ টা পর্যন্ত এ শো চলে। এখানে আমরা প্রায় একঘন্টা অতিবাহিত করি এবং বিভিন্ন দৃশ্য উপভোগ করি।

Teh Tarik
পরে চা পান ও কেনাকাটার প্রস্তুতির জন্য Lulu Market এ প্রবেশ করি। এটি আবুধাবি Lulu Group International এর মালিকানাধীন একটি Hyper market Super market(Super market)। আমি দুধ চা পছন্দ করি। স্থানীয় ভাষায় একে বলা হয় The Tarik । এটা তাদের জাতীয় পানীয়(National Drink)। মার্কেটের নিচ তলায় চায়ের কর্নারে গেলাম। এক কাপ চা টেনে অন্যদের সাথে বের হই। এখানে আগে কাউন্টারে টাকা জমা দিয়ে এন্ট্রি করে খাবার বা পানীয় সংগ্রহ করতে হয়। এ মার্কেটে কেনা-কাটার জন্য কাপড়-চোপড়সহ বিভিন্ন মালামাল সম্পর্কে প্রাথমিক ধারণা নিই।

রসনা বিলাসে
রাতের খাবার খেলাম রসনা বিলাসে। হোটেলটি বাংলাদেশী মালিকানায়/ব্যবস্থাপনায় পরিচালিত। এটি Bukit bintag এলাকায় অবস্থিত। কুয়ালালামপুরে রসনা বিলাস নামে আরেকটি হোটেলে আমরা নাস্তা করেছি। জানিনা একই নামে আর কোন হোটেল আছে কিনা। যা হোক দেশী খাবার খেয়ে হোটেল টাইম স্কয়ারে প্রত্যাবর্তন করলাম, বেশ ক্লান্ত হয়ে পড়েগছিলাম। রাত কাটালাম হোটেলে। নামাজ পড়ে বিছানায় যেতে রাত হলো প্রায় ০১-৩০ মিনিট। পরদিন সকাল ৯.০০ টায় ব্রেকফাস্ট শেষে লবিতে উপস্থিত থাকার কথা। কিন্তু অপেক্ষা করতে হলো, এখনো দু’জন বাকী। তাঁদের দেরীতে আসার কারণে এক ঘন্টা বিলম্ব হলো।

সিঙ্গাপুরী mam
পরদিন সকালে Time Square Hotel লবিতে বসা অবস্থায় কথা হয় পাশের সিটে বসা এক মেয়ের সাথে। বিশের নিচে বয়স। আলাপে জানা যায় তারা সিঙ্গাপুর হতে এসছে ভিজিটে। সাথে মা-বাবা, ছোট ভাই-বোন। এর মধ্যে একজন এক বছরেরও কম বয়সের। ফ্লোরে হামাগুড়ি দিচ্ছে। আরেক দম্পতির সাথে কথা হলো ; তারা এসেছে বাগদাদ হতে। কারো বয়স ৩০ এর ওপরে নয়। নাম বলেছিল, তবে মনে রাখতে পারিনি। অনেক পর্যটকের সাথে আমার আলাপ পরিচয় করার আগ্রহ ছিল ; কিন্তু সময়ের অভাবে এবং অন্যদের ব্যস্ততায় সে পরিবেশ হয়ে ওঠেনি। যা হোক বিলম্বে হলেও যাত্রা শুরু হলো।

আন্তর্জাতিক ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় প্রাঙ্গন
দ্বিতীয় দিনে শুরু হলো সাইট সিইং। প্রথমেই আন্তর্জাতিক ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস পরিদর্শন করি। গোম্বাক জেলায় অবস্থিত বিশ্ববিদ্যালয়টি ১৯৮৩ সালে ১৫৩জন ছাত্র নিয়ে শুরু হয়। জ্ঞানের ইসলামীকরণ ধারণা হতে ড. মাহাথির মোহাম্মদ এটি প্রতিষ্ঠা করেন। বাংলাদেশসহ ওআইসিভূক্ত আটটি দেশের সহায়তায় এটি পরিচালিত হচ্ছে। মোট ১৪টি ফ্যাকাল্টিতে শিক্ষা কার্যক্রম চলছে। সেদিন ছিল বন্ধের দিন। লাইব্রেরী ও মেডিক্যাল সেন্টারের পাশদিয়ে শুধু চারপাশের পরিবেশ ও ভবনসমূহ দেখে আসলাম। ক্যাম্পাসের ভেতর দিয়ে একটি ছোট খাল প্রবাহিত যার ওপরে একটি সেতু রয়েছে। গাছপালাসহ এর পরিবেশ খুব সুন্দর। প্রশাসনিক ভবনের সামনে সকলের গ্রুপ ছবি তোলা হয়।

কার্তিক মন্দির-Batu Caves
তারপর দুপুরে আমরা কার্তিক মন্দির পরিদর্শনে যাই। ভারতের বাইরে সর্ববৃহৎ, চুনাপাথরের পাহাড়, ২৭২টি সিড়ি বিশিষ্ট, গোম্বাক জেলায় কুয়ালালামপুর হতে ১৩ কিমি. দূরে। ভুমি হতে এর উচ্চতা ১০০ ফুট। হিন্দু সম্প্রদায়ের তীর্থস্থান। পাহাড়ের গায়ে উঁচুতে বিরাট কার্তিক মূর্তি, সোনালী রং, যাপ্রায় ৫০ ফুট উঁচু। ১৮৯২ সালে মূর্তিটি নির্মাণ করা হয় মর্মে জানা যায়। ঢাল বেয়ে কেউ কেউ চুড়ায় উঠছে, আমি উঠিনি। গলির ভেতরে মন্দির, ঢালে পুকুরে পানির কৃত্রিম প্রবাহ, গলির ধারে নানা রঙ্গের ফুলগাছ, খুব সুন্দর। চা পান করতে পাশের দোকানে ঢুকলাম। ভারতীয় দোকান-কলকাতার লোকেরা কাজ করছে। আমি এককাপ চা রাজশাহী অফিসের সহযাত্রী মোঃ আজিজুর রহমানের সাথে ভাগ করে নিলাম। নির্ধারিত সময়ে সবাই বাসে আসলেও দেরী করলেন একজন। কিছুক্ষণ অপেক্ষা করতে হলো।

গেন্টিং হাইল্যান্ড এর পথে
এ পর্যায়ে বাসযোগে দীর্ঘপথ পরে-ক্যাবল কারে করে এগিয়ে যাচ্ছি গেন্টিং হাইল্যান্ড এর পথে। দীর্ঘ পথ, রাস্তার দু’পাশে পরিকল্পিতভাবে সৌন্দর্য বর্ধক গাছপালা লাগানো হয়েছে। মাঝে মাঝে টিলা আর পাহাড় অপরূপ সুন্দর। বার বার দেখতে ইচ্ছে করে। ঢাল বিশিষ্ট মহাসড়কে সুন্দর ও আরামদায়ক বাসযাত্রা। সাদা-শুভ্র মেঘের ভেতর দিয়ে আকাশের বুক চিড়ে এগিয়ে যাচ্ছি উচ্চতর গন্তব্যস্থানে। নিচে গাছপালা ঘেরা পাহাড় আর ওপরে সীমাহীন আকাশ। হাতের নাগালে মেঘ। গা শিউরে যাওয়া পুলক মিশ্রিত আবহ। গেন্টিং হাইল্যান্ড- Genting Highland এটি মালয়েশিয়ার Pahang State এ অবস্থিত। ভূ-পৃষ্ঠ হতে প্রায় ৬০০০ ফুট(১৮০০ মিটার) উঁচু। এখানে আছে সুপার মার্কেট, হোটেল, থিম পার্ক ও ক্যাসিনো। দুপুরের খাবার খেলাম একটি ভারতীয় রেস্টুরেন্টে। দেখা যায় কফিহাউজ-কফির রঙ্গে সজ্জিত, কৃত্রিম গাছ, গাছে অজগর পেচানো, আছে পেঁচা আর মেছো বাঘ। এখানে আছে ডিজিটাল ওয়ার্ল্ড-ভবনের বিরাট দেয়াল জুড়ে টিভি পর্দা। ভেসে ওঠে বিজ্ঞাপনসহ বিভিন্ন তথ্য। ক্যাবল কারে নেমে আসলাম সমতলে। আবার বাসে করে যাত্রা।

প্রতীক্ষিত পুত্রজায়া
ফেরত পথে পুত্রজায়ার পথে রওয়ানা। Bukit Jalil Stadium হয়ে পুত্রজায়া এলাম। পুত্রজায়ার প্রতি আমার আলাদা আকর্ষণ ছিল। নেমেই অন্যতম স্থাপত্য পুত্রমসজিদে প্রবেশ করলাম। পুত্রজায়ায় প্রধান মন্ত্রীর অফিসের নিকটে, পুত্রলেকের পাড়ে আটটি ছোট ও একটি বড় গম্বুজবিশিষ্ট পুত্রা মসজিদ যার ধারণ ক্ষমতা ১৫০০০ জন। নির্মাণকাল ১৯৯০-৯৫, গোলাপী( Pink) রঙ্গের দেয়াল। তিন স্তরে-মূল মসজিদ, চত্বর ও আনুষঙ্গিক স্থাপনা। গম্বুজের উচ্চতা ৬০ ফুট। এটি মালয়েশিয়ার অন্যতম বড় মসজিদ। তখন নামাজের সময় ছিলনা, একাই আসরের নামাজ আদায় করি। মসজিদের ভেতরের ভিডিওচিত্র সংগ্রহ করি। বাইরের কিছু স্থিরচিত্র মোবাইল ফোনে ধারণ করি। দু’জন মহিলা কয়েকটি শিশুসহ মসজিদের বারান্দায় অবস্থান করছিল। একটু পরেই বৃষ্টি এলো। সময়ও কম ছিল বলে বাসের জন্য দ্রুত বেরিয়ে পড়লাম রাস্তায়। উল্লেখ্য, পুত্রজায়ায় মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রীর অফিসসহ অপরাপর প্রশাসনিক ভবনসমুহ অবস্থিত।

মালয়েশিয়ার কিছু সাধারণ তথ্য
মালয়েশিয়ার আয়তন ৩,২৯,৭৫৮ বর্গ কিলোমিটার, জনসংখ্যা প্রায় ২ কোটি ৮৩ লক্ষ, মাথাপিছু আয় ১০,৪৯০ মার্কিন ডলার। বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ১০৩.৬৮ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। অর্থনীতিতে শিল্প ও সেবা খাতের ভূমিকাই মুখ্য। এখানে Newly Industrialised Market Economy বিদ্যমান। তাদের মূল জনগোষ্ঠী মালয় (৬৮.৮০%)। তাছাড়া, কিছু চীনা(২৩.২০%) ও ভারতীয় বংশদ্ভোত জনগণও রয়েছে। ধর্মীয় দিক থেকে ৬১.৩০% মুসলিম, ১৯.৮০% বৌদ্ধ, ৯.২০% খ্রিস্টান, ৬.৩০% হিন্দু ও ৩.৪০% অন্যান্য। মুসলিম অধিবাসীদের অধিকাংশ শাফেয়ী মাযহাবের অনুসারী।

মালয়েশিয়ান পোশাক-পরিচ্ছদ
মালয়েশিয়ান পুরুষরা আমাদের মতোই শার্ট-প্যান্ট পরিধান করে। কিছু কিছু লোক আছে যারা ধর্মীয় পোশাক পরিধান করে। মহিলারা বেশীরভাগ টাইট প্যান্ট, হাতওয়ালা গেঞ্জি ও মাথায় হিজাব পরিধান করে। তাদের অধিকাংশের গায়ের রং উজ্জ্বল শ্যামলা বা ফর্সা। স্থানীয় অমুসলিম(বিশেষত চাইনিজ) ও পর্যটক মহিলারা সাধারণত স্বল্প-বসনা হয়ে চলাফেরা করে। পর্যটকদের মধ্যে ইউরোপীয়, আরব, চায়না, থাই এবং সিঙ্গাপুরী নাগরিকই বেশি।

মালয়েশিয়ার ব্যাংক ব্যবস্থা
মালয়েশিয়ার কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নাম Bank Negara, যার অর্থ জাতীয় ব্যাংক। Central Bank of Malayasia Act-1958 এর আওতায় দেশের মুদ্রা নীতি, ঋণ নীতি ও ব্যাংকিং খাত রেগুলেট করার উদ্দেশ্যে ব্যাংকটি প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। দেশের বিভিন্ন স্থানে ব্যাংক নেগারার ছয়টি শাখা রয়েছে। ব্যাংক নেগারার বর্তমান গভর্নর মোহাম্মদ বিন ইব্রাহীম। মালয়েশিয়ার ৮টি দেশী, ১৯টি বিদেশী, ১৮টি ইসলামী ব্যাংকসহ প্রায় অর্ধশত অফশোর ব্যাংক কার্যরত রয়েছে।

কুয়ালালামপুর আন্তর্জাতিক বিমান বন্দরের পথে
মালয়েশিয়া সফর শেষ করে আমরা মূল গন্তব্য শ্রীলঙ্কায় যাওয়ার অপেক্ষায়। ফ্লাইট রাত ১০-১০ মিনিটে। কলম্বোর উদ্দেশ্যে কুয়ালালামপুর আন্তর্জাতিক বিমান বন্দরে এলাম রাত ৮.০০ মিনিটের দিকে। যথারীতি বেল্টে মালামাল বুঝিয়ে দিয়ে বোর্ডিং পাস সংগ্রহ, চেকিং-স্ক্যানিংসহ ইমিগ্রেশনের আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করে ডিপার্চার কক্ষে ফ্লাইটের জন্য অপেক্ষা করতে থাকলাম। সাধারণত বিমানবন্দরে Business Class এর যাত্রীদের জন্য বসার আলাদা কর্ণার থাকে। এখানে ধর্মীয় নেতাদের জন্য কয়েকটি আসন সংরক্ষিত ছিল। পাশে লেখা ছিল-“Reserved for Clergy”। এখানে একজন বৌদ্ধ ভিক্ষু-কে বসে থাকতে দেখা যায়।

বন্দরনায়েক আন্তর্জাতিক বিমান বন্দর
১৮ মার্চ, ২০১৮। ফ্লাইট রাত ১০-১০ মিনিটে । কুয়ালালামপুর হতে যথারীতি বিমানে আরোহন করলাম। ড্রিস্কস এবং লাঞ্চ দেয়া হলো। পাশের সিটে ছিলেন খুলনা অফিসের সহকর্মী বিশ্বনাথ দাস। অনায়াসে কেটে গেলো দু’ঘন্টা। কলম্বো বন্দরনায়েক আন্তর্জাতিক বিমান বন্দর- অবতরণ করে রাত ১২-১০ মিনিটে। অভ্যর্থনার জন্য Central Bank of Sri Lanka এবং Hotel Galadari’র প্রতিনিধিদল নিজ নিজ প্রতিষ্ঠানের প্ল্যাকার্ড নিয়ে অপেক্ষা করছিলেন। এখানে শ্রীংঙ্কার সিম- Hutch সংগ্রহ করলাম- ৯০০ রুপী দিয়ে, বিকল্প হিসেবে Dialogue ছিল, তবে কাউন্টার কাছে ছিল বলে Hutch ই সংগ্রহ করলাম।

We are a team
এবার মুদ্রা বিনিময়ের পালা। ১০০ মার্কিন ডলারের বিনিময়ে শ্রীলঙ্কার ১৫৮৪০.০০ রুপী সংগ্রহ করলাম । এক্সচেঞ্জ কাউন্টারে একজন পর্যটক মহিলাকে এগিয়ে আসতে দেখে তাকে সুবিধার জন্য আমার আগে স্থান দিলাম। পরে তিন/চার জনের পেছন থেকে একজন মহিলা সামনে আসতে চাইলেন, অপরজন যুক্তি দিয়ে বললেন We are a team ; মানে আমরা এক সাথের লোক। যা হোক সুযোগ দেয়া হলো।

Hotel Galadari’র পথে
নির্ধারিত গাড়িতে হোটেলে- Hotel Galadari-তে ওঠলাম। পাঁচতারা হোটেল, কলম্বো-০১ এর অভিজাত এলাকা-সমুদ্র সৈকতের নিকটে অবস্থিত হোটেলের কক্ষ হতে সাগরের ঢেউ দেখা যায়। নিচে হোটেল লবি, রেস্টুরেন্ট। ভাল সুযোগ-সুবিধা। ভেতরে এয়ার কন্ডিশন। আশেপাশে Hotel Kingsbury, Hotel Hilton, Colombo City Hotel, Hotel Taj Samudra ইত্যাদি উন্নত মানের হোটেল ছিল। কাছেই পুরনো প্রেসিডেন্ট প্রাসাদ। কলম্বোর এই এলাকায় মুসলিম প্রভাব রয়েছে। Hotel ইত্যাদি সাইনবোর্ড এরই প্রমাণ। তাছাড়া, পাশের একটি মার্কেটে গিয়েছিলাম, এখানে একটি দোকানের নাম ছিল ঐধসববফরধ। বিধি মোতাবেক সকালের নাস্তা- বিনা খরচে- হোটেলের নীচ তলায়। বুফে সিস্টেম-তবে কী কী আইটেম মেন্যুতে আছে তা জানতেও সময় লেগেছে দুইদিন। খাবার আইটেম ও পরিবেশের সাথে আমরা এতোটা অভ্যস্ত ছিলাম না বলে কিছুটা অসুবিধেই হয়েছিলো। আমাদের টীমের ২৫ জনের মধ্যেবেশির ভাগ ছিলাম এ হোটেলে ; অন্যদের বাসস্থান ছিল Galle রোডের Renuka City Hotel।

মূল গন্তব্য : Centre for Banking Studies এর পথে
১৯ মার্চ সকাল ৮-০০ টায় হোটেল থেকে Centre for Banking Studies(CBS) এর উদ্দেশ্যে রওয়ানা হলাম নির্ধারিত বাসে। ক্লাসসমূহ সকাল ৯-০০ টা হতে। Centre for Banking Studies কলম্বো শহরের Rajgiriya এলাকায় অবস্থিত। বিভিন্ন কারণে প্রথমদিন Centre for Banking Studies এ উপস্থিত হতে দেরী হলো। তবে পরের দিন হতে সমস্যা হয়নি। হাজিরা শিটে স্বাক্ষর করে ক্লাসরুমে ঢুকলাম। এসি করা উপযুক্তভাবে সজ্জিত মনোরম শ্রেণিকক্ষ। তিনতলা বিশিষ্ট ভবনের বাইরে আঙ্গিনা ফুলের গাছ দিয়ে সাজানো। ভেতরে ডাইনিং হল ও প্রেয়ার রুম ছিল। লাঞ্চ ও চা/কফির ব্যবস্থা ছিল। পাঁচ কর্মদিবসের কর্মসূচি। তবে একদিন পুরোটা শিক্ষাসফরের মতো করে ছিল Expouser Visit। দ্বিতীয় দিনের শেষে আমাদের সম্মানে তাদের নিজস্ব হলরুমে এক মনোজ্ঞ সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। এতে CBS সহ কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাগণ উপস্থিত ছিলেন। প্রতিদিন ক্লাস শেষ হয় বিকেল ৪-৩০ মিনিটে হোটেলে ফিরে আসি সেই নির্ধারিত বাসে। সময় লাগে প্রায় এক ঘন্টা।

যারা লেকচার উপস্থাপন করলেন
প্রোগ্রামের শুরু হতেশেষ পর্যন্ত Mr. A A M Thassim, Director of Bank Supervision, Mrs. G W N Samudrika Senior Assistant Director(SAD), Mrs. P H Perera(SAD), Mrs. N N Gunawardena(SAD), Mrs. L S Priyangika(SAD), Mrs. C H Wijesinghe(SAD) এবং Mrs. R R S De Silva Jayatillake, Deputy Director, Central Bank of Sri Lanka ভিন্ন ভিন্ন বিষয়ে তাদের লেকচার উপস্থাপন করেন। উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে CBS এর Director Mrs. HPT Wijesuriya ও Deputy Director Mr. DMDB Dissanayake উপস্থিত ছিলেন।

Emdad নয় Imtath
সন্ধার আগে হাতে তেমন সময় থাকেনা। যতটুকু সময় পাই-কমরউদ্দিন ভাইসহ আমি বীচে চলে যাই। কিছ সময় কাটাই, হাঁটি, চা-নাস্তা ইত্যাদি চলে। প্রথম দিন সন্ধার পর শহরে বের হলাম। কমর উদ্দিন ভাই এর মোবাইলের মেমোরী শেষ। একটি মেমোরী কার্ড কিনতে হবে।একটি সিএনজি অটোরিক্সা(স্থানীয় ভাষায় টুকটুক) রিজার্ভ করি। আমি কিছু আঙ্গুর-আপেল ক্রয় করি। কিছু রিলোড কার্ডও। টুকটুক চালককে নাম জিজ্ঞেস করলে বলল আমরা শুনলাম ইমদাদ। সে নিজেকে মুসলিম বলে পরিচয় দিলো। ট্রিপ শেষে মোবাইল নম্বর সেভ করতে চাইলে কমর উদ্দিন ভাই নাম লিখলেন Emdad, সে ভুল ধরিয়ে বললো Imtath যাই হোক, দ্বিতীয় দিন যাই একটি জুয়েলারী দোকোনে। ৬০% ডিসকাউন্ট এর ঘোষনা দেয়া আছে। আবার ওই দিনই শেষ সুযোগ।

মুসলিম মহিলা দোকানী
Galle Face এর আকাশে নতুন চাঁদ। তিন বা চার দিনের হবে। এমনি এক বিকেলে বীচে হাঁটতে হাঁটতে দেখলাম, এক ব্যক্তি ওজনের মেশিন নিয়ে বসে আছে, এক ব্যক্তি ঝুড়িতে সাপ নিয়ে বসে আছে। ৩-৪ জন মুসলিম পর্যটকের সাথে দেখা হয়, কথা বলতে চাইলে বুঝা গেলো তারা আমাদের ভাষা বুঝে না। একদিন এক দোকানদার মুসলিম মহিলার সাক্ষাৎ পাই। তার কাছ থেকে সিগারেট কিনলেন সহকর্মী মোঃ কমর উদ্দিন। বীচে হাঁটতে দুই বাঙ্গালী ভদ্রলোকের সাথে হঠাৎ দেখা। তারা ছিল চীনের যাত্রী ; ফ্লাইট সিডিউলের কারণে কিছু সময় বীচে ভ্রমণের সুযোগ পায়। শেষ দিন ক্লাস ও সমাপনী অনুষ্ঠান শেষে একটি জুয়েলারী দোকানে, যার নাম ওসমান জেমস-জুয়েলারী।

আটকে গেলেন কমর উদ্দিন
এধষষব ঋধপব বীচে প্রতিদিনই বিভিন্ন স্কুল হতে শিক্ষকরা তাদের ছাত্র-ছাত্রীদের নিয়ে আসেন। একদিন সন্ধ্যের পর কোন এক স্কুলের ছাত্র-ছাত্রী এসেছে সমুদ্র দর্শনে। তারা মেইন রোড হতে ফুটপাথ অতিক্রম করে বীচের দিকে যাচ্ছিলো। কমর উদ্দিন সাহেবসহ আমি ফুটপাথ দিয়ে হাঁটছিলাম। স্কুলের শিশুরা একের পর এক ফুটপাথ ক্রস করে যাচ্ছে, ফলে কমর উদ্দিন সাহেব অগ্রসর হতে পারছিলেন না। তাঁকে দুই-এক মিনিট অসহায়ের মতো দাঁড়িয়ে থাকতে হলো। আমি ছিলাম পেছনে, এ দৃশ্য দেখার সুযোগ পেলাম।

শিক্ষাসফরে গলের পথে
শিক্ষাসফরে আমরা জেলা শহর গলে(Galle) যাই। আয়োজক প্রতিষ্ঠান সব কিছুর ব্যবস্থা করে। সাথে একজন স্থানীয় গাইডও ছিলেন। সফরের মাঝে তিনি শ্রীলঙ্কার বিভিন্ন বিষয়ে ব্রিফ করেন। শ্রীলঙ্কায় চারটি নদী রয়েছে, এর মধ্যে আমরা কালু নদী অতিক্রম করে গলের দিকে অগ্রসর হচ্ছিলাম। টি-টাইম হলে আমরা রাস্তার পাশে একটি রেস্টুরেন্টে প্রবেশ করি। শ্রীলঙ্কার Kalutara জেলায় অবস্থিত এর নাম New Moni’s Bakery and Restaurant । কলম্বো হতে এর দূরত্ব ৪০ কিমি.। কফি পান শেষে নারকেল গাছের সারি আর সমুদ্রের ঢেউ দেখতে দেখতে আমরা এগিয়ে যাচ্ছিলাম জেলা শহরে গলের দিকে।

কচ্ছপের খামার- পাশেই সৈকত
মাঝপথে একটি ছোট শহরের নিকটে সমুদ্র সৈকতের কাছে নামলাম। এখানে একটি কচ্ছপের খামার আছে তাও দেখে নিলাম। খামারটি নাম Kosgoda Sea Turtle Conservation Project । এটি কলম্বো হতে ৭২ কিমি. দক্ষিণে অবস্থিত। এখানে প্রায় দেড়শ বছর বয়স্ক একটি অন্ধ কচ্ছপও ছিল। খামারের অদূরে সৈকত। মাথার ওপর দুপুরের প্রখর সূর্য। অসীম নীল সমুদ্র হতে একের পর এক ঢেউ উর্মিমালা হয়ে ধেয়ে আসছে আর তীরের বেলা ভূমিতে আঁচড়ে পড়ছে মনের সুখে, অভিসারে। অনেক সুন্দর, এমন সৌন্দর্য উপভোগ করলাম কিছুক্ষণ।

ঐতিহাসিক শহর গল
যথাসময়ে জেলা শহর গলে পৌঁছলাম। ঐতিহাসিক শহর গল। এখানে আছে ডাচদের দূর্গ ; ক্যাথলিক চার্চ, চার্চের ঘন্টা, ডাচ মিউজিয়াম আর বড় প্রতিকী নোঙ্গর, পাশেই বীচ। মিউজিয়ামে ডাচ আমলের অনেক নিদর্শন রক্ষিত আছে। এখানে প্রায় একঘন্টা সময় অতিবাহিত করি। ফিরতি পথে এক হোটেলে দুপুরের খাবার গ্রহণ করলঅম ; দুপুরের খাবার। ফেরার সময় আগের একই রাস্তা দিয়ে না গিয়ে নিয়ে আসা হলো হাইওয়ে দিয়ে, সময়ও কম লেগেছে। সফরকালে রাস্তার পাশে অনেকগুলো Sea Hotel ও Ocean Diving School দেখা যায়। তাছাড়া Galle Mosque, Galle Islamic Cultural Centre, Galle Cricket Stadium ইত্যাদিও রাস্তার পাশে রেখে আমরা এগিয়ে চলি।

Adam peak ধশ এর কথা
ট্যুরিস্ট গাইডের ভাষ্যমতো Adam peak শ্রীলঙ্কার একটি প্রাচীন নিদর্শন যা দক্ষিণ-মধ্য শ্রীলঙ্কার রত্নপুরা জেলায় অবস্থিত। Adam peak সমুদ্র-সমতল হতে প্রায় ৭৩৫০ ফুট উঁচু। এটা একটি পর্বতচূড়া, যা হিন্দু, মুসলিম ও খ্রিস্টান সকল ধর্মের লোকের কাছেই পবিত্র বলে গণ্য। মুসলিম ও খ্রিস্টানরা মনে করে এটি হযরত আদম(আ:) এর পদচিহ্ন, হিন্দুরা মনে করে এটি তাদের দেবতা শিবের পদচিহ্ন। ইতালীয় পরিব্রাজক মার্কো পলো ও আরব পরিব্রাজক ইবনে বতুতা Adam peak পরিদর্শন করেছেন মর্মে জানা যায়। সময় স্বল্পতার কারণে আমাদের সেখানে যাওয়া সম্ভব হয়নি।

শ্রীলঙ্কার কিছু সাধারণ তথ্য
খ্রিষ্টপূর্ব ৫০০ হতে ৩৭০ অব্দ হতে ইতিহাস পাওয়া যায়। ১৬৪০ হতে ১৭৬০ পর্যন্ত ডাচ বণিকরা ইস্টইন্ডিয়া কোম্পানীর নামে দেশ শাসন করে। পরে ইংরেজরা এসে একইভাবে দেশ শাসন করে। ১৯৪৮ সালে দেশটি স্বাধীনতা লাভ করে। শ্রীলঙ্কার আয়তন ৬৫,৬১০ বর্গ কিলোমিটার, জনসংখ্যা প্রায় ২ কোটি ১১ লক্ষ। তাদের মূল জনগোষ্ঠী সিংহলী (৭৪.৯০%)। কিছু ভারতীয় তামিল ও মুসলিম অধিবাসী রয়েছে। মুসলিমরা আবার দুভাগে বিভক্ত। একটি হলো মরক্কো থেকে আসা, অন্যটি মালয় বংশোদ্ভত। ধর্মীয় দিক থেকে শ্রীলঙ্কার ৭০.১০% বৌদ্ধ, ১২.৬০% হিন্দু, ৯.৭০% মুসলিম ও ৭.৬০% খ্রিস্টান। বটগাছ ও হাতীকে তারা বিশেষ মর্যাদা প্রদান করে। কলম্বো শহরে কিছুদূর পরপরই বৌদ্ধমূর্তি লক্ষ্য করা যায়।

শ্রীলঙ্কার অর্থনীতি
শ্রীলঙ্কা একটি মধ্য আয়ের দেশ। বার্ষিক মাথাপিছু আয় ৩৮৫০ মার্কিন ডলার। বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ৭.৬৮ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। অর্থনীতিতে Knowledge-based social marketing system বিদ্যমান। রফতানি পণ্যের মধ্যে আছে-কাপড়, চা, পার্ল ইত্যাদি। পর্যটন খাত তাদের জাতীয় আয়ের অন্যতম উৎস। কর্মসংস্থানের হার ৯৬%। অনেক লোক বিদেশে কর্মরত আছে যারা বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা দেশে প্রেরণ করে।

শ্রীলঙ্কার শিক্ষা ব্যবস্থা ও সংস্কৃতি
শ্রীলঙ্কার জনগণের ৯২% শিক্ষিত। এখানে ১৭টি সরকারী বিশ্ববিদ্যালয় রয়েছে ; কোন বেসরকারী বিশ্ববিদ্যালয় নেই। বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির সময় কঠিন প্রতিযোগিতা হয়। তাছাড়া, কারিগরী ও চিকিৎসা বিষয়েও কয়েকটি ভালো শিক্ষা প্রতিষ্ঠান রয়েছে। শ্রীলঙ্কানদের পুরুষরা আমাদের মতোই শার্ট-প্যান্ট পরিধান করে। কিছু কিছু লোক আছে যারা ধর্মীয় পোশাক পরিধান করে। মহিলারা বেশিরভাগ পাতলা প্যান্ট ও গেঞ্জি পরিধান করে। কিছু কিছু মহিলা শাড়ি পরিধান করে। সাধারণত কেউ ওড়না ব্যবহার করে না। তাদের অধিকাংশের গায়ের রং কালো শ্যামলা। পর্যটকদের মধ্যে ইউরোপীয় ও আরবীয় নাগরিক বেশি। তাদের প্রধান ভাষা সিংহলী যা সংস্কৃতের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ।

শ্রীলঙ্কার ব্যাংক ব্যবস্থা
শ্রীলঙ্কার কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নাম Central Bank of Sri Lanka(CBSL), স্থানীয় ভাষায় একে বলা হয় “শ্রীলঙ্কা মহা ব্যাংকুয়া”। Monetary Law Act,1958 এর ৪৯ ধারা মোতাবেক ১৯৫৮ সালে CBSL প্রতিষ্ঠিত হয়। কেন্দ্রীয় ব্যাংকে মূলত তিনটি বিভাগ রয়েছে। আর্থিক খাত ব্যবস্থাপনা নিয়ে একটি বিভাগ, সুপারভিশন কার্যক্রম নিয়ে একটি বিভাগ এবং অন্যান্য কার্যক্রম নিয়ে একটি বিভাগ। প্রতিটি বিভাগের দায়িত্বে একজন করে ডেপুটি গভর্নর রয়েছেন। এ তিনটির অধীনে ২৭টি উপবিভাগ কাজ করছে। শ্রীলঙ্কার কেন্দ্রীয় ব্যাংকে গভর্নর ও ডেপুটি গভর্নরের নিচে অ্যাসিস্ট্যান্ট গভর্নরের ৮টি পদ রয়েছে, যা আমাদের এখানে নেই। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তত্বাবধানে ৩২টি বাণিজ্যিক ও বিশেষায়িত ব্যাংক কাজ করছে। এর মধ্যে কয়েকটি বিদেশী ব্যাংকও রয়েছে।

সমুদ্র দখল/নিয়ন্ত্রণ
Hotel Galadari-র কাছে Galle Face বীচের নিকটে শ্রীলঙ্কা সরকার ও China Communication Construction Company Ltd(CCCC) এর যৌথ উদ্যোগে সমুদ্র দখল করে বিরাট এলাকা নিয়ে একটি আধুনিক শহর নির্মাণের কাজ চলছে।

লাল মসজিদ দর্শন
২৩ তারিখ বিকেলে কলম্বোর লাল মসজিদ( Jamiul Alfar Mosque) দেখতে যাই। হাতে সময় কম ছিল, তবুও গেলাম। কলম্বো-১১তে পেটা এলাকায় অবস্থিত এটি। ১৯০৮ হতে সালে ১৯০৯ সালে এটি নির্মিত হয়। ইসলামী মুরীয় বিশেষ স্থাপত্যকলা বিশিষ্ট দ্বিতল মসজিদ ভবন। লাল(Red) রঙ্গের দেয়াল। ধারণ ক্ষমতা ১০০০০ জন। এখানে আসরের দুই রাকাত নামাজ পড়ে বের হতেই পকেটে হাত দিয়ে বুঝলাম যে আমার মোবাইল ফোনটি নেই। অনেক ডাটা ছিল এতে। মসজিদের কর্তৃপক্ষের সাহায্যে(সিসিটিভি রি-প্লে’র মাধ্যমে) পরীক্ষা করে বুঝা গেল যে ফোনটি মসজিদের বাইরে কোথাও হারিয়েছে। সম্ভবত ভুলবশত টুকটুকে(সিএনজি চালিত ফোর স্ট্রোকে) ফোনটি ফেলে আসি।

বিদায় শ্রীলঙ্কা
২৩ মার্চ, ২০১৮। কলম্বো হতে রাত ০১-০৫ মিনিটে ফ্লাইট। ২৪ মার্চ, ২০১৮ সকাল ০৭-১০ মিনিটে বিমান নির্ধারিত সময়ে কুয়ালালামপুর অবতরণ করে। খুব সহজেই সকল আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করে আমরা বিমানবন্দরের বাইরে আসলাম। পূর্বনির্ধারিত বাস অপেক্ষা করছিল। আমরা মালামালসহ বাসে ওঠলাম। আমাদের সকলেরই কেনাকাটা বাকী ছিল। Hanifa নামে একটি নামকরা সুপার মার্কেটের কাছে আমরা নেমে যার যার মতো কেনাটাকার জন্য নেমে গেলাম। এটি Rolong Tar 5 এলাকায় অবস্থিত। সময় নির্ধারণ করে দেয়া ছিল। কিন্তু সহযাত্রী মহিদুর রহমান সাহেবকে পাওয়া যাচ্ছেনা। যা হোক অনেক টেনশন আর তল্লাশীর পর তাঁকে পাওয়া গেল। পরে আমরা Plaza View Yat নামীয় একটি ইলেকট্রনিক্স মার্কেটের সামনে একটি খাবার দোকানে (Restaura Ar-Razzak) নাস্তা করলাম। রাস্তার ওপারে বড় বড় টবে লাগোনো হয়েছে ছোট আকারের বাঁশের ঝাড়, দৃষ্টিনন্দন। যথাসময়ে নির্ধারিত স্থানে সকলেই জড়ো হলেন।

পরিদর্শন কর্মকর্তা তাই ..
বাংলাদেশ ব্যাংকের ব্যাংক পরিদর্শন বিভাগে কাজ করেছি অনেক দিন। মাঝেমধ্যে পরিদর্শকের ভাবটি জেগে ওঠে। ফলে রাস্তার পাশে কোন ব্যাংক শাখার সাইনবোর্ড সকলের আগে দৃষ্টি আকর্ষণ করে। মালয়েশিয়ায় বিভিন্ন স্থানে Public Bank, Agro Bank, May Bank, CIMB Islamic Bank এবং শ্রীলঙ্কায় বিভিন্ন স্থানে Public Bank, Axis Bank, Commercial Bank, Union Bank, Amana Bank, Duetche Bank এর অফিস/শাখা নজরে পড়ে। ইচ্ছে হয় ব্যাংকে ঢুকে যাই, আর সিএল, অ্যাফেয়ার্স দিতে বলি দায়-সম্পদ তৈরী করার জন্য। Large Loan কী কী আছে দেখি ; সিসিটিভি, ফায়ার অ্যালার্ম, অগ্ন্রিনির্বাপক যন্ত্র আছে কিনা জানতে চাই ইত্যাদি।

অবশেষে ঢাকার পথে ..
২৪ মার্চ, ২০১৮। কুয়ালালামপুর হতে সন্ধ্যা ০৬-২০ মিনিটে ফ্লাইট। রাত ০৮-২০ মিনিটে যথারীতি ঢাকা শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে আমাদের বিমান অবতরণ করলো। প্রয়োজনীয় আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করে বাইরে আসলাম। আমাদের রিসিভ করার জন্য আমার ছোট ভাই মহিবুল ইসলাম এনাম উপস্থিত থাকার কথা। সে ভেবেছিল বের হয়ে আসতে একটু দেরী হবে। কিন্তু প্লেন যথাসময়ে ল্যান্ড করায় তার একটু বিলম্ব হয়। ইতোমধ্যে যুগ্ম-পরিচালক মোঃ আব্দুল হাফিজ সাহেবের ছেলে ট্যাক্সিক্যাব ভাড়া করে নিয়ে এলো। একই গাড়িতে কিছুদূর একত্রে চলার পর তাঁদের কাছ থেকে বিদায় নিলাম।

ঢাকা হতে ময়মনসিংহ
এবার আমি গেলাম মহাখালী টার্মিনালের ENA বাস কাউন্টারে । ENA সার্ভিসের কোন বাস পাওয়া যায়নি। অগত্যা ওঠলাম নিলয় নামে নেত্রকোণাগামী একটি বাসে। রাত ১-১৫ মিনিটে ময়মসনিংহ বাইপাস মোড়ে নামলাম- এখানে আমার পরিবারের সদস্যরা প্রাইভেট কার নিয়ে অপেক্ষা করছিলেন। বাসায় যেতে যেতে রাত ১-৩০ মিনিট। এক সপ্তাহের আবেগ, উৎকণ্ঠা আর অস্থিরতার অবসান হলো। শান্তিনীড়ে এঁকে দিলাম পদচিহ্ন। বিদেশ থেকে আনা উপহার সামগ্রী তুলে দিলাম স্বজনদের হাতে। তখন প্রয়োজন ছিল একটু স্বস্তির ঘুম।

    Print       Email

You might also like...

326957_112

পলাশি : ইতিহাসের কালো অধ্যায়

Read More →