Loading...
You are here:  Home  >  মধ্যপ্রাচ্য  >  Current Article

মুরসিবিরোধী অভ্যুত্থান ১১ দিনে যা ঘটেছিল

new

২০১৩ সালের ৩ জুলাই জেনারেল আবদুল ফাত্তাহ আল সিসির নেতৃত্বে ঘটা এক অভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত হন মিসরের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ মুরসি। সে সময় মুরসির সাথে কাজ করা এক ঊর্ধ্বতন কর্মকতা (নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক) মিডলইস্ট আইয়ের কাছে সেই ১১ দিনের ঘটনাবলি বর্ণনা করেন। তিনি বলেন, অভ্যুত্থানের ঘটনা ৩ জুলাই ঘটলেও সিসি আগের বছরের ডিসেম্বর থেকেই এর পরিকল্পনা করছিলেন। ১ জুলাই সেনাবাহিনীর দেয়া আলটিমেটামের খবর টিভিতে দেখে হতভম্ব হয়ে পড়েন মুরসি। তার উপদেষ্টারা বলছিলেন, ১০ লাখ বছরেও সামরিক অভ্যুত্থান হবে না

২৩ জুন ২০১৩ : সিসির হুমকি এবং মুরসিকে প্রাসাদ ছাড়ার আহ্বান
এই দিনে মুরসিরই নিয়োগ করা প্রতিরক্ষামন্ত্রী ও সশস্ত্রবাহিনীর প্রধান আবদুল ফাত্তাহ আল সিসি এক বিশেষ ভাষণ দেন। এতে তিনি সরকারবিরোধী অবস্থান গ্রহণের কথা জানিয়ে বলেন, আমরা মিসরের জনগণের ইচ্ছাকে রক্ষা করতে পূর্ণ দায়বদ্ধ। তাই যারা সেনাবাহিনীর বিরোধিতা করতে আসবে, তারা আসলে জনগণেরই বিরোধিতা করতে আসবে। আর কেউ যদি মনে করে যে, আমাদের ওপর হামলা চালাতে এলে আমরা চুপ করে বসে থাকব তাহলে সেটা ভুল হবে। সশস্ত্রবাহিনী কখনোই রাজনীতির সাথে যুক্ত হওয়ার চেষ্টা করবে না। কিন্তু আমি বলতে চাই, আমাদের একটি নৈতিক, জাতীয় ও ঐতিহাসিক দায়বদ্ধতা রয়েছে। আমরা মিসরকে লড়াই-সঙ্ঘাত, গৃহযুদ্ধের একটি অন্ধকার টানেলে চলে যাওয়াকে সমর্থন দিতে পারি না।
সিসি এর আগের দিনও মুরসির সাথে সাক্ষাৎ করেছিলেন। কিন্তু তখন তিনি এ ব্যাপারে কোনো ইঙ্গিত দেননি। মুরসির ওই ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেন, সিসি আগের বছরের ডিসেম্বর থেকেই এ ব্যাপারে পরিকল্পনা করে আসছিলেন। তখন থেকেই তিনি কায়রোর ন্যাভাল ফোর্সেস ক্লাবে বিরোধী পক্ষীয় নেতৃবৃন্দের সাথে বৈঠক করতেন। সেখানে সিসি নিজেকে দুই পক্ষের মধ্যে একজন মধ্যস্থতাকারী হিসেবে উপস্থাপন করেন। কিন্তু ২৩ জুনের ভাষণে তিনি পাকাপোক্তভাবে বিরোধীদের পক্ষে অবস্থান নেন।

একই দিনে রিপাবলিকান গার্ডের কমান্ডার জেনারেল মোহাম্মদ জাকি মুরসি ও তার সহযোগীদের ইত্তিহাদিয়া প্রেসিডেন্ট প্রাসাদ ছেড়ে রিপাবলিকান গার্ডের সদর দফতরে চলে যেতে বলেন। তাদেরকে বলা হয়, এ অবস্থায় প্রেসিডেন্ট প্রাসাদ নিরাপদ নয়। এর আগের দিন এক সংবাদ সম্মেলনে বিরোধী জোট মুরসিকে পদত্যাগ করে আগাম নির্বাচন দেয়ার আহ্বান জানায়।

২৬-২৯ জুন : রাজপথে তুমুল আন্দোলন
জুনের শেষ সপ্তাহে পুরো দেশে আন্দোলন ছড়িয়ে পড়ে। একদিকে যেমন মুরসির বিরোধীরা আন্দোলন করেছে, অন্য দিকে মুরসির সমর্থনে মাঠে নামে ব্রাদারহুড। এ সময় দেশের বিভিন্ন স্থানে ব্রাদারহুডের ২০টি অফিস লুট করে আগুন লাগিয়ে দেয়া হয়।
২৬ জুন দেশবাসীর উদ্দেশে মুরসি এক দীর্ঘ ভাষণ দেন। তাতে তিনি জনগণকে শান্ত থাকার আহ্বান জানিয়ে বলেন, ইনশা আল্লাহ আমরা এ সঙ্কট কাটিয়ে উঠতে পারব। এ সময় তিনি আগের বছরের ফিরিস্তি ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার কথা উল্লেখ করেন।

তার এ বক্তব্যের পর আন্দোলনকারীরা তাদের আন্দোলন আরো তীব্রতর করে। ৩০ জুন ব্যাপক বিক্ষোভের প্রস্তুতি হিসেবে তারা তাহরির স্কয়ারে জড়ো হতে থাকে। অথচ এ স্থান মুরসি সমর্থকদের জন্য নিষিদ্ধ করে দেয় সেনাবাহিনী। মুরসির সমর্থকেরা জড়ো হন নাহদা ও রাŸা স্কয়ারে। এ সময় মুরসিবিরোধীদের হাতে বেশ কয়েকবার আক্রমণের শিকার হন মুরসি সমর্থক ও ব্রাদারহুডের কর্মীরা।

৩০ জুন : গণবিক্ষোভ
মুরসি অবস্থান করছিলেন রিপাবলিকান গার্ডের সদর দফতরে। অথচ মুরসিবিরোধীরা তার প্রাসাদের দিকে মিছিল করে। তার পতনের দাবিতে স্লোগান দেয়। এ দিন সকালে তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা মুরসির সাথে কথা বলে তাকে ‘সাহসী সিদ্ধান্তে’ উৎসাহ দেন। এরপর মুরসির পররাষ্ট্রবিষয়ক উপদেষ্টা এসাম আল হাদ্দাদ মার্কিন রাষ্ট্রদূত অ্যানি প্যাটারসনের সাথে সাক্ষাৎ করলে তিনি হাদ্দাদকে বলেন, আন্দোলনকারীর সংখ্যা কত এটা বড় কোনো বিষয় নয়, বড় বিষয় হচ্ছে, সেনাবাহিনী কোন পক্ষে আছে। সে সময় রিপোর্টারেরা জানিয়েছিলেন, মুরসি বিরোধীদের চেয়ে মুরসি সমর্থকদের সংখ্যা কম ছিল না বরং বেশিই ছিল। কিন্তু মুরসিবিরোধীরা তাহরির স্কয়ারে আন্দোলন করার কারণে রিপোর্টারেরা সেটিই বেশি প্রচার করেন। ফলে বিশ্বব্যাপী এ বার্তাই প্রচার হয়।

১ জুলাই : সিসির আলটিমেটাম
অভ্যুত্থানের সব আলামত থাকা সত্ত্বেও মুরসির কর্মকর্তারা অভ্যুত্থান না হওয়ার ব্যাপারে আশাবাদী ছিলেন। কারণ মুরসি নিজে বিশ্বাস করতেন যে, সিসি কেবলই একজন মধ্যস্থতাকারীর দায়িত্ব পালন করছে।
কিন্তু ১ জুলাই যখন মুরসি সিসির সাথে বৈঠক করছেন, তখন টেলিভিশনে সেনাবাহিনীর একটি বিবৃতি প্রচার হয়, যাতে বলা হয়, দেশের অরাজক এই পরিস্থিতি যদি ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে সমাধান না হয়, তাহলে সেনাবাহিনী নিজেই এ ব্যাপারে পদক্ষেপ নেবে। মুরসি এই বিবৃতি দেখে হতবাক হয়ে যান।

২ জুলাই : মুরসির অফার
এ দিন মুরসি সিসির সাথে সাক্ষাৎ করে কিছু প্রস্তাব দেন। প্রস্তাবে বলা হয়, মন্ত্রিসভা পুনর্গঠন করা হবে, নতুন প্রধানমন্ত্রী নিয়োগ দেয়া হবে, সংবিধানের আপত্তিজনক বিষয়গুলো সংশোধন করা হবে। সিসিকে মুরসি এসব প্রস্তাব দিয়ে বলেন, সঙ্কট সমাধানে এটা কি যথেষ্ট হবে? সিসি সে সময় বলেন, অবশ্যই, কারণ বিরোধীরা যেসব দাবি করছে এগুলো তার চেয়েও বেশি। আমি বিরোধী পক্ষের সাথে সাক্ষাৎ করে আপনাকে জানাচ্ছি। ৫ ঘণ্টা পরে ফিরে এসে সিসি জানান, বিরোধীরা মুরসির প্রস্তাবে সাড়া দেয়নি।

৩ জুলাই : সিসির নিয়ন্ত্রণে সবকিছু
মূলত সিসি পরদিন অর্থাৎ ৩ জুলাই বিরোধী পক্ষের সাথে সাক্ষাৎ করেন এবং মুরসির পক্ষ থেকে দেয়া প্রস্তাবনাটি পেশ করেন। কিন্তু আন্দোলনকারীদের একজন মোনা মাকরাম এবিদ মনে করেন, সিসি মুরসির পক্ষ থেকে প্রস্তাব নয়, বরং নিজের পক্ষ থেকেই একটি প্রস্তাবনা পেশ করেছিলেন। আসলে তিনি কখনোই মুরসির সে প্রস্তাব বিরোধী পক্ষের কাছে পৌঁছাননি। বরং তিনি পরিস্থিতিকে জটিল করে তুলতে চাইছিলেন।

এ সময় হাদ্দাদ নরওয়ের রাষ্ট্রদূত টর ওয়েনেসল্যান্ডের সাথে সাক্ষাৎ করে বলেন, এমনটি নয় যে, আমরা সমঝোতা করতে চাইছি না, কিন্তু আমরা সমঝোতা করতে পারছি না। ওয়েনেসল্যান্ড বলেন, আমি অবস্থা বুঝতে পারছি, আমি কিছু করার চেষ্টা করছি। পরে তিনি যুক্তরাষ্ট্রের মাধ্যমে সেনাবাহিনীকে একটি বার্তা পৌঁছানোর ব্যবস্থা করেন, যাতে অভ্যুত্থানটি আরো দেরি করে করতে বলা হয়। এর ফলে একটি সমঝোতা করার সময় পাওয়া যায়।

সেনাবাহিনী ৩ জুলাই সকালেই অভ্যুত্থান করতে সবকিছু প্রস্তুত করেছিল, কিন্তু যখন এটি হয়নি তখন বুঝা যায়, ওয়েনেসল্যান্ড এর পেছনে কিছু করেছেন।

এ সময় যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে মুরসিকে বিরোধীদের দাবি মেনে একজন নতুন প্রধানমন্ত্রী ও মন্ত্রিসভা তৈরি করার আহ্বান জানানো হয়। সেই সাথে তার পছন্দের কোনো গভর্নরের হাতে সমস্ত ক্ষমতা হস্তান্তরেরও আহ্বান জানানো হয়। মুরসি এটি নিয়ে আলোচনার জন্য প্রস্তুত ছিলেন। কিন্তু তিনি সামরিক শাসনের প্রস্তাব সোজাসুজি নাকচ করে দিয়ে বলেন, এ অবস্থার চেয়ে তার কাছে মৃত্যুই শ্রেয়। হাদ্দাদ এ বিষয়ে আলোচনার জন্য জন্য মার্কিন রাষ্ট্রদূতকে ডাকেন। কিন্তু তিনি জানান, অনেক দেরি হয়ে গেছে। সেনাবাহিনী অভ্যুত্থান ঘটানোর ব্যাপারে পূর্ণ প্রস্তুত।

কিন্তু মিসরের সরকারি পক্ষ তখনো ভাবতে পারেনি, যেখানে মুরসির পক্ষের লাখো সমর্থক নাহদা ও রাŸায় রয়েছে এবং পশ্চিমা শক্তিগুলোও ক্ষমতাসীন পক্ষকে সমর্থন করছে, এমন অবস্থায়ও সেনাবাহিনী অভ্যুত্থান ঘটাতে পারে। কিন্তু উভয় চিন্তাই ভুল প্রমাণিত হয়।

পরিস্থিতি যখন নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়, তখন মুরসি তাদের সাথে লোকজনকে নিজ নিজ বাড়িতে চলে যেতে বলেন, অন্যথায় তারাও গ্রেফতারের মুখে পড়তে পারেন। কিন্তু তাদের বেশির ভাগই মুরসির কথা প্রত্যাখ্যান করে তার সাথেই গ্রেফতার হওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়।

এ দিকে সিসি যখন টেলিভিশনে মিসরের নিয়ন্ত্রণ নিজের হাতে নেয়ার কথা বলছিলেন, তখন মুরসি ও তার বেশির ভাগ ঊর্ধ্বতন উপদেষ্টাকে গ্রেফতার করা হয়। তাদের গ্রেফতার করেন রিপাবলিকান গার্ডের কমান্ডার জাকি, যাকে পরে সিসি প্রতিরক্ষামন্ত্রীর দায়িত্ব প্রদান করেন।

সেই থেকে মুরসি মিসরের তোরা কারাগারে আছেন। তার সমর্থকদের দাবি, তার এই সাজার পুরোটাই রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত, যার পেছনে কোনো ভিত্তি নেই।
সেনা অভ্যুত্থান হয়ে যাওয়ার পর মার্কিন প্রশাসনের পক্ষ থেকে বলা হয়, আমরা কোনো ধরনের কূটনৈতিক পদক্ষেপের সাথে যুক্ত ছিলাম না, আমরা কেবল মিসর ও মিসরের জনগণের পক্ষে। নরওয়ে এ ব্যাপারে কোনো মন্তব্য করতে অস্বীকার করে।

    Print       Email

You might also like...

333955_114

‘আমাদের বাঁচতে দিন’

Read More →