Loading...
You are here:  Home  >  সাহিত্য  >  Current Article

মুস্তাফা জামান আব্বাসীর লঘুসঙ্গীতের গোড়ার কথা

B10DFF55-2AD4-4F1F-82BC-756E034710D6

ড. আশরাফ পিন্টু |

মুস্তাফা জামান আব্বাসী (জন্ম : ডিসেম্বর-১৯৩৭) বাংলাদেশের একজন স্বনামধন্য সঙ্গীত শিল্পী। সঙ্গীত পিপাসু এক সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে তার জন্ম। বাবা বাংলা ভাওয়াইয়া গানের সম্রাট মরমি কণ্ঠশিল্পী আব্বাস উদ্দিন আহমদ। ছেলেবেলা থেকেই তার সঙ্গীতে হাতেখড়ি ঘটে। মুস্তাফা জামান আব্বাসী বাংলাদেশ টেলিভিশনের জন্মলগ্ন থেকেই ভাটিয়ালি, ভাওয়াইয়া, জারি, সারি, মারফতি, মুর্শিদি, দেহতত্ত্ব ইত্যাদি লোকগীতি টেলিভিশনের মাধ্যমে তুলে ধরে লোকসঙ্গীতকে সাধারণের মাঝে জনপ্রিয় করে তোলেন। এ ছাড়া তিনি প্রায় অর্ধ-শতাধিক গ্রন্থও রচনা করেছেন; যার মধ্যে বেশির ভাগ সঙ্গীত বিষয়ক। ‘লঘু সঙ্গীতের গোড়ার কথা’ তার এমনি একটি সঙ্গীত বিষয়ক ঋদ্ধতর গ্রন্থ।
‘লঘু সঙ্গীতের গোড়ার কথা’ গ্রন্থটিতে ছয়টি অধ্যায় রয়েছে। প্রথম অধ্যায়ে আছেÑ লোকসঙ্গীত ও পল্লী সঙ্গীতের ইতিহাস, বাংলা গানের উৎপত্তি ও বিকাশ। দ্বিতীয় অধ্যায়ে আছেÑভাটিয়ালি, ভাওয়াইয়া, রাখালি, চটকা, হামদ, নাত, মারফতি, মুর্শিদি, জারি, সারি, বাউল, গম্ভীরা ইত্যাদি গানের সংজ্ঞা ও বিবরণ। তৃতীয় অধ্যায়ে আছেÑরবীন্দ্র ও নজরুল সঙ্গীতের বৈশিষ্ট্য ও শ্রেণিবিন্যাস। চতুর্থ অধ্যায়ে আছেÑ সঙ্গীত ব্যক্তিত্বদের জীবনী ও সঙ্গীতে তাদের অবদান। পঞ্চম অধ্যায়ে আছেÑ সঙ্গীত শিল্পীদের জীবনী। ষষ্ঠ অধ্যায়ে আছেÑবাংলাদেশের লোকবাদ্যযন্ত্রের পরিচিতি উপমহাদেশের বিভিন্ন বাদ্যযন্ত্রের পরিচিতি।
বাংলা কবিতার মতোই আমাদের বাংলা গান হাজার বছরের পুরনো। বাংলা ভাষার প্রথম গ্রন্থ ‘চর্যাপদ’-কে আমরা প্রথম বাংলা কাব্যগ্রন্থ হিসেবে জানি। কিন্তু এগুলো মূলত বৌদ্ধ সিদ্ধাচার্যদের গূঢ় সাধন সঙ্গীত। এর পরবর্তী গ্রন্থ (বাংলাভাষার দ্বিতীয় গ্রন্থ) ‘‘শ্রীকৃষ্ণকীর্তন’’ও মূলত রাধা-কৃষ্ণের কীর্তন বা গান। মুস্তাফা জামান আব্বাসী তাঁর ‘লঘু সংগীতের গোড়ার কথা’ গ্রন্থের প্রথম অধ্যায়ে চর্যাপদ, নাথগীতি, গীতগোবিন্দ, শ্রীকৃষ্ণকীর্তন, বৈষ্ণব পদাবলী, মঙ্গলকাব্য, শাক্ত পদাবলী প্রভৃতি প্রাচীন বাংলা গানের বিশদ অলোচনা করেছেনÑ যা আমাদের অনেকের অজানা রয়েছে। চর্যাপদে না থাকলেও মধ্যযুগের বাংলা কাব্যগুলোতে (বিশেষ করে মঙ্গল কাব্যে) দেব-দেবীর স্তব বা স্তুতিতে পরিপূর্ণ ছিল। বাংলা টপ্পা গান বা নিধু বাবুর টপ্পা গানের মধ্য দিয়ে বাংলা গানে আধুনিকতা প্রবেশ করে। তবে বাংলা গানের পুরোপুরি আধুনিকতা এসেছে কাব্যগীতির মাধ্যমে। বিশ শতকের কবি বা গীতিকাররাই এ ক্ষেত্রে ভূমিকা পালন করেছেন। তারা গান লিখেছেন ও সুরও দিয়েছেন। এসব কবি ও গীতিকারের মধ্যে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, কাজী নজরুল ইসলাম, দ্বিজেন্দ্রলাল রায়, অতুল প্রসাদ সেন, রজনীকান্ত সেন প্রমুখ উল্লেখযোগ্য।
এ গ্রন্থের দ্বিতীয় অধ্যায়ে লোকসঙ্গীতের বিভিন্ন শাখা-প্রশাখা নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে। পল্লীগীতি থেকে শুরু করে ভাটিয়ালি, ভাওয়াইয়া, রাখালি, চটকা ইত্যাদি গানের উৎপত্তি, বিকাশ ও পরিবেশের সুন্দর বর্ণনা দেয়া হয়েছে। ভাটিয়ালি, ভাওয়াইয়া গান সম্পর্কে আমরা অবগত থাকলেও ‘চটকা’ গান সম্পর্কে অনেকেই অবগত নই। লেখক বলেছেন, ‘ভাওয়াইয়ার অপর রূপ চটকা। চটুল থেকে চটকা। যদিও এর বাণী চটুল নাও হতে পারে। হালকা সুর ও লঘু তাল এর বৈশিষ্ট্য।’ বাউল, জারি, সারি ইত্যাদি গানের পরিচিতি ও বর্ণনার সাথে লেখক আরেকটি অপরিচিত গানের কথা তুলে ধরেছেন; সেটি হলোÑ বিচার গান। এ গান হলো হেঁয়ালির মতো; কিছুটা আধুনিক কবিতার মতো দুর্বোধ্য। এ গানে কথার আড়ালে গানের বিষয়বস্তু গোপন করে মজা উপভোগ করে থাকেন গায়ক। যেমনÑ
নদীর কূলে বট বিরিক্ষি তাহার তলে চিতা
মা-পুতে সহমরণে যায় তখন জন্মে পিতা।…
বিচার গানের এমন বৈশিষ্ট্য লক্ষ করা যায় বাউল গানের মধ্যেও। বাউল গানের চাপান-কাটানের মধ্যে এ রকম ধাঁধাযুক্ত পংক্তি থাকে। এ ছাড়া এ অধ্যায়ে আরো আছেÑ হামদ, নাত, মারফতি, মুর্শিদি ইত্যাদি ভক্তিমূলক গানের আলোচনা।
তৃতীয় অধ্যায়ে আলোচনা করা হয়েছেÑরবীন্দ্র সঙ্গীত ও নজরুল সঙ্গীতের বৈশিষ্ট্য। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর শুধু একজন বড় কবিই নন, একজন শ্রেষ্ঠ গীতিকারও বটে। তিনি কবিতার চেয়ে গান লিখতেই বেশি স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করতেন। তার নিজের জবানিতেই শোনা যাক সে কথাÑ
‘গান লিখতে যেমন আমার নিবিড় আনন্দ হয় এমন আর কিছুতে হয় না; এমন নেশা ধরে যে তখন গুরুতর কাজের গুরুত্ব একেবারে চলে যায়।’
লেখক এখানে রবীন্দ্র সঙ্গীতের বিভিন্ন দিক নিয়ে আলোচনা করেছেন। রবীন্দ্র সঙ্গীতের বৈশিষ্ট্য, শ্রেণিবিভাগ আলোচনার পাশাপাশি তার গানে যে লোকসঙ্গীতের প্রভাব রয়েছে সে কথাও তুলে ধরেছেন।
বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলাম বাংলা গানের এক বিস্ময়কর প্রতিভা। গবেষকদের মতে তিনি সাড়ে তিন হাজারেরও বেশি গান লিখেছেন। শুধু বাংলাদেশেই নয়, বিশ্বের অন্যকোনো দেশে কোনো গীতিকার এক জীবনে এত বিপুল গান লিখেছেন কি না সন্দেহ। মুস্তাফা জামান আব্বাসী নজরুলের গানের বিভিন্ন দিকÑ সুর, তাল, লয়, রাগ ইত্যাদি নিয়ে মনোজ্ঞ আলোচনা করেছেন।
এ গ্রন্থের চতুর্থ অধ্যায়ে সঙ্গীত ব্যক্তিত্বদের জীবনীর মধ্যে আলোচিত হয়েছেÑ বিদ্যাপতি, চণ্ডীদাস, রামনিধি গুপ্ত, লালন শাহ, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, কাজী নজরুল ইসলাম, হাসন রাজা, রামপ্রসাদ সেন, দ্বিজেন্দ্রলাল রায়, অতুল প্রসাদ সেন, রজনীকান্ত সেন, গোলাম মোস্তফা, জসীমউদ্দীন প্রমুখ কবি ও গীতিকারদের জীবনী ও বাংলা গানে তাদের অবদান।
পঞ্চম অধ্যায়ে আলোচিত হয়েছে সঙ্গীত শিল্পীদের জীবনী। এখানে আছেন শিল্পী আব্বাস উদ্দিন আহমদ, কানাইলাল শীল, আব্দুল আলীম, আলতাফ মাহমুদ প্রমুখের জীবনী এবং শিল্পী হিসেবে বাংলা গানে তাদের অবদান। এখানে প্রসঙ্গত উল্লেখ্য যে, আব্বাস উদ্দিন ইসলামি গান লেখার ব্যাপারে কাজী নজরুল ইসলামকে উদ্বুদ্ধ করেন। বলা চলে তিনিই কবিকে প্রথম ইসলামি গান রচনা করতে প্রেরণা জোগান। নজরুল তখন বিদ্রোহী কবি হিসেবে জনপ্রিয়তার তুঙ্গে। তার কবিতা অসাম্প্রদায়িক ও সাম্যবাদী চেতনার কারণে ধর্মান্ধদের মনে আঘাত লাগে। তারা আদাজল খেয়ে লাগে নজরুলকে কিভাবে কাফের (!) উপাধিতে ভূষিত করা যায়। এ অবস্থায় শিল্পী আব্বাস উদ্দিন বলেন, ‘আপনি যদি ইসলামি গান লেখেন তাহলে মুসলমানদের ঘরে ঘরে আবার উঠবে আপনার জয়গান।’ আব্বাস উদ্দিনের অনুরোধে লেখেনÑ ‘ও মন রমজানের ঐ রোজার শেষে এলো খুশির ঈদ …’ গানটি অকল্পনীয় জনপ্রিয়তা অর্জন করে।
ষষ্ঠ অধ্যায়ে বাংলাদেশের লোকবাদ্যযন্ত্রের সংক্ষিপ্ত পরিচিতি তুলে ধরা হয়েছে। এর মধ্যে আছে সারিন্দা, একতারা, দোতারা, খমক, করতাল, বাঁশি, খোল, সারিন্দাম ঢোল ইত্যাদি। এ ছাড়া উপমহাদেশের বাদ্যযন্ত্রে মধ্যে আছে তবলা, পখোয়াজ (মৃদঙ্গ), হারমোনিয়াম, তানপুরা ইত্যাদি।
হালকা লয় বা লঘু সুরের গানকে বলা হয় লঘুসঙ্গীত। আমাদের লোকসমাজে এসব গান গীত হলেও এর উৎপত্তি কিংবা ইতিহাস আমরা অনেকেই জানি না। মুস্তাফা জামান আব্বাসী তাঁর ‘লঘু সংগীতের গোড়ার কথা’ গ্রন্থটিতে সঙ্গীতের বিভিন্ন শাখা-প্রশাখার সংক্ষিপ্ত বর্ণনাসহ সঙ্গীতের সাথে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি বা বাদ্যযন্ত্র প্রভৃতির মনোজ্ঞ আলোচনা করেছেন। গ্রন্থটি প্রাথমিক পাঠ হিসেবে সঙ্গীত পিপাসুদের কাছে বেশ সমাদৃত হবে এমনটি আশা করা যায়।

    Print       Email

You might also like...

SC Soudi ধূসর মরুর বুকে

ধূসর মরুর বুকে : সাঈদ চৌধুরী

Read More →