Loading...
You are here:  Home  >  কলাম  >  Current Article

মৃত্যুর মিছিল নিয়ে দেশ এগিয়ে চলছে

আলফাজ আনাম

অস্বাভাবিক মৃত্যুর খবর এখন আর মানুষকে আলোড়িত করে না। প্রতিদিনের সংবাদপত্রে থাকে খুন, গুম ও অপহরণের খবর। পুলিশের গুলিতে মানুষ মারা যাচ্ছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের হাতে প্রকাশ্যে রাজপথে গুলি করে হত্যার দৃশ্য কিংবা হাত-পায়ে গুলি করার ছবি সংবাদপত্রে বহুবার প্রকাশিত হয়েছে। প্রায়ই প্রকাশ্যে পিটিয়ে মানুষ মারার ঘটনাও বেড়ে গেছে। ক্ষমতার দ্বন্দ্ব এবং অবৈধ অর্থ ভাগবাটোয়ারা নিয়ে ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দলের মধ্যে খুনোখুনির ঘটনাও কম নয়। এভাবে মৃত্যুর খবর যেন সাধারণ বিষয়ে পরিণত হয়েছে। মানুষের সংবেদনশীলতা যেন লোপ পাচ্ছে। ধরে নেয়া হচ্ছে, এ দেশে এভাবেই মানুষ মারা যাবে।
দেশে যে মৃত্যুর মিছিল চলছে, তাতে এবার যোগ হয়েছে একসাথে ২৭ জন। এরা সমাজের নিচের তলার মানুষ। তাই এদের মৃত্যু নিয়ে হাহাকার হবে না, সংবাদপত্রে দু-এক দিন খবরের পর হারিয়ে যাবে। যেমন হারিয়ে গেছে রানা প্লাজায় প্রায় ১৫০০ মানুষের মৃত্যুর খবর। তাজরীন গার্মেন্টসের পুড়ে যাওয়া শ্রমিকদের কথাও কেউ মনে রাখে না। গত সপ্তাহে ময়মনসিংহে জাকাতের কাপড় আনতে গিয়ে যে ২৭ জন মানুষ পদপিষ্ট হয়ে মারা গেল, তার মধ্যে চারজন শিশু ও ২৩ জন নারী। এই যে মানুষ মারা গেল, এরা গরিব বলেই এভাবে মারা গেছে। এদের যদি শাড়ি-লুঙ্গি কেনার সামর্থ্য থাকত তাহলে ভোররাতে সেহরি খেয়ে ২৫০ টাকা দামের একটি শাড়ি নেয়ার জন্য এভাবে জীবন ত্যাগ করতে হতো না। সমাজে যাতে এমন গরিব মানুষ না থাকে, সে জন্য সম্পদশালীদের সম্পদে গরিবের হকের কথা ইসলামে জোর দিয়ে বলা হয়েছে।
জাকাত দয়া করে কাউকে শাড়ি-লুঙ্গি দেয়ার বিষয় নয়, এটা ইসলামের মৌলিক ইবাদতের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। জাকাত দিতে হবে শর্তহীনভাবে। জাকাত নিছক দান নয়, দায়িত্ব। এটা সাধারণ দান-খয়রাত ধরনের নফল কিংবা সুন্নত আমল নয়। জাকাত দেয়া প্রত্যেক ‘সাহেবে মাল’, অর্থাৎ নির্দিষ্ট পরিমাণ সম্পদের অধিকারীর ওপর ফরজ। ইসলামে এর গুরুত্ব কত বেশি, তার প্রমাণ হজরত আবু বকর রা:-এর শাসনকালের ঐতিহাসিক ঘটনা। তখন একদল মুসলমান তাকে বলল, ‘আমরা ইসলামের অন্য সব বিধিবিধান পালন করব; শুধু জাকাত দেয়া থেকে আমাদের অব্যাহতি দিন।’ ইসলামের প্রথম খলিফা তৎক্ষণাৎ এদের এই অন্যায় আবদার প্রত্যাখ্যান করে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করেছিলেন।
জাকাত হচ্ছে ‘বাধ্যতামূলক দান’, যা ইসলামের পঞ্চস্তম্ভের একটি। আল্লাহ তায়ালা সম্পদ দিয়েছেন সমাজের অভাবী মানুষের চাহিদা মেটানোর জন্য। তাই সম্পদের যারা অধিকারী, তাদের দায়িত্ব হলো দীনদরিদ্র মানুষের সাহায্যের জন্য এগিয়ে যাওয়া। অথচ বিশ্বজনীন ভালোবাসার অনুভূতিহীন কিছু লোক কেবল সম্পদ জড়ো করছে; কিন্তু গরিবের প্রতি তার দায়িত্ব ও কর্তব্য ভুলে গেছে। এ দেশে যারা জাকাত দিচ্ছেন তাদের অনেকে হয়তো ভুলে গেছেন, লোক দেখানোর জন্য যেমন নামাজ পড়লে তা কবুল হয় না তেমনি প্রদর্শনেচ্ছা থেকে জাকাত দেয়াও অত্যন্ত গর্হিত কাজ।
ইসলাম বলে, যেকোনো বস্তু বা সম্পদের প্রকৃত মালিক মানুষ নয়; মালিক হচ্ছেন আল্লাহ। সম্পদের খাতিরে সম্পদ অর্জন অথবা সম্পদ মানুষের মূল্য ও মর্যাদা বাড়াবে মনে করে সম্পদ বাড়িয়ে চলাকে এ কারণে নিন্দা করা হয়েছে। নিছক সম্পদ অর্জন করা আল্লাহর কাছে অর্থহীন। সম্পদ মানুষের মূল্য বা গুণ বাড়ায় নাÑ না দুনিয়ায়, না আখেরাতে। ইসলাম শিক্ষা দেয়, মানুষের এ জন্যই সম্পদ অর্জন করা উচিত যে, তা নিজের ও অন্যের যথাযথ প্রয়োজন পূরণে নিয়মমাফিক ব্যয় করা হবে।
নামাজ যেমন আল্লাহর নামে আদায় করা হয়, তেমনি জাকাত দিতে হবে আল্লাহর নামে। যাদের জাকাত দেয়া হবে, জাকাতদাতা তাদের কাছ থেকে কোনো ধরনের পার্থিব লাভ বা ফায়দা বা সুবিধা আশা বা দাবি করতে পারেন না। অথবা মানবদরদি হিসেবে নাম করার উদ্দেশ্যেও জাকাত দেয়া যাবে না। জাকাতের গ্রহীতাকে হেয় করে, নতুবা তাকে সাহায্য করার খোঁটা দিয়ে তার অনুভূতিতে আঘাত হানা অন্যায়। দুর্ভাগ্যজনক আমাদের দেশে যেভাবে জাকাত দেয়া হচ্ছে, তাতে নিজেকে ‘মানবদরদি’ হিসেবে তুলে ধরার প্রবণতা অধিক প্রকাশ পাচ্ছে। কিন্তু জাকাত দেয়ার মধ্য দিয়ে শর্তহীনভাবে যে সম্পদ দেয়া হচ্ছে, তাতে জাকাতগ্রহীতার অর্থনৈতিক উন্নতি হওয়ার বিষয় থাকছে উপেক্ষিত। জাকাত হতে পারে দেশের অসংখ্য গরিব মানুষের কর্মসংস্থান ও দারিদ্র্য বিমোচনের একটি শক্তিশালী হাতিয়ার। এখন যারা জাকাতের নামে শাড়ি-লুঙ্গি বিতরণ করছেন, তারা বিষয়টি এভাবে ভাবছেন বলে মনে হয় না।
জাকাত ব্যক্তির উদ্যোগে প্রদান করা হলেও মূলত রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থাপনায় এর আদায় ও বণ্টনের কাজ সম্পন্ন হলেই প্রকৃত সুফল পাওয়া সম্ভব। কিন্তু বাংলাদেশের রাষ্ট্রব্যবস্থায় কখনোই এভাবে জাকাত আদায়ের দিকে মনোযোগ দেয়া হয়নি। এ ক্ষেত্রে রাষ্ট্রের ওপর আস্থা ও বিশ্বাসযোগ্যতা গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। যিনি জাকাত দেবেন, স্বাভাবিকভাবে তিনি জানতে চাইবেন, যে অর্থ জাকাত হিসেবে দিলেন প্রকৃত হকদারদের কাছে রাষ্ট্র তা পৌঁছাতে পারছে কি না। ময়মনসিংহে জাকাতের কাপড় আনতে গিয়ে ২৭ জন লোক মারা যাওয়ার পর ইসলামিক ফাউন্ডেশন সংবাদপত্রে বিজ্ঞাপন দিয়ে রাষ্ট্রীয় জাকাত ফান্ডে অর্থ দেয়ার আহ্বান জানিয়েছে। প্রকৃতপক্ষে এ প্রতিষ্ঠানটি পারত জাকাতের সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব নিতে। দুর্ভাগ্যজনকভাবে সরকারি এ প্রতিষ্ঠানটির প্রতি দেশের ধর্মপ্রাণ মানুষের তেমন আস্থা ও বিশ্বাস নেই। এটি একটি দলীয় প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছে। এ প্রতিষ্ঠানের মহাপরিচালক করা হয়েছে এমন এক ব্যক্তিকে, যার প্রতি আলেম সমাজের আস্থা দূরে থাক, বিতর্কিত কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়া যেন তার মিশনে পরিণত হয়েছে। ফলে রাষ্ট্রীয় এ প্রতিষ্ঠানটিকে ইসলামের চর্চা ও কল্যাণকর কাজে নিয়োজিত করার সুযোগ ও সম্ভাবনা নষ্ট করে ফেলা হয়েছে।
রাষ্ট্রের যথাযথ ব্যবস্থাপনা না থাকলে সামাজিকভাবে জাকাত আদায় এবং এর কার্যকর বণ্টনের কর্মসূচি নেয়া যায়। এখন মানুষ প্রধানত ব্যক্তিগতভাবেই জাকাত দিচ্ছে, কিন্তু অনেক ক্ষেত্রে জাকাত সম্পর্কে মানুষের জ্ঞানের অভাব এবং প্রদর্শনমূলক মনোভাবের কারণে জাকাতের সুষ্ঠু বিলিবণ্টন হচ্ছে না, বরং প্রতি বছর জাকাতের শাড়ি-লুঙ্গি দেয়ার নামে প্রাণহানি ঘটছে। এর দায় শুধু যিনি এভাবে শাড়ি-লুঙ্গি বিতরণ করছেন তার ওপর বর্তায় না, রাষ্ট্রের ওপরও বর্তায়। একইভাবে, এ ধরনের প্রাণহানির ঘটনা যাতে না ঘটে, সে ব্যাপারে আলেম সমাজ সোচ্চার হওয়া উচিত। জাকাত কাকে কিভাবে দিতে হবে, সে ব্যাপারে জ্ঞানের যে অভাব আছে সে সম্পর্কে সচেতন করে তোলার ব্যাপারেও আলেম সমাজের করণীয় রয়েছে।
২.
জাকাতের নামে কাপড় বিতরণে ২৭ জন মানুষের প্রাণহানির ঘটনা এমন একসময় ঘটল, যখন বিশ^ব্যাংক বাংলাদেশকে নি¤œমধ্যম আয়ের দেশ হিসেবে সার্টিফিকেট দিয়েছে। এ নিয়ে সরকারের মন্ত্রীরা নানাভাবে উল্লাস প্রকাশ করছেন। ‘দেশ এগিয়ে যাচ্ছে’ বলে সরকারের প্রচারবিদেরা কত কাহিনী প্রচার করছেন। কিন্তু আমরা উন্নয়নের এমন এক চেহারা দেখছি যে, মাত্র ২৫০ টাকা দামের একটি শাড়ি সংগ্রহ করতে গিয়ে এ দেশের গরিব নারীরা মর্মান্তিকভাবে জীবন দিচ্ছে। মানুষের পায়ের তলায় পিষ্ট হয়ে মারা যাচ্ছে। বড় প্রশ্ন হলো, আসলে বাংলাদেশের মানুষের উন্নয়ন কোথায় হচ্ছে? রাজধানীতে একসাথে ৫০ জন লোকের যদি আমরা আয় ধরি, তাহলে কারো দৈনিক আয় ১০০ টাকা, আবার কারো আয় হবে ২০ হাজার টাকা। এর গড় করে যদি আমরা বলি, ৫০ জনের আয় প্রতিদিন পাঁচ হাজার টাকা, এটা কোনোভাবেই বাস্তবসম্মত হবে না। প্রকৃতপক্ষে এ দেশে কিছু মানুষের আয় বেড়েছে। আর কিছু মানুষ আরো গরিব হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী প্রায়ই বলেন, আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় এলে সবাই কিছু না কিছু পায়। কিন্তু এই পাওয়ার মধ্যে রয়েছে বিশাল এক ফারাক। এ সরকার নানাভাবে দেশে একটি সুবিধাভোগী শ্রেণী গড়ে তুলতে সক্ষম হয়েছে। প্রধানত অন্যায়ভাবে এদের আয় বাড়ছে এবং তা বাড়ছে অস্বাভাবিক হারে। আবার সমাজের একটি অংশ দ্রুত অর্থনৈতিক সক্ষমতা হারিয়ে ফেলছে। এই সক্ষমতা হারানোর সাথে প্রতিকূল রাজনৈতিক পরিস্থিতির গভীর সম্পর্ক রয়েছে।
দেশে এখন সবচেয়ে বেশি সুবিধাভোগী শ্রেণী হচ্ছে পুলিশ। এই বাহিনী সরকারের ‘প্রাণভোমরা’। ফলে এই বাহিনীর সদস্যদের জন্য যেমন সরকারি পর্যায়ে বেতনভাতা ও রেশনের সুবিধা বাড়ানো হয়েছে, তেমনি সরাসরি রাজনৈতিক কারণে তাদের আয় বেড়ে গেছে। বিষয়টি আমরা খোলাসা করে তুলে ধরতে পারি। এখন সারা দেশে বিরোধী দলের কমপক্ষে ৫০ হাজার নেতাকর্মী কারাগারে। এই রাজনৈতিক ব্যক্তিদের যখন গ্রেফতার করা হয় তখন প্রায় প্রতিটি পরিবারের কাছ থেকে পুলিশ কোনো না কোনোভাবে অর্থ আদায় করেছে। গ্রেফতারের নামে, রিমান্ডে কিংবা ক্রসফায়ারে হত্যার ভয় দেখিয়ে টাকা আদায় করেছে। অনেক পরিবারের টাকা দেয়ার সামর্থ্য না থাকার পরও ছেলে, ভাই বা স্বামীকে নিরাপদে জেলখানায় পাঠানোর জন্য ঋণ করেছে, জমি বন্ধক রেখেছে, এমনকি গয়না বিক্রি করার ঘটনাও ঘটেছে। আবার নির্ধারিত সময় টাকা না দেয়ার কারণে কেউ সন্তান বা ভাইকে হারিয়েছেÑ এমন ঘটনাও আছে। কেউ কেউ টাকা দিয়েও আপনজনকে ফিরে পাননি। এভাবে পুলিশকে টাকা দিতে গিয়ে দেশের কয়েক লাখ পরিবার তাদের অর্থনৈতিক সামর্থ্য হারিয়ে ফেলেছে। এ ছাড়া মামলা বা গ্রেফতারের আতঙ্কে হাজার হাজার রাজনৈতিক কর্মী নিজেদের ব্যবসায় বা চাকরি ছেড়ে পালিয়ে বেড়াচ্ছেন। এর বিরাট প্রভাবও অর্থনীতিতে পড়েছে। সমাজে বেশ কিছু লোক কর্মহীন হয়ে পড়ছেন। ব্যবসা-বাণিজ্য ছেড়ে দিয়েছেন। আবার কিছু লোক রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তার করে আঙুল ফুলে কলাগাছ বনে যাচ্ছেন।
দেশ এগিয়ে চলা বা নি¤œমধ্যম আয়ের দেশ হওয়ার গালগল্প সরকারের মন্ত্রীদের আত্মতুষ্টির কারণ হলেও দেশের গরিব মানুষ দিন দিন আরো গরিব হচ্ছে। নিম্ন আয়ের মানুষের আয় রোজগার বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। দেশের মানুষের কর্মসংস্থানের পথ আরো রুদ্ধ হয়ে যাচ্ছে। মানুষ কতটা বেপরোয়া হলে নিছক শ্রমিকের কাজ পাওয়ার জন্য নিজের জীবন বাজি রেখে সমুদ্র পাড়ি দিতে পারে, আমাদের নব্যধনিক শাসক শ্রেণী তা উপলব্ধি করতে পারবে না। একটা শাড়ির জন্য কেন মানুষ জীবনের ঝুঁকি নেয়, তা-ও তাদের বুঝে আসে না। দেশকে যদি আমরা প্রকৃতই উন্নত করতে চাই, তাহলে প্রথম দরকার মানুষের কাজের সংস্থান করা। কিন্তু কাজ পাওয়ার ক্ষেত্র দিন দিন ছোট হয়ে আসছে। ফলে মানুষের অভাব-অনটন বাড়ছে। রাজধানীতে ফাইওভার কিংবা কর্ণফুলী নদীর নিচে টানেল নির্মাণের মতো কসমেটিক উন্নয়ন দিয়ে এ দেশ এগোবে না। আগে মানুষের কাজের ব্যবস্থা করতে হবে। ব্যাংক থেকে টাকা লুট করে কিছু লোক ধনী হতে পারে, কিন্তু এতে সাধারণ মানুষের কোনো লাভই হবে না। কাজের সন্ধানে সমুদ্র পাড়ি দেয়া মানুষ যখন না খেয়ে মারা যায় কিংবা জাকাতের শাড়ি আনতে গিয়ে যখন নারী ও শিশুরা লাশ হয়, তখন বোঝা যায় কোথায় কেমন উন্নয়ন হয়েছে আর কারা এর সুফল পাচ্ছে।
alfazanambd@yahoo. com

    Print       Email

You might also like...

Saadat-hossain

আস্থার পুঁজি উবে গেলে মানুষ নিঃসহায় হয়ে যায়

Read More →