Loading...
You are here:  Home  >  প্রবন্ধ-নিবন্ধ  >  Current Article

যুক্তরাষ্ট্র-চীন বাণিজ্যযুদ্ধ

326450_138

এবার বাণিজ্যযুদ্ধের যুগে প্রবেশ করতে যাচ্ছে দুই পরাশক্তি যুক্তরাষ্ট্র ও চীন। সর্ববৃহৎ অর্থনীতির এই দুটি দেশের এই সঙ্ঘাতকে অশনি সঙ্কেত হিসেবে দেখা হচ্ছে বিশ্ববাণিজ্যের জন্য। সামরিক খাত ও বিশ্বে প্রভাববিস্তার নিয়ে দুই দেশের লড়াই এবার ছড়িয়ে পড়ছে নতুন একটি ফ্রন্টে। দেশের অর্থনীতির দোহাই দিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তার দেশে আমাদানিকৃত চীনের পণ্যে বাড়তি শুল্ক আরোপের ঘোষণা দেয়ার পরই চীন পাল্টা ব্যবস্থা নেয়ার ঘোষণা দিয়েছে। এতে উভয় দেশের বাণিজ্য সম্পর্ক স্মরণকালের মধ্যে সবচেয়ে ভয়াবহ আকার ধারণ করতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। যার প্রভাব পড়বে সারা বিশ্বের ব্যবসাবাণিজ্যের ওপর।

ধীরে নির্বাচনী প্রচারণার সময় করা সব বিতর্কিত অঙ্গীকারই পূরণ করে চলেছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। বারাক ওবামার সময় চালু করা নিজ দেশের নাগরিকদের স্বাস্থ্যসেবা প্রকল্প ‘ওবামা কেয়ার’ বাতিল করেছেন। অভিবাসন নীতি- বিশেষ করে মুসলিম অভিবাসীদের ওপর কড়াকড়ি আরোপ করেছেন। জেরুসালেমকে ইসরাইলের রাজধানী হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছেন। ইরানের সাথে পারমাণবিক চুক্তি থেকে বেরিয়ে যাওয়ার বিষয়টিও অনেক দূর এগিয়েছে। নাফটা চুক্তি থেকে বের হয়ে গেছেন। আর বিশ্ব অর্থনীতিতে সবচেয়ে বড় ধাক্কা হয়ে এসেছে চীনের সাথে শুরু হওয়া বাণিজ্যযুদ্ধ। এ সবই ছিল ডোনাল্ড ট্রাম্পের নির্বাচনী অঙ্গীকার। দেশের রক্ষণশীল ভোটারদের কাছে এসব অঙ্গীকার করেই নির্বাচনে জিতেছিলেন কট্টর জাতীয়তাবাদী ডোনাল্ড ট্রাম্প।

নির্বাচনী প্রচারণার সময়ই বারবার বলেছিলেন, যুক্তরাষ্ট্রের সাথে প্রতারণা করছে চীন। যুক্তরাষ্ট্রের শ্রমবাজার দখল করেছে চীনারা। তাদের ‘শিক্ষা’ দিতে তিনি চীনা বাণিজ্যের ওপর কড়াকড়ি আরোপ করবেন। এর প্রথম পদক্ষেপ হিসেবে গত জানুয়ারিতে আমদানিকৃত সৌর প্যানেল ও ওয়াশিং মেশিনের ওপর নতুন করে শুল্ক আরোপ করে যুক্তরাষ্ট্র। মার্চের শেষ দিকে বিদেশ থেকে আমদানিকৃত পণ্যে ২৫ শতাংশ ও অ্যালুমিনিয়ামের ওপর ১০ শতাংশ শুল্ক আরোপ করেন ট্রাম্প। ওই সব পণ্যের আমদানিমূল্য আনুমানিক ছয় হাজার কোটি ডলার।

অভিধানে ইংরেজি ট্যারিফ শব্দের বাংলা হচ্ছে শুল্ক, যা মূলত বিদেশে উৎপাদিত পণ্যের ওপর আরোপিত ট্যাক্স। দেশীয় বাজারে বিদেশী পণ্যের প্রভাব কমাতে শুল্ক আরোপ করা হয়। শুল্ক আরোপের ফলে পণ্যের দাম বেড়ে যায় এবং আশা করা হয়, ক্রেতারা ওই পণ্যের প্রতি আগ্রহ হারিয়ে ফেলবে। দেশের অর্থনীতিকে শক্তিশালী করতে দেশে উৎপাদিত পণ্য সস্তায় ক্রেতাদের হাতে তুলে দিতে এই কৌশলটি ব্যবহার করা হয়। অর্থাৎ বিদেশী পণ্যের দাম বাড়িয়ে দেয়া।

যুক্তরাষ্ট্রের এই শুল্ক বৃদ্ধির ঘোষণার পাল্টা ব্যবস্থা হিসেবে সে সময় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র থেকে আমাদানিকৃত মদ, শূকরের মাংস, ফলসহ ৩০০ কোটি ডলারের মার্কিন পণ্য আমদানির ওপর শুল্ক বসায় চীন। ১৫ শতাংশ থেকে শুল্ক বাড়িয়ে ২৫ শতাংশ করার ঘোষণা দেয়। মূলত এর মাধ্যমেই বেজে ওঠে বাণিজ্যযুদ্ধের দামামা। বিনিয়োগকারী থেকে বাণিজ্য বিশেষজ্ঞ- সবাই শঙ্কা প্রকাশ করেন দুই পরাশক্তির নতুন এ লড়াই নিয়ে।

এরপর কয়েক দফা আলোচনা হয় বেইজিং ও ওয়াশিংটনের মধ্যে। মার্কিন বাণিজ্যমন্ত্রী উইলবার রস ও চীনা উপ-প্রধানমন্ত্রী লিও হির মধ্যে তিন দফা বৈঠক হয় এ বিষয়ে। নতুন মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মাইক পম্পেওর বেইজিং সফরের সময়ও আলোচনা হয় বাণিজ্য ইস্যুতে। একপর্যায়ে উভয় দেশই নতুন শুল্ক আরোপের বিষয়টি স্থগিত রাখার ঘোষণা দেয়, কিন্তু গত সোমবার ট্রাম্প আবার নতুন করে ২০ হাজার কোটি ডলারের চীনা পণ্যে শুল্প আরোপের ঘোষণা দেয়।

ট্রাম্প মনে করেন, চীনের কাছে বাজার খুলে দিয়ে আমেরিকার মারাত্মক ক্ষতি হয়েছে। তিনি বলেছেন, চীনের মূল লক্ষ্য হচ্ছে- নানা কারসাজি করে শুধু জিনিস বিক্রি করা, যার পরিণতিতে যুক্তরাষ্ট্রের শত শত শিল্পকারখানা বন্ধ হয়ে গেছে। লাখ লাখ মানুষ চাকরি হারিয়েছে।

ট্রাম্পের সর্বশেষ শুল্ক আরোপের ঘোষণার পাল্টা ব্যবস্থা নেয়ার ঘোষণা ইতোমধ্যেই দিয়েছে চীন। চীনের বাণিজ্য মন্ত্রণালয় ট্রাম্পের নতুন ঘোষণাকে ‘ব্ল্যাকমেইল’ হিসেবে আখ্যা দিয়েছে। বেইজিং বলছে, ইতঃপূর্বের বৈঠকগুলোতে দুই দেশের মধ্যে যে সমঝোত হয়েছে এটি তার বিরোধী। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কেও হতাশ করেছে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের এই ঘোষণা। শক্ত প্রতিক্রিয়া ও সমপরিমাণ পাল্টা ব্যবস্থা নেয়ার হুমকি দিয়েছে চীনের বাণিজ্য মন্ত্রণালয়। কাজেই তাদের পক্ষ থেকে নতুন কোনো ঘোষণা আসা সময়ের ব্যাপার মাত্র।

সমগ্র বিশ্বব্যবস্থা যখন মুক্তবাণিজ্য ও উদার নীতির দিকে ঝুঁকছে, সে সময় ডোনাল্ড ট্রাম্প হাঁটতে শুরু করেছেন সম্পূর্ণ উল্টো পথে। বিশ্বের এক ও দুই নম্বর অর্থনীতির মধ্যে এই বাণিজ্যযুদ্ধের পরিণতি নিয়ে বিশ্বজুড়ে উদ্বেগ গভীর থেকে গভীরতর হচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রের শুরু করা বাণিজ্যযুদ্ধে বিশ্ববাজারে অস্থিরতা দেখে দেবে সেটা নিশ্চিত।

ট্রাম্পের গত সোমবারের ঘোষণার পরই যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের শেয়ারবাজারে বড় ধরনের দরপতন হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রে অন্য যেসব দেশ পণ্য সরবরাহ করে তারাও ক্ষতিগ্রস্ত হবে এতে। গত জি-৭ সম্মেলনেই দেখা গেছে তার প্রতিফলন। কানাডার প্রধানমন্ত্রী জাস্টিন ট্রুডোর সাথে ব্যাপক মতানৈক্য হয়েছে ট্রাম্পের। যুক্তরাষ্ট্র সবচেয়ে বেশি স্টিল ও অ্যালুমিনিয়াম আমদানি করে কানাডা থেকে। বিশ্লেষকরা বলছেন, চীনকে মোকাবেলা করতে গিয়ে ট্রাম্প মিত্র দেশগুলোর সাথে সম্পর্ক নষ্ট করছেন। এমনকি ট্রাম্পের নিজ দল রিপাবলিকান পার্টির অনেকেও অবস্থান নিয়েছে তার এই একরোখা বাণিজ্যনীতির বিরুদ্ধে। অবশ্য ট্রাম্প এসবকে পাত্তাই দিচ্ছেন না। তিনি প্রকাশ্যে বলেছেন, বাণিজ্যযুদ্ধ ভালো এবং আমেরিকার তাতে কোনো ক্ষতি নেই, বরং লাভ।

আসলেই এতে কোনো লাভ আছে কি না তা নিশ্চিত হতে পারছেন না। বিবিসি ওয়ার্ল্ড সার্ভিসের বাণিজ্যবিষয়ক রিপোর্টার অ্যান্ডু ওয়াকার মনে করেন, এতে সমস্যা আরো বাড়বে। যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে পণ্যের দাম বেড়ে যাবে, ফলে সবচেয়ে বড় সমস্যা হবে মার্কিন নাগরিকদেরই। অ্যান্ডু ওয়াকার মনে করেন, যেসব চীনা পণ্যে শুল্কারোপ করা হয়েছে, সেসব ক্ষেত্রে মার্কিন আমদানিকারকরা চীন বাদ দিয়ে বিকল্প সাপ্লায়ার খুঁজে নেবে, ফলে যুক্তরাষ্ট্রের খুব বেশি লাভ হবে না।

অনেকে মনে করছেন, ট্রাম্পের এটি একটি রাজনৈতিক চাল। চলতি বছর অনুষ্ঠিত হবে সিনেট নির্বাচন। যে জাতীয়তাবাদের মানসিকতা দেখিয়ে ট্রাম্প প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে জিতেছেন তা-ই আবার কাজে লাগাতে চান তিনি। সিনেটে রিপাবলিকানদের জিতিয়ে আনতে ট্রাম্প দেশের বাণিজ্য উন্নয়ন ও বেকারত্ব হ্রাসের এই টোপ ফেলেছেন। আর মার্কিন ভোটাররা যে কট্টরজাতীয়তাবাদী ইস্যুগুলোকে সমর্থন করে, সেটি তো ২০১৬ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনেই দেখা গেছে।

কিন্তু কথা হচ্ছে, চীনের সাথে নতুন একটি সেক্টরে যুদ্ধ লাগিয়ে কতটা সফল হবেন ট্রাম্প? চীন বর্তমান বিশ্ব অর্থনীতিতে বড় শক্তি। অনেক দিন ধরেই তাদের অর্থনীতির চাকা ক্রমেই জোরে ঘুরছে। বিশ্ববাজার দখলে এখন চীন সবাইকে ছাড়িয়ে। তাই এ যুদ্ধে চীনকে পরাজিত করা ট্রাম্পের পক্ষে সম্ভব নয়। এমনিতেই বাণিজ্য যুদ্ধ আসলে কাউকে থামিয়ে রাখতে পারে না। রাশিয়ার ওপর যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন ধরনের বাণিজ্য নিষেধাজ্ঞ রয়েছে, তবুও সমান তালে যুক্তরাষ্ট্রকে টক্কর দিয়ে চলেছে মস্কো। আর সারা বিশ্বেই চীনা বাজারের যে অবস্থা, তাতে তাদের হারানো ট্রাম্পের পক্ষে সম্ভব নয়। আবার চীনা পণ্য আমদানি কমলে যে যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতি খুব বেশি লাভবান হবে তার সম্ভাবনাও কম। অতীতে বহুবার ইস্পাত শিল্পকে এভাবে সুরক্ষা দেয়ার চেষ্টা ব্যর্থ হয়েছে, কারণ প্রযুক্তির উন্নতির সাথে সাথে ইস্পাত শিল্পে শ্রমিকের চাহিদা দিন দিন কমছে। ২০০২ সালে একটি গবেষণা সংস্থার হিসাবে, ইস্পাত আমদানির ওপর বাড়তি শুল্ক বসালে বড়জোর তিন হাজার ৫০০ মানুষের চাকরি বাঁচবে। ইস্পাত শিল্প উদাহরণ মাত্র, অন্য সব সেক্টরের চিত্রটাও এর চেয়ে ভিন্ন কিছু নয়।
মাঝখান থেকে ক্ষতিগ্রস্ত হবে অনুন্নত ও উন্নয়নশীল দেশগুলো। দুই পরাশক্তির রেষারেষিতে বিশ্ববাজারে অস্থিতিশীলতা এলে তা সামাল দিয়ে টিকে থাকা তাদের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠবে।

বাণিজ্য ঘাটতি কী
বাণিজ্য ঘাটতি হলো আপনি কোনো দেশ থেকে যে পরিমাণ পণ্য আমদানি করবে তার সাথে সেই দেশে কী পরিমাণ পণ্য রফতানি করবে তার পার্থক্য। অর্থাৎ চীন থেকে যুক্তরাষ্ট্র যে পরিমাণ পণ্য আমদানি করে, তার চেয়ে অনেক কম পণ্য চীন নেয় যুক্তরাষ্ট্র থেকে। এটিই যুক্তরাষ্ট্রের জন্য বাণিজ্য ঘাটতি। ২০১৭ সালে যুক্তরাষ্ট্রের এমন বাণিজ্য ঘাটতির পরিমাণ ছিল ৩৭ হাজার ৫০০ কোটি ডলার। চীনের শিল্পখাত ক্রমেই সম্প্রসারিত হওয়ায় এই পার্থক্য দিন দিন বাড়ছে। আর এটিই কমাতে চাইছেনে ডোনাল্ড ট্রাম্প।

যদিও বাণিজ্য ঘাটতিকে সবসময় নেতিবাচক হিসেবে দেখা হয় না অর্থনীতিতে। এখন অনেক দেশই উৎপাদন শিল্পে বিনিয়োগ কমিয়ে সেবা শিল্পে অধিক মনোযোগ দিচ্ছে। প্রয়োজনে শিল্পপণ্যগুলো তারা আমদানি করছে বিদেশ থেকে। ২০১৭ সালে ব্যাংকিং, পর্যটন ও ভ্রমণের মতো সেবা খাতগুলো থেকে যুক্তরাষ্ট্র প্রায় ২৫ হাজার কোটি মার্কিন ডলার সমপরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা আয় করেছে। যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতির ৯০ শতাংশই আসে সেবা খাত থেকে। অন্য দিকে চীনের অর্থনীতি পুরোপুরি শিল্পপণ্য নির্ভর। সেবা খাতে তাদের বৈদেশিক মুদ্রা আসে খুবই কম। আর সে কারণেই ট্রাম্পের নতুন এই বাণিজ্যনীতির বিরোধিতা করছেন অনেকে।

    Print       Email

You might also like...

dav

থাইল্যান্ডে বাংলাদেশিদের ব্যবসা ও বিয়ে

Read More →