Loading...
You are here:  Home  >  প্রবন্ধ-নিবন্ধ  >  Current Article

যে কারণে আশরাফকে সরিয়ে দেয়া হলো

জাকির হোসেন লিটন

syed-asrafজাতীয় চার নেতার অন্যতম সৈয়দ নজরুল ইসলামের ছেলে সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে যেমন গুরুত্বপূর্ণ তেমনি দলীয় সভানেত্রীর অত্যন্ত বিশ্বস্ত হিসেবেও পরিচিত ছিলেন। ওয়ান-ইলেভেনের কঠিন সময়ে অনেকেই সুবিধাজনক অবস্থান নিলেও জিল্লুর রহমানের সাথে মিলে শেখ হাসিনার পক্ষে দৃঢ় অবস্থান নেন তিনি। ক্লিন ইমেজের রাজনীতিবিদ হিসেবে পরিচিত সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম আওয়ামী লীগ বা সরকারের বিপদের সময় বেশ শক্ত হাতে পরিস্থিতি মোকাবেলা করেছেন। দলের সাধারণ সম্পাদক হওয়ার পরও কর্মীদের সময় না দেয়া এবং মন্ত্রণালয়ে অফিস না করার অভিযোগ ছিল তার বিরুদ্ধে। তবে সৈয়দ আশরাফুল ইসলামের বিরুদ্ধে তদবির, বাণিজ্য বা দুর্নীতির কোনো অভিযোগ ছিল না।
কিন্তু বর্তমান মন্ত্রিসভায় অনেক মন্ত্রীকে নিয়েই বিতর্ক রয়েছে। বিশেষ করে দুর্নীতি মামলার সাজা আর গম কেলেঙ্কারি নিয়ে সাম্প্রতিককালে চরম বিতর্কে পড়েন দুই মন্ত্রী। কিন্তু তাদের কারো বিরুদ্ধে ব্যবস্থা না নিয়ে হঠাৎ করেই ব্যবস্থা নেয়া হলো সৈয়দ আশরাফুল ইসলামের বিরুদ্ধে। এতে বেশ অবাক হয়েছেন দলের সর্বস্তরের নেতাকর্মীরা। সৈয়দ আশরাফের মন্ত্রিত্ব হারানোর পেছনে কী কারণ থাকতে পারে তা নিয়ে রীতিমতো গবেষণা চালাচ্ছেন তারা।
বিষয়টি একান্তই প্রধানমন্ত্রী ও সৈয়দ আশরাফের বিষয় হওয়ায় কেউ সরাসরি কোনো ধরনের নেতিবাচক মন্তব্য করতে রাজি না হলেও আওয়ামী লীগ উপদেষ্টামণ্ডলীর অন্যতম সদস্য ও সাবেক মন্ত্রী সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত বলেছেন দল, দেশ ও গণতন্ত্রের স্বার্থেই প্রধানমন্ত্রী তাকে সরিয়ে দিয়েছেন। আর সৈয়দ আশরাফও মন্ত্রিত্বের কাঙ্গাল নন।
মন্ত্রিপরিষদে পরিবর্তনের ফলে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় আরো গতিশীল হবে আশা প্রকাশ করে দলের উপদেষ্টামণ্ডলীর আরেক সদস্য ও অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত বলেছেন, সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম দলের সাধারণ সম্পাদক হওয়ার সময়ই তাকে দফতরবিহীন মন্ত্রী করার একটা প্রস্তাব ছিল। প্রধানমন্ত্রী এত দিন পর ওই প্রস্তাব বাস্তবায়ন করেছেন।
দলের প্রভাবশালী প্রেসিডিয়াম সদস্য ওবায়দুল কাদের বলেছেন, দফতর থেকে সরিয়ে দিয়ে প্রধানমন্ত্রী তাকে ভারমুক্ত করেছেন। এখন তিনি দলে বেশি সময় দিতে পারবেন।
সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানায়, সৈয়দ আশরাফুল ইসলামের বিরুদ্ধে মন্ত্রণালয়ে অনুপস্থিতির অভিযোগ বহুল আলোচিত। তবে মন্ত্রিসভার বৈঠকে নিয়মিত অংশ নিলেও নিজ দফতরে তেমন একটা যেতেন না। মন্ত্রণালয়ের খুব জরুরি নথিপত্র থাকলে বিশেষ ব্যবস্থায় বাসা থেকে মন্ত্রীর স্বাক্ষর করিয়ে আনা হতো। ফলে মাঠপর্যায় থেকে দলীয় সংসদ সদস্য এবং দলের জেলাপর্যায়ের নেতারা ঢাকায় মন্ত্রীর সাথে দেখা করে নিজের এলাকার উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের বিষয়ে কথা বলতে চাইলেও মন্ত্রীর দেখা পেতেন না। বিষয়গুলো নিয়ে দলের বিভিন্ন ফোরামে আলোচনা হলেও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এসব নিয়ে বেশ হাস্যরসে মেতে থাকতেন। কিন্তু গত মঙ্গলবার একনেক সভায় উপস্থিত না থাকায় বেশ ক্ষুব্ধ হয়ে প্রধানমন্ত্রী তাকে দফতর থেকে অব্যাহতি দিয়ে প্রবাসী কল্যাণমন্ত্রী ইঞ্জিনিয়ার খন্দকার মোশাররফ হোসেনকে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব দেন। এর পেছনে আর কী কারণ থাকতে পারে তা নিয়ে আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় নেতাদের বক্তব্যে একাধিক বিষয় উঠে আসছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক সম্পাদকমণ্ডলীর এক নেতা জানান, দল ও সরকারের অনেক নীতির সাথে একমত হতে পারেননি স্বচ্ছ ও ইতিবাচক রাজনীতিক সৈয়দ আশরাফ। তাই তিনি নিজ থেকেই মন্ত্রণালয় ও দলের পদ থেকে সরে যেতে চাইতেন। এর আগে একাধিকবার তিনি পদত্যাগ করেছেন বলেও চাউর হয়। পরে প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপে তা আর বেশি দূর এগোয়নি। এবার প্রধানমন্ত্রী তাতে সায় দিয়েছেন।
এ নেতা আরো বলেন, স্বাধীনতার পর তাজউদ্দীন আহমদকেও এভাবে সরিয়ে দেয়া হয়েছিল, এবার সৈয়দ আশরাফকে সরানো হলো। এতে সিগন্যাল তো ভালো মনে হচ্ছে না।
অন্য এক কেন্দ্রীয় নেতার মতে, এলজিআরডি মন্ত্রণালয়ের অধীনে রাস্তাঘাট থেকে শুরু করে ইউনিয়ন, উপজেলা, জেলা, পৌরসভা ও সিটি করপোরেশন পর্যায়ে ব্যাপক উন্নয়ন হয়। বিশেষ করে গ্রামীণ রাস্তাঘাটের উন্নয়নে এলজিআরডি মন্ত্রণালয়ের ভূমিকা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। সে জন্য এ মন্ত্রণালয়ে বরাদ্দও থাকে বেশি। আর স্থানীয় পর্যায়ে দলের নেতাকর্মীরাও এ মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে উপকৃত হতে পারেন। কিন্তু আশরাফের অনুপস্থিতির কারণে মাঠ নেতাকর্মীরা সে উপকার বা বরাদ্দ থেকে বঞ্চিত হন। অন্য দিকে মন্ত্রণালয়ে জাতীয় পার্টির একজন নেতা প্রতিমন্ত্রী হিসেবে থাকায় বিরোধী দল জাতীয় পার্টির নেতাকর্মীদেরই বেশি সুবিধা হচ্ছিল। সে জন্য আওয়ামী লীগের মাঠ নেতাকর্মীদের স্বার্থে তাকে সরিয়ে দেয়া হতে পারে।
দলের নির্ভরযোগ্য একটি সূত্র জানায়, প্রধানমন্ত্রী কন্যা সায়মা হোসেন পুতুলের শ্বশুর ও প্রবাসী কল্যাণমন্ত্রী ইঞ্জিনিয়ার খন্দকার মোশাররফ হোসেন দীর্ঘ দিন ধরে বিভিন্ন মাধ্যমে এ মন্ত্রণালয়টি পাওয়ার জন্য চেষ্টা করছিলেন। মঙ্গলবারের একনেক বৈঠকেও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তার সেই আগ্রহের কথা প্রকাশ করেন এবং অবশেষে বৃহস্পতিবার তাকে সেই দায়িত্ব দেন।
সূত্রটি আরো জানায়, স্বাধীনতার পর গণতান্ত্রিক শাসনামলে দলের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিরাই এ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পালন করে আসছিলেন। কিন্তু খন্দকার মোশাররফ হোসেনের দলে তেমন কোনো গুরুত্বপূর্ণ পদ নেই। তাই দলের আগামী কাউন্সিলে হয়তো তাকে বড় কোনো পদে নিয়ে আসা হতে পারে। এর আগে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব দিয়ে তার একটা ইঙ্গিত দেয়া হলো।
তবে অসমর্থিত একটি সূত্র জনায়, প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পালনে খন্দকার মোশাররফ হোসেন সফল হতে পারেননি। কারণ, তার সময়ে মালয়েশিয়া, দুবাই, সৌদি আরব ও কুয়েতসহ বাংলাদেশের বড় বড় শ্রমবাজারগুলোতে জনশক্তি রফতানিতে ধস নেমেছে। বেসরকারি জনশক্তি রফতানিকারকরা জনশক্তি রফতানির স্বার্থে তাকে সরিয়ে দিতে বিভিন্ন মাধ্যমে প্রধানমন্ত্রীর কাছে দেনদরবার করছেন। আর মোশাররফ হোসেন যেহেতু স্থানীয় সরকার মন্ত্রাণালয়ে আগ্রহী সেহেতু কৌশলে তাকে প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রাণালয় থেকে সরিয়ে দেয়া হলো। আপাতত তিনি প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয়ে থাকলেও শিগগিরই সেখানে নতুন মন্ত্রী দেয়া হতে পারে বলে জানায় সূত্রটি।
আওয়ামী লীগ কেন্দ্রীয় সম্পাদকমণ্ডলীর একজন সদস্যের মতে, সৈয়দ আশরাফকে সরিয়ে দিয়ে এক দিকে যেমন মায়া ও কামরুলের ইস্যুটি আপাতত সামাল দেয়া হয়েছে তেমনি তারাসহ বিভিন্ন অনিয়ম ও দুর্নীতিতে জড়িত অন্য মন্ত্রীদেরও রেড সিগন্যাল দেয়া হলো। এর মধ্য দিয়ে সরকারের ইমেজ রক্ষায় কাউকেই ছাড়া হবে না এমন বার্তাটিই দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী।
তবে আওয়ামী লীগ সম্পাদকমণ্ডলীর এক সদস্য আশরাফের দফতরবিহীন হওয়ার বিষয়টিকে ইতিবাচক হিসেবে গ্রহণ করার পরামর্শ দিয়ে বলেন, একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখেই এই পরিবর্তন। সামনে হয়তো আরো চমক অপেক্ষা করছে।
তার ধারণা, সৈয়দ আশরাফের সাথে কথা বলেই প্রধানমন্ত্রী এই সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। আর দলের সাধারণ সম্পাদক যদি স্থানীয় সরকারমন্ত্রী থাকার ইচ্ছা প্রকাশ করতেন, তাহলে প্রধানমন্ত্রী কোনো দিন তাকে সরাতেন না।

    Print       Email

You might also like...

DD636266-A2D9-4B53-8F7F-65466D247000

বিজ্ঞানে মুসলিমদের ঐতিহ্য সম্পর্কে সমকালীন বিজ্ঞানী টাইসন

Read More →