Loading...
You are here:  Home  >  কলাম  >  Current Article

রাজনীতিক কবে বিজ্ঞানমনস্ক হবেন?

জয়া ফারহানা : ১৯১৯-এর ২৯ মে পূর্ণগ্রাস সূর্যগ্রহণের দিনে সারা রাত জেগে ছিলেন কোয়ান্টাম মেকানিক্সের জনক ম্যাক্স প্ল্যাংক, আলোর পথ বাঁকবে কিনা তা জানার উত্তেজনায়।

ম্যাক্স প্ল্যাংকের এই প্রতিক্রিয়ায় আরেক বিজ্ঞানী আর্নস্ট স্ট্রসকে আইনস্টাইন বলেছিলেন ম্যাক্স আমার শ্রেষ্ঠ বন্ধুদের মধ্যে শ্রেষ্ঠ। তবে তার সমস্যা একটাই। ফিজিক্সটা ঠিকমতো বোঝে না সে। বুঝলে সারা রাত উত্তেজনায় না কাটিয়ে নিশ্চিন্তমনে ঘুমাতে যেত। বিষয়টি অবিশ্বাস্য ভাববেন না। কোয়ান্টাম মেকানিক্সের জনক ম্যাক্স প্ল্যাংক ফিজিক্স বোঝেন না, আইনস্টাইনের এমন মন্তব্যের পেছনে কারণ আছে নিশ্চয়ই।

প্রায় আড়াইশ’ বছর ধরে মহাশূন্য মহাকাশের যেসব জটিল ধাঁধা মীমাংসা করতে বিজ্ঞানীরা খাবি খাচ্ছিলেন, আইনস্টাইনের এক আপেক্ষিক তত্ত্বের মাধ্যমে তার অনেকটা মীমাংসা হয়ে গেছে ততদিনে। এক নির্ভুল মহাকর্ষ সূত্র নির্ভুলভাবে মিলিয়ে দিয়েছে বহু অমীমাংসিত অঙ্ক। অঙ্ক কষে বলে দিয়েছেন কোনো বস্তুর উপস্থিতি তার চারপাশের শূন্যস্থানকে দুমড়ে-মুচড়ে দেয়, বস্তু প্রচণ্ড ভারি হলে দোমড়ানোর পরিমাণও বেড়ে যায়। অঙ্কে আরও দেখিয়েছেন- আলো সরলরেখায় চলে, ঠিক আছে।

তবে ব্যতিক্রমও আছে। ভারি বস্তুর পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় আলো বাঁকা পথেও যায়। তবে এই বেঁকে যাওয়ার পরিমাণ ঠিক কতটা হবে তাও নির্ধারিত। আইনস্টাইন নিজে নিঃসন্দেহ। কিন্তু ম্যাক্সের মনে সন্দেহ ছিল সূর্যের পেছনের নক্ষত্রকে তো কোনোদিনই দেখা যায় না। তাহলে কীভাবে বোঝা যাবে আলো বাঁকা পথও ধরে? উত্তর জানার উপায় সূর্যগ্রহণের সময় নক্ষত্রকে দেখা। ১৯১৯-এর ২৯ মে পূর্ণগ্রাস সূর্যগ্রহণের দিনে তাই সারা রাত জেগে ম্যাক্স প্রমাণ নিতে চাচ্ছিলেন আইনস্টাইনের তত্ত্ব ঠিক কি না। আইনস্টাইন বললেন, আমার তত্ত্বে আমি পুরোপুরি সন্তুষ্ট। কিন্তু দুঃখ একটাই।

এই তত্ত্বের সত্যতা বোঝার জন্য আমার বন্ধু ম্যাক্সকে সারা রাত জেগে থাকতে হল। এ হল বিজ্ঞান যার সত্যতা দেশ-কাল-জাতির ঊর্ধ্বে। সম্ভবত বিজ্ঞানের এ ধ্রুপদীমনস্কতার কারণে বিজ্ঞানভিত্তিক সমাজ ও রাষ্ট্র নির্মাণের জন্য অগ্রসর চিন্তার মানুষদের এত ব্যাকুলতা। কিন্তু বিজ্ঞানমনস্ক রাষ্ট্র নির্মাণের জন্য কিছুসংখ্যক মানুষের আকাঙ্ক্ষাই যথেষ্ট নয়। বিজ্ঞানমনস্ক রাষ্ট্র নির্মাণের জন্য সবার আগে দরকার রাজনীতির বিজ্ঞানমনস্ক হওয়া। কোনো কোনো দেশের রাজনীতি বিজ্ঞানমনস্কতার কাছাকাছি পৌঁছাতে পেরেছে। সে কারণে সেখানকার সেফলজিস্টদের নির্বাচনী অঙ্ক মেলে প্রায় বিজ্ঞানীদের সূত্রের মতোই।
আমাদের দেশের রাজনীতি কোন মনস্ক জানি না। তবে সেফলজিস্টদের অঙ্ক এখানে খাবি খায়। এখানে সেফলজিস্টদের জয়-পরাজয়ের বিশ্লেষণকেই কেবল বুড়ো আঙুল দেখানো হয় না, আরও এককাঠি চমক দেখিয়ে ভোটের দিনের দোরগোড়ায় এসে নির্বাচন স্থগিতও হয়ে যায়। হা হতোস্মি! রাজনীতি বিজ্ঞানমনস্ক হওয়া তো দূর, দিন দিন ভাগ্যমনস্ক হয়ে যাচ্ছে। বিশ শতকের শুরুতে জরুরি প্রয়োজনে বাইরে বের হওয়ার আগে পাঁজি পুঁথি মিলিয়ে দেখার প্রচলন ছিল। পঞ্জিকা দেখে মিলিয়ে নেয়া হতো শনি আর মঙ্গল এখন কোন ঘরে। অশ্লেষা মঘায় যাত্রা নাস্তি, শুক্র যদি বক্রি হয়…। কিন্তু সে তো সাধারণ মানুষের সংস্কৃতি।

সাধারণ মানুষের যারা প্রতিনিধিত্ব করেন, সেই রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বরাও যদি বিজ্ঞানমনস্ক হওয়ার পরিবর্তে জ্যোতিষমনস্ক কিংবা সংস্কারাচ্ছন্ন হয়ে ওঠেন তবে তা বিজ্ঞানমনস্ক রাষ্ট্র দেখতে আগ্রহীদের জন্য দুঃখজনক। আমাদের দেশে রাজনীতিকে যারা নিয়ন্ত্রণ করেন সেই সর্বোচ্চ ক্ষমতাধররা কি আদৌ বিজ্ঞানমনস্ক? তাদের অনেকের আঙুলেই ভাগ্যনির্ধারণী পাথরের আংটি দেখতে পাই। অনেক নেতাকে জানি যারা তাদের জন্য বিবেচিত যে কোনো শুভ কাজের আগে জ্যোতিষ ও ঠিকুজি কোষ্ঠি বিচার করেন। কোনো কোনো নেতা তেরো সংখ্যাকে অশুভ মানেন। জাতীয় পর্যায়ের নেতাদের সংস্কারাচ্ছন্ন মনের এমন আরও বহু উদাহরণ আছে যা স্মরণ করলে আমাদের কেবল দীর্ঘশ্বাসই ফেলতে হবে। ব্যক্তিগত পর্যায়ের সংস্কার যা সাধারণের কাছে দৃশ্যমান নয় সংস্কারের এমন তালিকা যদি বাদও দিই তবুও কথা থেকে যায়। কারণ নির্বাচনের ঠিক আগে গুরুত্বপূর্ণ নেতাদের মাজার জিয়ারতের দৃশ্য তো সবাই দেখেন। নির্বাচনী প্রচারণা শুরুর আগে মাজার জিয়ারতের সংস্কৃতি রীতিমতো প্রতিষ্ঠিত। মাজার জিয়ারত দিয়ে যারা নির্বাচনের কাজ শুরু হওয়াকে শুভকর ভাবেন তারা কীভাবে বিজ্ঞানমনস্ক রাষ্ট্র নির্মাণ করবেন?

২০১৮-কে বলা হচ্ছে নির্বাচনের বছর। যে দুই নগরে নির্বাচনের আয়োজন চলছিল তার একটির আয়োজন বন্ধ হয়েছে। অন্যটির বাসিন্দারা রয়েছেন আতঙ্কের মধ্যে। আতঙ্কের তালিকায় কখন কোন প্রার্থীর পোস্টার ছিঁড়ে ফেলার কেওয়াজের মধ্যে পড়ে ঠ্যাং ভাঙার সম্ভ্রমহানি থেকে শুরু করে মার্ডার কেস মামলার অজ্ঞাতনামা আসামি হওয়ার ঝুঁকি সবই আছে। যা হোক, নগর নির্বাচন নিয়ে নগরবাসীর ফোবিয়া আমাদের আলোচনার বিষয় নয়। এ মুহূর্তে আমাদের ভাবনা কার্ল মার্কসের দ্বিশত জন্মবার্ষিকী। এবং এই উপলক্ষকে ঘিরে বাংলাদেশের মতো উদীয়মান উন্নয়নশীল দেশে আদৌ বিজ্ঞানমনস্ক সমাজ ও রাষ্ট্র নির্মাণ সম্ভব কিনা তা যাচাই করা।

প্রায় ত্রিশ বছর আগে পঁচাত্তর নোবেল জয়ী বিজ্ঞানী তাদের স্বাক্ষর করা এক বিবৃতিতে জানিয়েছিলেন আকাশে গ্রহ-নক্ষত্রের অবস্থান, তাদের চলাচল বা অবস্থানের পরিবর্তন কোনোভাবেই পৃথিবীর মানুষের জীবন নিয়ন্ত্রণ করতে পারে না। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল সায়েন্স ফাউন্ডেশন বলেছে, জ্যোতিষশাস্ত্র হাতুড়ের ভণ্ডামি ছাড়া কিছু নয়। পাথর বা তাবিজ ধারণ করে চন্দ্র-সূর্য-তারকাদের আকর্ষণ করা বা ভাগ্যের পরিবর্তনও নিছক মূর্খতা। যুক্তরাষ্ট্রের একটি সমীক্ষা বলছে সেখানকার ঊনচল্লিশ শতাংশ নেতা জ্যোতিষশাস্ত্রে বিশ্বাস করেন এবং এদের বড় একটি অংশ দিনক্ষণ মেনে নতুন কাজে প্রবৃত্ত হন। প্রেসিডেন্ট রেগান তেত্রিশ সংখ্যাটিকে তার ক্ষেত্রে সৌভাগ্যের সূচক বলে ভাবতেন। আমাদের দেশেও অনেক নেতা বিশেষ কোনো দিন বা বিশেষ কোনো সংখ্যাকে সৌভাগ্যের সূচক ভাবেন। বাংলাদেশের অতি গুরুত্বপূর্ণ নেতা সাত সংখ্যাটিকে তার জন্য বিশেষভাবে শুভ ভাবেন। বহু নেতা যারা ভাষণের ভাষায় বলিষ্ঠভাবে প্রগতিশীল, ব্যক্তিজীবনে তাদের অনেকেই ভাগ্যবাদী, জ্যোতিষশাস্ত্রে বিশ্বাসী।

‘দ্য ফিউচার অব দ্য ইউনিভার্স’ শিরোনামের বক্তৃতায় হকিং বলেছিলেন একটি বই লিখব আমি যার নাম হবে ‘গতকালের আগামীকাল : ভবিষ্যতের ইতিহাস’। ব্রহ্মাণ্ডের ভবিষ্যৎ নিয়ে এ পর্যন্ত যত বিজ্ঞানী যত ভবিষ্যদ্বাণী দিয়েছেন সেসবই হবে বইয়ের উপজীব্য। লোকে তবে দেখত ভবিষ্যৎ সম্পর্কে বিজ্ঞানীদের তাবৎ অনুমান মিথ্যা প্রমাণ হয়েছে। নিজের তত্ত্ব বিগ ব্যাং, মহাবিস্ফোরণ বা ব্রহ্মাণ্ড সৃষ্টি এবং মহাসংকোচন বা সৃষ্টির লয় নিয়েও মজা করতে ছাড়েননি। বলেছেন পৃথিবী ধ্বংসের ব্যাপারে এ পর্যন্ত ধর্মযাজকরা যত ভবিষ্যদ্বাণী করেছেন তার কোনোটিই মেলেনি। আমার অবস্থা তাদের চেয়ে কিঞ্চিৎ ভালো। মহাসংকোচন যদি হয় তাহলে আমার হিসাবে তা ঘটবে এক হাজার কোটি বছর পর। হিসাব ভুল হলেও আমায় কেউ ধরতে পারবে না। হকিংয়ের শ্রম-মেধা-নিষ্ঠা-একাগ্রতা-অধ্যবসায়-সাধনা কিছুর সঙ্গেই পৃথিবীর কোনো মানুষের তুলনা চলে না। তবে হকিংয়ের হিউমারকে ধার করে বলা যায় নির্বাচন নিয়ে আমাদের সেফলজিস্টদের ভবিষ্যদ্বাণী বিজ্ঞাননির্ভর না হয়ে অনেকটা দৈববাণীর মতো। প্রাচীন গ্রিক দেশে দেবতারা যেভাবে দৈববাণী ঘোষণা করতেন অনেকটা তেমন। ভালো উদাহরণ গ্রিসের ডেলফির ‘অরাকল’। পারস্যের সঙ্গে যুদ্ধ। স্পার্টার অধিবাসীরা দেবতাদের কাছে জানতে চাইলো ফলাফল কী হবে? দৈববাণী হল হয় স্পার্টা জিতবে নয় তার রাজা মারা যাবে। আমাদের দেশের রাজনীতির দশা ওই দৈববাণীর চেয়েও শোচনীয়। এখানে দুটি খারাপের কোনোটিই না ঘটে অধিকতর খারাপ তৃতীয় ঘটনাটি ঘটে।

দুই.

জিআইএসএস (গোদার্ড ইন্সটিটিউট অব স্পেস স্টাডিজ) তাদের গবেষণা প্রতিবেদনে জানিয়েছে জলবায়ু পরিবর্তন হলে বজ্রপাতের সংখ্যা বাড়ে। আমরা ভুলেও গোদার্ড ইন্সটিটিউট অব স্পেস স্টাডিজের প্রতিবেদনের দিকে নজর দিচ্ছি না। বাংলা ভাষার শ্রেষ্ঠ ঔপন্যাসিক মানিক বন্দোপাধ্যায় লিখেছেন, খালের ধারে প্রকাণ্ড বটগাছের গুড়িতে ঠেস দিয়া হারু ঘোষ দাঁড়াইয়াছিল। আকাশের দেবতা সেইখানে তাহার দিকে চাহিয়া কটাক্ষ করিলেন। হারুর মাথার কাঁচা পাকা চুল আর রুক্ষ চামড়া ঝলসিয়া পুড়িয়া গেল।

আকাশের দেবতা কারও দিকে চাইলেই বজ্রপাতে মৃত্যু হয় বলে ধারণা ছিল গাওদিয়াবাসীর। শত বছর পরও প্রায় একই জায়গায় দাঁড়িয়ে আছি আমরা। মাটির দেবতা কটাক্ষ করে চাইলেই আমাদের জীবনে দুর্ভোগ নেমে আসে বলেই হয়তো ভাবি আকাশের দেবতা কারও দিকে চাইলেই বজ্রপাতে মৃত্যু হয়।

জয়া ফারহানা : গল্পকার ও প্রাবন্ধিক

    Print       Email

You might also like...

2337561_kalerkantho-2018-24-pic-5

মুনাফাবাজি নামক ভূত ঠেকাবে কে?

Read More →