Loading...
You are here:  Home  >  Uncategorized  >  Current Article

রোহিঙ্গাদের নাগরিকত্ব

এবনে গোলাম সামাদ l

বর্তমান বিশ্বে মানুষকে কোনো-না-কোনো রাষ্ট্রের নাগরিক হিসেবে বাস করতে হয়। রাষ্ট্র এমন একটি প্রতিষ্ঠান যে, তার সদস্য মানুষ না হয়েই পারে না। আগের দিনে নাগরিক হওয়ার সমস্যা এত জটিল ছিল না। যেমন হয়ে উঠেছে এখন। মানুষ বর্তমানে প্রধানত তিনভাবে কোনো-না-কোনো রাষ্ট্রের নাগরিকত্ব লাভ করে থাকে- ১. রক্তগত অধিকার, ২. জন্মভূমিগত অধিকার ও ৩. অর্জিত অধিকার।

রক্তগত অধিকার (Jus Sanguinis) বলতে বোঝায়, কার পিতা যদি কোনো রাষ্ট্রের নাগরিক হন, তবে তার পুত্রের সেই রাষ্ট্রের নাগরিক হওয়ার অধিকারকে। যেমন- পিতা যদি বাংলাদেশী হন, তবে তার পুত্র বাংলাদেশে না জন্মেও হতে পারেন বাংলাদেশী। বাংলাদেশী নাগরিকদের উল্লেখ করা হয় বাংলাদেশী, বাঙালি নয়।

জন্মগত অধিকার (Jus Soli) বলতে বোঝায়, কেউ যদি কোনো রাষ্ট্রে জন্মান, তবে তিনি সেই রাষ্ট্রে জন্মেছেন বলেই তার নাগরিকত্ব লাভ করতে পারেন; তার পিতা সেই রাষ্ট্রের নাগরিক না হলেও।

অর্জিত নাগরিকত্ব (Naturalized citizenship) বলতে বোঝায়, কেউ যদি বৈদেশিক রাষ্ট্রে সরকারি চাকরি গ্রহণ করে বহুদিন বিদেশে বাস করেন, সম্পত্তি ক্রয় করেন অথবা সেনাবাহিনীতে যোগদান করেন; তবে তিনি ওই রাষ্ট্রের নাগরিকত্ব লাভ করতে পারেন। মেয়েরা যদি অন্য দেশের নাগরিককে বিবাহ করেন, তবে তারা পেতে পারেন তাদের স্বামীর দেশের নাগরিকত্ব।

রোহিঙ্গাদের নাগরিকত্ব নিয়ে এখন প্রশ্ন তোলা হচ্ছে, তারা বাংলাদেশ থেকে যাওয়া মানুষ। কিন্তু কথাটা ঐতিহাসিকভাবে কতটা সত্য? আরাকান বর্তমানে মিয়ানমারের অঙ্গরাষ্ট্র হলেও এক সময় তা ছিল একটা পৃথক রাজ্য। আরাকান ও বাংলাদেশের মধ্যে কোনো পাহাড়-পর্বত নেই। মানুষ বাংলাদেশ থেকে আরাকানে সহজেই যেতে পেরেছেন। যেমন- আরাকান থেকে মানুষ পায়ে হেঁটে সহজেই আসতে পেরেছেন প্রাচীন গৌড় বাংলায়। গৌড়ের সুলতান জালালউদ্দীন মোহাম্মদ শাহর রাজত্বকালে (১৪১৮-১৪৩৩ খ্রিষ্টাব্দ) আরাকানের এক রাজা মং সুআ মাউন বার্মার মূল ভূখণ্ডের দক্ষিণ ভাগের এক রাজার দ্বারা আক্রান্ত হয়ে তার রাজত্ব হারান। তিনি রাজত্ব হারিয়ে পালিয়ে আসেন গৌড়ে।

গৌড়ের সুলতান তাকে সৈন্য দিয়ে সাহায্য করেন। তার হৃতরাজ্য পুনরুদ্ধারে। তিনি আরাকানে যে নতুন রাজধানী স্থাপন করেন, তার নাম দেন রোহও অথবা ম্রোহং। গৌড় থেকে যাওয়া সৈন্যরা রোহংয়ে থেকে যান। এদের বংশধরদের বলা হতে থাকে রোহিঙ্গা। রোহিঙ্গারা আরাকানে গিয়েছেন সেই সুলতানি আমলেই। হঠাৎ করেই সেখানে তারা বাংলাদেশ থেকে যেয়ে উপস্থিত হননি। এর পরও বাংলাদেশ থেকে বহু লোক গিয়েছেন অরাকানে। আরাকানের রাজারা তাদের যেতে উৎসাহিত করেছেন। কেননা, আরাকানে ধান চাষ করার জন্য যথেষ্ট কৃষক ছিলেন না। বাংলাদেশ থেকে মানুষ সেখানে নীত হয়েছেন ধান চাষ করার জন্য। এখন এই ইতিহাসকে স্বীকার না করে বলা হচ্ছে, রোহিঙ্গা মুসলমানরা চুপ করে বাংলাদেশ থেকে আরাকানে গিয়েছেন।

মিয়ানমারের একজন অধ্যাপক কয়েক বছর আগে বলেছিলেন, তিনি ব্রিটিশ শাসনামলের কাগজপত্রে রোহিঙ্গা নামটি খুঁজে পাচ্ছেন না। রোহিঙ্গা শব্দটি বাংলা ভাষার, ইংরেজি ভাষায় তা গৃহীত হয়নি। কিন্তু ব্রিটিশ শাসনামলেই ১৯৩০-এর দশকে অরাকানে যে লোক গণনা করা হয়, তাতে দেখা যায়, আরাকানের মোট জনসমষ্টির শতকরা প্রায় ৩৬ ভাগ হলেন আরাকানি মুসলমান। এই মুসলমানদের বংশধরদের নিশ্চয়ই বলা যেতে পারে না বাংলাদেশের নাগরিক। কেননা, তারা জন্মেছেন আরাকানের মাটিতে, তাই জানি না কিভাবে এখন প্রমাণ করার চেষ্টা হচ্ছে রোহিঙ্গারা বিবেচিত হতে পারেন না মিয়ানমারের নাগরিক হিসেবে। কারণ, আন্তর্জাতিক প্রথা অনুসারে বলতে হয়, তারা আরাকানের লোক। আর যেহেতু আরাকান বর্তমানে মিয়ানমারের অঙ্গরাষ্ট্র; তাই তারা বিবেচিত হওয়া উচিত মিয়ানমারের নাগরিক।

যে দেশটিকে ইংরেজি ভাষায় বলা হয় বার্মা, ফারসি ভাষায় তাকে বলা হতো বারহামা। বারহামা নামটির উদ্ভব হতে পেরেছিল দেশটির সংস্কৃত নাম ‘ব্রহ্ম’ থেকে। আরাকান নামটি ইংরেজি। এ নামটির উদ্ভব হতে পেরেছিল ফারসি আরাখং নাম থেকে। ১৯৫৮ খ্রিষ্টাব্দে বার্মায় সেনাপতি নে উইন (Ne Win) ক্ষমতা দখল করেন। নে উইন ১৯৮৯ খ্রিষ্টাব্দে সরকারিভাবে বার্মার নাম পরিবর্তন করে নাম রাখেন মিয়ানমার। কেননা, যাদের আমরা বলি বর্মি, তারা নিজেদের বলেন ম্রানমা। এর আগে নে উইন ১৯৭৪ খ্রিষ্টাব্দে আরাকানের নাম বদলে করেন রাখাইন। নে উইনের সময় থেকে মিয়ানমারে চর্চা হতে থাকে উগ্র ম্রানমা জাতীয়তাবাদ এবং সঙ্গে যুক্ত হয় মিয়ানমারের হীনযান বৌদ্ধ সন্ন্যাসীদের (ভিক্ষু) ধর্মীয় গোঁড়ামি। নে উইনের সময় থেকেই শুরু হয় আরাকানে বৌদ্ধদের মধ্যে মুসলিমবিদ্বেষ। এর আগে এই বিদ্বেষ ছিল না অথবা থাকলেও তা বর্তমান বিদ্বেষের তুলনায় ছিল খুবই নগণ্য। খ্রিষ্টীয় সপ্তদশ শতাব্দীর প্রথম ভাগে আরাকানের অন্যতম সভাকবি দৌলত কাজী তাঁর ‘সতী ময়না’ কাব্যে লিখেছেন-

কর্নফুলী নদী পূর্বে আছে একপুরী।
রোসাঙ্গ নগরী নাম স্বর্গ- অবতরী॥
তাহাতে মগধ বংশ ক্রমে বুদ্ধা চার।
নাম শ্রী সুধর্ম রাজা ধর্মে অবতার॥
প্রতাপে প্রভাত ভানু বিখ্যাত ভুবন।
পুত্রের সমান করে প্রজার পালন।

এখানে আমরা দেখতে পাচ্ছি, আরাকানের রাজা সুধর্মা হলেন ধর্মে বৌদ্ধ। কিন্তু সব প্রজাকে তিনি প্রতিপালন করছেন পুত্ররূপ বিবেচনা করে। কাউকে অবহেলা করছেন না মুসলমান হিসেবে। আরো বলা হচ্ছে, তিনি (সুধর্মা) হলেন, মগধ বংশের রাজা। তাকে বলা হচ্ছে না আরাকানি। মগধ বলতে বোঝায়, দক্ষিণ বিহারের একটা অংশকে। বাংলা ভাষায় মগের মুল্লুক বলে একটা কথা প্রচলিত আছে। মগের মুল্লুক বলতে বোঝায়, আইনকানুন-বিবর্জিত লুটপাটের রাজত্বকে। এই মগ বলতে ঠিক কাদের বোঝাত, এখন তা নিয়ে উঠেছে প্রশ্ন। এই মগরা আরাকান থেকেই আসত, কিন্তু সব আরাকানি যে মগ ছিল তা নয়। তা ছাড়া, এই মগদের সাথে যুক্ত হয়েছিল পর্তুগিজ জলদস্যুরা; যারা ছিল খুবই ভয়ঙ্কর প্রকৃতির।

বাংলাদেশের প্রথম জরিপ করে যিনি মানচিত্র আঁকেন সেই ব্রিটিশ জরিপকারক মেজর জেমস রেনল লিখেছেন, মগ জলদস্যুদের অত্যাচারে দক্ষিণবঙ্গের অনেক জায়গা জনশূন্য হয়ে যায়। আর এই জনশূন্য জায়গায় গড়ে ওঠে সুন্দরবন। সুন্দরবন আগে ছিল না। তিনি এসব কথা শুনেছেন বয়োবৃদ্ধ ব্যক্তিদের মুখে। এখন আরাকান থেকে পালিয়ে আসা রোহিঙ্গাদের মুখে আমরা যেসব কাহিনী শুনতে পাচ্ছি, তাতে মনে হচ্ছে সেই পুরনো মগের মুল্লুকেরই কথা।

আমি মনে করি, রোহিঙ্গা সমস্যাকে সমাধান না করে, ঝুলিয়ে রাখা উচিত হবে না। কারণ, এর ফলে রোহিঙ্গারা পড়বে আরো দুরবস্থার মধ্যে। অন্য দিকে, এর জন্য আমাদের এই অঞ্চল জড়িয়ে পড়তে পারে পূর্ব-পশ্চিমের ক্ষমতার কলহের মধ্যে। পূর্বের শক্তি বলতে আমি বুঝি রাশিয়া ও চীনকে। আর পশ্চিমের শক্তি বলতে বুঝাচ্ছি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, গ্রেট ব্রিটেন ও ফ্রান্সকে। চীন ও রাশিয়া এখন আর নিরপেক্ষ রাষ্ট্র নয়। তারা গ্রহণ করেছে মিয়ানমারের পক্ষ। আর এর ফলে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, গ্রেট ব্রিটেন ও ফ্রান্স নিতে পারে বাংলাদেশের পক্ষ। কিন্তু এ জন্য শুরু হতে পারে এই অঞ্চলে এমন এক সঙ্ঘাত, যাতে জীবন যাবে বহু মানুষের। যেমন যাচ্ছে বর্তমান সিরিয়ায়।

ব্রিটেনের লেবার পার্টি বলছে, রোহিঙ্গা সমস্যা সমাধান করতে হলে তাদের দিতে হবে মিয়ানমারের নাগরিকত্ব এবং ফেরত নিতে হবে আরাকানে। ব্রিটেনের লেবার পার্টির চিন্তার প্রভাব এক সময় অং সান সু চির ওপর যথেষ্ট ছিল। কিন্তু বর্তমানে তার ওপর সেই আগের প্রভাব আর আছে বলে মনে হয় না। যেহেতু চীন ও রাশিয়া গ্রহণ করেছেন মিয়ানমারের পক্ষ; তাই তিনি এখন বলতে পারছেন, রোহিঙ্গাদের আরাকানে যেতে হবে বাংলাদেশের নাগরিক হিসেবে। কিন্তু বাংলাদেশ এতে কোনোভাবেই সম্মত হতে পারে না। কেননা, মিয়ানমার যেকোনো সময় আবার তাদের বাংলাদেশের নাগরিক হিসেবে পারবে বাংলাদেশে ফেরত পাঠাতে। কাজে কাজেই সমস্যাটির কোনো সমাধান না হয়ে আপাতত কিছু দিনের জন্য স্থগিত হবে মাত্র।

আমরা শুনেছিলাম, বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক আদালতে মিয়ানমারের বিরুদ্ধে সমুদ্রসীমা নিয়ে মামলা করে জিতেছে। মিয়ানমার মেনে নিয়েছে, আন্তর্জাতিক আদালতের ঠিক করে দেয়া সমুদ্রসীমা। কিন্তু এখন আমরা দেখছি, মিয়ানমার সেনাবাহিনীর বঙ্গোপসাগরে বাংলাদেশের পানি সীমানার মধ্যে মৎস্য শিকারে নিয়োজিত বাংলাদেশী জেলেদের ওপর ছুড়ছে গুলি। অর্থাৎ সে মেনে নেয়নি আন্তর্জাতিক আদালতের রায়। যে কারণেই হোক, সে ভাবছে বাংলাদেশ এখন আর সেনাশক্তিতে তার সমকক্ষ নয়। তাই সে হয়ে উঠেছে যথেষ্ট বেপরোয়া। জাতিসঙ্ঘের মাধ্যমে রোহিঙ্গা সমস্যা সমাধান সম্ভব হবে না। কেননা, বিশ্বের আর সব রাষ্ট্র রোহিঙ্গাদের পক্ষ নিলেও চীন-রাশিয়া পক্ষ নেবে মিয়ানমারের। তারা ভেটো দিলে মিয়ানমারের প্রতিকূলে কোনো প্রস্তাব জাতিসঙ্ঘ গ্রহণ করতে পারবে না।

মিয়ানমারে যে বৌদ্ধ ধর্ম চলে এবং যা মিয়ানমারের রাষ্ট্রধর্ম হিসেবে স্বীকৃত তা হলো, হীনযান বৌদ্ধ ধর্ম। পৃথিবীর তিনটি রাষ্ট্রে হীনযান বৌদ্ধ ধর্ম বিরাজ করছে। এরা হলো মিয়ানমার, থাইল্যান্ড ও শ্রীলঙ্কা। চীনে মানুষ যে বৌদ্ধ ধর্ম অনুসরণ করে, তা পরিচিত হলো মহাযান বৌদ্ধ ধর্ম হিসেবে। তিব্বতে যে বৌদ্ধধর্ম চলে তাকে বলে লামা বৌদ্ধ ধর্ম। কিন্তু এর উদ্ভব হতে পেরেছে মহাযান বৌদ্ধ ধর্ম থেকে। তিব্বতের ধর্মগুরু দালাই লামাকে চীন সরকার অনেক আগেই তিব্বত দখল করে বহিষ্কার করেছে। দালাই লামা নিয়েছেন রোহিঙ্গাদের পক্ষ।

সম্প্রতি শ্রীলঙ্কার হীনযান বৌদ্ধরা সেখানে বসবাসরত মুসলিম নাগরিকদের ওপর হামলা করেছে। সম্ভবত, তারা চাচ্ছে তাদের দেশ থেকে মুসলিম বিতাড়ন। শ্রীলঙ্কায় যেসব মুসলমান থাকেন, তারা শ্রীলঙ্কার নাগরিক, কিন্তু তারা হলেন তামিলভাষী। ধর্মের সাথে এখানে যুক্ত হচ্ছে আরেকটি বিরোধ, তা হলো ভাষার। শ্রীলঙ্কার মুসলমানদের কী অবস্থা দাঁড়াবে আমরা তা জানি না। অন্য দিকে ভারতের তামিলভাষী তামিলনাড়ুর সঙ্গে বহুদিন ধরেই চলে আসছে শ্রীলঙ্কার বিরোধ। সেই বিরোধ আবার দেখা দেবে কি না বলা যায় না। হীনযান বৌদ্ধরা সংখ্যায় বেশি নন। তারা যদি ভেবে থাকেন, যুদ্ধ করে তারা অন্যদের ওপর জয়ই হবেন, তবে সেটা বাস্তবসম্মত হবে না। কিন্তু তবুও সেই পথ তারা গ্রহণ করতে পারেন। কেননা, তারা ভাবতে পারেন রাশিয়া ও চীন নেবে তাদের পক্ষ। চীন ইতোমধ্যে ভারতবিরোধী হওয়ার কারণে শ্রীলঙ্কার পক্ষ নিয়ে ফেলেছে। বাংলাদেশ, মালয়েশিয়া ও ইন্দোনেশিয়ায় যত মুসলমানের বাস। পৃথিবীর অন্য কোনো অঞ্চলে তা বাস করে না। এ তিনটি দেশকে নিয়ে যদি একত্রে একটি প্রতিরক্ষাব্যবস্থা গড়ে তোলার উদ্যোগ নেয়া হয়, তবে এ অঞ্চলে একটা শক্তির ভারসাম্য আসা সম্ভব। বাংলাদেশ এই উদ্যোগ নিলে ভালো হয়।

লেখক : প্রবীণ শিক্ষাবিদ ও কলামিস্ট

    Print       Email

You might also like...

194031afghan

রেশমি কোরআন শরীফ!

Read More →