Loading...
You are here:  Home  >  এক্সক্লুসিভ  >  Current Article

রোহিঙ্গা সমস্যায় আন্তর্জাতিক ভূমিকা

ibrahimসৈয়দ মুহাম্মদ ইবরাহিম, বীর প্রতীক: এখনকার অন্যতম আলোচিত বিষয় হচ্ছে রোহিঙ্গা সমস্যা। রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠী যে বিরাট সমস্যার মধ্য দিয়ে দিন পার করছে, সেটা সম্বন্ধে আমরা সবাই কম-বেশি অবহিত। এই সমস্যাটির অনেকগুলো আঙ্গিক আছে। সবগুলো আঙ্গিক নিয়ে এই স্বল্পপরিসরের কলামে আলোচনা করা সম্ভব নয়। তারপরও আঙ্গিকগুলো বা সংশ্লিষ্ট প্রশ্নগুলো উল্লেখ করে রাখছি। প্রথম প্রশ্ন হলো, মিয়ানমার সরকার এ কাজটি কেন করছে? সম্পূরক প্রশ্ন হলো কাজটি কী? এর উত্তর হলো, কাজটি ইংরেজি পরিভাষায় এথনিক ক্লিনজিং তথা একটি জাতিগোষ্ঠী বা একটি সম্প্রদায়কে নিশ্চিহ্ন করে ফেলা। অনেকের মতে, এটি গণহত্যার পর্যায়েও পড়ে। দ্বিতীয় প্রশ্নটি হলো এই সমস্যার সাথে বাংলাদেশ সরকারের সম্পৃক্ততা কী বা আমরা বাংলাদেশীরা কেনই বা এই সমস্যা নিয়ে উদ্বিগ্ন হবো? তৃতীয় প্রশ্ন হলো, দক্ষিণ এশিয়া এবং দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া রাষ্ট্রগুলোর সংশ্লিষ্টতা কতটুকু আছে বা কতটুকু থাকা উচিত এই সমস্যা নিরসনে? চতুর্থ প্রশ্ন, আন্তর্জাতিক বিশ্ব বিশেষত পাশ্চাত্য এবং বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় মানবাধিকার সংস্থাগুলো এই সমস্যা প্রসঙ্গে কী ভূমিকা রাখছে বা রাখছে না। এখানে দু-একটি আঙ্গিক আলোচনা করছি।
বর্তমান রাখাইন প্রদেশের সাবেক নাম আরাকান। এবং বর্তমান রাজধানী শহর সিতওয়ের আগে নাম ছিল আকিয়াব। ১৯৬২ সাল থেকে বার্মার সরকার পরিকল্পিতভাবে বর্তমান রাখাইন প্রদেশের দিকে তাদের আগ্রাসী ধ্বংসাত্মক দৃষ্টি দিতে থাকে। বার্মা তথা বর্তমান মিয়ানমারে কোনোকালেই জাতিগোষ্ঠীগুলোর মধ্যে সম্প্রীতি পূর্ণভাবে বজায় ছিল না। বর্তমানের মিয়ানমারে শতাধিক নৃগোষ্ঠী বসবাস করে, যথা শা-ন কারেন, শিন, বর্মি, কাচিন, নাগা ইত্যাদি। এসব নৃগোষ্ঠীকে একটি জাতিরাষ্ট্রের অন্তর্ভুক্ত করে জাতীয় একাত্মতা গড়ে তোলা কঠিন কাজ এবং বার্মার কেন্দ্রীয় সরকার এ কাজটি কোনো দিনই সুন্দরভাবে সম্পন্ন করতে পারেনি। ফলে ইনসার্জেন্সি ও অবশ্যম্ভাবী কাউন্টার ইনসার্জেন্সি বার্মার বিভিন্ন অঞ্চলে সর্বদাই বিদ্যমান ছিল এবং এখনো বহু জায়গায় আছে। তবে একটি গুরুত্বপূর্ণ তথ্য হলো, সব নৃগোষ্ঠীর মধ্যে একটি মাত্র গোষ্ঠী ধর্মীয় পরিচয়ে মুসলমান। বাকিরা হয় বৌদ্ধ অথবা খ্রিষ্ট ধর্মাবলম্বী অথবা প্রকৃতিপূজারী। ফলে বার্মার কেন্দ্রীয় সরকার চার-পাঁচ দশক ধরেই আরাকান বা রাখাইন প্রদেশের মুসলমান রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর প্রতি আগ্রাসী দৃষ্টিভঙ্গি ও কর্মকাণ্ড অব্যাহত রেখেছে। কেন্দ্রীয় সরকারের প্রতিনিধিরা বিভিন্ন সময়ে এসব জনগোষ্ঠীর সাথে তথা ইনসার্জেন্ট গোষ্ঠীগুলোর সাথে শান্তি বা সমঝোতার আলোচনা চালিয়েছে। কিন্তু কোনো দিনই তারা রোহিঙ্গাদের প্রতিনিধিদের সাথে আলোচনা করেননি। সর্বশেষ মিয়ানমারের সেনাশাসকেরা এই আলোচনা সম্পন্ন করেছেন। ১৫টি বিদ্রোহী গোষ্ঠীর সাথে আলোচনা চালানোর পর সাতটি গোষ্ঠীর সাথে সমঝোতা চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছিল ২০১৫ সালের অক্টোবরে। অতঃপর মিয়ানমারে ক্ষমতার পালাবদল ঘটে। সূ চির সরকার ক্ষমতায় আসে। বিগত আগস্টে ১৮টি বিদ্রোহী সংগঠনের প্রতিনিধিরা আমন্ত্রিত হয়ে একটি শান্তি সম্মেলনে অংশগ্রহণ করেছিলেন। কিন্তু অগ্রগতি তথৈবচ। এখানেও রোহিঙ্গাদের কোনো প্রতিনিধিকে স্থান দেয়া হয়নি। রোহিঙ্গা সমস্যার পেছনে অনেক কারণ থাকতে পারে। কিন্তু প্রধানতম কারণ, মিয়ানমারের সরকারগুলোর পক্ষ থেকে রোহিঙ্গাদের প্রতি ধারাবাহিক ও ক্রমাগত ক্রমবর্ধমান আগ্রাসী, ধ্বংসাত্মক ও সাম্প্রদায়িক দৃষ্টিভঙ্গি ও কর্মকাণ্ড। মিয়ানমার সরকার এবং সামরিক বাহিনী দৃঢ়ভাবে সঙ্কল্পবদ্ধ আরাকান তথা রাখাইন প্রদেশকে রোহিঙ্গামুক্ত করতে।
আনুষ্ঠানিকভাবে মিয়ানমার সরকার স্বীকার করে না যে, তারা রোহিঙ্গাদের ওপরে বর্বরোচিত নৃশংস অত্যাচার চালাচ্ছে। অত্যাচারের অংশ হচ্ছে হত্যাকাণ্ড, গ্রামগুলোতে আগুন লাগানো, মহিলাদের ধর্ষণ ও নিপীড়ন, জমির ফসল ধ্বংস, উপাসনালয়গুলো ধ্বংস এবং বহির্বিশ্বের সাথে যোগাযোগের মাধ্যমগুলো নিষ্ক্রিয় করা। মিয়ানমার সরকার সচেতনভাবেই চাচ্ছে, রোহিঙ্গারা যেন মিয়ানমারের ভূমি ছেড়ে অন্য দেশে চলে যায়। রোহিঙ্গাদের আবাসভূমি আরাকান তথা রাখাইন প্রদেশ বঙ্গোপসাগরের তীরবর্তী একটি প্রদেশ। অতএব রোহিঙ্গাদের যেকোনো দেশে যেতে হলে হয় বঙ্গোপসাগর পাড়ি দিতে হবে অথবা বাংলাদেশের সাথে সীমান্ত সৃষ্টিকারী নাফ নদী পাড়ি দিতে হবে অথবা আরাকানের উত্তর অংশের আরো গভীর অরণ্য ও আরো সুউচ্চ পর্বতমালা পার হয়ে অন্য দেশে চলে যেতে হবে। যে উপায় রোহিঙ্গারা অবলম্বন করুক না কেন, প্রতিটি রাস্তাই বিপদসঙ্কুল। বিপন্ন রোহিঙ্গারা তাদের আবাসভূমির মাটি ছেড়ে নৌযানে চড়ার পর তাদের স্বাগত জানানোর জন্য কেউই অপেক্ষারত নেই। মধ্যপ্রাচ্যে, সিরিয়ার উপকূল বা তুরস্কের উপকূল থেকে শরণার্থীরা ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিয়ে যেমন অজানার উদ্দেশ্যে পাড়ি দেয়, তেমনি রোহিঙ্গারাও আরাকানের উপকূল থেকে অজানার উদ্দেশ্যে পাড়ি দিয়েছে। কেউ নাফ নদীর পশ্চিম পাড়ে বাংলাদেশের দিকে আসতে চায়, কেউ সমুদ্র পাড়ি দিয়ে দূরে থাইল্যান্ডে যেতে চায় বা আরো শত মাইল বেশি পাড়ি দিয়ে মালয়েশিয়া যেতে চায়। কিন্তু রোহিঙ্গাদের গ্রহণ করার জন্য কেউই খুশি মনে দাঁড়িয়ে নেই। এটিই ইতিহাসের পরিহাস।
বাংলাদেশের নিকটতম প্রতিবেশী দেশ দু’টি। একটি হচ্ছে ভারত, অপরটি মিয়ানমার। বাংলাদেশের স্থলসীমান্তের ৯৪ শতাংশ ভারতের সাথে এবং শুধু ৬ শতাংশ মিয়ানমারের সাথে। বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিমে তথা সাতক্ষীরা জেলার সাথে ভারতের সীমান্ত যেমন নদীর মধ্যস্রোত দিয়ে, তেমনি বাংলাদেশের সর্ব দক্ষিণ-পূর্বে মিয়ানমারের সাথে সীমান্তটিও নদীর মধ্যস্রোত দিয়ে। মিয়ানমার ও বাংলাদেশের মাঝখানের নদীটির নাম নাফ নদী। যখন গণ্ডগোল বা সঙ্কট থাকে না, তখন বাংলাদেশের টেকনাফ নৌবন্দরের সাথে অপর পাড়ে মিয়ানমারের নৌবন্দরের বাণিজ্যিক যোগাযোগ থাকে। মানবপাচার তো বটেই, মাদকদ্রব্য পাচারেরও অন্যতম ‘লাভজনক’ রাস্তা হলো এই নাফ নদীর এপার-ওপার।
অত্যন্ত উল্লেখযোগ্য একটি কথা হলো, রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর চেহারার সাথে চট্টগ্রাম ও কক্সবাজার জেলার মানুষের চেহারার বেশখানিকটা মিল আছে; কক্সবাজার জেলার মানুষের ভাষার সাথে রোহিঙ্গাদের মৌখিক ভাষারও বেশ কিছুটা মিল আছে। রোহিঙ্গারা যে নিয়মে কাপড়চোপড় পরে, পঞ্চাশ-ষাট বছর আগে এবং তার আগেকার আমলে চট্টগ্রাম ও কক্সবাজারের গ্রামের পুরুষ ও মহিলারা অনেকটা ওই ভাবেই কাপড়চোপড় পরত। এই মিলগুলোকে মিয়ানমারের সরকার পুঁজি করে অপপ্রচার চালায় যে, রোহিঙ্গারা আদতে বাংলাদেশের বা তার আগে পূর্ব পাকিস্তানের মানুষ। অপবাদটি জঘন্য। মিয়ানমার আরাকান বা রাখাইন প্রদেশের ভূখণ্ডের ওপর একচ্ছত্র অধিকার প্রতিষ্ঠা করার জন্য এই অপপ্রচারের আশ্রয় নিয়েছে।
যদি রাখাইন প্রদেশে রোহিঙ্গারা বসবাস করতে পারে, তাহলে মিয়ানমার সরকারের মতে মিয়ানমারের রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা বিঘিœত হয় অথবা এর আশঙ্কা থাকে। অপরপক্ষে আমি মনে করি, মিয়ানমারে যদি শুধু বার্মিজ রাখাইনরা থাকে তাহলে বাংলাদেশের জন্য তা নিরাপত্তার হুমকি। কারণ, মিয়ানমার সরকার রাখাইন প্রদেশকে সামরিকীকরণ করবে, নিজে অথবা অন্যকে দিকে নৌবাহিনীর ঘাঁটি গড়ে তুলবে এবং এগুলো বাংলাদেশের জন্য হুমকি হওয়ার আশঙ্কা অনেক। সম্পূর্ণ মিয়ানমারীয় দখলের রাখাইন প্রদেশের মাটি থেকে বাংলাদেশের দক্ষিণ-পূর্বপ্রান্তের বান্দরবান জেলার জন্য সমস্যা সৃষ্টি করা হতে পারে। রোহিঙ্গাদের যদি রাখাইন প্রদেশের মাটি থেকে ব্যাপকভাবে উচ্ছেদ করা হয়, তাহলে রোহিঙ্গারা যে দেশেই আশ্রয়ের জন্য যাক না কেন, তাদের মধ্যে প্রতিশোধস্পৃহা জাগ্রত হবে। ফলে প্রতিশোধমূলক কর্মকাণ্ড সৃষ্টি হবে। অশান্তিপূর্ণ বা সশস্ত্র ও বিদ্রোহমূলক হতেই পারে। এরূপ অশান্তিপূর্ণ বা বিদ্রোহমূলক কর্মকাণ্ডগুলোর উত্তাপ বাংলাদেশের সর্ব দক্ষিণ-পূর্বের জেলা বান্দরবানের ওপর প্রভাব ফেলতে পারে। বিদ্রোহীমূলক কর্মকাণ্ডে লিপ্ত রোহিঙ্গারা দূরবর্তী মালয়েশিয়া অথবা থাইল্যান্ডের মাটি ব্যবহার না করে নিকটবর্তী দেশের মাটি ব্যবহার করতে চাইতে পারে।
রোহিঙ্গা সমস্যায় মানবিক দিকটি কোনো অবস্থাতেই অবহেলাযোগ্য নয়। কিন্তু এটিকেই অবহেলা করেছে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়, দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলো ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলো। বাংলাদেশ রোহিঙ্গা উদ্বাস্তু সমস্যার সাথে পরিচিত চল্লিশ বছরের অধিক কাল ধরে। ১৯৭৮ সালে প্রথমবারের মতো রোহিঙ্গা উদ্বাস্তুরা বাংলাদেশের মাটিতে এসেছিল। সেই সময় মিয়ানমার এবং বাংলাদেশের সীমান্তবর্তী কর্তৃপক্ষের মধ্যে অনুষ্ঠিত আলোচনার মাধ্যমে সমঝোতায় উপনীত হয়ে রোহিঙ্গা শরণার্থীদের নিজেদের দেশে ফেরত পাঠানো হয়। কিন্তু পরে আরো তিনবার (বর্তমানটিসহ) যখন উদ্বাস্তু সমস্যা সৃষ্টি হয়, তখন তাৎক্ষণিকভাবে তাদের ফেরত পাঠানো সম্ভব হয়নি। রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর মানুষ হিসেবে বেঁচে থাকার মৌলিক অধিকার লঙ্ঘিত হচ্ছে। লঙ্ঘনকারী দেশ হচ্ছে মিয়ানমার। এ বিষয়টি জোরালোভাবে আন্তর্জাতিক কমিউনিটির কাছে উপস্থাপন করতেই হবে। জাতিসঙ্ঘের সাবেক মহাসচিব কফি আনানের নেতৃত্বে একটি কমিশন করা হয়েছে। এই কমিশনের প্রাথমিক মতামতই আন্তর্জাতিক কমিউনিটিকে আশ্বস্ত করার জন্য যথেষ্ট যে, রাখাইন প্রদেশে ভয়াবহ মানবিক বিপর্যয় ঘটে গেছে। বিবিসি, রয়টার্স, এএফপি ইত্যাদি সংবাদমাধ্যম যতটুকু সম্ভব তুলে ধরেছে। কিন্তু পৃথিবীর শক্তিধর দেশগুলোর নেতারা এটিকে গুরুত্ব দিচ্ছেন না।
বাংলাদেশ নিজেই জনবহুল দেশ। এর দক্ষিণ-পূর্বাংশে অবস্থিত কক্সবাজার জেলা সদর হচ্ছে একটি পর্যটন শহর। এই শহরকে কেন্দ্র করে অনেক উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের চিন্তা বা বাস্তবায়ন করা হচ্ছে বা ভবিষ্যতে হবে। কিন্তু কক্সবাজার জেলার জনসংখ্যায় যদি ভারসাম্য নষ্ট হয়, সেটা শুধু কক্সবাজারের অর্থনীতি নয়, সমগ্র বাংলাদেশের অর্থনীতিতে ও সামাজিক শৃঙ্খলায় প্রভাব ফেলবে। কথা বাস্তব। তবে একইভাবে বাস্তব হলো এই যে, রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীকে বাঁচার জন্য আশ্রয় দিতে বাংলাদেশ নিজ বিবেকের কাছে দায়বদ্ধ। অতএব, বাংলাদেশকে এগিয়ে আসতে হবে রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দেয়ার জন্য এবং যুগপৎ বাংলাদেশকে কূটনৈতিক পরিশ্রম করতে হবে যেন আরো দেশ ও সংস্থাকে সংশ্লিষ্ট করা যায় এই সমস্যা সমাধানে। বাংলাদেশকে কূটনৈতিকভাবে সোচ্চার অবস্থান নিতে হবে। আরো একটি কথা, বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের মধ্যে সীমান্ত এলাকায় এবং বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের মধ্যকার আন্তর্জাতিক জলরাশিতে বাংলাদেশের সামরিক অবস্থান শক্তিশালী করতে হবে। প্রবাদবাক্য আছে, শক্তের ভক্ত নরমের যম। আমাদেরকে সামরিকভাবে, কূটনৈতিকভাবে ও আন্তর্জাতিক সম্পর্কের অঙ্গনে শক্ত অবস্থান নিতে হবে যেন মিয়ানমার মানবতামূলক দৃষ্টিভঙ্গিকে আমাদের দুর্বলতা মনে না করে। গত চার-পাঁচ দিনে মালয়েশিয়া সরকারের দৃষ্টিভঙ্গি ফুটে উঠেছে। আজো অর্থাৎ ১৯ ডিসেম্বর মিয়ানমারে রোহিঙ্গা মুসলমানদের দুর্দশাকে আঞ্চলিক উদ্বেগের বিষয় হিসেবে উল্লেখ করে তা অবসানে পদক্ষেপ নিতে দক্ষিণ-পূর্ব এশীয় দেশগুলোর জোট আসিয়ানের নেতাদের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে মালয়েশিয়া। আসিয়ানকে রোহিঙ্গাদের মানবিক ত্রাণসহায়তা দেয়ার কাজে সমন্বয় এবং তাদের ওপর পরিচালিত নিপীড়নের ঘটনা তদন্তও করতে বলেছে দেশটি। সোমবার মিয়ানমারের ইয়াঙ্গুন শহরে আসিয়ান দেশগুলোর পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের বৈঠকে মালয়েশিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী আনিফাহ আমান এ আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি বলেছেন, মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে রোহিঙ্গাদের মানবাধিকারের অগ্রগতি হচ্ছে ধীরগতিতে। মিয়ানমার সেনারা রোহিঙ্গাদের গণগ্রেফতার, বিচারবহির্ভূত হত্যা ও ধর্ষণ অব্যাহত রেখেছে। তিনি বলেন, রাখাইনের পরিস্থিতি আঞ্চলিক উদ্বেগের বিষয়ে পরিণত হয়েছে। কাজেই এর সমাধানও সবাইকে একসাথে মিলেই করতে হবে। মালয়েশিয়া সরকারের পক্ষ থেকে আন্তর্জাতিক কমিউনিটির কাছে দেয়া অন্যতম যুক্তি এবং মিয়ানমার সরকারের প্রতি উচ্চারিত হুঁশিয়ারির অন্যতম যুক্তি হলো, যখন একটি দেশের অভ্যন্তরে সংঘটিত কর্মকাণ্ড প্রতিবেশী দেশগুলোর ক্ষতির কারণ হয় বা প্রতিবেশী দেশগুলোর জন্য বিড়ম্বনার সৃষ্টি করে, তখন ওই দেশের কর্মটিকে অভ্যন্তরীণ ব্যাপার বলে উপেক্ষা অথবা মার্জনা করার সুযোগ থাকে না। মালয়েশিয়া স্পষ্ট করেই বলেছে, বর্তমান মিয়ানমার সরকার ইচ্ছাকৃতভাবেই মুসলমানবিদ্বেষী দৃষ্টিভঙ্গির কারণে রোহিঙ্গাদের ওপর অত্যাচার, নিপীড়ন ও ধ্বংসযজ্ঞ চালাচ্ছে। অতএব, মালয়েশিয়া এ বিষয়টিকে মিয়ানমারের অভ্যন্তরীণ বিষয় হিসেবে মেনে নিতে অপারগ। মিয়ানমারে রোহিঙ্গানিপীড়নের নিন্দা করে জরুরি বৈঠকের আহ্বান জানিয়েছে ইসলামি সহযোগিতা সংস্থা (ওআইসি)। তবে এর তারিখ বা সময়সূচি জানানো হয়নি। সংস্থাটির মহাসচিব ড. ইউসুফ এ আল ওয়াতাইমিন নিউ ইয়র্ক, জেনেভা ও ব্রাসেলসের স্থায়ী কার্যালয়ে ওআইসি সদস্য দেশগুলোর প্রতিনিধিদের নিয়ে জরুরি বৈঠকের নির্দেশ দিয়েছেন। নিউ ইয়র্ক, জেনেভা ও ব্রাসেলসে ওআইসির স্থায়ী প্রতিনিধি ও রাষ্ট্রদূত পর্যায়ের বৈঠকের পর পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের কাক্সিক্ষত বৈঠকটি হতে পারে। তবে এই প্রথমবারের মতো রোহিঙ্গা ইস্যু নিয়ে বৈঠক আহ্বান করল ৫৭টি মুসলিম দেশের সংস্থা ওআইসি। মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস ওয়াচের (এইচআরডব্লিউ) এশিয়া বিভাগের পরিচালক ব্র্যাড অ্যাডামস বলেন, এক মাসে তিন শতাধিক বাড়িঘর স্থানীয় বাসিন্দারা পুড়িয়ে দিয়েছে আর সেনাসদস্যরা তা দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখছে, যেটা বিশ্বাস করা কঠিন। তিনি বলেন, কৃত্রিম উপগ্রহের ছবিতে মিয়ানমারের সরকারি কর্মকর্তারা ধরা পড়ে গেছেন। যারা হামলার বিষয়টি অস্বীকার করে আসছিলেন, এখন তাদের তা স্বীকার করা উচিত। আমি মনে করি, আন্তর্জাতিক কমিউনিটি পদক্ষেপ নিতে দেরি করেছে। তবে দেরিতে হলেও শুরু করেছে। আমি প্রস্তাব করছি, বাংলাদেশকেও এরূপ সুস্পষ্ট ও কঠোর অবস্থান নিতে হবে।
নিজে যেহেতু জন্মসূত্রে চট্টগ্রাম জেলার লোক, সেহেতু রোহিঙ্গা সমস্যা প্রসঙ্গে আমার স্পর্শকাতরতা থাকা স্বাভাবিক। ২০০১ ও ২০০২ সালে চার-চারবার মিয়ানমারের তৎকালীন রাজধানী রেঙ্গুন সফর করেছি এবং রেঙ্গুন শহরের বিভিন্ন স্তরের মানুষের সাথে অনানুষ্ঠানিকভাবে আলাপ করেছি। আমার কাছে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ছিল, কেন বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের মধ্যকার সম্পর্ক উষ্ণ হবে না? আমার মা এখনো জীবিত। তার আপন দাদা হাফেজ মাওলানা আনোয়ার আলী রহ: প্রসিদ্ধ বুজুর্গ ছিলেন এবং তিনি তার জীবন ব্যয় করেছেন মিয়ানমারে ইসলাম ধর্মপ্রচারে ও মানুষের খেদমতে। তার মাজার রেঙ্গুন শহরের অদূরেই অবস্থিত। মিডিয়ার মাধ্যমে বাংলাদেশের মানুষের কাছে সুপরিচিত নাম এ রকম আরো অনেক। মূলত চট্টগ্রামের অনেকেই আছেন, যাদের সাথে মিয়ানমার বা আরাকান প্রদেশের সাথে সামাজিক যোগাযোগ ছিল বা এখনো আছে। ২০০২ সালে আমি উদ্যোগ নিয়েছিলাম এবং প্রতিষ্ঠা করেছিলাম বাংলাদেশ-মিয়ানমার ফ্রেন্ডশিপ সোসাইটি। উদ্বোধন অনুষ্ঠানে ঢাকায় অবস্থিত মিয়ানমার দূতাবাসের সব কর্মকর্তা ও কর্মচারী এবং ঢাকা মহানগরে অবস্থানরত মিয়ানমারের নাগরিকদের মধ্য থেকে ২০ জনের মতো উপস্থিত ছিলেন। বর্তমানেও বাংলাদেশ মিয়ানমার চেম্বার অব কমার্স আছে। বাংলাদেশের নাগরিকেরা এবং সরকারগুলো সব সময়ই চেয়েছে মিয়ানমারের সাথে সুসম্পর্ক রাখতে ও সম্পর্ক উন্নত করতে। মিয়ানমারে অনেক খনিজসম্পদ আছে, বিশাল বনজসম্পদ আছে এবং মিয়ানমারের জলরাশিতে মৎস্যসম্পদও আছে। মিয়ানমারের মাটির নিচের গ্যাস ভারত ব্যবহার করছে, আমরাও করতে পারি। এসব কথার মধ্য দিয়ে বোঝাতে চাচ্ছি, মিয়ানমারের সাথে আমাদের সম্পর্ককে অত্যন্ত সুকৌশলে পরিচর্যা করতে হবে। এক দিকে মানবতার ডাক, এক দিকে বিবেকের ডাক; অপর দিকে অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক বাধ্যবাধকতা বা ভবিষ্যতের সম্ভাবনা। এসব কিছু মাথায় রেখে রোহিঙ্গা সমস্যা সমাধানের চেষ্টা করতে হবে। বাংলাদেশের গণমাধ্যম মোটামুটি ইতিবাচক ভূমিকা পালন করেছে। এটি বাংলাদেশ সরকারের জন্য একটি সম্পূরক শক্তি।
-লেখক : চেয়ারম্যান, বাংলাদেশ কল্যাণ পার্টি

    Print       Email

You might also like...

6afed405318d4219e5ce1f58be1a4401-5a1580a4a4885

২৭ নভেম্বর লন্ডনে কারি শিল্পের ‘অস্কার’

Read More →