Loading...
You are here:  Home  >  প্রবন্ধ-নিবন্ধ  >  Current Article

সহবতে উলামা : মাওলানা মুহাম্মদ তাহির আলী তহিপুরী (র.)

সৈয়দ মবনু : সিলেট শহর থেকে গোলাপগঞ্জ হয়ে রানাপিং যাওয়ার পথে তহিপুর একটি গ্রাম। আমার বাবার সাথে রানাপিং মাদরাসার প্রতিষ্ঠাতা আল্লামা রিয়াছত আলী চৌঘরি (র.)-এর খুব আন্তরিক সম্পর্ক ছিলো। আল্লামা চৌঘরি ছিলেন আল্লামা আনোয়ার শাহ কাশ্মিরী (র.)-এর হাদিসের ছাত্র। তিনি খুব তীক্ষ্ন বুদ্ধিসম্পন্ন লোক ছিলেন। আমাদের ছোটবেলা তিনি খুব বৃদ্ধ, তবে টনটনা সচেতন। আমি মাঝেমধ্যে তাঁর সহবত পাওয়ার জন্য বাবাকে লুকিয়ে রানাপিং চলে যেতাম। হুজুরও আমাকে খুব স্নেহ করতেন। রানাপিং গেলে মাদরাসায় দেখা হতো মাওলানা মুহাম্মদ তাহির আলী তহিপুরী (র.)-এর সাথে। মাঝেমধ্যে তাঁর বাড়িতে যাওয়া হতো। হযরতের বড় ছেলে মাওলানা লোকমানকে আমি জানতাম আজাদ দ্বীনি এদারায়ে তালিম বাংলাদেশের পঞ্চাশসালা দস্তারবন্দি সম্মেলনের সময় থেকে। তখন তিনি মাঝেমধ্যে সম্মেলন উদযাপন কমিটির অফিসে আসতেন, থাকতেন, কাজে সহযোগিতা করতেন। মাওলানা লোকমানও আমাকে খুব স্নেহ করতেন। আমার বাবা এক সময় রানাপিং মাদরাসার মজলিসে শুরার সদস্য ছিলেন। খেলাফত-জমিয়ত সংঘাত শুরু হলে বিভিন্ন সময় রানাপিং মাদরাসা নিয়েও কর্তৃত্বের সংঘাত হতো। শায়খে চৌঘরি ছিলেন খেলাফত আন্দোলনে হযরত হাফেজ্জী হুজুর (র.)-এর পক্ষে। অনেকে চেষ্টা করেন চৌঘরিকে রানাপিং থেকে সরিয়ে মাদরাসার কর্তৃত্ব নিতে। দীর্ঘ লড়াই চলে। মামলা মুকদ্দমা হয়। এই সময় মাওলানা মুহাম্মদ তাহির আলী তহিপুরী (র.) ছিলেন আল্লামা রিয়াছত আলী চৌঘরি (র.)-এর পক্ষে। আল্লামা তহিপুরী (র.) ছিলেন আল্লামা চৌঘরি (র.)-এর ছাত্র। অন্যদিকে আল্লামা তহিপুরী (র.)-এর মুর্শিদ শায়খে কৌড়িয়া (র.) ছিলেন আল্লামা চৌঘরি (র.)-এর বিরুদ্ধে। আমার বাবা আলহাজ¦ সৈয়দ আতাউর রহমানও তখন ছিলেন চৗঘরি হুজুর-এর পক্ষে। বাবার সূত্রে তখন আল্লামা তহিপুরী (র.)-এর সাথে আমার আন্তরিক সম্পর্ক ছিলো। মাঝেমধ্যে মোলাকাতের জন্য তাঁর বাড়িতে গেলে তিনি অনেক স্নেহ করতেন। বিশেষ করে তাঁর ছেলে মাওলানা লোকমান আমাকে অনেক ভালোবাসেন। আমার স্ত্রীর আপন তালতো বোনের বিয়ে হয়েছে আল্লামা তহিপুরী (র.)-এর বড়ছেলের সাথে। এই সূত্রে তিনি আমার আত্মীয়ও।

আমি হযরত তহিপুরী (র.)-কে দেখেছি রানাপিং মাদরাসায়, দেখেছি তাঁর নিজ বাড়িতে। তাঁর সম্পর্কে আমার যতটুক জানা হয়েছে, তিনি সবসময় সুন্নাতের পাবন্দ ছিলেন। বেশিরভাগ সময় অজু অবস্থায় থাকতেন। আমাদের নিজের দেখা, বড়দের প্রতি তাঁর শ্রদ্ধা ছিলো খুব। তাঁর উস্তাদ শায়খে চৌঘরি কিংবা তাঁর মুর্শিদ শায়খে কৌড়িয়াকে তিনি খুব মান্য করতেন। ছোটদের প্রতি ছিলো তাঁর অতি স্নেহ, আমি খুব ছোট ছিলাম, তবু তিনি আমাকে খুব গুরুত্ব দিয়ে আদবের সাথে এমনভাবে কথা বলতেন, যেন প্রেম মুক্তার মতো ঝরছে। তাঁর ছাত্ররা বলেছেন, তিনি ছাত্রদেরকে অত্যন্ত ভালোবাসতেন। আত্মীয় স্বজনদের সাথেও তাঁর গভীর সুসম্পর্ক ছিল। দানের ক্ষেত্রে তিনি উদার ছিলেন। ছোট-বড়, আপন-পর, মুসলিম-অমুসলিম সবাইকে দান করতেন। তিনি কোনদিন গিবত করতেন না। কেউ গিবত করলে তাঁকে গিবতের কুফল বলে দিতেন। তাহাজ্জুদ, ইস্রাক, আওয়াবিন ও তিলাওয়াত ইত্যাদি তাঁর আমালে নিয়মিত ছিলো বলে অনেকে উল্লেখ করেছেন। তিনি ধর্ম-বর্ণ-জাত নির্বিশেষে মানুষকে খুব মূল্যয়ন করতেন। আমার নিজের অভিজ্ঞতা থেকে দেখেছি, হযরত তহিপুরী (র.) সর্বদা মেহমানদের শান অনুযায়ি মহমানদারী করতেন। তিনি ছোট-বড় সবার মতামতকে গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করতেন।

মাওলানা মুহাম্মদ তাহির আলী তহিপুরী (র.)-এর জন্ম ৩ জানুয়ারী ১৯১৬ খ্রিস্টাব্দ। স্থানীয় মক্তবে প্রাথমিক শিক্ষা শুরু করেন। পাঁচ বছর বয়সে ঢাকা উত্তর পরগনার জায়গীরদার পাড়ার মায়না প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ৩য় শ্রেণীতে ভর্তি হয়ে পঞ্চম শ্রেণী পযর্ন্ত পড়ালেখা করেন। পঞ্চম শ্রেণী পাশের পর যখন মাধ্যমিকে ভর্তি হলেন তখন ঢাকা উত্তর রানাপিং আরাবিয়া হুছাইনিয়া মাদ্রাসার জনৈক ছাত্রের মাধ্যমে তাঁর মেধার সংবাদ পেয়ে মাদ্রাসার প্রতিষ্ঠাতা আল্লামা রিয়াছত আলী চৌঘরী হুজুর (র.) তহিপুরীর বাবার কাছে গিয়ে বলেন, তোমার ছেলে আমাকে দিয়ে দাও। তাঁর বাবাও দিয়েদিলেন। এই শুরু মাদরাসায় পড়া। মাদরাসায় ভর্তি হওয়ার পর মুহাম্মদ তাহির আলী তহিপুরী (র.) প্রথম বছর ছরফ ও নাহু এবং দি¦তীয় বছর হেদায়তুন্নাহু ও কাফিয়া অর্থাৎ প্রতি বছরে দুজামা’ত করে দুই বছরে চার জামায়াত পাস করে মাত্র এগারো বছর বয়সে আল্লামা রিয়াছত আলী চৌঘরী হুজুরের সহযোগিতায় উচ্চশিক্ষার জন্য দারুল উলুম দেওবন্দে চলে যান। দারুল উলুম দেওবন্দে তিনি ছয় বছর লেখাপড়া করে তাকমিল ফিল হাদিস জামায়াতে কৃতিত্বের সাথে উত্তীর্ণ হন। তখন তাঁর বয়স ছিলো ষোল। দারুল উলূম দেওবন্দে তাঁর শিক্ষকদের মধ্যে ছিলেন বৃটিশী বিরোধী ভারতবর্ষের স্বাধীনতা আন্দোলনের নেতা শায়খুল ইসলাম আল্লামা সৈয়দ হোসাইন আহমদ মাদানি (র.), শায়খুল আদব আল্লামা এ’যাজ আলী (র.), দারুল উলুম দেওবন্দ-এর সাবেক মুহতামিম আল্লামা আছগর হুছাইন (র.), আল্লামা ইবরাহিম বলইয়াবী (র.), আল্লামা মোহাম্মদ মিয়া (র.)। তাঁর সহপাঠিদের মধ্যে ছিলেন কুতবে জামান আল্লামা লুৎফুর রহমান শায়খে বর্ণভী (র.), আল্লামা বদরুল আলম শায়খে রেঙ্গা (র.), ফুলবাড়ির আল্লামা বশিরুদ্দিন (র.) প্রমূখ।

হযরত তহিপুরী (র.) ছাত্র জীবন শেষে তায্কিয়ায়ে নাফ্স বা আত্মশুদ্ধির জন্য নিজ শিক্ষক হযরত মাওলানা সৈয়দ হোসাইন আহমদ মাদানী (র.)-এর নিকট বায়াত গ্রহণ করেন। এরপর তিনি উস্তাদ ও মুর্শিদের পরামর্শে নিজ দেশে ফিরে আসেন। হযরত মাদানী (র.)-এর কাছে বায়াত নিলেও তিনি খিলাফতি লাভ করেন মাওলানা মাদানি (র.)-এর খালিফা হাফিজ মাওলানা আব্দুল করিম শায়খে কৌড়িয়া (র.)-এর কাছ থেকে।

দেশে ফিরে তিনি তাঁর শিক্ষক শায়খে চৌঘরী (র.)-এর নির্দেশে ১৩৫৯ হিজরীতে ঢাকা উত্তর রানাপিং আরাবিয়া হুসাইনিয়া মাদরাসায় সহকারী শিক্ষক হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেন। অতপর একাধারে ৬১ বছর এই মাদরাসায় কর্মজীবনের এক বিরাট অধ্যায় ব্যয় করেন।

এই ৬১ বছরের মধ্যে সহকারি শিক্ষকতায় দু বছর, অতঃপর শিক্ষাসচিবের দায়িত্ব নিতে হয়। তখন তাঁর বয়স ১৮বছর। অসাধারণ কৃতিত্বের সাথে তিনি এ দায়িত্ব আদায় করেন। মাত্র ৫ বছরে তিনি মাদরাসার শিক্ষা বিভাগকে আশাতীত সাফল্যে নিয়ে যেতে সম্পূর্ণভাবে সক্ষম হন। শিক্ষা সচিবের দায়িত্ব আদায়ের মাত্র ৫ বছর যেতেনা যেতে মাদরাসার সার্বিক উন্নতিকল্পে তাঁকে মুহতামিম বা প্রিন্সিপালের দায়িত্ব নিতে হয়। এ সময় তিনি নিজ শিক্ষক আল্লামা রিয়াছত আলী চৌঘরী (র.)-এর সহবত আরও ঘণিষ্ঠভাবে লাভ করেন। চৌঘরী (র.)-এর নির্দেশনা ও খাছদোয়ায় একাধারে ৪৭ বছর এ গুরুদায়িত্বে তিনি ছিলেন।

মাওলানা মুহাম্মদ তাহির আলী তহিপুরী (র.)-এর পাঠদানের বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে তাঁর অনেক ছাত্র আমাকে বলেছেন, তিনি বোখারী শরিফ থেকে শুরু করে যেকোন কিতাব ছাত্রের মেধা অনুপাতে ধীরস্থীরে, পৃথক পৃথক শব্দ প্রয়োগে, ধারাবাহিক ভাবে, পিছনের ছবকের সাথে মিলরেখে নিখুঁতভাবে পড়াতেন, যা প্রত্যেক ছাত্রের স্মৃতিতে স্পষ্টভাবে স্থান করে নিতো। তিনি কোনদিন লম্বা তাকরির দিতেন না, কঠিন শব্দগুলো পর্যবেক্ষন করে মূল বাক্য বা বাক্যের মূল শব্দগুলো সমাধান করে দেয়ার উপর গুরুত্বারোপ করতেন। কেউ কোন প্রশ্ন করলে স্নেহভরে জবাব দিয়ে বলতেন, ‘আপনার কি বিষয়টি হল (বুঝ) হয়েছে?’ হ্যাঁ বললে সামনে চলতেন। না হয় পূনরায় নতুন ভঙ্গিতে বুঝাতেন। এতে অন্য ছাত্র বিরক্ত হলে বলতেন, ‘বেটাত বুঝে নাই বলে এখানে বুঝতে এসেছে, তাকে বুঝতে দিন। একজন ছাত্রের কাজ হল না বুঝলে প্রশ্ন করে বুঝে নেয়া, আর শিক্ষকের দায়িত্ব হল তাকে সুস্পষ্টভাবে বুঝিয়ে দেয়া। এতে অন্য কেউ বিরক্ত হওয়া চলেনা।’ তাঁর ছাত্রদের বক্তব্য থেকে স্পষ্ট যে, তিনি অত্যন্ত দক্ষ এবং আদর্শবান শিক্ষক ছিলেন। প্রতিদিন তিনি ক্লাসে ঘন্টা বাজার সাথে সাথে হাজির হতেন। সময় অপচয় করতেন না। তিনি অবসর সময় হয় পাঠদানে, নয়তো ইবাদতে, নতুবা সমাজিক কাজে সময় দিতেন। তাঁর ঘুম ছিলো অল্প। প্রয়োজন ছাড়া কথা বলতেন না। তিনি কোন কাজের জন্যে কোথাও কাউকে পাঠালে কাজটি কি এবং কীভাবে করতে হবে, আনুমানিক কত সময় লাগবে ইত্যাদি অত্যান্ত পরিস্কারভাবে আস্তে আস্তে বুঝিয়ে দিতেন।

১৯৯৩ খ্রিস্টাব্দের ২৮ নভেম্বর শনিবার বিকাল চারটার দিকে হযরত (র.) আকস্মিক অসুস্থ্য হয়ে যান। সাথে সাথে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক ডেকে সুচিকিৎসার ব্যবস্থা করা হয়। মোট একমাস এগার দিন অসুস্থ অবস্থায় থেকে ৭ই জানুয়ারী ১৯৯৪ খ্রিস্টাব্দ মোতাবেক ২৪ শে পৌষ ১৪০০ বাংলা, ২৪ শে রজব ১৪১৪ হিজরী রোজ শুক্র বার দিবাগত রাত ১১ টা ৩০ মিনিটে তিনি ইন্তেকাল করেন। হযরত তহিপুরী (র.)-এর জানাযায় তাঁর ছাত্র, ভক্ত, মুরিদ এবং অনেক বুজুর্গদের উপস্থিতিতে ইমামতি করেন তাঁর মুর্শিদ হযরত শায়খে কৌড়ীয়া (র.)।

    Print       Email

You might also like...

11675_185

চাঁদের এক মাসে কয় পূর্ণিমা?

Read More →