Loading...
You are here:  Home  >  কলাম  >  Current Article

সিরিয়াকে নিয়ে মধ্যপ্রাচ্যে ভাঙা-গড়ার খেলা

Masumur Rahman Kaliliমাসুম খলিলী: মধ্যপ্রাচ্যের রক্তক্ষয়, ধ্বংসযজ্ঞ ও স্নায়ুযুদ্ধের হানাহানির কেন্দ্র হয়ে ওঠা সিরিয়ায় এখন নতুন নতুন ঘটনা ঘটছে। রাশিয়ার প্রত্যক্ষ সামরিক হস্তক্ষেপের মাস ছয়েক অতিবাহিত হওয়ার পর মস্কো সেখান থেকে সেনা প্রত্যাহারের ঘোষণা দিয়েছে। রুশ ঘাঁটির বাইরে বিমান হামলা ও স্থল অভিযানে সহায়তাকারী রাশিয়ান সৈন্যরা সিরিয়া ত্যাগ করতে শুরু করেছে ইতোমধ্যে। বড় ধরনের সামরিক অভিযান শুরু করে মাঝপথে সেনা প্রত্যাহারের ঘোষণা ভøাদিমির পুতিন কেন দিলেন, সে এক রহস্য ও হিসাব-নিকাশের ব্যাপার। ক্রেমলিন সরকারিভাবে বলছে, সিরিয়ার প্রেসিডেন্ট বাশার আল আসাদের অবস্থানকে সংহত করাই ছিল মস্কোর সামরিক অভিযানের মূল লক্ষ্য। সে লক্ষ্য ইতোমধ্যে অর্জিত হয়েছে। বহু এলাকা বাশারবাহিনী পুনর্দখল করতে সক্ষম হয়েছে। আলেপ্পো এবং এর আশপাশের এলাকা দখলের চূড়ান্ত অভিযানের দোরগোড়ায় গিয়ে মস্কোর সেনা প্রত্যাহারের ঘোষণা দেয়ার পেছনে ভিন্ন কোনো কারণ যে রয়েছে, তাতে সন্দেহ নেই।
রাশিয়া ঘোষণা দিয়েছিল, তার সামরিক অভিযানের লক্ষ্য হলো আইসিসকে ধ্বংস করা। আর এটি হলো মধ্যপ্রাচ্যে তার শীর্ষ এজেন্ডা। কিন্তু মস্কোর বিমান হামলার ঘটনাগুলোতে কোনো সময় মনে হয়নি যে, দেশটি আইএসকে ধ্বংস করতেই সেখানে গেছে। আর আইএস নিয়ন্ত্রিত উল্লেখযোগ্য কোনো এলাকা মস্কোর সামরিক সহায়তায় আসাদবাহিনী দখল করেছেÑ এমন কোনো তথ্যও নেই। এ ব্যাপারে পুতিনের একটি বক্তব্য ছিল বেশ তাৎপর্যপূর্ণ। তিনি বলেছিলেন, ‘আইএসের সাথে যুদ্ধ করাকে কেন্দ্র করে সব কিছু আবর্তিত হচ্ছে মনে করা ঠিক হবে না। প্রকৃতপক্ষে ভূ-রাজনৈতিক লড়াইয়ে রাশিয়ার ভবিষ্যৎ অবস্থান কী দাঁড়াবে সেটিই হলো গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু।’ সেনা প্রত্যাহারের ঘোষণায় পুতিনের এ বক্তব্যেরই সত্যতা মিলছে।
দ্বিতীয়টি হলো পুতিনের নিজস্ব ইমেজের বিষয়। সিরিয়া অভিযানের পর রুশ রাজনীতিতে পুতিনের কর্তৃত্বপরায়ণতা এখন আর আলোচনার বিষয় নয়। তিনি নিজে নিরঙ্কুশ ক্ষমতার শিখরে পৌঁছে গেছেন। সামনে হয়তো ক্ষমতা বর্তমান এ পর্যায়ে অব্যাহত থাকবে অথবা তা কমতে থাকবে। সিরিয়ায় যুদ্ধের শুরু এবং সমাপ্তির ঘোষণার মধ্যে স্পষ্টত বোঝা যায়, এর মধ্যে পুতিনের নিজ দেশের ক্ষমতায় কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার একটি বিষয়ও ছিল। যুদ্ধের শুরুর চেয়েও সমাপ্তি টানার ব্যাপারে রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দের মধ্যে অধিকতর ঐকমত্যের প্রয়োজন হয়। কিন্তু পুতিনের সে ধরনের কিছুর প্রয়োজন হয়েছে বলে মনে হয়নি।
এ বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ যে, সিরিয়ায় সামরিক অভিযানের সময় রাশিয়া কৌশলগত নানা স্বার্থকে বড় করে দেখলেও এর যে মূল্য রয়েছে তার হিসাব-নিকাশের সাথে বাস্তবতার কিছুটা ব্যবধান থেকে যায়। এ ক্ষেত্রে তুরস্কের সাথে সম্পর্ক একটি গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু। ন্যাটোর সদস্য হওয়ার পরও তুরস্কের সাথে রাশিয়ার গড়ে ওঠে বিশেষ অর্থনৈতিক সম্পর্ক। রাশিয়ার ওপর পাশ্চাত্য অর্থনৈতিক অবরোধ আরোপ করলেও আঙ্কারা নিজেকে এর বাইরে রাখে। রাশিয়ার একটি প্রধান গ্যাস বাজার হয়ে ওঠে তুরস্ক। নতুন একটি গুরুত্বপূর্ণ পাইপলাইন প্রকল্পে যুক্ত হয় দুই দেশ। সিরিয়ায় আকস্মিক রুশ অভিযান এবং এর জের ধরে একপর্যায়ে তুর্কি আঘাতে রুশ বিমান বিধ্বস্ত হওয়ার ঘটনায় দুই দেশের সম্পর্কের মারাত্মক অবনতি ঘটে। তুরস্কে রুশ পর্যটকপ্রবাহ এবং তুর্কি জনশক্তির রাশিয়া গমন বন্ধ হয়ে যায়। পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রসহ কয়েকটি বৃহৎ রুশ প্রকল্প হয়ে যায় স্থগিত। অন্য দিকে, সৌদি আরবসহ উপসাগীয় দেশগুলোর সাথে সম্পর্কের টানাপড়েনে তেলের বাজার নিয়ন্ত্রণে রাশিয়া প্রতিকূল অবস্থার মধ্যে পড়ে। রাশিয়ার সাথে এসব দেশের স্বার্থ-সংশ্লিষ্ট বেশ কিছু সমঝোতা অকার্যকর হয়ে পড়ে। এতে রাশিয়ার সিরিয়া বিজয়ের চূড়ান্ত হিসাব-নিকাশ অনেক বেশি ব্যয়বহুল হবে বলে প্রতীয়মান হয়।
রাশিয়ার সিরিয়া থেকে সামরিক উপস্থিতি প্রত্যাহারের পেছনে এ তিন কারণ ছাড়াও সক্রিয় থাকতে পারে যুক্তরাষ্ট্রের সাথে গোপন সমঝোতা। আমেরিকা রাশিয়ার সব ধরনের কৌশলগত স্বার্থকে নিজ স্বার্থের অনুকূল মনে করে না এ কথা সত্যি; কিন্তু মধ্যপ্রাচ্য ঘিরে যে পরিকল্পনা বাস্তবায়নের দিকে যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্ররা এগোতে চাইছে, তাতে মস্কোর সহযোগিতা প্রয়োজন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর সাইকেস-পিকট চুক্তির মাধ্যমে মধ্যপ্রাচ্যের যে বিভাজন হয়েছিল, সেটিকে ভেঙে দিয়ে নতুন বিন্যাসের পরিকল্পনার বিষয় এখন আর সংশ্লিষ্টদের অজানা নয়। এ বিভাজনে মধ্যপ্রাচ্যে পাশ্চাত্য শক্তির যেমন বিশেষ স্বার্থ রয়েছে, তেমনি রয়েছে ইসলামি বিশ্বের ভবিষ্যৎ ভূ-রাজনৈতিক স্বার্থের বিষয়। সাইকেস-পিকট চুক্তিতে এর আগে মধ্যপ্রাচ্যের যে মানচিত্র ছিল, তাকে একেবারেই পাল্টে দেয়া হয়। উসমানীয় খেলাফতের শেষ সময়ে আরব জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের অন্যতম প্রধান নেতা ছিলেন জর্ডানের বাদশাহ হোসেনের পিতা হোসেন বিন আলি। তিনি আশা করেছিলেন নতুন বিন্যাসে তিনি পুরো জাজিরাতুল আরবের রাজা হবেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত এটিকে ভেঙে জর্ডান নামে একটি রাষ্ট্র করে তার শাসক বানানো হয় তাকে। আবদুল আজিজ আল সৌদ হন জাজিরাতুল আরবের বড় অংশের বাদশাহ। এর নাম হয় তার পরিবারের নামে সৌদি আরব। সিরিয়া, ইরাক, লেবানন, লিবিয়া নামে আলাদা কোনো রাষ্ট্র আগে ছিল না। রাষ্ট্র ছিল না কুয়েত, কাতার, আমিরাত, ওমান বা বাহরাইন। এসব দেশ ভাগ করে তামিম গোত্রের বিভিন্ন প্রভাবশালী ব্যক্তিকে শাসক বানানো হয়। এই বিভাজনে মধ্যপ্রাচ্যের একটি প্রধান জাতিধারা ও ক্রুসেড বিজয়ী গাজী সালাউদ্দিন আইয়ুবির নিজ জাতিগোষ্ঠী কুর্দিদের চারটি রাষ্ট্রে বিভক্ত করা হয়েছে। তুরস্ক, ইরান, ইরাক, লিবিয়া বা আর্মেনিয়া প্রতিটি দেশেই কুর্দিরা আজ সংখ্যালঘু। সাংস্কৃতিক ও জাতিগত স্বাতন্ত্র্য নিয়ে সব দেশের শাসক এলিটদের সাথে দ্বন্দ্ব সৃষ্টি হয়েছে কুর্দিদের। এই দ্বন্দ্ব-সঙ্ঘাতে কুর্দি জাতিধারাকে এক দিকে স্বাধীনতার জন্য উসকে দেয় পাশ্চাত্য; আর সেই সাথে উগ্র ধর্মনিরপেক্ষতার আদর্শ গ্রহণ করকে সহায়তার জন্য করা হয় শর্ত। উসমানীয় খেলাফতের অবসানের পর খণ্ডিত তুর্কি রাষ্ট্রকে টিকিয়ে রাখতে কামাল আতাতুর্কের ওপরও এভাবে ধর্মবিরোধী উগ্র মতাদর্শ গ্রহণে বাধ্যবাধ্যকতা আরোপিত হয়েছিল। তুর্কি ভাষা লেখার হরফ আরবি থেকে পাল্টে করা হয় রোমান। আরবি নাম রাখা, এমনকি আরবিতে আজান দেয়া পর্যন্ত তুরস্কে নিষিদ্ধ করা হয়। অনেক মসজিদসহ ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানে তালা দেয়া হয়। এভাবে খণ্ডিত পরিসরে তুরস্কের রাষ্ট্রকাঠামো টিকে থাকে। ইস্তাম্বুল তুরস্কের অংশ হিসেবে থেকে যায়। খেলাফত বা ইসলামি উত্তরাধিকারকে তুরস্কের অগ্রগতির জন্য প্রতিবন্ধকতা হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার চেষ্টা হতে থাকে।
সাইকেস-পিকট চুক্তিবলে বিভক্ত-মধ্যপ্রাচ্যের নতুন বিন্যাসে কুর্দিদের জন্য আলাদা রাষ্ট্র গড়ার জন্য সেই শর্তই গোপনে রাখা হয়েছে তাদের সামনে। তাদের শুধু তুরস্ক, ইরাক ও সিরিয়ার রাষ্ট্রকাঠামোর সাথেই সঙ্ঘাতে নামানো হয়নি, একই সাথে আইএসের মতো উগ্র ‘ইসলামিস্ট’ হিসেবে পরিচিতদের সাথে লড়াইয়ে সামনে রাখা হয়েছে। এসব পদক্ষেপের অন্তর্গত কারণ হিসেবে বলা হচ্ছে মধ্যপ্রাচ্যের নতুন বিন্যাসের কথা। এ বিন্যাসের ব্যাপারে প্রকাশিত মানচিত্রে চার দেশের কুর্দি এলাকা নিয়ে ‘স্বাধীন কুর্দিস্তান’ করার বিষয় রাখা হয়েছে। এ ধরনের রাষ্ট্র নির্মাণের অর্থ হলো, তুরস্কের রাষ্ট্রশক্তির সাথে তাদের মুখোমুখি করা এবং ভঙ্গুর ইরাক সরকারের সাথে দ্বন্দ্ব-সঙ্ঘাত সৃষ্টি করা; একপর্যায়ে সঙ্ঘাতে জড়িয়ে ফেলা ইরানকেও। পাঁচ বছরের সঙ্ঘাতে সিরিয়ার অবস্থা এমন করা হয়েছে যে, বাশার আল আসাদ তার কর্তৃত্ব টিকিয়ে রাখতে সিরিয়ার কুর্দি এলাকায় স্বনিয়ন্ত্রিত শাসন বা ‘রাষ্ট্র’ গড়ার ব্যাপারটি একপ্রকার মেনে নিয়েছেন।
এখন মধ্যপ্রাচ্যের যে রাষ্ট্রশক্তিগুলো রয়েছে, তারা গত পৌনে এক শ’ বছরের রাষ্ট্রকাঠামোকে বহাল রাখতে চায়। সৌদি আরবসহ উপসাগরীয় দেশগুলো এ জন্য উপসাগরীয় সহযোগিতা পরিষদÑজিসিসি গঠন করেছে। এর পরিসর বাড়িয়ে একসময় আরব সেনাবাহিনী গড়ার প্রস্তাব ওঠে। এটিকে আরো বড় করে শেষ পর্যন্ত ইসলামি সামরিক জোটের যাত্রা শুরু করা হয়েছে। এ জোটে নেয়া হয়েছে সব সুন্নি রাষ্ট্রকে। ‘সুন্নি’ নাম দেয়া না হলেও লক্ষ্য রাখা হয়েছে সুন্নি রাষ্ট্রগুলোর জোট গঠনকে, যে জোট মধ্যপ্রাচ্যের বিদ্যমান রাষ্ট্রকাঠামো টিকিয়ে রাখতে আগ্রাসী শক্তিকে সম্মিলিতভাবে প্রতিরোধ করবে। এ উদ্যোগে তুরস্কও গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার হিসেবে যোগ দিয়েছে।
ইরানের যে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা রয়েছে, সেটি হলো মধ্যপ্রাচ্যে শিয়া ইসলামের আধিপত্য প্রতিষ্ঠা। এ জন্য ইরান সেখানে একটি কার্যকর সরকারব্যবস্থার পত্তন ঘটাতে পেরেছে। এ ব্যবস্থা পাশ্চাত্যের কাছে গণতান্ত্রিক হিসেবে গ্রহণযোগ্য না হলেও মুসলিম বিশ্বের সংখ্যালঘু ধর্মীয় ও জাতিধারা হিসেবে এটাকে পৃষ্ঠপোষকতা দানের মাধ্যমে মুসলিম দুনিয়ায় পরস্পর প্রতিদ্বন্দ্বিতাকে জোরালো করতে চাইছে পাশ্চাত্যের নীতিনির্ধারকেরা। ইরানের সাথে পারমাণবিক গবেষণা নিয়ে চুক্তির মাধ্যমে বিশ্বের দ্বার তেহরানের জন্য উন্মুক্ত করা হয়েছে। এর আগে সাদ্দামের পতন ঘটিয়ে ইরাকে শিয়া প্রাধান্য স্থাপনের মধ্য দিয়ে ইরানের প্রভাব বলয়কে ইরাক-সিরিয়া-লেবানন হয়ে উপসাগরীয় দেশগুলোর চতুর্দিক পর্যন্ত নিয়ে যাওয়া হয়েছে। ইয়েমেনে শিয়া হুথি উত্থানের মধ্য দিয়ে এক দিকে এডেন প্রণালী নিয়ন্ত্রণ, অন্য দিকে শিয়া অধ্যুষিত সৌদি অঞ্চল পর্যন্ত নিয়ে যাওয়া হয়েছে ইরানি প্রভাব। এ অবস্থাটিকে অত্যন্ত গভীরভাবে বিশ্লেষণ করলে সৌদি আরবকে তিন ভাগে বিভক্ত করার যে মানচিত্র ইউএস আর্মড ফোর্সেস জার্নালে প্রকাশ করা হয়েছে, তার যোগসূত্র পাওয়া যাবে এর সাথে।
মধ্যপ্রাচ্যে নব পর্যায়ের অস্থিরতা শুরু হয় ২০১০ সালে আরব বসন্তকে কেন্দ্র করে। এ জাগরণের জন্য মধ্যপ্রাচ্যের প্রভাবশালী দেশ তুরস্ক-কাতারকে পৃষ্ঠপোষক হিসেবে সামনে নিয়ে আসা হয়। এভাবে তাদের আরব রাজতান্ত্রিক দেশগুলোর মুখোমুখি করা হয়েছে। আরব বসন্তের পর অনুষ্ঠিত নির্বাচনে মিসর, তিউনিসিয়া, মরক্কোতে ইসলামিস্টদের বিজয়কে বাধা দেয়া হয়নি। আবার তাদের ক্ষমতা থেকে বিদায় করে নিশ্চিহ্নকরণের নানা কর্মসূচিও বাস্তবায়ন করা হচ্ছে।
সাধারণভাবে রাষ্ট্রকাঠামো ভেঙে দেয়ার জন্য প্রথম যে কাজটি বিশ্বশক্তিগুলো অবলম্বন করে তার মধ্যে রয়েছে স্থিতি নষ্ট করা। এ জন্যই হয়তো বা ইরাকে সাদ্দাম শাসনের অবসানের পর লিবিয়ায় গাদ্দাফির পতন ঘটানো হয়েছে। মিসরে মোবারকের পতনের পর বাশার আল আসাদের পতন ঘটানোর আন্দোলন থেকে গৃহযুদ্ধ সৃষ্টি করা হয়েছে সিরিয়ায়। কিন্তু কোনো পক্ষকে সেখানে জয়ী হতে দেয়া হয়নি। বাশারের পতনের মতো অবস্থা দেখা দিলে বিদ্রোহীদের সহায়তা কমিয়ে দেয়া হয়। সিরীয় বাহিনীর সামরিক হস্তক্ষেপের ঠিক আগ মুহূর্তে পুতিন-ওবামা বৈঠক হওয়ার প্রতি ইঙ্গিত দিয়ে অনেক বিশ্লেষক বলতে চাইছেন, আসাদের অবস্থান শক্তিশালী করার জন্য ক্রেমলিনের সামরিক হস্তক্ষেপে পেন্টাগনের অনুমোদন থাকতে পারে।
মধ্যপ্রাচ্যের প্রভাব বিস্তারের লড়াইয়ে রাশিয়া আবির্ভূত হয়ে সেখানকার ভাগ-বিভাজনে তার কর্তৃত্ব নিশ্চিত করতে চাইছে। যুক্তরাষ্ট্র তার এ ভূমিকাকে গ্রহণ করে নিলে নতুন মধ্যপ্রাচ্য বিভাজনের পরিকল্পনা বাস্তবায়নে নতুন কোনো রুশ-মার্কিন সমঝোতা কার্যকর করার চেষ্টা হতে পারে। এ প্রচেষ্টার প্রধান শিকার আদর্শগতভাবে করা হতে পারে মধ্যপন্থী সুন্নি ইসলামকে। আর রাষ্ট্র হিসেবে প্রধান লক্ষ্যবস্তু করা হতে পারে তুরস্ক ও সৌদি আরবকে। তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তৈয়ব এরদোগানের সাম্প্রতিক বক্তব্য এবং সৌদি আরবের প্রিন্স তুর্কি আল ফয়সলের মতো সাইড লাইনে থাকা নীতিনির্ধারকদের বক্তব্য বিশ্লেষণ করলে সঙ্কটের গভীরতা অনুমান করা যায়। তুর্কি পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেছেন, স্বাধীনতার পর থেকে তার দেশ এত বড় সঙ্কটে পড়েনি।
এ দু’টি দেশকে অর্থনৈতিক এবং নিরাপত্তার দিক থেকে দুর্বল করার জন্য এক দিকে প্রতিবেশী রাষ্ট্রিক-অরাষ্ট্রিক নানা শক্তির সাথে সঙ্ঘাতে জড়ানো হয়েছে। অন্য দিকে, অন্তর্ঘাতী বোমা হামলার মতো ঘটনা ঘটিয়ে সামাজিক ও অর্থনৈতিকভাবে অস্থির করে তোলা হয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যের মানচিত্রের নব বিন্যাসের পরিকল্পনা পাশ্চাত্যের পরিত্যাগ অথবা তা সফল না হওয়া পর্যন্ত এ অস্থিরতা চলতে থাকবে। এ ক্ষেত্রে দাবার ঘুঁটি হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে সিরীয় পরিস্থিতিকে। এটি দিয়ে এক দিকে তুরস্কের অখণ্ডতাকে লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছে। অন্য দিকে উপসাগরীয় দেশগুলোর রাষ্ট্রিক নিরাপত্তাকে হুমকিতে ফেলা হয়েছে। ইসরাইল এবং পাশ্চাত্যের বিভিন্ন মিডিয়ায় বলা হচ্ছে, ওয়াহাবি মতাদর্শের সৌদি শাসন এবং ইসলামি ফেভারের একেপি শাসন তাদের বৃহত্তর স্বার্থের জন্য ক্ষতিকর। দেশ দু’টির অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা হুমকি এবং সীমান্তের চার পাশের উত্তেজনাকর অবস্থার সাথে এ বিষয়টিকে মিলিয়ে পাঠ করতে হবে।
এ অবস্থায় নিজেদের মানচিত্রকে অপরিবর্তিত রাখতে একটি সম্মিলিত উদ্যোগ নেয়ার প্রচেষ্টা মধ্যপ্রাচ্যে রয়েছে। রাষ্ট্রের মধ্যে আদর্শগত নানা বিভাজন সত্ত্বেও বৃহত্তর রাষ্ট্রীয় অখণ্ডতা বজায় রাখতে ও অরাজকতা ঠেকাতে জনগণ সরকারকে সমর্থন জুগিয়ে যাচ্ছে। মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো শক্ত ও পরিণামদর্শী ভূমিকা নিতে পারলে দুই বৃহৎ শক্তি যুক্তরাষ্ট্র ও রাশিয়ার নতুন ভাগবাটোয়ারা এবং ইসরাইলি আঞ্চলিক আধিপত্য প্রতিষ্ঠার পরিকল্পনার আগ্রাসন থেকে নিজেদের রক্ষায় সফল হতে পারে। সে ক্ষেত্রে পাশ্চাত্য মধ্যপ্রাচ্য নিয়ে নতুনভাবে পরিকল্পনা নিতে বাধ্য হবে।

    Print       Email

You might also like...

রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ ধেয়ে আসছে

Read More →